
সেই অনেক দিন আগের কথা। একদেশে ছিল এক ভাই আর তার এক ছোট্ট বোন। টিপু আর টুশি। সেই টিপু একদিন টুশির হাতটা ধরে বললো কি, "মা মারা যাবার পর আমাদের কোন খুশির সময় আসে নি টুশি'পু। নতুন মা আমাদেরকে প্রত্যেকদিন-ই মারে, কাছে গেলেই লাথি দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়। খুব খিদে পেলেও শক্ত রুটি নাহলে ফেলে দেয়া ময়লা খাবার খেতে দেয়। বল্, মা থাকতে আমরা কতো ভাল ছিলাম! মা এসব জানতে পারলে খুব কষ্ট পাবেন। আয়, আমরা দু'জন মিলে দূরে কোথাও চলে যাই। তাহলে আর এতো কষ্ট থাকবে না আর আমাদের!"
তারপর ওরা সারাদিন এবড়ো-খেবড়ো মাঠ কি বিশাল পাথুরে পাহাড় পেড়িয়ে গেল; একসময় পুরো আকাশ মেঘ করে বৃষ্টি আসলে টুশির মুখটাও কেমন ভার হয়ে আসে। সে টিপুর হাত জড়িয়ে বলে ওঠে, "ভাইয়া, দেখো স্বর্গ-ও আমাদের সাথে কাঁদছে!" সন্ধ্যা হতে হতে ওরা বিশাল এক বনের মাঝে এসে পৌঁছায়। ভাই-বোন দু'জনই খিদেয় আর সারাদিনের ধকলে বেশ ক্লান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু এতোবড় বনে খাবার কোথায় পাবে ওরা ? তাই দু'জন একটা বড় গাছের নিচে বসে একজন আরেকজনের গায়ে হেলান দিয়ে কখন ঘুমিয়ে গেল ওরাও বুঝতে পারলো না!
পরদিন সকালে সূর্যটা একেবারে তেজীভাবে ঝকমক করতে থাকলে ওদের ঘুম ভাঙলো। কিন্তু কড়া রোদে ওদের খুব কষ্ট হতে থাকলো। টিপু বললো, "টুশি'পু, আমার একটু পানি খেতেই হবে। খুব পিপাসা পেয়েছে। কাছেই একটা ঝর্ণা আছে বোধহয় আমি পানির ঝমঝম শুনেছি। ওখানে গিয়ে খেয়ে নেবো, চলো।" তারপর টিপু উঠে টুশির হাতটা শক্ত করে ধরে ঝর্ণার খোঁজে বনে ঢুকে গেল।
ঐদিকে ওদের সৎমা, যে কিনা আসলে এক ডাইনী বুড়ি ছিল, সে তার জাদুবলে সব-ই জানতে পেরেছিল। সে চুপিচুপি তাদের পিছু নেয় আর টিপুর তেষ্টার কথা শুনতে পেরে বনের সব ঝর্ণাকেই জাদু করে ফেলে!
টিপু-টুশি হাঁটতে হাঁটতে একটা ঝকমকে রঙিন পাথুরে ঝর্ণার পাশে এসে দাঁড়ায়। টিপু পানি খাবার জন্য ঝর্ণার পাশে বসতেই টুশি পরিষ্কার শুনতে পেল ঝর্ণাটা ঝমঝমিয়ে বলছে,
"যেই না আমার পানি খাবে
সে ভয়ংকর এক বাঘ হবে!"
টুশি সাথে সাথে কেঁদে উঠে বলে, "ভাইয়া! পানি খেয়ো না! তাহলে তুমি বাঘ হয়ে যাবে আর আমাকে টুকরো টুকরো করে খাবে!"
ভাইটা বোনের কান্না দেখে খুব তেষ্টা পেলেও পানি না খেয়ে বললো, "আচ্ছা, এর পরের ঝর্ণাটা থেকে খেয়ে নেবো।" এরপর ওরা আরেকটা রিমঝিম ঝর্ণার সামনে এসে থামে; টুশির কানে এবারো ঝর্ণাটা ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে,
"যেই না আমার পানি খাবে
সে তক্ষণি এক নেকড়ে হবে!"
টুশি এবার-ও টিপুর হাত ধরে বলে, "ভাইয়া! পানি খেয়ো না! তাহলে তুমি হিংস্র নেকড়ে হয়ে যাবে আর আমাকে টুকরো টুকরো করে খাবে!" এবার-ও টিপু পানি খেল না কিন্তু হাঁপিয়ে গিয়ে বলে উঠলো, "এরপরের ঝর্ণাটা থেকে আমাকে পানি খেতেই হবে টুশি'পু! আমি নাহলে বাঁচবোই না কিন্তু!"

পরের ঝর্ণাটাও কিন্তু টুশিকে সাবধান করে দেয় ঝুমঝুমিয়ে,
"যেই না আমার পানি খাবে
সে টিংটিঙে এক হরিণ হবে!"
টুশি ভাইকে সাবধান করার জন্য বলতে যাবে কিন্তু ততক্ষণে বেশ দেরী হয়ে গেছে। টিপু খুব পিপাসার্ত হয়ে ঝর্ণার পানিতে ঠোঁট ছোয়াতেই সে ছোট্ট সোনালী এক হরিণ হয়ে গেল!
ছোট্ট বোনটা ভাইয়ের এ অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে গেল। হরিণটাও বোনের চারপাশ ঘিরে কাঁদতে থাকলো। একটু পর ছোট্ট টুশি হরিণটার গলা জড়িয়ে বলে ওঠে, "আহারে! প্রিয় হরিণটা আমার! তুমি কোন চিন্তা কোর না! আমি কক্ষণোই তোমাকে ছেড়ে যাবো না!" তারপর টুশি ওর চুলের সোনালী রিবনটা খুলে হরিণের গলায় বেঁধে দেয়। তারপর কিছু গাছের বাকল ছিড়ে একটার সাথে আরেকটা বুনে দড়ির মতো পাকিয়ে নেয় যাতে বনের পশু তাদের আঘাত না করতে পারে।

সব ব্যবস্থা হয়ে গেলে ওরা আবারো হাঁটতে শুরু করে। অনেক অনেক দূর হেঁটে যাওয়ার পর ওরা একটা ঘর দেখতে পায়। টুশি ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখে ঘরটা একেবারে খালি! সে মনে মনে ভাবে, "আমরা কিছুদিন এখানে থাকতে পারি তো!" টুশি ভাইটার জন্য নরম পাতা, ঘাস আর মস দিয়ে সুন্দর একটা বিছানা বানায় ঘরের ভেতর। প্রত্যেকদিন সকালে ও বের হয়ে যেত আর বন থেকে ফল-মূল, বাদাম নিয়ে আসতো। হরিণটার জন্য ও আনতো নরম নতুন সবুজ ঘাস। টুশি ঘাসগুলো নিজের হাতে খুব যত্ন করে খাওয়াতো ভাইটাকে আর খাবার পর আনন্দে বোনটাকে ঘিরে নেচে বাড়াতো রঙিন সোনালী হরিণটা! সন্ধ্যা হলে টুশি প্রার্থনায় বসতো আর তারপর ক্লান্ত হয়ে গেলে ভাইয়ের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে যেতো। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে টুশি ভাবতো আর ভাবতো, "ইশ! টিপু যদি ঠিক আগের মতো হয়ে যেতো তাহলে তারা এখানে কতো সুখেই না থাকতে পারতো!"
এমনি করে অনেক অনেকদিন কেটে গেল। টুশি অনেক বড় হয়ে গেছে কিন্তু হরিণটা সেই তেমন-ই আছে ডাইনির জাদু-মন্ত্রে। এমন সময় সে দেশের রাজা বেশ আয়োজন করে বনে শিকারে যাবেন বলে ঠিক হলো। বনের গাছ-পালার মধ্য দিয়ে ছিটকে-ছুটে ঢুকলো রাজারক্ষীদের শিঙার শব্দ, কুকুরের বিকট ঘেউঘেউ আর শিকারীদের আনন্দ-ধ্বনি! হরিণটা খুশিতে ছটফটিয়ে ওঠে, "এই বনে কখনো তো কেউ আসে নি এতোদিন!" বোনের কাছে করুন করে বলে ওঠে, "টুশি'পু আমাকে একটু শিকার দেখতে যেতে দাও! আমি ঘরের মধ্য আর বন্দী থাকতে পারছি না!" টুশি যতক্ষণ না সম্মতি জানালো ততক্ষণ-ই কেঁদে গেল নাছোড় ভাইটা। "কিন্তু," টুশি শর্ত দেয় ভাইকে, "সন্ধ্যায় যখন তুমি ফিরে আসবে তখন বলবে 'আমার ছোট্ট বোন, আমাকে আসতে দাও'। এটা না বলা পর্যন্ত আমি দরজা খুলবো না আর তুমি ছাড়া অন্য কাউকে আমি ভেতরে-ও আসতে দেবো না। কারন তুমি না হয়ে শিকারীরা যদি চলে আসে তাহলে আমাদের ক্ষতি হতে পারে ভাইয়া।" সাথে সাথে শর্ত মেনে নিয়ে সোনালী হরিণ এক লাফে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। খোলা বাতাসে মনের আনন্দে খেলা করে আর শিকারীদের দিকে এগোয়। রাজা আর শিকারীর দল এতো সুন্দর একটা হরিণ দেখে একেবারে অবাক হয়ে যায়! সাথে সাথে ওরা হরিণটাকে তাড়া করে কিন্তু ছোট্ট হরিণটা চোখের নিমেষেই একটা ঝোপে সেঁধিয়ে যেন অদৃশ্য-ই হয়ে যায়! সারাদিন বনে ঘুরে সন্ধে ঘনালে ভাইটা ঘরে ফেরে। দরজায় এসে বলে ওঠে, "টুশি'পু, আমার ছোট্ট বোনটা, আমাকে আসতে দাও!' টুশি দরজা খুলতেই সে ভেতরে ঢুকে যায় আর সারাদিনের লাফালাফিতে খুব ক্লান্ত থাকায় তার নরম বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ে।
পরদিন সকালে ভাইটা আবারো বনে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। টুশি আবারো তাকে সতর্ক করে দেয়, "মনে রেখো সন্ধ্যায় ফিরতে হবে আর দরজায় এসে কি বলতে হবে।" হরিণ সম্মতি দিয়ে বনে ঢুকে যায়।
এবার রাজা আর তার দলবল যখনি সোনালী রিবন বাঁধা হরিণটা দেখলো তখন তার পেছনে একেবারে সদলবলে তাড়া করলো। কিন্তু ছোট্ট হরিণটা খুব অস্থির আর কঠিন শিকার। তারা প্রায় সারাদিন হরিণটার পেছনে ছুটে সন্ধ্যায় হরিণটাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেললো। একজন শিকারী হরিণটার পা লক্ষ্য করে একটা তীর ছুড়লো যাতে সেটা এতোটা ছুটে বেড়াতে না পারে। তীরের আঘাতে হরিণটা প্রচন্ড ব্যথায় প্রানভয়ে ঘরের দিকে পড়ি-মরি ছুটে গেল আর চিৎকার করে বোনকে ডেকে বললো, "টুশি'পু, আমার ছোট্ট বোনটা, আমাকে আসতে দাও!" সেই শিকারী-ও কিন্তু হরিণের পেছনে পেছনে সেই ঘরে গিয়েছিল আর হরিণ-টুশি দু'জনের কথাই শুনে ফেলেছিল! সে রাজাকে গিয়ে সব খুলে বলার পর রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন পরদিনই এই অদ্ভুত রহস্যের উন্মোচন করবেন বনে গিয়ে।

এদিকে টুশি তার প্রিয় হরিণটার ক্ষত দেখে প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেল। ভাইয়ের পায়ের ক্ষতটা গাছ-গাছড়ার রস দিয়ে ভালো করে বেঁধে দিল ও। তারপর সারারাত ভাইয়ের পাশে জেগে কাটিয়ে দিল। ক্ষতটা তেমন গভীর না হওয়ায় হরিণটা পরদিন সকালেই ভাল হয়ে উঠলো। আবারো সে বনে যাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠলো। এবার টুশি কেঁদে উঠে বললো, "এবার তুমি ঠিক মারা পড়বে ভাইয়া। আমাকে একেবারে একা করে তুমি মারা পড়বে! আজকে আমি কিছুতেই তোমাকে যেতে দিচ্ছি না!" হরিণটা এবার মরিয়া হয়ে বলে, "তাহলে আমি খুব কষ্টে এমনিতেই মারা পড়বো টুশি'পু। আমি যখন-ই ঐ শিঙার শব্দ শুনি আমি আর কিছুতেই ঘরে থাকতে পারি না যে!" টুশি প্রচন্ড দুশ্চিন্তা আর দুঃখ চেপে রেখে ভাইটাকে যেতে দেয়। হরিণটা ঠিক আগের মতোই খুশিতে আটখানা হয়ে নিমেষে বনে হারিয়ে যায়!
এবার হরিণটাকে দেখেই রাজা শিকারীদের হুকুম দিলেন যে ওটাকে যেকোন ভাবে ধরে ফেলতে তবে কোনভাবেই যেন ওকে ব্যথা দেয়া না হয়। সূর্যটা ডুবে যাওয়া পর্যন্ত ওরা হরিণটার পেছন পেছন দৌড়ে সন্ধ্যায় সেই ঘরটার কাছাকাছি পৌঁছে গেল আর হরিণটাকে বন্দী করে ফেললো। রাজা এবার ঠিক হরিণটার মতো তার বোনকে ভেতরে ঢুকতে দেবার কথাটা বলতেই দরজাটা খুলে গেল। রাজা সাথে সাথে ঘরে ঢুকে গেলেন আর দেখলেন খুব সুন্দর একেবারে পরীর মতো সুন্দর একটা মেয়ে ঘরে দাড়িয়ে আছে। টুশি খুব ভয় পেয়ে দেখলো তার ভাই তো না বরং এক সোনালী মুকুট পড়া রাজা দাঁড়িয়ে আছে তার দরজায়। কিন্তু রাজা টুশির হাতটা নরম করে ধরে বললেন, "তুমি কি আমার সাথে যাবে? আমি এ রাজ্যের রাজা। আমার রাজ্যের রানী হবে?"
"হ্যা হবো!" লজ্জা পেয়ে বলে টুশি, "তবে আমার এই সোনালী হরিণটা সবসময় আমার সাথে থাকবে। আমি ওকে ছেড়ে কক্ষণো যাবো না।"
রাজা বললেন, "তুমি যতোদিন চাও ততদিন এই হরিণ তোমার সাথে থাকবে। তুমি চাইলে সারাজীবন থাকবে ও তোমার সাথে!"
এসময় হরিণটা এসে তার বোনের পাশে দাড়ায় আর টুশি ওর গলা জড়িয়ে আদর করে ওদের ছোট্ট ঘরটা ছেড়ে যাবার প্রস্তুতি নেয়।
এরপর খুব ধুমধাম করে রাজা-রানীর বিয়ে হয়ে গেল। তারা খুব হাসি-খুশির একটা জীবন কাটাতে লাগলো। সোনালী হরিণটাকেও খুব আদর-যত্নে রাখা হলো। রাজবাড়ির বাগানে সে মনের আনন্দে খেলে বেড়াতো!
ওদিকে টিপু-টুশির সৎমা, সেই ডাইনী বুড়িটা ভেবেছিল কি এতোদিনে নিশ্চয়ই বনের কোন হিংস্র পশু টুশিকে টুকরো টুকরো করে খেয়ে ফেলেছে আর হরিণটাকে শিকারীরা মেরে ফেলেছে। কিন্তু যেই না রাজা-রানীর বিয়ের খবর তার কানে পৌঁছালো ডাইনী এবার ভীষণ রেগে গেল! সারা দিনরাত সে ভাবতে লাগলো কিভাবে ওদের বিশাল একটা শাস্তি দেয়া যায়! ডাইনীর নিজের মেয়েটা ছিল ভীষন রগচটা আর কুৎসিত। তার দু'টো চোখের জায়গায় ছিল একটা মাত্র চোখ। কিন্তু ডাইনী চাইতো তার মেয়েটাই এ রাজ্যের রানী হবে। "ভাবিস্ না!" রেগেমেগে মেয়েকে সান্তনা দেয় ডাইনী, "তুই-ই রাজ্যের রানী হবি! আমি সব ব্যবস্থা করছি!"
এর-ই মধ্য রানী টুশি এক ফুটফুটে ছোট্ট রাজকুমারের জন্ম দিল। রাজা তখন শিকারে গেছেন। ডাইনীটা এই সুযোগে রানীর সেবিকার রূপে রানীর কাছে পৌঁছে গেল। সে টুশিকে বললো কি, "আসুন রানী! আপনার জন্য গরম পানি করেছি। ঠান্ডা হওয়ার আগেই গোসল সেরে নিন।" সে টুশিকে গোসলের টাবে নিয়ে ছেড়ে দিল যার নিচে কিনা সে আগুন-চুল্লি জ্বেলে রেখেছিল! রানীকে সেই গনগনে আগুনে ছেড়ে দরজা আটকে দিয়ে সঙ্গেসঙ্গে সেখান থেকে পালিয়ে যায় ডাইনী। টুশি অনেক চেষ্টার পর-ও কিছুতেই নিজেকে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পারলো না।
ডাইনী এরপর তার মেয়েকে জাদু করে রানীর ছদ্মবেশে সাজিয়ে দিল। ঠিক রানীর মুকুট পড়িয়ে তার বিছানায় রেখে আসলো মেয়েকে। কিন্তু জাদুর পর-ও ডাইনী তার মেয়ের একটা চোখের জায়গায় দুই চোখ দিতে পারলো না। রাজা যাতে সেটা বুঝতে না পারে সেজন্য আরেকটা চোখের জায়গায় ডাইনী বুড়িটা নিজেই শুয়ে রইলো। এরমধ্যই রাজা শিকার থেকে ফিরেছেন। শুনেছেন যে তার রাজবাড়ি আলো করে এসেছে এক ফুটফুটে রাজপুত্র! রাজা আনন্দে আটখানা হয়ে রানীর সাথে দেখা করতে চললেন। রাজা ঘরে ঢুকতে যাবার সময় ডাইনীটা করুণভাবে বলে উঠলো, "রানীর চোখে আলো গেলে উনি বাঁচবেন না, উনি অসুস্থ। উনার এখন খুব যত্ন প্রয়োজন। দয়া করে পর্দায় হাত দেবেন না মহারাজ!" তাই রাজা রানীর সাথে দেখা না করেই ফিরে গেলেন আর জানতেও পারলেন না যে বিছানায় নকল রানী ঘুমিয়ে আছে!
তারপর মধ্যরাত ঘনিয়ে আসে। সারা রাজ্য ঘুমে বিভোর হয়ে আছে। তখন রাজপুত্রের বিছানার পাশে জেগে থাকা এক সেবিকা দেখলো কি, দরজা খুলে রানী টুশি প্রায় ভাসতে ভাসতে আসছেন একেবারে পরীদের মতো! ভেতরে এসে সে শুয়ে থাকা ছোট্ট রাজকুমারকে পরম আদরে কোলে তুলে নেয়, নাক ডুবিয়ে আদর করে দেয় তারপর আলতো করে চুমু দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয় আবার। তারপর সে সোনালী হরিণটার ঘরে যায়। হরিণটার গলা জড়িয়ে আদর করে। তারপর চুপিচুপি কোথায় যেন হারিয়ে যায়! পরদিন সকালে সেই সেবিকা মেয়েটা রাজরক্ষীদের জিজ্ঞেস করে যে রাতে তারা কাউকে ভেতরে আসতে বা বাইরে বেরিয়ে যেতে দেখেছে কি না। কিন্তু রক্ষীরা জানায় তেমন কিছুই দেখে নি তারা। পরপর বেশ কয়েক রাত এমন-ই হতে দেখলো মেয়েটা। কিন্তু ভয় পেয়ে গিয়ে কাউকে বললো না ঘটনাটা।
বেশ অনেকদিন কেটে যাবার পরে রানী একরাতে কথা বলে উঠলো সেবিকা মেয়েটার সাথে,
"আমার ছোট্টসোনা ভাল আছে ?
আমার হরিণ কেমন আছে ?
"অনেক দিন যে কেটে গেল,
অনেক প্রহর কেটে গেছে!
এবার আমার যেতেই হবে
-স্বর্গপুরীর দেশে।"
প্রচন্ড অবাক হয়ে সেবিকা কোন কথা বলতে পারে না। তবে সে বুঝতে পারে যে রানী বলছেন যে তিনি এভাবে আর আসতে পারবেন না। টুশি রাজপুত্র আর হরিণটাকে এক-ই ভাবে আদর করে কাঁদতে কাঁদতে একটু পরেই অদৃশ্য হয়ে যায়। পরদিন রাজাকে সব খুলে বলে মেয়েটা। রাজা সিদ্ধান্ত নেন আজ রাতে তিনি নিজেই দেখবেন পুরো ঘটনাটা।
রাত ঘনিয়ে আসে। রাজা লুকিয়ে বসে অপেক্ষা করেন কখন আসবে সেই অদ্ভুত সময়। হঠাৎ রানীর কন্ঠ শোনেন রাজা। টুশি এসে ঢোকে ঘরে আর কাঁদতে কাঁদতে করুনভাবে সেবিকা মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
"আমার ছোট্টসোনা ভাল আছে ?
আমার হরিণ কেমন আছে ?
"অনেক দিন যে কেটে গেল,
অনেক প্রহর কেটে গেছে!
এবার আমার যেতেই হবে
-স্বর্গপুরীর দেশে।"
রাজা এবার বেড়িয়ে এসে টুশিকে ছুঁয়ে বলেন, "তুমি আমার রানী না হয়েই পারো না!" টুশি চমকে উঠে রাজাকে দেখে কেঁদে উঠে বলে, "হ্যা মহারাজ! আমি-ই আপনার রানী!" তখন-ই ডাইনীর জাদু নষ্ট হয়ে গেল আর টুশি আবার আগের জীবন ফিরে পেল। টুশি এরপর রাজাকে সব খুলে বললো। রাজা শয়তান ডাইনী বুড়ি আর তার রগচটা মেয়েটাকে পরদিন-ই আটক করলেন তার রক্ষীদের দিয়ে। ডাইনীকে পুড়িয়ে মারা হলো আর তার মেয়েকে গহীন বনে ছেড়ে দেয়া হলো। হিংস্র পশুরা টুকরো টুকরো করে খেল মেয়েটাকে। আর যেই না ডাইনী পুড়ে গেল ওমনি তার সব জাদু নষ্ট হয়ে গেল! সোনালী হরিণটা নিমেষেই হয়ে গেল টগবগে সুন্দর এক তরুন! টিপু তার আসল রূপ ফিরে পেল!
তারপর ?
তারপর রাজা-রানী টুশি- টিপু আর তাদের রাজপুত্র- সবাই খুব সুখ-শান্তিতে হাসি-খুশি একটা জীবন কাটাতে লাগলো!
______________________________________________
Brother & Sister