
বৃহঃষ্পতিবার রাত দশটা। অফিস শেষে তিড়িং বিড়িং করতে করতে বাসায় এসে জম্পেশ একটা গোসল দিয়েছি। এর পর মা জননী আদর করে ভরপেট খাওয়াইলেন। এরপর দোস্তদের ফোন.........বিহারি ক্যাম্প গিয়া চাপ লুচি মারতে হবে। পরেরদিন ঈদ (প্রতি শুক্রবার আমার জন্য রোজার ঈদ আর শনিবার বকরা ঈদ, বিষয়টা আমি সেইভাবে সেলিব্রেট করি)!!
আড্ডা মারতে রওনা দিলাম। অন্যদিন আমরা চারজন থাকি, এইবার দুইজন বেশি। মোস্তাকিমে গিয়া সব লুটি চাপ অর্ডার দিলো। আমি ' খামুনা, ভাত খাইয়া আসছি' বইলা সাইড নিলাম। এবং যথারীতি লুচি চাপ আসার পর 'দোস্ত একটু টেস্ট করি' বইলা এর ওর প্লেটে হামলা করলাম। খাওয়া শেষে সব বাইরে আসছি, মজনু (আসল নাম না, কারও আসল নাম নিমু না) কইলো চল বিরিশিরি যাই। সাধারনত আমরা চারজন গেলে এক গাড়িতে জায়গা ঠিকমত হয়, কেননা চারজনই মাশাল্লা। কিন্তু আজ অতিরিক্ত দুইজন আছেন, এবং দুই জনই মোটামুটি বোল্ডার সাইজের। বিরিশিরি যাবার ইচ্ছা আগে থেকে থাকলেও যাত্রা পথের ভোগান্তির কথা ভেবে (এই ছয়জন এক গাড়িতে কোনভাবেই আটবে না) আমি 'থাক আজকে না, এই সপ্তাহ একটু রেস্ট নেই' বলে পাশ কাটাতে চাইলাম। কিন্তু মজনু নাছোড় বান্দা, আমারে সাইডে নিয়া বলে 'সাপোর্ট দে, নাইলে এই শালারা যাইতে চাইবো না'।


সোমেশ্বরী নদী
এর মিনিট বিশেক পর আমরা নেত্রকোনার রাস্তায়! কিছুক্ষণ ঘুম দিবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু সহযাত্রীদের কল্যাণে তা হয়ে উঠল না। ময়মনসিংহ গিয়ে এক হোটেলে পরটা আর ডিম ভাজা অর্ডার করলাম, কিন্তু ডিম ভাজা থেকে ভয়ানক গন্ধ আসছিল। ইনভেস্টিগেশন করে বের করলাম ডিম ভাজার পিয়াজ- মরিচের কুচি সম্ভবত দুইদিন আগের। তাই শুকনা পরটা পানি দিয়ে নামিয়ে দিলাম।

স্বচ্ছ ধারা সোমেশ্বরী
যাত্রা পথে রাস্তা ভাঙ্গাচোরা। বিরিশিরি পৌছালাম ভোর চারটার দিকে। কিন্তু চীনা মাটির পাহাড় কই। এক লোককে জিজ্ঞেস করতে রাস্তা বাতলে দিল, রাস্তা কেমন জানতে চাইলে বলল ভালোই। কিন্তু এবার মাটির রাস্তা!! যেতে হবে দুর্গাপুর। কিছুটা পথ সামনে যাবার পর সোমেশ্বরী নদী সঙ্গ নিল। বেশ লাগছিলো; কিন্তু চীনামাটির পাহাড় কোথায়? একবার এই দিক, একবার সেই দিক! অবশেষে জানলাম সোমেশ্বরী নদী পার হতে হবে, এবং সামনে আর গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে না। একটা স্কুলের মাঠে গাড়ি রেখে আল্লার নাম নিয়ে নদীতে নেমে পড়লাম, স্বচ্ছ টলটলে পানি, দূরে পাহাড়ের হাতছানি। ছয়জন নদীর মাঝ বরাবর গিয়ে আটকে গেলাম, সামনে আর হেটে যাবার উপায় নেই। একটা ট্রলার এসে উদ্ধার করলো। ওপারে গিয়ে দেখি বস্তা ভরে চীনা মাটি রাখা, উৎসাহ বাড়লো। কিন্তু যাবার উপায় কি?

সোমেশ্বরীর বালুচর
এ এলাকায় চলাচলের মাধ্যম হল সাইকেল, অতিদুর্লভ রিক্সা, মোটর সাইকেল এবং নিজের পা। রিক্সা পেলাম না, আর মোটর সাইকেল ২০ টাকার ভাড়া দেড়শ টাকা চাইল! শুনলাম বিজয়পুর যেতে হবে, দুরত্ব এক কিলো- তাই হাটার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু কিছুদূর পর কাকড় ছড়ানো রাস্তা, আর আমাদের খালি পা। হাটতে গিয়ে জান বেরিয়ে গেল। এবং একটু পরই টের পেলাম এই এক কিলো মানে কয়েক কিলো। মাঝপথে একটা কাচামাটির রাস্তা বাম পাশে চলে গেছে। এক বালক বলল বাম পাশের রাস্তা দিয়েই সাদামাটি যাওয়া যায়। কিন্তু আমরা বিজয়পুর শুনে এসেছি - সোজা হাটতে লাগলাম। একসময় পা ফুলিয়ে রানিখং পার হয়ে বিজয়পুর বিডিআর ক্যাম্প পৌছালাম, বাংলাদেশের শেষ সীমান্ত। কিন্তু কোথায় চীনা মাটি?? তখন মনে হল সেই বালক ঠিক বলেছিল। এর মাঝে বৃষ্টি নামল, সব ভিজে চুপচুপে - পা এর অবস্থা কাহিল। চীনা মাটি মনে হয় দেখা হবে না। ভাগ্যক্রমে দুটা রিক্সা পেলাম, কিন্তু তাদের খেপ আছে - যাবে না। হাতে পায়ে ধরে কাকড় বিছানো রাস্তা পার করতে রাজি করালাম।

বিজয়পুর বিডিআর ক্যাম্প থেকে দূরে টিলার ওপর রানিখং মিশন

নদীর ওপারে ভারত
পথে কাচা রাস্তাটা পড়ল। মনটা শক্ত করে ঘোষনা দিলাম যাই হোক, আমি চীনামাটির পাহাড় না দেখে ঢাকা যাব না, খেচু সবসময় নেতিয়ে থাকে। কিন্তু এবার সে আমার কথায় সায় দিল। অতএব এবার কাচা রাস্তা ধারে হাটতে লাগলাম - পথে সবাইকে জিজ্ঞেস করলাম 'ভাই, সাদামাটি কতদূর'; সবাই বলে এইতো একটু এগোলেই। এবং অবশেষে সাদামাটি - চীনা মাটির দেখা মিলল!! শুধু সাদা মাটির পাহাড় না, গোলাপী পাহাড় ও দেখা দিল, সাথে টলটলে নীল জলের লেক!!

চীনা মাটির গোলাপী রংয়ের পাহাড়

পাহাড় বেয়ে ওঠার লোভ সামলাতে পারলামনা

স্বচ্ছ নীল জলের লেক
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুলাই, ২০০৯ দুপুর ২:৪৯