১/
২০১৬ সালে আমাদের ইউনিভার্সিটিতে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী সুজি নাকামুরা এসেছিলেন। এর দুই বছর আগে উনি নোবেল প্রাইজ পান নীল আলো তৈরি করার জন্য।
অনেকেই ভাবতে পারেন, নীল আলো আর এমন কি? এটা আবিস্কারের জন্য কি কেউ নোবেল প্রাইজ পেতে পারে?
নাকামুরা সাহেবের সাথে এক রুমে দুপুরের খাবার খাওয়ার কথা বলাতে বাংলাদেশের স্বনামধন্য ইউনিভার্সিটির এক প্রফেসর আমাকে বলেছিলেন, “আরেহ উনি তো একটা ছোট জাপানি কোম্পানির মামুলি ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন।” সেই বাংলাদেশি প্রফেসরের কথা শুনে মনে হয়েছিল যেন কোন ছোট কোম্পানির মামুলি ইঞ্জিনিয়ার নোবেল প্রাইজ পাবার যোগ্য না। বাংলাদেশের সেই প্রফেসর আরো কি বলেছিলেন সেটা পরে বলছি। তার আগে নাকামুরা সাহেব ও নীল আলোর গল্প বলে নেই।
প্রথম কথা, নীল আলো এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
নাকামুরা সাহেব নীল আলো তৈরি করেছিলেন লাইট এমিটিং ডায়োড (LED) দিয়ে। যদিও পঞ্চাশের দশকেই LED দিয়ে বিভিন্ন রঙের আলো বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছিলেন, কিন্তু নীল রঙের আলো কেউ তৈরি করতে পারছিলেন না। প্রায় কয়েক দশক বিজ্ঞানীদের নাকানি-চুবানি খাইয়েছিল এই নীল আলোর রহস্য।
নীল আলো তৈরি করতে না পারার কারণে থমকে ছিল অনেক আবিস্কারও। কারণ, অনেক আগে লাল ও সবুজ আলো বিজ্ঞানীরা তৈরি করতে পারলেও নীল আলো তৈরি করতে না পারার কারণে সাদা আলো তৈরি করা যাচ্ছিল না। কারণ, সাদা আলো তৈরি করতে লাল ও সবুজের সাথে নীল আলোও দরকার হয়। শুধু সাদা আলো না, অন্য যেকোন রঙের আলো তৈরি করতে গেলে লাল, সবুজ ও নীল আলোর কম্বিনেশন দরকার হয়। মূলত, যে কোন রঙ এই তিন রঙ্গের আলো বিভিন্ন অনুপাতে মিশিয়ে তৈরি করা যায়। সুতরাং, নীল আলো না থাকার কারণে থমকে ছিল আজকের দিনের মোবাইলের বাহারি ডিসপ্লে তৈরির কাজ। আরো থমকে ছিল কম্পিউটার ও দামী টিভির স্ক্রীণ তৈরির কাজ। নাকামুরা সাহেব LED দিয়ে নীল আলো তৈরি করেন সেই আশির দশকে। এর আগে বর্তমান প্রযুক্তির মোবাইল বা টিভির স্ক্রীণ তৈরি করা ছিল কল্পণাতীত।
এসব ছাড়াও LED এর বাতি অনেক বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী। যেখানে একটা সাধারণ বাতি প্রাপ্ত এনার্জির মাত্র শতকরা ৪ ভাগ ব্যবহার করতে পারে সেখানে LED বাতি শতকার ৫০ ভাগ এনার্জি ব্যবহার করতে পারে। সুতরাং, খুব কম বিদ্যুৎ খরচ করেই LED দিয়ে এমন বাতি বানানো যায় যেটা সাধারণ বাতি পারে না। তাছাড়া LED এর বাতি সাধারণ বাতি থেকে একশত গুণ পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
নীল বাতি কিভাবে তৈরি করা হল? এটা তৈরি করা এত ঝামেলাপূর্ণ কেন ছিল?
নীল বাতি তৈরিতে বিজ্ঞানীরা যখন হিমশিম খাচ্ছিলেন, তখন পুরো পর্যায় সারণি ঘেঁটে অল্প কিছু ম্যাটেরিয়াল পাওয়া গেল যেগুলো দিয়ে নীল আলো তৈরি করা যেতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ ম্যাটেরিয়ালের গুনাগুণ খুব আশানুরূপ ছিল না। তাও বিজ্ঞানীদের খুব আশা ছিল জিংক সেলেনাইডের উপর। নাকামুরা সাহেব যখন আমেরিকাতে গিয়ে নিজের প্রাপ্ত সম্মান না পেয়ে নিজ দেশ জাপানে ফিরে এসে নীল আলোর উপর গবেষণা করার কথা মনস্থির করলেন তখন একজন নবীন হিসাবে তিনি জিংক সেলেনাইড এর উপর আস্থা না রেখে আস্থা রাখলেন গ্যালিয়াম নাইট্রাইডের উপর।
প্রথমত, আলো তৈরীর জন্য দরকার ফোটন কণিকা। ইলেকট্রণ আর হোল এর রেডিয়েটিভ রিকম্বিনেশন হলে তৈরি হয় ফোটন। এজন্য গ্যালিয়াম নাইট্রাইডের সাথে নিয়ন্ত্রিতভাবে সুনির্দিষ্ট ভেজাল মিশিয়ে (ডোপিং) n-টাইপ আর p-টাইপ ম্যাটেরিয়াল তৈরি করা প্রয়োজন। ভোল্টেজের উপস্থিতিতে n-টাইপ গ্যালিয়াম নাইট্রাইড ইলেকট্রন সাপ্লাই দিবে আর p-টাইপ গ্যালিয়াম নাইট্রাইড হোল সাপ্লাই দিবে। এই ইলেকট্রন আর হোলের সংযোগে তৈরি হবে ফোটন কণিকা যেটা নীল আলো দিবে।
বিজ্ঞানীরা গ্যালিয়াম নাইট্রাইডের সাথে সিলিকণ মিশিয়ে খুব সহজেই n-টাইপ ম্যাটেরিয়াল তৈরি করতে পারলেও ম্যাগনেশিয়াম মিশিয়ে কোনভাবেই p-টাইপ ম্যাটেরিয়াল তৈরি করতে পারছিলেন না। প্রায় কয়েক দশক বিজ্ঞানীদের নাকানি-চুবানি খাওয়ানোর পর নাকামুরা সাহেব খেয়াল করেন যে আসলে গ্যালিয়াম নাইট্রাইডকে যে পদ্ধতিতে p-টাইপ ডোপিং করা হয় তার পদ্ধতিতে একটা ছোট ভুল আছে। সেটা হল মেটাল অর্গানিক ক্যামিক্যাল ভেপার ডেপোজিশন পদ্ধতিতে যখন গ্যালিয়াম নাইট্রাইডকে ডোপ করা হয় তখন সিস্টেমের ভিতরে থেকে যাওয়া হাইড্রোজেন ম্যাগনেসিয়ামের সাথে বিক্রিয়া করে ম্যাগনেসিয়াম-হাইড্রোজেন যৌগ তৈরি করে। এর ফলে ম্যাগনেসিয়াম আর গ্যালিয়াম নাইট্রাইডের ভিতরে গিয়ে হোল তৈরি করতে পারে না।
নাকামুরা সাহেব তখন হিরোশি আমানো ও ইসামু আকাসাকি নামে দুই প্রফেসরের সাথে কাজ করে গ্যালিয়াম নাইট্রাইড থেকে হাইড্রোজেন সরানোর ব্যবস্থা করেন। উনারা খুব সহজভাবে শুধুমাত্র হিট-ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে গ্যালিয়াম নাইট্রাইড এর ভিতর থেকে দুষ্ট হাইড্রোজেনকে বের করে আনেন। হিট-ট্রিটমেন্ট এতটাই সহজ যে এটা একটা ম্যাটেরিয়ালকে নির্দিষ্ট এনভায়রনমেন্টে সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে নিয়ন্ত্রিতভাবে ঠান্ডা করার একটা পদ্ধতি। বহু যুগ আগে থেকেই এই পদ্ধতি বিভিন্ন ম্যাটেরিয়াল মডিফিকেশনে ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনকি কামারেরাও দা-বটি তৈরি করার সময় হার্ডনেস বৃদ্ধির জন্য এই পদ্ধতিতে লোহা গণগণে গরম করে পিটিয়ে সাইজ করে পানিতে চুবান। যদিও, হিট-ট্রিটমেন্টের অনেক শাখা-প্রশাখা আছে কিন্তু এর মূলনীতি এটাই। সেটা হল গরম করে ঠান্ডা করা। হিট-ট্রিটমেন্টের সাহায্য গ্যালিয়াম নাইট্রাইড থেকে দুষ্ট হাইড্রোজেন বের করে আনার এই পদ্ধতি বের করতে নাকামুরা সাহেব ও উনার সহযোগীদের দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে। উনাদের হাজার হাজার আরো সাম্ভব্য পদ্ধতিগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়েছে, দিনের পর দিন ল্যাবরেটরিতে ঘুমাতে হয়েছে। উনাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে আজ মানুষ এত সহজেই নীল আলো তৈরি করতে পারছে।
নাকামুরা সাহেব আমাদের বলেছিলেন, এই নীল আলো তৈরির আগের পাঁচ বছর তিনি একদিনও ছুটি নেন নাই। এমনকি সাপ্তাহিক ছুটির দিন কিংবা বড়-দিন, নিজের জন্মদিন অথবা অন্য যে কোন উপলক্ষই থাকুন না কেন তিনি ছুটি না নিয়ে দিনের পর দিন কাজ করে গেছেন। যার ফলশ্রুতিতে পৃথিবী পেয়েছে নীল আলোর বর্ণিল ছটা আর উনি ও উনার দুই সহযোগী পেয়েছেন নোবেল প্রাইজ। তিনি ছিলেন জাপানের নিচিয়া কেমিক্যাল কর্পোরেশনের এক ইঞ্জিনিয়ার। যেই তিনি প্রথমবার আমেরিকাতে গিয়ে প্রাপ্ত সম্মান পাননি সেই তিনি এখন আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার এক ডাকসাইটে প্রফেসর।
২/
আমাকে সেই বাংলাদেশি প্রফেসর কি বলেছিলেন?
কথা প্রসঙ্গে নাকামুরা সাহেবের কথা উঠতেই বাংলাদেশের এক স্বনামধন্য ইউনিভার্সিটির প্রফেসর এমনভাবে উনাকে “মামুলি ইঞ্জিনিয়ার” বলেছিলেন যে আমার মনে হয়েছিল “মামুলি ইঞ্জিনিয়ার”-রা নোবেল প্রাইজ পাবার যোগ্য না। উনি আরো বলেছিলেন, “শুধু হিট-ট্রিটমেন্ট করেই একজন নোবেল প্রাইজ পেয়ে গেল? এটা একটা কথা!”
আসলে হিট-ট্রিটমেন্টের পদ্ধতিটা সহজ হলেও সেটা বের করতে নাকামুরা সাহেব ও উনার সহযোগীদের কি পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয়েছে সেটা অনেকেই বুঝে নাই। আর যদি ব্যাপারটা এতই সহজ হয় তাহলে বাংলাদেশের সেই প্রফেসর নিজে কেন এই পদ্ধতি আবিস্কার করেন নাই? মূলকথা হল, বাংলাদেশের বেশিরভাগ প্রফেসর সবাইকে নিজেদের ছাত্র ও সর্বজান্তা ভাবেন এবং সেই কারণে অনেক সময় গবেষণা থেকে দূরে থাকেন।
বাংলাদেশের সেই প্রফেসরের কথা আমি “কথার কথা” হিসাবে নেই নাই কারণ “কথার কথা”-এর মাধ্যমেই মানুষের মনের ভিতরটা দেখা যায়।
গবেষণার প্রথম পাঠ হওয়া উচিত বিনয় শেখা ও “আমি কিছু জানি না, তাই সবার কাছ থেকে শিখতে এসেছি” এই নীতি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা। আমার কথা বিশ্বাস না হলে নাকামুরা সাহেবের সাথে দেখা করে আসতে পারেন এটা বুঝার জন্য যে নোবেল প্রাইজ পেয়েও একজন কত বিনয়ী হতে পারে।
৩/
আরো একটা সহজ নোবেল প্রাইজ পাবার গল্পঃ
ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির দুই প্রফেসর ২০০৪ সালের এক শুক্রুবার বিকেলে পাগলামি করে গ্রাফাইটের শিটের উপর স্টিকি টেপ বসিয়ে হ্যাঁচকা টান মেরে গ্রাফাইটের কয়েকটি লেয়ার তুলে আনেন। ঠিক যেভাবে নিজের পায়ে স্কচ টেপ লাগিয়ে হ্যাঁচকা টান মারলে লোমগুলো ছিঁড়ে আসে অনেকটা সেই পদ্ধতিতে উনারা গ্রাফাইটের কয়েকটা লেয়ার আলাদা করেন।
গ্রাফাইট কি জানেন? ওই যে পেন্সিলের লিড - সেটাও কিন্তু গ্রাফাইটের শিট। যাইহোক, উনারা আবারো সেই কয়েকটি গ্রাফাইটের লেয়ারের উপর স্টিকি-টেপ বসিয়ে হ্যাঁচকা টান মেরে আরো চিকণ গ্রাফাইটের লেয়ার তৈরি করেন। এই পদ্ধতি কয়েকবার করার পর উনারা গ্রাফাইটের একটা মনোলেয়ার (এক অণুর স্তর) তৈরি করতে সক্ষম হন।
গ্রাফাইটের এই মনোলেয়ারের নাম “গ্রাফিন” যা কিনা আজকের দুনিয়ায় গবেষকদের কাছে এক “আলাদীনের চেরাগ”। গ্রাফিন আসলে ছয়টি কার্বণ মিলে একটা ষড়ভূজাকৃতির কাঠামো যেগুলো পাশাপাশি বসে একটা বিশাল জালের মত শিট তৈরি করে। গ্রাফিন নামক জালের যে ফুটোগুলো আছে সেগুলো এতই ক্ষুদ্র যে এর ভিতর দিয়ে ক্ষুদ্র পরমাণুও যেতে পারে না। গ্রাফিন স্টিলের চেয়ে ২০০ গুণ শক্তিশালী আবার কপারের চেয়ে ১০ লক্ষ গুণ বিদ্যুৎ পরিবাহী। তাই ইলেকট্রনিক্সের উপর গ্রাফিনের কোটিং থাকলে জিনিসটা থাকে সুরক্ষিত আবার বিদ্যুৎ পরিবহণে কোন সমস্যা হয় না। এছাড়াও গ্রাফিনের আরো হাজারো গুণাগুণ আছে যেগুলো এখানে বলে শেষ করা যাবে না।
এই যুগান্তকারী আবিস্কারের জন্য ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির সেই দুই পাগলাটে প্রফেসরের ২০১০ সালে নোবেল প্রাইজ পান। সেই দুই প্রফেসরের নাম আন্দ্রে জেমস ও কস্তা নোভোসেলভ। আমি যদি সেই এই প্রফেসরের নাম বাংলাদেশের সেই ডাকসাইটে প্রফেসরকে বলতাম উনি হয়ত আন্দ্রে জেমস ও কস্তা নোভোসেলভকে উনার ইউনিভার্সিটির ঝাড়ুদাড় বানিয়ে দিতেন।
তাই বাংলাদেশের সেই প্রফেসরকে লম্বা সালাম দিয়ে চলে এসেছি।
----------------------------------------------------------------------------
সমাপ্ত
লেখাটা যদি শেয়ার করতে চান, তাহলে দয়া করে আমার টাইম লাইন থেকে করবেন। ধন্যবাদ।
বই দ্যা ওয়ে, চায়না সিরিজের মত সিংগাপুর সিরিজ আসছে। শীঘ্রই পোস্ট করা শুরু করব।