মাঝে মাঝে ব্লগ ঢুকে যখন কিছু মানুষরূপী শেয়ালের ঘৃন্য আচরণ দেখি আর আরও দেখি আমাদের বিদ্বান-বিদূষী রমন (মধুসুদন থেকে ধার নিলাম) এবং রমনীগন সেটা হাসিমুখে সহ্য করে যাচ্ছেন, দেখেও না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন তখন আমি বিহবল হয়ে ভাবি আমরা কি টাইম মেশিনে করি পিছিয়ে যাচ্ছি? এরই নাম কি শিক্ষা? শিক্ষা মানুষকে যদি সঠিক কথা বলার, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহসই না যোগালো তাহলে সেই শিক্ষার কি দাম আছে?
আজকে সারাদিন খুব এলেবেলে ঘুরে বেড়ালাম, ঘুরতে ঘুরতে এক সময়ে ন্যাশনাল আর্কইভে চলে গেলাম। সেখানে দেখে হয়ে গেলো ঢাকার উনিশ শতকের কয়েকজন নারীদের সাথে, অবশ্যই বইয়ের পাতায়!
সেই সময়েও এত প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও কেমন করে তাঁরা নিজ নিজ অবস্থানে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন, দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। আমি চাইছি আমার সেই মুগ্ধতা সবার সাথে শেয়ার করতে.........

হরিপ্রভা তাকোদা
হরিপ্রভা তাকোদাকে বলা হয় আধুনিক বাঙালি নারীর প্রথম অধ্যায়।
আপত: দরিদ্র কিন্তু শিক্ষিত এক পরিবারে হরিপ্রভা জন্ম গ্রহণ করেছিলেন ১৮৯০ সালে। পিতা শশী ভূষন মল্লিক ছিলেন নবধর্মে দীক্ষিত এক আধুনিক মানুষ। উনিশতকের শেষ দিকে শশীভুষন পরিবার ঢাকায় চলে আসেন এবং এখানে স্থাযী ভাবে বসবাস শুরু করেন।
প্রথম জীবনে হরিপ্রভা কোথায় পড়াশুনা করেছিলেন সে বিষয়ে স্পষ্ট কোন তথ্য জানা যায়নি। তবে সম্ভবত তিনি ইডেন স্কুলে মেট্রিক পর্যন্ত পড়েছিলেন।
অন্যদিকে জাপানি তরুন উয়েমন তাকেদা ভাগ্য ফেরাতে এসেছিলেন ঢাকায়, তার একটি সাবানের ফ্যাক্টরি ছিল নাম 'ইন্দোজাপানিজ সোপ ফ্যাক্টরী"!
এক সময়ে এই তাকেদার সাথে পরিচয় হয়ে হরিপ্রভার এবং সেই পরিচয় থেকেই বিয়ে!
আর এটাই ছিল প্রথম কোন বাঙালী মহিলার সাথে জাপানি বিয়ে আর কোন জাপানিরও প্রথম বাঙালি বিয়ে!
যাই হোক, তাকোদার সাবানের কারখানা বেশি দিন না চলায় ১৯১২ সালের দিকে তিনি কারখানা গুটিয়ে স্ত্রী সহ জাপানে চলে যান, এটাই ছিল কোন বাঙালি মহিলার প্রথম জাপান যাত্রা, যা সে সময়ে প্রবল আলোড়ন তুলেছিল সমাজে।
তাকোদা দম্পতি জাপানে ছিলেন চার মাস, এরপর তারা আবার ঢাকায় ফিরে আসেন। ফিরে আসার দু'বছর পরে ১৯১৫ সালে হরিপ্রভা তাকোদার জাপান ভ্রমন কাহিনী নিয়ে লেখা বই "বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা" প্রকাশিত হয়। ৬১ পাতার বইটির দাম ছিল চার আনা!

বঙ্গমহিলরা জাপান যাত্রা বইয়ের প্রথম পাতা~
বলা যায় বাংলা ভাষায় রচিত জাপান সংক্রান্ত প্রথম পূর্ণাঙ্গ বই হলো হরিপ্রভার "বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা"। শুধু বাংলা ভাষাতেই নয় চীন বা পূর্ব এশিয়ার বাইরে এশিয়ার অন্য কোন ভাষায় জাপান সংক্রান্ত এমন বই রচিত হয়েছিল কিনা সেটা গবেষণার বিষয়!
অসাধারণ ছিল তাঁর পর্যবেক্ষন শক্তি আর যাত্রা পথের সূক্ষ ও সাবলীল বর্ণানায় মুগ্ধ হয়েছিল সে সময়ে বঙ্গবাসী!

নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের সাথে জাপানের টোকিওতে কালো শাড়ি পরা হরিপ্রভা তাকোদা
১৯৭২ সালের কোলকাতার শম্ভুনাথ হসপিটালে জীবনাবসান হয় হরিপ্রভা তাকোদা নামের "ঢাকা শহরের প্রথম আধুনিক মহিলার"!

লীলা নাগ:
লীলাবতী নাগ, লীলা নাগ বা লীলা রায় তিন নামেই তিনি পরিচিত। বিশ শতকের প্রথমার্ধে শুধু ঢাকা শহরেই নয়, পুরো বাংলায় অসামান্য মহিলা, রাজনিতীবিদ, সংগঠক হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি।
১৯০০ সালে লীলা নাগের জন্ম হয় আসামের গোয়ালপাড়া, পিতা গিরীশ চন্দ্র রায়। গিরীশ চন্দ্র সিভিল সার্ভিসের চাকরীর অবসর নেবার পরে ঢাকার বকশিবাজারে বসবাস শুরু করেন। এর মাধ্যে লীলা বেথুন কলেজ থেকে ইংরেজী সাহিত্যে অর্নাসে প্রথম হয়ে স্বর্ণ পদক পান।
ইতমধ্যে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে, লীলা সেখানে ইংরেজীতে এম.এ করতে চাইলেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখনো সহশিক্ষা হবে কিনা, সে বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত না হয়নি। অন্যদিকে লীলাও নাছোড়বান্দা, সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ করবেনই, তখন উপাচার্য হার্টগ তাকে এম.এ পড়ার অনুমতি দান করেন।
লীলা নাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী হিসাবে ভর্তি হলেন, সাথে সুষমা সেনগুপ্ত নামের আরেকজন ছাত্রী।
লীলা নাগ শুধু ঢাকা বিশ্ববদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রীই ছিলেন না, ছিলেন গুপ্ত সংস্থার প্রথম নেত্রী, বিনা বিচারে আটক প্রথম মহিলা কারাবন্দী, প্রথম ছাত্রী সংগঠক!
বিয়ে করেছিলেন সহপাঠী অনিল রায়কে।
১৯২৩ সালে লীলা গঠন করেছিলেন "দীপালি সংঘ" নামের মেয়েদের একটি সংগঠন যেটা ছিল বিশ শতকের ঢাকার ইতিহাসের একটা মাইল ফলক।
তিনিই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দিপালী হাইস্কুল যা বর্তমানে কামরুন নেসা হাই স্কুল নামে পরিচিত। নারী শিক্ষা বিস্তারে তার উৎসাহ ছিল অপরিসীম, ১৯২৮ সালে তিনি নারী শিক্ষা মন্দির নামে স্কুল স্থাপন করেছিলেন, পরে সাম্প্রদায়িক কারণে যার নামে হয়ে যায় 'শেরে বাংলা বালিকা বিদ্যালয়'!
মহিলাদের জন্য একটা মাসিক পত্রিকাও নিয়মিত ভাবে প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি, নাম ছিল জয়শ্রী। এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে বাংলার সকল বিখ্যাত সাহিত্যিকগণই লিখেছেন। এখানেই রবীবাবুর বিখ্যাত গান 'আত্মজয়ী নামে ছাপা হয়েছিল....
'সংকোচেরই বিহ্ভলতা নিজেরে অপমান
সংকটের কল্পনাতে হোয়োনা ম্রিয়মান
মুক্ত করো ভয়
আপন-মাঝে শক্তি ধরো নিজের করো জয়।"
তিনি কাজ করেছিলেন পূর্ব বাংলার সংখ্যলঘু রক্ষা ও শরণার্থীদের পুনর্বাসনে। সক্রিয় ছিলেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে। এ সময়ে সুফিয়া কামাল কোলকাতা থেকে ঢাকায় শরনার্থী হয়ে আসলে লীলা রায় তাকে সাহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর উদ্যোগে গঠিত হয়েচিল "পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সমিতি" যা বর্তমান মহিলা সমিতির শেকড়।
এরপর পূর্ব পাকিস্তান সরকারের কোপানলে পরে ১৯৫১সালের দিকে এই দম্পতি ঢাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
সাহসী সংগ্রামী এই নারীর ১৯৭০ সালে মৃত্যুবরন করেন।

মেহেরবানু খানম
মেহেরবানু খানম, ঢাকার প্রথম মুসলমান মহিলা চিত্রকর!
ঢাকার নবাব খাজা আহসানউল্লাহর মেয়ে মেহেরবানু(১৮৮৫-১৯২৫) ছেলে বেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি প্রবল আগ্রহী ছিলেন,পারিবারিক বিধিনিষেধও তাকে দমাতে পারেনি! তবে বিয়ের পরে তাঁর স্বামী সন্তানেরা খুব উৎসাহ দিয়েছেন তাকে।
১৯২০ সালে তার আকা একটি ছবি প্রথম 'মোসলেম ভারত' পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, সেটা দেখে মুগ্ধ হয়ে কাজী নজরুল ইসলাম "খেয়া পারের তরনী" লিখে ফেলছিলেন!
অচ্ছন বাঈ:
অচ্ছন বাই ছিলেন উনিশ শতকের ঢাকার বিখ্যাত বাঈ! তিনি শুধু নাচ বা গানেই সেরা ছিলেন না, ঠুমরী গানের চমৎকার সব বন্দিশও রচনা করে গেছেন, যার কিছু প্রামাণ্য রচনা এখনও শুদ্ধ সংগীত মহলে প্রচলিত হয়ে আসছে।

আন্নু, গান্নু ও নওয়াবীন:
এরা তিন বোন এবং উনিশ শতকের ঢাকার বিখ্যাত বাই। যে কারণে তাদের স্মরণ করছি, এই তিন বোন মিলে ১৮৮০ সালে ঢাকার পূর্ববঙ্গ রঙ্গভূমি ভাড়া নিয়ে মঞ্চস্থ করেছিলেন সে আমলের বিখ্যাত উর্দু নাকট 'ইন্দ্রসভা" এবং এটাই ছিল ঢাকাতে মেয়েদের অভিনিত প্রথম কোন নাট্যাভিনয়! এছাড়াও 'যাদুনগর' নামের আরেকটি নাটকও তারা মঞ্চস্থ করেছিলেন।
সুতরং একবিংশ শতকের আধুনিকাগণ কেন এখনও এত ভয় এত সংকোচ! সাহসি হয়ে ওঠো তুমি! জীবনের মানেটাকে খুঁজে বার করার চেষ্টা করো ভগিনীগণ.....
আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে পড়তে পারেন মুনতাসির মামুনের "ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী"
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০১২ বিকাল ৫:১৯