ট্রাফিক জ্যাম আর সুখ/দূখঃ
আমার বাসা থেকে অফিসের দূরত্ত্ব প্রায় ১০ কিমি। এই পথ পাড়ি দিতে কখনো ২ ঘন্টার কম লাগেনা। গড়পরতা গতি ৫ কিমি/ঘন্টা! কিন্তু ঢাকা ছাড়া বেশ কয়েকটি ভাল শহরে দেখেছি গাড়ি ৮০ কিমি/ঘন্টা গতিতেও চলে। যাই হোক, এই পথ যেতে ৩০ মিনিটের বেশি লাগা উচিত না। প্রতিদিন গড়পরতা আমার অহেতুক সময় ব্যয় হচ্ছে ৩/৪ ঘন্টা। আমি প্রতিদিন ৮ ঘন্টা ঘুমাই, খাওয়া দাওয়া আর অন্যান্য ছোট কাজের জন্য সময় ধরে মোট ১০ ঘন্টা যায় ২৪ ঘন্টার মধ্যে। সুতরাং আমার উৎপাদনশীল সময় ১৪ ঘন্টা।
দেখা যাচ্ছে আমার ১/৪ উৎপাদনশীল সময় অহেতুক নষ্ট হচ্ছে রাস্তায়! আর এই সময়টাও নিশ্চই উপভোগ্য নয় কেননা রাস্তার ধুলা, বাসের নোংরা সীট, ঠাসাঠাসি করে থাকা যাত্রীদের ঘামের গন্ধ, বেপপরোয়া হর্ন, বাস কন্ডাক্টারের সাথে ভাড়া নিয়ে ঝগড়া, ড্রাইভারকে গালাগালি, প্রায় সবসময়ই বাসে রাজনীতির অন্ধ আলোচনা, আর ইদানিং যুক্ত হয়েছে হেডফোন ব্যবহার না করে মোবাইলের স্পীকারে গান শোনা ইত্যাদি............ এসবের ফলে যে মানষিক অবসন্নতা তা নিয়ে বাকি ৩/৪ সময় ও কি আমি ঠিকমত ব্যবহার করতে পারছি? বাসায় এসে আর কিছু করার মুড থাকেনা, আত্মীয়-স্বজনের বাসায় আসা-যাওয়ার ট্রাডিশনতো বন্ধ হয়ে গেছে এই কারনেই। আর ওই নষ্ট হওয়া সময়কে আমি মূল্যবানই বা বলি কি করে, যেখানে মানুষের জীবনেরই কনো মূল্য নেই? প্রতিদিন পত্রিকা খুল্লেই খুন-খারাবির খবর অবসম্ভাবী, তার মধ্যে কয়টার বিচার হয় জানিনা।
রাস্তায় চলতে গেলে দেখি বেকার লোকের অভাব নেই। ছোটোখাটো কোনো ব্যপারেও উৎসুক লোকের অভাব হয়না। সবার হাতে অফুরন্ত সময়, ঘন্টার পর ঘন্টাও দাঁড়িয়ে থাকে অনেকে। সবাই মেনে নিয়েছে ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম হচ্ছে নিয়তি। তাই রাস্তার মধ্যে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকাটাও কাউকে ভাবায় না। (কিন্তু আমি মনে করি কিছু পদক্ষেপ জ্যাম কমাতে পারে - সেগুলোর সম্ভাব্যতা অসম্ভাব্যতা নিয়ে পরে লেখার ইচ্ছা রইল।) কত হাতি ঘোড়ার সময়ও নষ্ট হচ্ছে, সেখানে আমার মত আদার বেপারির সময় নষ্টে কারো ভ্রুক্ষেপ করার কথা না। কিন্তু সময়ের মূল্য রচনা যে কেন পড়তাম স্কুলে তা এখন আমার বোধগম্য হয়না।
ঢাকার বাতাসে নাকি টাকা উড়ে। কথা সত্য, তা না হলে এতো লোক ঢাকায় - সবাই কিছু না কিছু উপায়ে টাকা হাতে পাচ্ছেই। ৫ হাজার আয়ের লোক থাকছে ৭ হাজার টাকার ভাড়া বাসায়, অন্যান্য খরচও নেহায়েত কম না - কি করে এত খরচ সে জোগাড় করে তা আমার মাথায় ঢোকেনা। যা হোক, অফিসে যাওয়ার সময় বাসে বাদুড়-ঝোলা হয়েও উঠতে না পাড়ায় অনেকে কেনার চেষ্টা করছেন নিজের গাড়ি, কিনেও ফেলছেন অনেকে। চাকরির বিচারে যার সংসার চালানো কঠিন হওয়ার কথা, তারও দেখি এক্টা গাড়ি হয়েই যাচ্ছে! কিন্তু এটাই কি পরিত্রাণ? জ্যামে বসে থেকে হাজারো প্রাইভেট কার আটকে থাকতে দেখেতো তা মনে হয়না। কিন্তু এই ট্রাফিক জ্যাম নিরসনের জন্য সরকারের কোন পদক্ষেপ তো দেখি না। এক ট্রাফিক জ্যামের জন্যই ঢাকায় থাকাটা আমার কাছে আজাবের মতো লাগে - পানি, গ্যাস, বিদ্যুতের সমস্যা নাহয় বাদ দিলাম।
কি এক্টা দুলাইনের বিখ্যাত কবিতা শুনেছিলাম, কার জানিনাঃ
খাচ্ছিদাচ্ছি, ঘুমাচ্ছি, অফিস যাচ্ছি।
খাচ্ছিদাচ্ছি, ঘুমাচ্ছি......
এমন চল্লেও তো ভালই হতো। কিন্তু আরেক্টা জিনিষ যোগ হয়ে গেছে ঢাকার জীবনেঃ
খাচ্ছিদাচ্ছি, ঘুমাচ্ছি, অফিস যাচ্ছি, এক্টু করে মরে যাচ্ছি।
খাচ্ছিদাচ্ছি, ঘুমাচ্ছি......
