১/
২০০৫ সাল। আমরা তখন আর্লি টোয়েন্টিজে। আমাদের চোখে ছিল হাজারো রং-বেরঙ্গের স্বপ্ন।
সেই সময়ের ঢাকা শহর আজকের চেয়ে অনেক আলাদা ছিল। আমাদের ফেসবুক, হোয়াটসআপ, ইন্সটাগ্রাম আর টিকটক ছিল না। আমাদের ছিল বাটনওয়ালা মোবাইল ফোন। সেই ফোন দিয়েই আমরা বন্ধুত্ব করতাম, যোগাযোগ করতাম। সেই সময়ে ঢাকা শহরে আন্ডারগ্রাউন্ড অনেক ব্যান্ড ছিল। আমাদেরও আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড ছিল। আমরা স্বপ্ন দেখতাম একদিন আমরাও সমাজ পরিবর্তন করে দিব আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড দিয়ে। আমরা হতে চেয়েছিলাম জিমি হ্যান্ড্রিক্স, এরিক ক্ল্যাপটন, ব্যাড ফিঙ্গার, রিঙ্গো, বব মার্লি অথবা আজম খান।
একদিন বুয়েটের ক্লাস শেষ করে ফাইয়াজদের গ্রীণ-রোডের বাসাতে চলে গেলাম। আমার ব্যাগে বই খাতা ছিল না, ছিল Zoom GFX4 গিটার প্রসেসর। ফাইয়াজদের বাসায় আমরা গান করতাম, গান বানাতাম, গান লিখতাম। ফাইয়াজদের বাসাটা আমাদের অনেক প্রিয় ছিল।
ফাইয়াজের রুমের পুরো একটা দেয়াল জুড়ে ছিল এক বিশাল স্লাইডিং জানালা। সেটা খুলে দিলে ঢাকার আকাশের অনেকটাই সেই রুমে নেমে আসত। আর ফাইয়াজের ছিল বিশাল বিশাল সিন্দুক। সেখানে থাকত থরে থরে সাজানো টেপ-ক্যাসেট, না হয় গল্পের বই। ফাইয়াজের সংগ্রহশালা এত বিশাল ছিল যে বাসাতে জায়গা না আঁটার কারণে সেসব সিন্দুকে রাখতে হত।
যেই সময়ের কথা বলছি সেই সময়ে ইন্টারনেটে দুনিয়ার সব গান সহজলভ্য ছিল না। আমরা যে পরিমাণ দুনিয়ার তাবত বিখ্যাত-অখ্যাত অথবা কুখ্যাত ব্যান্ডের গান শুনতাম, তাতে বিশাল ঝক্কি-ঝামেলা করে টেপ রেকোর্ডারে গান শুনতে পারাটাই আমাদের বিশাল প্রাপ্তি ছিল। বাংলাদেশে দুস্প্রাপ্য সেইসব টেপ-রেকোর্ডার ফাইয়াজ কিভাবে সংগ্রহ করত সেটা আরেক বিশাল কাহিনী।
ফাইয়াজের বাসাতে গিয়ে দেখি আমার আগেই তান্না, নোবেল আর মুগ্ধ চলে এসেছে। ফাইয়াজ আর নোবেল সেই সময়ের বিখ্যাত আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড Dreek-এ ছিল। অনেকের মনে থাকতে পারে Dreek ২০০৭ সালের ডি-রকস্টার প্রোগ্রামে সারা বাংলাদেশের মাঝে পঞ্চম হয়েছিল। ফাইয়াজ ছিল গিটারিস্ট আর নোবেল ছিল ভোকালিস্ট। এইখানে বলে রাখি, ডি-রকস্টারে Dreek পারফর্ম করছিল আমার গিটার দিয়ে। আমি বুয়েটের পড়ে আর টিউশনি করে সেই সময়ে Ibanez JS100 (জো স্যাট্রিয়ানি সিরিজ) গিটার কিনে ফেলেছিলাম। সাধ্যের চেয়ে অসম্ভব দামী সেই গিটার কেনা থেকে বুঝা হয়ত যায় আমরা কতটা সিরিয়াস ছিলাম। অনলাইনে গিটারটার দাম আর আমার সেই সময়ের বয়স বিবেচনা করলে হয়ত ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন।
এইদিকে, আমি আর তান্না আরেকটা আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড তৈরি করেছিলাম। বলা বাহুল্য, আমরা আর Dreek ব্যান্ড আসলে অনেক সময়েই একসাথে স্টেজে পারফর্ম করতাম। আমরা ছিলাম ব্রাদারহুড।
আচ্ছা আগের কথাতে আসি।
সেইদিন বুয়েট থেকে ফাইয়াজের বাসাতে আমরা গিয়েছিলাম একটা গান বানানোর জন্য। বুয়েটে সারাদিন ক্লাস করে সেই গানের একটা লাইনই আমার মাথাতে ছিল। সেটা হল, ‘আমার চোখে আঁধার, তোমার চোখে আলো’। গানের বাকি লাইনগুলো ফাইয়াজদের বাসাতে বসে লেখার ইচ্ছা ছিল।
আমার প্রথম লাইনটা শুনে মুগ্ধ গানের পরের লাইনগুলো ঝটপট লিখে ফেলেছিলঃ
আমার চোখে আঁধার, তোমার চোখে আলো
দৃষ্টির গভীরে হাজারো স্বপ্ন লুকিয়ে ছিল।
আকাশকে বিলিয়ে দিতাম, স্বপ্লের সব রংগুলো
আজ কেন তবে আমাদের, এই পথ শুধু সাদাকালো।
আমি গিটারে একটা প্রোগ্রেশন আগেই তৈরি করে রেখেছিলাম। খুব সিম্পল C-মেজর স্কেলের উপর তৈরি করে একটা প্লাগইন। এটা শুনে ফাইয়াজ আর তান্না মিলে খুব ঝটপট Fruty Loops সফটওয়ার দিয়ে একটা ড্রামস লুপ তৈরি করে ফেলে। সেটার উপর তান্না বেস গিটার বাজায়। এদিকে মুগ্ধ, নোবেল আর তান্না সেই গিটার, ড্রামস আর বেসের উপর ভিত্তি করে গানটার সুর তৈরি করে।
এদিকে রাত অনেক গভীর হয়ে গিয়েছে। ফাইয়াজদের বাসাতে পেটপুরে আমরা খেয়েছি সবাই। আমাদের নিজেদের ভিতর হাসি-ঠাট্টা আর অনেক গল্পের মাঝে গানের কাজ চলতে থাকে। ফাইয়াজের জানালা দিয়ে ঢাকার আকাশের মিটমিট করে জ্বলতে থাকা তারাগুলো আমাদের মাঝে নেমে আসে। আমরা লাইট নিভিয়ে তারার আলোতে আর কম্পিউটারের স্ক্রিনের আভায় কাজ করতে থাকি। হয়ত এই পরিবেশটাই আমার মনে এক বিশাল আবহ তৈরি করেছিল। তাই পরের লাইনগুলো আমি লিখে ফেলি এভাবেঃ
নিঃসীম এই রাতে তুমি আবার
আলো হয়ে জেগে থাকো আকাশে
স্পর্শ দিয়ে তুমি এই দুচোখে
নতুন স্বপ্ন এঁকে চলো আনমনে …
হেঁটেছিলাম আমি, একা পথে
বিবর্ণ সব স্বপ্ন নিয়ে …
হটাৎ কোন এক ঝড় এসে
আলো সব নিভে গেল …
আলো সব নিভে গেল …
সেই C-মেজর স্কেলের উপর আমরা গানের বাকি কাজটা করে যাই। সেই রাতে কতবার যে নোবেল আর তান্না ভোকাল টেক করছিল সেটা আর না বলি। গভীর রাতে যখন আমরা পুরো গানটা শুনছিলাম, আমরা নিজেরাই বারবার শিহরিত হচ্ছিলাম। অদ্ভুত মায়াময় ছিল সেই সময়টা।
বেশি আবেগের ঠেলায় আমি আরো কয়েক লাইন লিখে ফেলি গানটার। কিন্তু সবাই এই বাড়তি লাইনগুলো গানটিতে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। সবার মতে গানটি যতটুকু করা হয়েছে, ততটুকুই একেবারে ঠিক আছে। ওতে বাড়তি কিছু যোগ করলে আর ব্যাপারটা ঠিক থাকবে না। আমি সবার কথা মেনে নেই। গানের বাড়তি লাইনগুলো ছিল এমনঃ
আকাশে বাড়িয়ে হাত, আমি ছুঁতে চাই দিগন্ত
দিগন্তটা ছুঁতে গিয়ে আমি হারিয়েছি সব স্বপ্ন
আকাশে বাড়িয়ে হাত অনুভব করি সবই যে শূণ্য
শূণ্যতা ছাড়া নেই যে আমার আর কিছু দেবার মত …
যাইহোক, গান বানিয়ে আমরা এতটাই শিহরিত হই যে, আমি আর তান্না পরের দিনই আমাদের গিটার-গুরু আদিল ভাইয়ের বাসাতে চলে যাই। আদিল ভাই আমাদের গিটার শিখাতেন। ভাইয়ের হাত ধরেই আমার মিউজিকের গ্রামার, রিদম প্রোগ্রামিং, মিউজিক নোটেশন ইত্যাদি শেখা। আদিল ভাই চোখ বন্ধ করে আমাদের পুরো গানটা শুনে সেটার উপর আরো কিছু গিটারের কাজ করে দেন। অসম্ভব সুন্দর সেই সময়গুলো এখনো আমাদের চোখে ভাসে।
২/
জীবনের গতি আর সময়ের স্রোত অনেক নিষ্ঠুর।
২০০৭ সালেই ডি-রকস্টার প্রোগ্রাম চলার সময়ে নোবেল ইতালি চলে যায়। আমি খুব সচেতনভাবেই ২০০৮ সালে দেশ ছেড়ে মালয়শিয়া চলে যাই। অনেকেই অবশ্য বলতে পারেন, বুয়েটে পড়ে কেন উচ্চ-শিক্ষার জন্য মালয়শিয়া গিয়েছিলাম। সেই গল্প না হয় আরেকদিন করব। তবে শুধু বলে রাখি মালয়শিয়া যাওয়া আমার খুব সচেতন একটা সিদ্ধান্ত ছিল।
ফাইয়াজ কিছুদিন পরে ২০০৯ সালে অস্ট্রোলিয়া চলে আসে। তান্না একটা বেসরকারি ব্যাংকে যোগ দেয়। আমার সেই Ibanez জো স্যাট্রিয়ানি সিরিজের গিটারটি মালয়শিয়া যাওয়ার সময় তান্নাকে দিয়ে আসি। এদিকে মুগ্ধ ডাক্তারি পড়া শেষ করে মেডিক্যাল অফিসার হিসাবে মানব সেবায় নেমে পড়ে।
সময়ের স্রোতে আমরা সবাই অনেক দূরে চলে গেলেও আমাদের মাঝে ঠিকই যোগাযোগ ছিল। আমরা সবমসয়ই আমাদের সেই আর্লি টোয়েন্টিজকে মিস করতাম। ফেসবুকের মাঝেই জানতে পারতাম মুগ্ধের পাহাড়প্রীতির কথা, বান্দরবনের মানুষের কথা। সে বিনে পয়সায় বান্দরবনের পাহাড়ি মানুষের কাছে চিকিৎসা পৌঁছে দিত, নিজের পয়সায় কিনে দিত ঔষধ। মুগ্ধের কাছেই জানতে পারি বগা লেকের পাশে বাস করা সিয়াম দিদির কথা, তার স্কুলের কথা। মুগ্ধ সেই স্কুলের জন্য টাকা পাঠাত। বগা লেকের ধারে মুগ্ধের দেয়া টাকায় সিয়াম দিদি কিছু বার্মিজ আম গাছ লাগান।
মুগ্ধের ইচ্ছে ছিল উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকা যাবার। যাবার সব প্রস্তুতিও প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। ওর ইচ্ছে ছিল বান্দরবনে একটা ট্যুর দিয়ে এসেই আমেরিকার ভিসা প্রসেসিং শুরু করবে।
আমরা এসব ঠিকই শুনতাম, কিন্তু জীবন-জীবিকার তাগিদে অনেক কিছুই আমাদের পক্ষে করা সম্ভব হত না। আমরা মুগ্ধকে খুব হিংসে করতাম। জীবনকে কতভাবে দেখা যায়, কতভাবে বেঁচে থাকা যায়, সেই মন্ত্র আমরা মুগ্ধের কাছ থেকে শিখেছিলাম।
৩/
২০১২ সালের জানুয়ারি মাসের এক সকালের গল্প।
মালয়শিয়ার কুয়ালালামপুরে বসে খবর পেলাম আমাদের বন্ধু মুগ্ধ আর আমাদের মাঝে নেই। বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চূড়া জো ত্লাং থেকে দুই সপ্তাহের অভিযান শেষ করে ঢাকায় ফিরে যাওয়ার সময় মুগ্ধদের বাসটি বান্দরবনের থানচিতে এসে প্রায় দুইশত ফুট গভীর খাঁদে পড়ে যায়। মুগ্ধ প্রচন্ড আঘাত পেয়ে সেখানেই মারা যায়। মুগ্ধসহ সে দূর্ঘটনায় মারা যায় আরো সতেরো জন।
মুগ্ধের এই আকস্মিক চলে যাওয়া আমরা আজো কেউ মেনে নিতে পারিনি। মুগ্ধের কথা মনে পড়লেই মনে পড়ে হাজারো স্মৃতি। সেই ফাইয়াজদের গ্রীণ-রোডের বাসা, ফাইয়াজের জানালা, তারা ভরা রাতে গিটার বাজানো, ঢাকার রাজপথ, তপ্ত দুপুর, সাঁঝবেলা, রূপকথা, বারান্দায় পড়ে থাকা ইজি-চেয়ার, রঙ জ্বলে যাওয়া জানালার কার্নিস, বুক শেলফের অগোছালো বইয়ের স্তুপ, আরো কত কি কি ...
মুগ্ধের খবর শুনে সিয়াম দিদি সেই দূর্গম এলাকা থেকে ঢাকা চলে আসেন শেষবার দেখা করার জন্য।
সিয়াম দিদির লাগানো সেই বার্মিজ আম গাছগুলো এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। সেখানে এখন অনেক আম হয়। বগা লেকের সেই স্কুল ঘরের পাশের গাছগুলো এখনো আগলে রেখেছেন সিয়াম দিদি। যখন পর্যটকেরা আসেন, কথা বলেন, সিয়াম দিদি গাছগুলো দেখিয়ে বলেন, “গাছগুলো চেনেন? এর নাম মুগ্ধ গাছ।”
৪/
মুগ্ধের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ২০১৪ সালে তান্না আমাদের সেই ‘সাদা-কালো’ গানটি তার ‘অবয়ব’ ব্যান্ডের কভারে ডুগডুগিতে প্রকাশ করে। পরে ২০১৯ সালে তার ব্যান্ডের কভারে "আবির্ভাব" নামক এলবামে গানটি আবার পূনঃপ্রকাশিত হয়।
পৃথিবীতে ভালো মানুষেরা বেশিদিন থাকে না। আমাদের মুগ্ধও ছিল না। কিন্তু মুগ্ধ তার মুগ্ধতার রেশ নিয়ে আমাদের মাঝে রয়ে গেছে চিরজীবন। আর আমরা যারা এখনো জীবন বয়ে চলেছি তারা এখনো মুগ্ধের সাথে বেঁচে আছি আমাদের সেই আর্লি টোয়েন্টিজে।
প্রকৃতির খেলায় একদিন এই পৃথিবীতে আমরাও থাকবনা। বেঁচে থাকলে একদিন আমাদেরও চোয়াল ধীরে ধীরে বসে যাবে, চামড়া কুঁচকে যাবে, কপালের মাঝে বলিরেখা দেখা দিবে। অনেকদিন পরে হয়ত জীবনের অন্য কোন প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমাদেরও মনে পড়বে সেই ২০০৫ সালের তারাভরা রাতের কথা। সময় বদলাবে, ঋতু বদলাবে, মানুষ বদলাবে, কিন্তু মুগ্ধ আর সাদা-কালো গানটি রয়ে যাবে আমাদের আর্লি টোয়েন্টিজে।
৫/
অবয়ব ব্যান্ডের কভারে “সাদা-কালো” গানটির লিংক।
লেখাটি আমার ফেসবুক টাইমলাইন থেকে পুন্:প্রকাশিত
***
সমাপ্ত