আন্তর্জাতিক নদী সংক্রান্ত নিয়মাবলী কিংবা বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের সমঝোতা কোনো কিছুরই তোয়াক্কা না করে বাংলাদেশের সীমানার সামান্য উজানে বরাক ও তুইভাই নদীর সংযোগস্থলের ৫০০ মিটার ভাটিতে বাঁধ নির্মাণ করতে যাচ্ছে ভারত সরকার। ১৬২.৮ মিটার উঁচু ৩৯০ মিটার দীর্ঘ এই বাঁধের পরিকল্পনার সমস্ত কিছু ভারত সরকার সম্পন্ন করেছে সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সাথে, বাংলাদেশকে পুরোপুরি অন্ধকারে রেখে, একতরফাভাবে। ১৯৯৫ সালের আগে বেশ কয়েকটি স্থান বাঁধ নির্মাণের জন্য খোঁজাখুঁজির পর ভূ-প্রকৃতিগত গঠন প্রতিকূল হওয়া এবং বিপুল কৃষি জমি ধ্বংস হবার কারণ দেখিয়ে সেগুলো বাতিল করা হয়। কিন্তু ১৯৯৫ সালে একই বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন আরেকটি এলাকা বর্তমানে নির্মিতব্য টিপাইমুখ বাঁধের এলাকায় এটা নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ভারত সরকার। সেই বছরেই মনিপুরের মুখ্যমন্ত্রী মন্ত্রীসভায় বাঁধের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্তের কথা জানান। ১৯৯৮ সালে মনিপুরের পার্লামেন্টে বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এভাবে বাধার সম্মুখীন হয়ে ভারত সরকার ১৯৯৯ সালে নর্থ-ইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার কো-অপারেশন (নেপকো) এর কাছে তা হস্তান্তর করে। ২০০১ সালে মনিপুরের আদবাসী জনগোষ্ঠীর আন্দোলনকে অস্ত্রের মুখে দমন করতে সেনাবাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং মনিপুরে প্রেসিডেন্টের বা কেন্দ্রীয় শাসন জারি করা হয় এবং নেপকোর প্রস্তাব পাস করিয়ে আনা হয়। ২০০৩ সালে নেপকো প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে একটি সংশোধনী প্রস্তাব আনে এবং প্রকল্পের নাম টিপাইমুখ মাল্টিপারপাস ব্যারেজ থেকে টিপাইমুখ হাইড্রোইলেকট্রিক প্রজেক্ট করে। “বর্তমানে এই প্রজেক্টের নাম বদলিয়ে যেহেতু হাইড্রোইলেকট্রিক প্রজেক্ট করা হয়েছে কাজেই তা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই ব্যবহৃত হবে”, “জলাধারের পানিকে অন্যকোনো কাজে ব্যবহারের জন্য উত্তোলন বা গতিপথ পরিবর্তন করা হবে না।” “শুধু ভূ-পৃষ্ঠের প্রবাহমান পানির ক্ষয়হীন ব্যবহার হবে এতে। নদীর গতিপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না” ইত্যাদি কথাবার্তা রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জনসহ ভারতীয় শাসকশ্রেণী প্রচার করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তাদের এই প্রচার অসার, কপটতাপূর্ণ এবং মিথ্যা। কেননা ক্ষয়যুক্ত বা ক্ষয়হীন যে ধরনের ব্যবহারই বাঁধ দিয়ে করা হোক না কেন, তাতে নদীর স্বাভাবকি পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। একদিকে তারা সত্য গোপন করছেন, আর অন্যদিকে মিথ্যা বলছেন। ভারতীয় শাসকশ্রেণী বাংলাদেশকে যখন বলছেন এই বাঁধ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ছাড়া অন্যকাজে ব্যবহৃত হবে না তখনই ভারতীয় প্রচার মাধ্যমে জনগণকে বলা হচ্ছে প্রাথমিকভাবে এই বাঁধ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও বন্যা থেকে রক্ষার জন্য নির্মিত হলেও পরবর্তীতে সেচ ও অন্যান্য সুবিধা তা থেকে পাওয়া যাবে। স্মরণীয় ফারাক্কা বাঁধ যখন প্রথম দেওয়া হয় তা ছিল কলকাতা বন্দরকে পলি জমার হাত থেকে রক্ষা করার নিরীহ প্রস্তাব। সেই ফারাক্কার প্রভাব আমাদের সকলেই জানা। কাজেই টিপাইমুখ বাঁধের পরিণতিও সহজেই অনুমেয়। আর টিপাইমুখ বাঁধ যেখানে হচ্ছে তার আরও কিছুটা উজানে ফুলের তালা নামক স্থানে নদীর গতিপ্রবাহকে সরিয়ে নিতে ব্যারজ করা হচ্ছে। যা ভারতের নদী সংযোগ মহাপরিকল্পনার সাথে যুক্ত এবং এর লক্ষ্য রাজস্থানের খরা সমস্যার সমাধান। অর্থাৎ এই বাঁধ শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হবে পিনাকরঞ্জনের এই কথায় বিশ্বাস স্থাপন করার কোনো কারণ নেই। বিশেষতঃ ফারাক্কার টাটকা স্মৃতি যখন আমাদের মনে দগদগে ক্ষত হিসেবে হাজির আছে।
দ্বিতীয়ত, বাঁধ মাত্রেই নদীর গতিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে, জীব বৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, প্রতিবেশ হুমকির সম্মুখীন হয়। জলবিদ্যুতের জন্য নির্মিত বাঁধে তা হয় না ওই কথাটাও সত্য নয়। বিভিন্ন জলবিদ্যুঃ কেন্দ্রের নির্মিত বাঁধের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ভাটি অঞ্চলের পানির গতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস করে। উপরিভাগের পানির তাপমাত্রা বাড়ায়, নিচের তাপমাত্রা কমায়। পানিতে দ্রবীভূত নাইট্রোজেনের পরিমাণ বাড়ায়। উজানে পানির স্তরের উচ্চতা বাড়ায়। ভাটিতে কমায়। যার মিলিত প্রভাবে বিপুল পলি পড়ে নদীর তলদেশ উঁচু হয় (গতির ১ মাত্রা হ্রাসে ১৬ গুণ বেশি পলি পড়ে), মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রজাতির জন্য পরিবেশকে অনুপযুক্ত করে তোলে, প্রতিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করে, ভূমির ক্ষয় ঘটায়। এদের প্রতিক্রিয়া নির্ভর করে, নদীর প্রবাহের পরিমাণ ও বাঁধের আকারের উপর। কাজেই টিপাইমুখের মতো বৃহৎ বাঁধ নির্মাণের ফলে তা নদীর গতিপ্রবাহের ওপর কোনো প্রভাব বিস্তার করবে না বলা হয় মূর্খতা নয় জেনেশুনে মিথ্যাচার। বিখ্যাত লেখক ভারতীয় পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অরুন্ধতী রায় চমৎকারভাবে বাঁধ প্রসঙ্গে প্রয়োজনীয় কথাগুলো বলেছেন এভাবে-
“বড় বাঁধের শুরু হর্ষধ্বনিতে আর শেষটা কান্নায়। একসময় ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী, মতাদর্শ নির্বিশেষে সবাই প্রবল উচ্ছ্বাসে বড় বড় বাঁধকে স্বাগত জানিয়েছে। বাঁধকে নিয়ে কাব্যও করা হয়েছে সে সময়। এখন আর হয় না। এখন বড় বাঁধের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছে। উন্নত বিশ্বে এগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এগুলো উপকার যা করে তার চাইতে ক্ষতিই করে বেশি। বড় বাঁধ সেকেলে। অগ্রহণযোগ্য। অগণতান্ত্রিক। সরকারের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার, কে কী পাবে, কতটুকু ফলাবে তা ঠিক করে দেবার হাতিয়ার। কৃষকের জ্ঞান তার কাছ থেকে কেড়ে নেবার নিশ্চিত পদ্ধতি। গরিবের পানি, সেচ আর জমি বড়লোকের হাতে উপহার দেবার উদ্ধত পথ। এগুলোর জলাধার মানুষকে করে গৃহহীন, নিঃস্বু রিক্ত। প্রতিবেশগত বিবেচনায় চরম দুর্দশা সৃষ্টিকারী। এগুলো মাটিকে বানায় আবর্জনা। বন্যা, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, খরা আর রোগের বিস্তার এগুলোর পরিণতি। বড় বাঁধের ভূমিকম্প প্রবণতা সৃষ্টিরও যথেষ্ট প্রমাণ আছে।
[‘দি গ্রেটার কমন গুড’-অরুন্ধতি রায় ১৯৯৯]
দুনিয়াব্যাপী বড় বাঁধের বিরুদ্ধে নানা ধরনের প্রতিবাদ, বিক্ষোভের প্রেক্ষিতে এসব বাঁধের বেশিরভাগে অর্থায়নকারী বিশ্বব্যাংক এডিবিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও আওয়াজ ওঠে। তখন তারা নিজেদের পিঠ বাঁচাতেই ওয়ার্ল্ড কমিশন অন ড্যাম (ডঈউ) নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়। এমনকি ডঈউও বাঁধের সাথে মানুষের জীবনমান, পরিবেশ ইত্যাদিকে যুক্ত করে গবেষণা করে বিদ্যমান বাঁধগুলোর অপূরণীয় ক্ষতিকে অস্বীকার করতে পারেনি। ডঈউ এর ভাষ্য অনুযায়ী বড় বাঁধ প্রতিবেশের উপর নিম্নোক্ত প্রভাব রাখে-
* বন ও বন্যপ্রাণী ধ্বংস, উজানে প্রাণী প্রজাতির লোপ, উজানে সংলগ্ন এলাকায় জলাধারের প্লাবনজনিত কারণে ক্ষয়।
* উজান ও ভাটিতে জলজ প্রাণবৈচিত্র্য বিশেষত মাছের ধ্বংস, এবং ভাটিতে পলিবিধৌত অঞ্চল, জলাভূমি, নালা, মোহনা ও নিকটস্থ সামুদ্রিক প্রতিবেশের ধ্বংস।
* পানির মান, প্রাকৃতিক বন্যা, জৈব বৈচিত্র্যের উপর দীর্ঘস্থায়ী কুপ্রভাব, বিশেষ: যখন একই নদীর ওপর একাধিক বাঁধ দেয়া হয়।
মোটের ওপর প্রতিবেশের উপর ভালোর চাইতে খারাপ প্রভাবই বেশি এবং জীবপ্রজাতি ও প্রতিবেশের লক্ষণীয় ও অপূরণীয় ক্ষতি বড় বাঁধের ফলে হয়ে থাকে।
[Dams and Development: A new framwork for decision makings. An overview, Nov-16, 2000, WCD Publication]
অন্যদিকে মানুষের জীবনের উপর বাঁধ কী প্রভাব রেখেছে তাকে সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে এভাবে-
* বাঁধের ফলে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
* বাঁধের ভাটিতে বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষ বিশেষত প্লাবনভূমির স্বাভািবক কৃষিকর্ম ও মাছ ধরা যাদের জীবিকা তারা তাদের জীবিকা হারায় এবং তাদের সম্পদের ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়ে।
* বাস্তুচ্যুত বহুসংখ্যক মানুষকে হিসেবেই ধরা হয়নি। ফলে তারা কোনো ক্ষতিপূরণও পায়নি। বিশেষতঃ আদিবাসী জনগণের ক্ষেত্রে এটা বেশি ঘটেছে।
* যারা ক্ষতিপূরণ পেয়েছে তাদের ক্ষতিপূরণও অপ্রতুল। অনেকেই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার জন্য বিবেচিত হয়নি।
* এমনকি ৯০-এর দশক পর্যন্তও বাঁধের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ভাটি অঞ্চলে প্রতিবেশ ও মানুষের জীবনে কী সমস্যা সৃষ্টি হবে তা বাঁধ নির্মাণ পরিকল্পনার সময় হিসেবেই ধরা হয়নি।
[পূর্বোক্ত]
আর আমাদের মতো ভাটির দেশে বাঁধের প্রভাব কী হবে সেটা আমরা ফারাক্কার জ্বলন্ত উপস্থিতির ফলে আমাদের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়েই টের পাই। টিপাইমুখ হলে তার অভিজ্ঞতাও যে আলাদা খুব বেশি কিছু হবে না তা বলাই বাহুল্য। ভারতীয় শাসকরা যতই ঢাক ঢাক গুড় গুড় করুক না কেন। এখানে সংক্ষেপে টিপাইমুখ বাঁধের সম্ভাব্য প্রতিক্রিযা আমরা উল্লেখ করছি-
* টিপাইমুখ বাঁধের ফলে শুকনো মৌসুমে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর গতিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পাবে। এই সুরমা-কুশিয়ারা যেহেতু মেঘনায় এসে পড়েছে কাজেই গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদী মিলিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও গতিশীল মিঠা পানির অববাহিকার একটি বাংলাদেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। কেননা এই গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা স্রোতধারার ১৫% পানি আসে মেঘনা দিয়ে।
* নদী বিধৌত বাংলাদেশ নানা ধরনের জলাভূমি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বিভিন্ন বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও অবস্থান অনুসারে যাদের নামকরণ করা হয়। হাওড় হচ্ছে ভূ-প্রকৃতিগতভাবে প্লাবন সমভূমির অবনমনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া এক ধরনের বাটি আকৃতির অভ্যন্তরীণ জলাধার। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অংশের মোট ভূমির প্রায় ২৫ ভাগই এ ধরনের জলাধার। এই হাওড়গুলোর প্রতিবেশগত ভারসাম্য, সুরমা, কুশিয়ারা এবং মেঘনার প্লাবনভূমি, তাদের মোহনা এবং তারা যে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে সেগুলোর ভাগ্য নদীর উত্থান-পতন তথা নদীর বার্ষিক প্রবাহের পরিমাণের সাথে বাঁধা। ফলে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর ৫০টিরও বেশি শাখানদী এবং সিলেট অঞ্চলের অসংখ্য হাওড়-বাওড়-এ এর সরাসরি প্রভাব পড়বে। ফলে ধ্বংস হবে এই অঞ্চলের জলজ প্রাণবৈচিত্র্য প্রতিবেশগত ভারসাম্য। ধ্বংস হবে এলাকার জনসাধারণের খাদ্যের বিশাল অংশের যোগানদাতা হরেকরকম মাছ এবং মাছ ধরায় নিয়োজিত লোকদের জীবিকা।
* বাংলাদেশের ধানের একটা বড় অংশ আসে এই অঞ্চল থেকে এবং এক্ষেত্রে এই জলাভূমিগুলোর সেচের পানির একটা বড় ভূমিকা আছে। জলাধারগুলো শুকিয়ে যাওয়া কিংবা সময়মতো পানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া তাই সেখানকার কৃষি বিশেষতঃ বোরো চাষের ক্ষেত্রে মারাত্মক খারাপ প্রভাব রাখবে।
* সিলেট অঞ্চলের জৈববৈচিত্র্য এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি। নানা ধরনের বনভূমিতে অনেক বিরল উদ্ভিদ ও প্রাণীর বাস এখানে। এই জৈব বৈচিত্র্য ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এই বাঁধের কারণে।
* কাজেই এই এলাকার জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এখানে মৌসুমী বায়ু প্রবাহের কালেই বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৬০-৭০ ভাগ হয়ে থাকে (যা সাধারণভাবে জুন থেকে অক্টোবরের ভেতরে)। এ ধরনের হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার প্লান্টে আবার সাধারণভাবে মে-জুন মাসেই সমস্ত পানি ধারণ করতে হয় বছর জুড়ে একে কার্যক্ষম রাখতে। বরাক এবং এর শাখা নদীগুলো সাধারণত বছরের অন্য সময়ে শান্ত থাকে এবং বর্ষায় যখন টানা ৩/৪ দিন ধরে বৃষ্টিপাত হয় তখন এরা অশান্ত হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে মেঘনা উপত্যকার উজানে জুলাই-আগস্ট মাসে অধিক বৃষ্টিপাত হলে প্রজক্টের কর্তাদেরও বাঁধের দ্বার খুলে দিয়ে পানি ছেড়ে দেয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। সেক্ষেত্রে অপ্রতিরোধ্য অকাল বন্যায় মনিপুরের বাঁধের ভাটির অঞ্চল এবং বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাংশ ভেসে যাবে। এবং এর আগেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের বাঁধ ছেড়ে দিয়ে বন্যা ঘটাবার নজির বাংলাদেশে এবং পাকিস্তানের পাঞ্জাবে আছে। যা সেন্টার ফর সায়েন্স এন্ড এনভায়রনমেন্ট, ইন্ডিয়াও স্বীকার করেছে। কাজেই নদীর গতিপ্রবাহ পাবার ফলে শুষ্ক মৌসুমে খরা এবং বর্ষায় বন্যা এই বাঁধের আরেকটা অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।
* বাঁধের ফলে পানির স্তর নিচে নেমে যাবে, ফলে মাটির লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়বে। এবং যদি গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর গতিপ্রবাহ হ্রাস প্রায় তা উপকূলসহ সারা দেশেরই মাটির লবণাক্ততা বাড়াবে। কেননা নদী যখন সমুদ্রে মিলিত হয় তখন মিঠা পানির স্রোত লোনা পানিকে ঠেলে দিয়ে স্থলভাগে তার প্রবেশে বাধা দেয়। এক্ষেত্রে মিঠা পানির স্রোতের দুর্বল হওয়া মানে লোনা পানির স্থলভাগে ঢুকে পড়া। দীর্ঘ মেয়াদে যার ফলাফল মাটি ফসলের অনুপযুক্ত হওয়া। ত্বকের সমস্যাসহ নানা ধরনের রোগবালাইয়ের বৃদ্ধি।
* যেখানে এই বাঁধ করা হচ্ছে সেটি বিশ্বের ৬টি ভূমিকম্পপ্রবণ এলকার একটি যেখানে গত ৫০ বছরে ২টি ৮ মাত্রার চেয়ে বড় ভূমিকম্প হয়েছে। এই পুরো এলাকাটাই গঠিত পাললিক শিলাদ্বারা যার নাম সুরমা রক এবং এটি একটি ফল্টের উপরিভাগ। কাজেই এরকম অঞ্চলে একটি বাঁধের ফলে তার আদি শিলাস্তরের ক্ষয় এবং বাঁধের মাধ্যমে তৈরি হওয়া চাপে তা টেকার সম্ভাবনা খুবই কম এবং তা ভূমিকম্প-প্রবণতাকেও বৃদ্ধি করবে। ফলে সেখানে এবং সংলগ্ন অঞ্চলে ভূমিকম্প প্রবণতা বেড়ে যাবে।
* বাঁধের ফলে ২৯৩.৫৩ ভূমি স্থায়ীভাবে জলমগ্ন হবে যার ভেতরে ২১৭ কি.মি. সংক্ষিত বনাঞ্চল। মনিপুরের আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের শত বছরের বাপ-দাদার ভিটে থেকে উচ্ছেদ হবে। নদী কেন্দ্রিক তাদের জীবন ও সংস্কৃতির উপরও তা হবে মারাত্মক আঘাত। আর এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে যে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে তা-ও মনিপুর বাসীর জন্য নয়। মনিপুরবাসীর চাহিদা যেখানে ১৫০ মেগাওয়াট সেখানে এই বাঁধের বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা হতে যাচ্ছে ১৫০০ মেগাওয়াট। (নিয়মিতভাবে ৪১২ মেগাওয়াট উৎপাদিত হবে) ফলে এই বিদ্যুৎ চলে যাবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মুম্বাই, দিল্লীর ঝলমলে বাতির জৌলুস বাড়াতে। আর তার তলে ৫০,০০০ এরও বেশি মনিপুরবাসীর জীবন পড়বে ঘোর অমানিশার মুখে।
আসলে বাঁধ নির্মাণ শুধু বাঁধেরই নির্মাণ নয় একই সাথে মতাদর্শের নির্মাণ। যে মতাদর্শ উন্নয়নের। নয়া উদারতাবাদী নগদ লাভের হিসাব নিকাশের। যেখানে লাভ-ক্ষতির বিবেচনাটা নিখাদ অর্থের মাপকাঠিতে হয়। মানুষের জীবন, প্রাণ-প্রকৃতি যেখানে তুচ্ছ। যে উন্নয়নে কিছু মানুষের জন্য বলি দেওয়া হয় বিশাল জনগোষ্ঠীকে। দেশের ভেতরে পিছিয়ে পড়া জাতিগোষ্ঠী, বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে অর্থ-অস্ত্রে দুর্বর দেশ আর সমগ্র দরিদ্র খেটে খাওয়া জনসাধারণই যার অসহায় শিকার। এই উন্নয়ন ধারায় মানুষ আর তার মা প্রকৃতি শেষ কথা নয় টাকাই শেষ কথা। এ হচ্ছে নয়া উদারতাবাদী উন্নয়ন, সাম্রাজ্যবাদের উন্নয়ন দর্শন। এই ধরনের উন্নয়ন দর্শনেরই ধারক-বাহক ভারতের শাসকশ্রেণী যেমন তেমনি বাংলাদেশেরও শাসকরাও। উপরন্তু বাংলাদেশের নতজানু, সাম্রাজ্যবাদের কাছে দেশবিক্রিকারী শাসকশ্রেণী এমনকি জাতীয় স্বাথর্ বিবেচনাতেও পদক্ষেপ নিতে অক্ষম। বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মিউ মিউ আওয়াজ এই অক্ষমতারই ন্যাক্কারজনক প্রকাশ। বিএনপি এখন টিপাইমুখের বিরুদ্ধে কথা বলছে জোরেশোরে। খুব ভাল কথা। কিন্তু আমরা প্রশ্ন করতে চাই যখন টিপাইমুখের মূল পরিকল্পনা পাস হয় তাখন এই বিএনপিই তো ক্ষমতায় ছিল তখন তারা কেন এর জোর প্রতিবাদ করেনি? কেন আন্তর্জাতিক ফোরামে তা তুলে ধরেনি? এই প্রতিবাদের কতটুকু খাঁটি আর কতটুকু মেকী, শুধু রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য জনগণের ভারতবিরোধী চেতনাকে ব্যবহার করা? আর বিএনপিও কি একই রকম উন্নয়নের জোয়ারে দেশকে ভাসিয়ে দেয়ার গুলগল্প ফেরী করে না? বড় বড় বাঁধ দিয়ে নদীকে মেরে ফেলার, প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস করার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান কোথায়? একই ধরনের দেশবিরোধী পরিবেশ বিরোধী, মানুষ বিরোধী অবস্থানই তাদেরও অবস্থান। কাজেই তাদের কাছে পিটাইমুখ বাঁধের কার্যকর বিরোধিতার আশা বৃথা। বাংলাদেশের জনগণের নানা ধরনের প্রতিবাদী সংস্থা গড়ে উঠেছে ও উঠছে তাদেরই এই লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সংগ্রাম এগিয়ে নিতে হবে। মনিপুরের জনগণের প্রতিবাদের সাথে সংহতি গড়ে তুলতে হবে। যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। কেবল জনগণের ঐক্যের পথেই বাংলাদেশকে, তার প্রাণ-প্রকৃতি-নদী-মানুষকে আমরা রক্ষা করতে পারবো।