somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গণজাগরণের আন্দোলন: নতুন আলোর পথে

১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ বিকাল ৫:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অনেকদিন আগে এক আড্ডায় কথা উঠেছিলো, এখন আবার মুক্তিযুদ্ধ হলে মানুষজন কি যুদ্ধে যেতো? কয়েকজন আবেগী হয়ে বলেছিলো, "হ্যা অবশ্যই সবাই যেতো", একজন চিন্তা ভাবনা করে বলেছিলো, "এখনতো আমাদের পূর্ণশক্তির সামরিক বাহিনী আছে, যুদ্ধ করবে ওরা, সাধারণ মানুষ যুদ্ধে যাবে কেন?" যাইহোক, শেষপর্যন্ত সবাই স্বীকার করে নেয়, "নাহ! এখন কেউ যুদ্ধে যাবেনা, সবাই নিজের ধান্দাটাই বুঝে, দেশের ব্যাপারে অভিযোগ করতে খাড়া, কিন্তু দেশের জন্য জীবন বাজী রাখবে এইরকম বান্দা এখন আর তেমন একটা নাই।" এখন আমরা উপলব্ধি করছি, আমরা ভুল ভেবেছিলাম, এদেশের অনেক মানুষ এখনো দেশের জন্য যুদ্ধে যেতে রাজী।

৭১ এর যে ধারণা আমরা বাবা-চাচা বা বিভিন্ন লেখালেখি থেকে জানতে পারি, সেখানে বুঝা যায় পাকিস্তানীদের অত্যাচারে যখন দেশের মানুষ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো তখন দেশে আসলে তিন ধরনের মানুষ ছিলো। এক ধরনের মানুষ হচ্ছে দেশের অধিকাংশ মানুষ, যারা রাজপথে নেমে আন্দোলন করেছে, পরে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ করেছে অথবা যোদ্ধাদের সাহায্য করেছে, তাদের জন্য লেখালেখি করেছে, বিভিন্নভাবে সমর্থন জানিয়েছে। আরেকপক্ষ ছিলো যারা মনে করেছে পাকিস্তানের কথা মতো চললেই ভালো, এমনকি পাকিস্তানের প্রতি তাদের সমর্থন জানানোর জন্য অনেকে নিজের দেশের মানুষকে হত্যা করতেও কার্পণ্য করেননি। এদের মধ্যে কয়েকজন রাজনৈতিকভাবে পুরো মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের মানুষের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিলো আর কয়েকজন নেহায়েত ধান্দাবাজ, এই সুযোগে শক্তিশালী পাকিস্তানে পক্ষে থেকে কিছু সুবিধা কামিয়ে নেয়াই এদের উদ্দেশ্য ছিলো। যাহোক, এদের সবাইকেই আমরা সমষ্টিগতভাবে রাজাকার নামে চিনি এবং এদেরকে দেখলে এখনো আমাদের মুখে আপনাআপনি থুথু চলে আসে। এর বাইরে স্বল্প সংখ্যক আরেক ধরনের মানুষ ছিলো সেই সময়, যারা দেশকে ভালবাসতো, পাকিস্তানের অনৈতিক শোষণকে ঘৃণা করতো, কিন্তু পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে আন্দেোলনে এরা শরীক ছিলোনা। এরা হুজুগের বশে লাফালাফি করা, দেশের মধ্যে ঝামেলা সৃষ্টি হোক চাইনা, শেখ মুজিব ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এইসব করছে - এইসব বুলি আউড়াতো, দেশ ঠিক হয়ে যাক এইটা এরাও চাইতো কিন্তু নিজে কষ্ট করে দেশ ঠিক করতে রাজী ছিলোনা। যাই হোক, ধরে নেয়া যায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে হানাদারবাহিনী আর রাজাকাররা এদেরকেও ছাড় দেয়নাই, অতএব এরাও হয়তো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি হয়ে গিয়েছিলো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এরা নিশ্চয় বড় বড় চাকরী বাকরী করেছেন, এম ডি, জি এম হয়েছেন, কমান্ডার, জেনারেল হয়েছেন, বড় বড় ব্যবসা বাণিজ্য করেছেন। যেখানে এরআগে পাকিস্তান আমলে কোন বাংগালীর পক্ষে কোন প্রতিষ্ঠানের প্রধান হওয়া দূরের কথা, বড় কোন চাকরীরও সুযোগ ছিলনা, বড় ব্যবসা বাণিজ্যের সুযোগ ছিলোনা, কোন আর্মি অফিসার মেজরের উপরে উঠা সম্ভব ছিলোনা, ভালো সবকিছু ছিলো পাকিস্তানীদের দখলে। দেশ স্বাধীন হওয়ার সুফল কিন্তু শুধু প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মুক্তিযোদ্ধারা পেয়েছে তা নয়, সবার জন্যই সুবিধাগুলো ছিলো, সবাই তা গ্রহণ করেছে এমনকি রাজাকাররাও! কিন্তু জাতি বেঈমানী কখনো ভোলেনা, শ্রদ্ধাটা তাই শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যই রয়ে গেছে।

এখনকার আন্দোলন হয়তো মুক্তিযুদ্ধের মতো বিশাল নয়, কিন্তু তাও কেমন যেন মিল আছে। এখানেও দেশের অধিকাংশ মানুষ এর পক্ষে, রাজপথে, ফেসবুকে, ব্লগে যেভাবে হোক। এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কিন্তু এই গণজাগরণটাই। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম এ দেশের মানুষ দেশের সব সমস্যা নিয়ে সবসময় গালিগালাজ করেই যাবে, দরকার হলে পরিবর্তনের জন্য ঝাপিয়ে পড়বেনা। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ধরেই নিয়েছিলো দেশকে নিয়ে যা ইচ্ছা করলেও দেশের মানুষ কখনো রাস্তায় নামবেনা, ফেসবুকে দুইটা গালি দিবেতো! কি আসে যায়! কিন্তু এই গণজাগরণ সবাইকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এখন আমরা জানি কিছু হলেই আমরা প্রতিবাদ করবো। রাজনৈতিক দলগুলো জানে যা ইচ্ছে করার দিন শেষ, সাধারণ মানুষ কিন্তু ছেড়ে দিবেনা! মানুষকে জাগিয়ে তোলার জন্য খুনী রাজাকারদের ফাঁসীর দাবী ছিলো সবচেয়ে আদর্শ। এই একটা জায়গায় এদেশের সব(প্রায় সব) মানুষ সমানভাবে আন্দোলিত। এইটা সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের দাবী। এই কারণেই এর সাথে পদ্মা সেতু, হলমার্ক কেলেংকারীর তুলনা হয়না। এইদেশের চিটাগাং বা রংপুরের একজন কৃষক বা দিনমজুর আসলে পদ্মাসেতু নিয়ে কতটুকু বিচলিত হবে বা কতটুকু জানে বলে আমরা আশা করি? হলমার্ক কেলেংকারী পটুয়াখালী বা মৌলভিবাজারের সাধারণ একজন মানুষের পক্ষে বোঝা কতটুকু সম্ভব? এইসব দাবী নিয়ে সমগ্র বাংলাদেশে আন্দোলন কি আসলে সম্ভব হতো? কিন্তু এখন সম্ভব। কারণ, ঐ যে গণজাগরণ তৈরী হয়ে গেছে! এই জায়গা থেকে আস্ত আস্তে দেশের পরিবর্তন হবে আমরা বিশ্বাস করি। আমাদের দেশে ৭১ এর শিক্ষা থেকে বলছি, এদেশের মানুষ কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের মনে রাখে, সেই সাথে রাজাকারদেরও। এখনকার মানুষের দ্বিতীয় পক্ষ, যারা এখন আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্হান নিয়েছে তাদের মনে রাখা উচিত ৪০ বছর পরেও জাতি আজ রাজাকারদের গালি দিচ্ছে। কাদেরকে বাঁচানোর জন্য সবার কাছে ঘৃণিত হওয়ার সম্ভাব্য পথে এরা এগিয়ে যাচ্ছে আমার ধারণা এরা নিজেরাও তা জানেনা। আর যে বুদ্ধিমান তৃতীয় পক্ষ দেশের সব সমস্যা নিয়ে সবসময় বিরক্ত, তারা চান সবকিছু ঠিকমতো চলবে, তারা বড় বড় চাকরী করবে, আরাম করে লাইফ কাটাবে, গাড়ীতে করে ঘুরে সহজে ঘুরে বেড়াবে, ফ্রি ফ্রি সবকিছু পাবে, এইগুলা নাহলে এরা খুব রেগে যাবে। এরা ধরেই নিয়েছে দেশতো ওদেরকে একটা পার্ফেক্ট লাইফ দিতে বাধ্য, কিন্তু দরকার হলে দেশের জন্য ঝাঁপয়ে পড়তে এরা রাজী না। এরা দেশকে ভালোবাসে হয়তো, রাজাকারদের ফাঁসীও চায় হয়তো, কিন্তু এইসব আজাইড়া, হুজুগে লাফালাফি করে ঝামেলা তৈরী করা এরা পছন্দ করেনা, সমর্থনও করেনা। যুগে যুগে মানুষের স্যাক্রিফাইসেই যে আজকে আমরা নানান সুযোগসুবিধা পাচ্ছি সেটা এদের মাথায় থাকেনা। জাতি হয়তো এদেরকে রাজাকারের দোসরদের মতো ঘৃণা কখনো করবেনা, কিন্তু এদের জন্য ভালোবাসা বা শ্রদ্ধাটাও কিন্তু থাকবেনা!

পরিশেষে, আরেকটা খুবি ক্ষুদ্রগোষ্ঠীর মানুষও আজকের আন্দোলনের শামিল যাদের মূল আক্রোশ মনে হয় ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে! এরা মূলত নাস্তিক এবং অনেকে নিজেকে অতি প্রগতিশীল পরিচয় দিতে পছন্দ করে। জামায়েতে ইসলামী যে আজকে ৪০ বছর পরেও বাংলাদেশে টিকে আছে তাঁর মূল কারণ তারা খুব সুপরিকল্পিতভাবে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের একটা অংশকে বুঝিয়ে এসেছে জামায়েতে ইসলামী হচ্ছে এদেশের ইসলামের পথে মুক্তির একমাত্র উপায়! মুসলিমদের অবশ্যই জামায়েতে ইসলামী করা উচিত জাতীয় ব্রেইন ওয়াশ নামক পদ্ধতির মাধ্যমে তারা এ ব্যাপারে ব্যপকভাবে না হলেও কিছুটা সফল। জামায়েতে ইসলামীকে গালি দিতে গিয়ে ইসলাম নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলা মানে কিন্তু জামায়েতে ইসলামীর এতদিনের চেষ্টাকেই সাপোর্ট দেয়া! পশ্চিমা মিডিয়া যারা সবসময় ইসলামের দোষ খুঁজতে খুবি আগ্রহী, তারাও এই সুযোগে জামায়েত নেতাদের দেশের ইসলামিক নেতা ট্যাগ দিয়ে তাদের কুকীর্তি এবং এখন তাদের বিচারের দাবীর নিউজ কাভার করেছে; গোলাম আজম, নিজামী, কাদের মোল্লারা কি আসলে এদেশের মুসলিমদের নেতা নাকি শুধুমাত্র জামায়াতে ইসলামীর নেতা যারা এদেশের অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছে??? এদেশের মুসলিম মানেই জামায়েতে ইসলামীর সমর্থক না এবং জামায়েত ইসলামী কখনোই মূল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারেনা। এই ক্ষুদ্র আজাইড়া গ্রুপকে বলছি, ইসলাম নিয়ে ফালতু প্রোপাগান্ডা ছড়াবেননা, নাস্তিকতাএবং তথাকথিত প্রগতিশীলতা পছন্দ হলে ঐগুলো নিয়ে থাকুন, অন্তত আজকে যেসব মুসলিম রাস্তায় আন্দোলন করছে বা সমর্থন জানাচ্ছে তাদেরকে সম্মান জানানোর জন্য হলেও ইসলাম নিয়ে বাজে কথা বলা বন্ধ করুন। অন্যরাও না বুঝে ইসলামবিরোধী কথাবার্তায় তাল দিবেননা দয়া করে।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ সকাল ১০:৪০
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মোদির সাথে ডঃ ইউনূসের সাক্ষাৎ এবং.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৬ ই এপ্রিল, ২০২৫ সকাল ৭:৫০

মোদির সাথে ডঃ ইউনূসের সাক্ষাৎ এবং.....

'সাইড লাইনে সাক্ষাৎ" দেখে যারা উল্লাসে উচ্ছ্বসিত, আনন্দে উদ্ববেলিত....কেউ কেউ আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে গলাবাজি করছেন- ভারত ভুল বুঝতে পেরেছে, ডক্টর ইউনুস স্যারের কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইউনূস বিদেশে দেশকে করছেন অপমান-অপদস্থ

লিখেছেন sabbir2cool, ০৬ ই এপ্রিল, ২০২৫ সকাল ১০:৪৬


দুর্নীতির কারণে তার যাওয়ার কথা ছিল জেলে, গেছেন তিনি বঙ্গভবনে প্রধান উপদেষ্টার শপথ নিতে। এটা খোদ মুহাম্মদ ইউনূসের স্বীকারোক্তি ছিল। তার দেশশাসনের আট মাসে বিদেশে যখন গেছেন তিনি, তখন স্বীকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

=এখানে আর নিরাপত্তা কই!=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৬ ই এপ্রিল, ২০২৫ বিকাল ৩:১৩


কোন সে উন্নয়নের পথে হাঁটছি বলো
এই গিঞ্জি শহর কি বাসের অযোগ্য নয়?
শূন্যে ভাসমান রাস্তা-নিচে রাজপথ
তবু কি থেমে আছে যানজট কিংবা দুর্ঘটনা?

দৌঁড়ের জীবন-
টেক্কা দিতে গিয়ে ওরা কেড়ে নেয় রোজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

এই শহর আমার নয়

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৬ ই এপ্রিল, ২০২৫ বিকাল ৫:০২




এই শহর আমার নয়
ধুলিমলিন, পোড়া ধোঁয়ায় ঘেরা
ধূসর এক স্বপ্নহীন চেহারা।
এই শহর, আমার নয়।

ঘোলাটে চোখে জমে হাহাকার,
চেনা মুখেও অচেনার ছাপ।
পথে পথে স্বপ্নরা পোড়ে,
আলোর ছায়ায় খেলে আঁধার।

এই শহর... ...বাকিটুকু পড়ুন

টিউবওয়েলটির গল্প

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৬ ই এপ্রিল, ২০২৫ রাত ৯:০৪



এটা একটি টিউবওয়েল।

২০০৯ সালে, যখন আমি নানী বাড়ি থেকে লেখাপড়া করতাম, তখন প্রতিদিন এই টিউবওয়েল দিয়েই গোসল করতাম। স্কুল শেষে ক্লান্ত, ঘামাক্ত শরীর নিয়ে যখন ঠান্ডা পানির ঝাপটায় নিজেকে স্নান... ...বাকিটুকু পড়ুন

×