কিছু দিন আগে ১৯৬২ তে চীন দ্বারা দখল হয়ে থাকা লাদাখের ব্ল্যাক টপ এলাকাটি ভারতীয় সেনারা পুনরুদ্ধার করার পর সেনাদের যে সেলিব্রেসান এর ভিডিও সোসাল মিডিয়া বা মিডিয়া তে দেখা যাচ্ছে, সেখানে অনেকের মনে একটা প্রশ্ন আসছে ঐ ভিডিও তে তো ভারতের পতাকার বদলে একটা অন্য পতাকা হাতে সৈন্যরা সেলিব্রেসান করছে ?? এর পিছনের আসলে সত্যটা কি? এই পোস্ট টা পড়লে ব্যাপারটি জানতে পারবেন -- (ভিডিওটার ইউটিউব লিন্ক পোস্টের শেষে দেওয়া আছে)
.সম্প্রতি লাদাখে চীনা সেনা আগ্রাসন পরিস্থিতিতে প্যাংগং ও স্প্যাঙ্গার লেক অঞ্চলে ২৫ থেকে ২৭ শে আগস্ট SFF কে মোতায়েন করা হয়েছিল , কারণ এই দুটি অঞ্চলে LAC বরাবর চীনা সেনাঘাঁটিগুলি অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় অবস্থিত। ফলে পাহাড়ের ঢালে সেনা পজিশন বানাতে পারতো না ভারতীয় সেনা। কিন্তু গত ২৮ ও ২৯ শে আগস্ট তিনবার প্রায় ৫০০ চীনা সেনা প্যাংগং লেক এবং স্প্যাঙ্গার লেক অঞ্চলে ভারতীয় সীমায় অনুপ্রবেশের চেষ্টা করলে প্রায় খালি হাতে চীনা সেনাদের রুখে দেয় SFF জওয়ানরা। এই লড়াইয়ে SFF কোম্পানি লিডার নিমা তেনজিং শহীদ হন। খবর পৌঁছায় সেনার নর্দান কমান্ড হয়ে দিল্লিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকে। সেনাবাহিনী জানায় এই অঞ্চলে চীনা সেনার সেনাঘাঁটিগুলি LAC এর গায়ে উঁচুতে আর ভারতীয় সেনাঘাঁটিগুলি নিচুতে থাকায় LAC থেকে অনেক দূরে। ফলে মাঝে বিরাট বাফার জোন ছেড়ে দেবার জন্যেই চীনা সেনা বারবার সেই ফাঁকা জায়গায় ঢুকে পজিশন তৈরি করে আর জায়গাটি নিজেদের বলে দাবি করে। ...এবারে চীনাদের ঠেকাতে মুখোমুখি অবস্থান ছাড়া গতি নেই। চীনা সেনাঘাঁটির গায়েই মুখোমুখি উঁচু স্থানগুলোতে পজিশন নিতেই হবে। অবশেষে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সবুজ সংকেত পেয়ে ৩০শে আগস্ট মাঝরাতে SFF সকল চীনা নজরদারী এবং হাইটেক সার্ভিল্যান্স সিস্টেমকে ফাঁকি দিয়ে চুপিসারে পাহাড়ে উঠে প্যাংগং লেকের দক্ষিণে দেশের অন্যতম স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্ট ব্ল্যাক টপ হিল, প্যাংগং লেকের দক্ষিণ পূর্বে স্প্যাঙ্গার লেকের স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্ট স্প্যাঙ্গার টপ এবং স্প্যাঙ্গার টপের পূর্বে আরেকটি স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্ট রেকিন টপ এ উঠে চীনা সেনাঘাঁটিগুলির গায়েই একাধিক পজিশন নেয়। পরদিন ৩১শে আগস্ট রাতে প্যাংগং লেকের ফিঙ্গার ফোরের সুউচ্চ ত্রিশূল হাইট'ও পুনরুদ্ধার করে SFF. ...সেনাবাহিনীর এই স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স বা SFF এর সদস্য সংখ্যা ঠিক কত তা সেনাবাহিনীর বহু উচ্চপদস্থ কর্তারাও জানেন না। SFF এর তিব্বতীরা আজও চীনের তিব্বত আগ্রাসন এবং তাদের পূর্বসূরি স্বাধীনতাকামী "খাম্পা গেরিলা"দের সংগ্রামের ইতিহাস রক্তে ও মস্তিষ্কে বহন করে। ১৯৬২ তে ইন্দো চীন যুদ্ধে চরম নেহেরুর দালালির জন্য সেনারা পাহাড়ে যুদ্ধের উপযুক্ত পোশাক টা অবধি পেত না। তারপরও পেশাদারিত্ব ও বীরত্ব দেখাবার পরেও প্রায় ৫০০০ ভারতীয় সেনার বলিদান ও যুদ্ধে হার নেহেরুকে কোনরকম প্রভাবিত করে নি উল্টে তিনি অকাসই এলাকা চিন দখল করা নিয়ে পার্লামেন্ট বলেছিলেন ঐ ভুমি তে তো একটা ঘাস ও হ্য় না ঐ জমি থাকার থেকে না থাকা ভাল , তখন একজন বলেছিলেন নেহেরু জি আপনার মাথায় তো টাক আছে ওতে তো একটা চুলও হয় না এক কাজ করুন ঐ যুক্তিতে আপনার মাথাটাও কেটে চীনকে দিয়ে দিন, নেহেরু কোন উত্তর দিতে পারেননি। এমনই জঘন্য লোক ছিলেন এই নেহেরু. যাই হোক তখন ভারতীয়ন সেনার অফিসার রা চীনা সেনার এই পার্বত্য যুদ্ধে দক্ষতার বিপরীতে উপযুক্ত প্রতিরোধ গড়তে তৎকালীন ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর সেকেন্ড ইন কমান্ড বঙ্গসন্তান ভোলানাথ মল্লিকের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। ...স্পাইমাস্টার ভোলানাথ মল্লিকের পরামর্শে ভারত সরকারের তরফ থেকে আমেরিকার সাহায্যের প্রার্থনা করে সেপ্টেম্বর মাসে ওয়াশিংটন'কে পরপর দুটো চিঠি লেখা হয়েছিল। CIA চীনা সেনার বিরুদ্ধে তিব্বতের মালভূমিতে উপযুক্ত গেম চেঞ্জার খুঁজছিল এবং স্বাধীনতাকামী তিব্বতি খাম্পা গেরিলাদের বীরত্ব ও ঐতিহ্যের উপযুক্ত সংরক্ষক চাইছিল। ফলে চিঠি পাবার দু সপ্তাহের মধ্যে তৎকালীন US ডিফেন্স সেক্রেটারি রবার্ট ম্যাকনামারা এবং CIA চিফ জন ম্যাককোন দিল্লি উড়ে আসেন। দ্রুত তিব্বতি গেরিলা সেনা তৈরির সকল প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয় ভারতের ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো এবং CIA এর তত্ত্বাবধানে। ১৪ই নভেম্বর ১৯৬২, ভারতীয় সেনার মেজর জেনারেল সুজন সিং উবান'কে নবগঠিত তিব্বতি গেরিলা বাহিনীর প্রথম ইন্সপেক্টর জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যেহেতু মেজর জেনারেল উবান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনার ২২ মাউন্টেইন রেজিমেন্ট'কে কমান্ড করতেন সেহেতু নবগঠিত এই টপ সিক্রেট তিব্বতি গেরিলা বাহিনীর নাম দেওয়া হয় ২২ এস্টাব্লিশমেন্ট বা টু টু এস্টাব্লিশমেন্ট। ...তিব্বতীরা ভারতীয় রাজাদের সেনায় মধ্যযুগ থেকে অংশ নিলেও এবারই প্রথম তিব্বতের স্বাধীনতাকামী "চুষি গ্যাংড্রুক" নেতাদের সহায়তায় প্রায় ৫,০০০ খাম্পা গেরিলা যোদ্ধাকে ভারতীয় সেনার অংশ হিসেবে CIA এবং ভারতীয় কমান্ডো ট্রেনাররা চরম গোপনীয়তায় ট্রেনিং দেওয়া শুরু করে। সত্তরের দশকে এই গেরিলাদের ভারতীয় সেনার SFF (স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স) হিসেবে এর তত্ত্বাবধানে দিয়ে দেওয়া হয়। তবে বর্তমানে মোদী আমলে SFFকে কমান্ড করছে ভারতের সেনার মন্ত্রক। এই গেরিলা যোদ্ধারা নিজেদের বলেন ভিকাসি (Vikas), আর ভারতীয় সেনায় SFF কে বলা হয় Vikas(ভিকাস) রেজিমেন্ট. (ভিকাস) Vikas ফোর্স একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ সেনা। ফোর্সের নিজস্ব হালকা থেকে ভারী অস্ত্র, মর্টার থেকে আর্টিলারি, হেলিকপ্টার থেকে স্ট্র্যাটেজিক বিমান, প্রয়োজন অনুযায়ী মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স থেকে সার্ভিল্যান্স ইকুইপমেন্ট, ছোট গাড়ি থেকে সাঁজোয়া গাড়ি, মাইন সুইপার থেকে ট্যাংক সবই আছে। ...খুব অল্প সংখ্যক ভারতীয় সেনা জওয়ান ও অফিসারদের SFF এ ডেপুটেশনে দেওয়া হয়। SFF এর বেশিরভাগ অফিসাররাই তিব্বতি উদ্বাস্তু। আমাদের প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল দলবীর সিং সুহাগ এই SFF এর ইন্সপেক্টর জেনারেল হিসেবে বহুদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। এই ফোর্সে মেয়েদেরও প্রচুর সংখ্যায় নিয়োগ করা হয়। প্রতিটি সদস্য ছেলে হোক বা মেয়ে অত্যন্ত কঠিন ট্রেনিং নিতে হয় প্রায় দেড় থেকে দুবছর। তারা একাধারে পর্বত যুদ্ধের স্পেশাল ট্রেনিং, জঙ্গল যুদ্ধের গেরিলা ট্রেনিং, সিক্রেট পার্বত্য অভিযানে পর্বতারোহণের ট্রেনিং এবং যে কোনো স্পেশাল ইন্টেলিজেন্স গ্যাদারিং এর জন্যে ট্রেনিং পেয়ে থাকে। এরা প্রত্যেকে দক্ষ পর্বতারোহী, পর্বত যোদ্ধা, ট্রেইন্ড প্যারাট্রুপার এবং অবশ্যই জঙ্গল যুদ্ধে পারদর্শী গেরিলা সেনা। বহুবছর এদের কাশ্মীর, চীন ও মায়ানমার সীমান্তে কোভার্ট অপারেশন এবং ইন্টেলিজেন্স গ্যাদারিং সহ নানা সিক্রেট অপারেশনে ব্যবহার করা হয়ে আসছে। ...১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাকে অপারেশন ঈগল চালাতে ভারতীয় সেনা এদের প্যারাট্রুপিং করেছিল। পাকসেনাদের হাত থেকে প্রায় ৩,০০০ তিব্বতি SFF জওয়ান চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলকে মুক্ত করেছিল এবং পাকসেনাদের মায়ানমারে পালিয়ে যাওয়া আটকেছিল। এই যুদ্ধে SFF এর ৫৬ জন সেনা এবং একজন দাপন (ব্রিগেডিয়ার) শহীদ হয়েছিলেন। বাংলাদেশের কেউ কোনোদিন এই তিব্বতি ফোর্সের নাম শুনেছে কিনা কে জানে! SFF এর মত একটি সর্বোচ্চ প্রশিক্ষিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সেনা যারা ভারতবর্ষ ও তাদের দলাই লামার প্রতি সর্বোচ্চ সৎ ও বিশ্বাসযোগ্য এবং যারা তাদের হারানো স্বাধীন তিব্বত ফিরে পেতে যখন তখন নিজেদের আত্মাহুতি দিতে পারে, তারা জানে তারা কোনো পুরস্কার মেডেল চক্র কিছুই পাবে না, এমনকি তাদের বলিদানও প্রকাশ্যে সরকারিভাবে স্বীকৃত হবে না। তবুও তারা চীনের বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াইয়ে সদা প্রস্তুত। ফলে সাম্রাজ্যবাদী চীন এবং তিব্বত দখলকারী চীনা সেনারা SFF কে যমের মতো ভয় পায়। ...SFF সেনারা বলে চীন আমাদের ভূমি দখল করতে পারে কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কের দখল নিতে পারবে না। আমাদের জীবনের এক ও একমাত্ৰ উদ্দেশ্য তিব্বতের স্বাধীনতা, দলাই লামাকে লাসার পোতালা প্যালেসে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। SFF এর যুদ্ধ সংগীত এর বাংলা অনুবাদ এইরূপ- - " আমরা হলাম ভিকাসি, চাইনিস রা অন্যায় ভাবে আমাদের থেকে আমাদের আমাদের ভুমি কেড়ে নিয়ে আমাদের নিজেদের বাস্তুচুত করেছে, তারপরও ভারতবর্ষ আমাদেরকে নিজেদের মত করেই রেখেছে। একদিন, অবশ্যই একদিন আমরা চিনকে উচিত শিক্ষা দিয়ে তিব্বত থেকে তাড়িয়ে আমাদের তিব্বতকে পবিত্র করব।“!" কার্গিল যুদ্ধ থেকে রোজকার কাশ্মীরের LOC অঞ্চলে জেহাদি অনুপ্রবেশ ঠেকানো, সিকিমের ডোকালাম থেকে অরুণাচলের জঙ্গল সীমান্ত রক্ষা, সবেতেই ভারতীয় সেনার সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে চলছে SFF....সবশেষে চীনা আগ্রাসন ঠেকাতে দেশের জন্য সর্বোচ্চ বলিদান দেওয়া তিব্বতি SFF জওয়ান নিমা তেনজিং'কে আমাদের প্রণাম! তার পরিবারের প্রতি জানাই সমবেদনা! শহীদ কোম্পানি লিডার নিমা তেনজিং এর স্বাধীন তিব্বতের স্বপ্ন সফল হোক। জয় তিব্বত!
জয় হিন্দ। ভারত মাতা কি জয়। জয় শ্রী রাম
সংগৃহীত
সেলিব্রসান এর ভিডিও লিন্ক-- Click This Link
১. ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ রাত ১২:২৫ ০