
আকাশে অনেক্ষন ধরে চিলটা উড়ছে। জিনিষটা মোটেই ভালো ঠেকছেনা জমিরন এর কাছে। সদ্যই বাচ্চা ফুঁটানো মুরগীটা বারে বারে বাচ্চাদের তার কোলের তলে আশ্রয় দিতে বাধ্য হচ্ছে যখন সুযোগসন্ধানি চিলটার ছায়া ক্রমশ বাড়ছে। অলুক্ষনে চিলটার জন্যই হোক কিংবা অন্য কোনো কারনেই হোক মনটা ভার হয়ে আসে। কি ছিলো তাদের জীবন এখন কি হয়েছে। আশার আলো দেখা দিয়েছে নূরি’র জন্মের পর থেকে। জন্মের সময় সাদা ধবধবে ছিলো, মনে হচ্ছিল গা থেকে আলো ঠিকরে পড়ছে তাই নাম দেওয়া হয়েছিলো নূরি। মেয়েটা সুলক্ষনা। ওর জন্মের পর থেকেই সংসারে এক্টুখানি সচ্ছলতা আসে। ও এখন ক্লাস এইটে উঠেছে ওদের সচ্ছল ঘরে আলো ঢুকার চেষ্টা করছে। এখন মুরগী’র ঘর বড় করতে হয়েছে, লাউ এর মাচাং লাউয়ের ভারে নুয়ে পড়েছে। নূরি'র বাবার ইচ্ছা এবার একটা পুষ্কনি কাটবে। গঞ্জের কাছের জমিতে ধান হয়েছে অনেক, পেকে গেছে কয়েকদিন পরেই তুলতে পারবে সোনালী ধান। সেই উপলক্ষ্যেই নূরি’র বাপ গঞ্জে গেছে কাস্তে আর জন ঠিক করতে। ধানের মৌসুমে কামার আর জন’দের সুসময়, তাদেরকে অগ্রীম না বললে, প্রয়োজনের সময় পাওয়া দুস্কর হয়ে উঠে। সোনালী স্বপ্ন দেখে আর জমিরন সন্তান আর স্বামীর জন্য ভাত রাঁধে। তবুও মনটার মাঝ থেকে খচখচ ভাবটা দূর হয়না। কিছুক্ষন পরেই নূরী আর তার বাপ ফিরবে সেই আশাটাও মনের দুঃশ্চিন্তা দূর হয়না। সেটা হতে পারে এই নিরিবিলিতে বসতবাড়িতে একাকী থাকার জন্য আবার হতে পারে আকাশে চিলটা উড়ার জন্য। কারো উপর দোষ চাপিয়ে এখন কিছুটা নির্ভার লাগছে জমিরনের।
- কি গো! ঘরত কেউ আছোনি?
ডাক দিতে দিতে জমিরনের আঙ্গিনায় সুরত মিয়া ঢুকে, সদ্য লেপা উঠোনটাতে ফেলে লাল রঙের পানের পিক। সুরত মিয়াকে দেখে আড়ষ্ট জমিরন আরো আড়ষ্ট হয়ে ঘোমটা টেনে দেয়, সুরত মিয়ার শকুন চক্ষু হৃষ্টপুষ্ট লাউয়ের দিকে নাকি তাকে পর্যবেক্ষন করছে বুঝে উঠতে পারে না জমিরন। আড়ষ্টতা নিয়েই বলে,
- নূরি’র বাপ গঞ্জে গ্যাছে মিয়াসাব।
- ও! আইচ্ছা, আইলে তারে দেখা করতে কইয়ো আমার লগে। অনেকদিন তোমাগো খোঁজ খবর নিয়া হয়না তাই ভাবলাম পথে যখন পড়ছে সালামের বউ মাইয়ারে দেখেই যাই।
বলতে বলতে জমিরনের টুল টানতে দেখে “যাইগা, সালামরে পাঠায়া দিও” বলে সুরত মিয়া চলে যায়। কিছুটা স্বস্তি ফেরে জমিরনের। মানুষটার জন্য দম আটকে গেছিলো। মোটামুটি অপরিচত মানুষ দেখলেই অস্বস্তিতে পড়ে যায় জমিরনের সেই ছোটবেলা থেকেই।
খুব বেশি দেরি হয়না সালাম আর নূরির ফেরত আসতে। তবুও দম বন্ধ ভাবটা কাটেনা জমিরনের। আজ সারাদিন এমন ভাবেই যাবে মনে হয়। তারউপর নূরির বাপের এবং নূরির মুখটাও কালো হয়ে আছে বাসার ঢুকার পর থেকেই। বলবে কি বলবে না দ্বিধাগ্রস্ত থেকেও বলে ফেলে জমিরন,
- মিয়াসাব আইছিলো, আপ্নারে দেখা কর্বার কইছে!
কিছুক্ষন চুপ করে থেকে শুনেও না শুনার ভাণ করে, তবুও অন্যমনষ্ক ভঙ্গিতে সালাম বলে,
- দেখা হয়ছে মিয়াসাবের লগে!
- কি চায় উনি?
নূরির বাপের কথাগুলো হাহাকার মত শোনানোর জন্য কিংবা নিতান্ত কৌতুহলের কাছে পরাজিত হয়ে জমিরন আবার জিজ্ঞাসা করে।
- গঞ্জের জমিখান হের উত্তর বিলের জমিখান এর লগে বদালায়া নিতে চায়।
মলিন ধূসর হয়ে উঠে সালামের চোখ কিংবা উঁকি দেয় নোনা জল।
- ক্যা! হের কি জমি কম পড়ছেনি, আমাগো একখান মাত্র আবাদি জমি তাও নজর পড়ছে?
কিছুটা শ্লেষের সাথে জমিরন উত্তর দেয়।
- হের পোলারে নাকি স’মিল বানায়া দিবো গঞ্জের কাছে!
- তুমি কি কইলা?
- আমি আর কি কমু! কইলাম, মিয়াসাব আপ্নের উপকার শোধ কর্বার পারুম্না কিন্তু এই জমিখান আপ্নারে দিলে আমি এক্কেবারে নিঃস্ব হইয়া যামু। তাই হুইনা উনি আমারে ভাববার সময় দিছেন একহপ্তা।
দীর্ঘশ্বাস বের হয় সালাম, জমিরনের বুক থেকে। উত্তর বিলের জমি বছরের অর্ধেক সময় ডুবে থাকে পানিতে, আমন ছাড়া কোনো ধান হয়না বললেই চলে। ওরা কয়দিন বর্গা নিছিলো সুরত মিয়ার কাছ থেকে তাই জানে জমিটা সমন্ধে। সেজন্য দীর্ঘশ্বাসটা যেনো আরো বেশি আর দীর্ঘ হয়ে উঠে। বিকাল না গড়াতেই দূরের টিলা হতে ডেকে উঠে কোনো বুবুক্ষু শিয়াল। জমিরন কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ে মুরগীদের খোয়াড়ে উঠানোতে, একটা ভালো দরজা বানানোর দরকার নতুবা শেয়ালে ভেঙ্গে ফেলতে পারবে দরজাটা একটু চাপ দিলেই। হারিকেনের কাচ মুচছে নূরি, বিকালের আলোতে মেয়ের সৌন্দর্যে খুশি আবার শঙ্কিত হয়ে পড়ে জমিরন। আজ সারাদিনের ধকলে নূরির মন খারাপের কারন জানা হয়ে উঠেনি, সেটা বয়সের দোষ ভেবে শান্তি পায় জমিরন। তবুও কোথাও যেনো ছায়া থেকে যায় মনের গহীনে।
গ্রাম ভেঙ্গে লোক জড়ো হয়েছে, মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে। শালিস হবে। গ্রামে লীলা খেলা, বেলাল্লাপানার কোনো স্থান নেই। সেটা জানাতে হাজির হয়েছে গ্রামের মাথা থেকে শুরু করে হারু পাগল পর্যন্ত। হারু পাগল শালিসটা কেন্দ্র করে মানুষের চক্রে শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে, হাসছে আর বলছে “বিচার হবে! বিচার হতেই হবে!!” ঘটনার সূত্রপাত ছিলো নূরি নাকি মিয়াসাবের টাকার লোভে তার বড় পূত্র আসগরকে বশ করার চেষ্টায় রত ছিলো। আসগর নূরিকে অনেক নিষেধ করা সত্বেও নূরি নাকি বার বার তাকে অনুরোধ করেছে। তাই সে নূরিকে নিয়ে তার বাপ মার কাছে যাচ্ছিল। নূরির চিতকারে আশেপাশের মানুষ ছুটে আসলে আসগর নূরিকে ওখানেই ফেলেই চলে যায় ভাবে এটাই নূরির জন্য ভালো হবে ভেবে। নূরির এমন বেলাল্লাপানায় গ্রামের ময়মুরব্বিরা বিরক্ত হয়। জমিরনের সুন্দর দেহের খোটা দেয় কেউ কেউ, কেউ কেউ বলতে থাকে সালামের উন্নতির পেছনে তার বউ মেয়ের দেহের হাত আছে। তাই গ্রাম থেকে বেলাল্লাপানা উচ্ছেদের জন্য জমিরনদের একঘরে করে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়, নির্দেশিত হয় বেলাল্লাপানার হাতেনাতে ধরা পড়ার জন্য ১০০ ঘা বেতের আঘাত নূরির জন্য উপহার হিসাবে, কারন মাতব্বরদের ধারনা এর জন্য তাকে মাটিতে জীবন্ত পুঁতে ফেলায় শ্রেয় ছিলো। আসগরের সুন্দর চরিত্রের জন্য এবং তার বয়স হওয়া সত্বেও বিবাহ না দেওয়ার জন্য মাদ্রাসার হুজুর এবং ময় মুরব্বিরা মৃদু ভর্তসনা করে মিয়াসাবেরে এবং হুকুম দেওয়া হয় অনতি বিলম্বে তাকে বিবাহ দেওয়ার জন্য। বিচারে সবাই খুশি হয়ে উঠে নাকি বিচার পর্ব শেষে মিয়াসাবের দেওয়া ভোজনের জন্য সবাই উতফুল্ল ছিলো সেটা বোঝা যায়না। কানে ঢোকেনা কারো জমিরনদের আহাজারি, নূরির তীব্র চিৎকার। মেয়েকে বাঁচাতে সালামের পিঠের রক্তাক্ত দাগ। সবাই উপভোগ করে তবে কেউ প্রশ্ন করে না, অশিক্ষিত আসগরের বাড়ি স্কুল ঘরের কাছে না থাকা সত্বেও সে ওইখানে প্রতিনিয়িত কি করতে যেত! কেউ প্রশ্ন করে না নূরি আসগরকে জ্বালালেও সে চিত্কার দিলো কেনো! কেউ জানতে চায় না নূরিদের বাড়ি পূর্ব পাড়ায় হলেও কেনো আসগর পশ্চিমের জঙ্গলের দিকে নূরিকে নিয়া যাওয়ার জন্য টানছিলো!! প্রশ্ন তখন ঘুরপাক খেতে থাকে ভোজের জন্য উৎসর্গিত গরূটা এড়ে না বকনাকে ঘিরে, ডালের লবন কিংবা রাঁধুনীর সিদ্ধহস্ততা বিশয়ক। কারো নজরে পড়ে না কিংবা পড়াতে চায়না ভাঙ্গা মন, ভাঙ্গা শরীর নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়না হওয়া জমিরনদের দিকে। সবাই আত্মতৃপ্তিতে ঢেঁকুর তোলে, সেটা খাবারের আত্মতৃপ্তি নাকি বিচারের বুঝা যায়না।
অনেকক্ষন ধরে আকাশে একটা চিল উড়ছে। তার ছায়া পড়ছে জমিরন্নেছার উঠোনে। তবে এতে জমিরনকে শঙ্কিত কিংবা উতকন্ঠিত মনে হচ্ছে না। সে নির্বাক বসে আছে। চিলের ছায়া দেখে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়া মুরগী কিংবা তার ছানারা কেউ নেই তাই ভয়ের কিছু নেই। গতকাল রাতে আকাশ পাতাল জ্বরে ভুগা নূরি’র বাপের সেবা করতে গিয়ে ভুলে গিয়েছিলো মুরগীর খোয়াড়ের দরজা বন্ধের কথা। সকালে তাদের কয়েকটি পশম আর রক্ত ছাড়া আর কিছুই নেই খোয়াড়ের আশেপাশে। একটু আগে নূরির বাপ গঞ্জের জমিখানা দিয়ে এসেছে সুরত মিয়াকে জ্বর শরীর নিয়ে। পায়ে ধরে অনুনয় বিনয় করে বলে এসেছে তার মেয়ের যেনো জানাজাটা হয়, আর কিছুরি তার দর্কার নেই। দরকার পড়বে না হয়তো। নূরি ঝুলছে ঘরটির সিলিং এ, কেমন যেনো নির্বাক চারিধার। নিঃশব্দতাও ঘুরে ফিরছে। আহাজারি করার নেই কেউ, নেই কেউ স্বান্তনা দেয়ার ও। তবুও জমিরনের কোনো ভাবান্তর নেই, চিলের ছায়া ক্রমশ বড় হচ্ছে তবুও ভীতি কাজ করছে না জমিরনের। তার যে আজ হারাবার কিছু নেই। আসুকনা পৃথিবীর বড় শিকারী পাখি, তাতে কিবা এসে যায়।
উৎসর্গঃ প্রিয় ব্লগার জিসান শা ইকরাম'কে
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০১২ রাত ১১:৩৭