অনুবাদ: আবদুর রব
[মানুষের মনের অপার রহস্য টোমাজ ট্রান্সট্রোমার-এর কবিতার উপজীব্য। অধিকাংশ সময় নিজের অভিজ্ঞতার সাথে সঙ্গীত আর প্রকৃতির রূপের সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে তাঁর কবিতা। ইতিহাস, অস্তিত্বের প্রশ্ন আর মৃত্যু নিয়ে লিখেছেন তিনি। একজন সুইডিশ সমালোচক বলেন: “তার কবিতা যেন ধর্মনিরপেক্ষ প্রার্থনা।” বিনয়ী, ভণিতাহীন ট্রান্সট্রোমার সব সময় রাজনৈতিকে বিতর্ক এড়িয়ে চলেছেন, থেকেছেন লোকচক্ষুর অন্তরালে।
অনূদিত এই কবিতাগুলি (শেষ কবিতাটি বাদে) সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির মাসিক কাগজ নতুনধারার ২৪ তম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে]
নীল বাড়িটা
এ-রাত সূর্যের আভায় দীপ্যমান। আমি গভীর জঙ্গল থেকে আমার বাড়ির ঝাপসা নীল দেয়ালের দিকে তাকাই। যেন আমি সদ্যমৃত, যে তার বাড়িটাকে দেখছে একটা নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে। আশিটি গ্রীষ্ম অব্দি এই বাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে। এর কড়িবর্গা চারবার আনন্দ আর তিনবার দুঃখের মাতৃত্ব ধারণ করেছে। যখন কেউ এই বাড়িতে বাস করতে করতে মারা যায়, বাড়িটি রঙ করা হয়। মৃত মানুষ নিজেই পেইন্টিং হয়ে যায়, তুলি ছাড়া, ভিতর থেকে।
বাড়ির বাইরে, মুক্ত আঙিনা। একদা বাগান, এখন অনেকটা ঝোপঝাড়ে ভরে গেছে। ভাঙ্গাড়ীর জঙ্গল, আগাছার প্যাগোডা, ওয়েলিং টেক্সট, আগাছার উপনিষদ, ভাইকিংদের নৌকাভর্তি আগাছা, ড্রাগনের মাথা ভর্তি আগাছা, বর্শাফলক— একটা আগাছা সাম্রাজ্য। আগাছায় ভরে যাওয়া সারা বাগান জুড়ে একটা বুমেরাংয়ের ছায়া ছুটে বেড়ায় যা ছোঁড়া হয়েছে বারংবার। আমার বহু আগে এই বাড়িটায় যে লোকটা বাস করত তার সাথে এই বুমেরাংটার একটা বোঝাপড়া বুঝি এখনও বাকি আছে। সে যেন একেবারেই একটা শিশু। তার কাছ থেকেই আসে প্রণোদোনা, একটা ভাবনা, ভাবনাটা যেন একটা ইচ্ছা: বানাও... আঁক... ভবিতব্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর জন্য।
বাড়িটা যেন শিশুর অংকন। একটা শিশুসুলভ ব্যাপার-স্যাপার আছে এর মধ্যে কারণ কেউ যেন—খুব তাড়াতাড়ি—শিশু হওয়ার চিন্তা পরিত্যাগ করেছিল। দরোজা খোল, ভিতরে ঢুকে পড়, দেখবে সিলিংয়ে অশান্তি তো দেয়ালে শান্তির পরশ। বিছানার উপর সতের পালের একটা জাহাজের পেইন্টিং ঝোলে, ফুঁসে ওঠা ঢেউয়ের চূড়া, এবং বাতাস যা ওই ছবিটার সোনালি ফ্রেম ধরে রাখতে পারে না।
এখানে সবকিছু হয় আগেভাগে, চৌরাস্তার আগে, চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ারও আগে। এই জীবনের জন্য তোমাকে ধন্যবাদ! তবু আমি বিকল্পটা নিয়ে আফসোস করি। স্কেচ, সবগুলোই, বাস্তব হতে চায়। একটা জাহাজের ইঞ্জিন জল থেকে বহদূরে বেড়ে ওঠে গ্রীষ্ম-রাতের দিগন্তে। হাসিকান্না টলটল করে শিশিরের আতশি কাচে। আসলে কিছু না জেনেই, আমরা পানিতে ঝাঁপ দিই, আমাদের জীবনের সঙ্গী একটা জাহাজ, নীরবে অনুসরণ করে অন্য পথে। ইত্যবসরে দ্বীপের পিছনে ঝলসে ওঠে সূর্যটা।
(From The Blue House, translated by Göran Malmqvist, published by Thunder City Press.)
বৃক্ষ এবং আকাশ
বৃক্ষটা বৃষ্টির ভিতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে
ধুসর বৃষ্টিছাটের মধ্যে আমাদের পাশ দিয়ে হন হন করে চলে যায়।
তাড়া আছে তার। বৃষ্টির ভিতর সে জীবন খোঁজে যেন ফলের বাগানের ব্লাকবার্ড।
বৃষ্টি থেমে গেলে সেও থেমে যায়
নিশ্চল, নৈঃশব্দময় রাত্রি
অপেক্ষা করে যেমন আমরা চারিদিকে পেঁজা তুলার মতো
বরফ পড়ার অপেক্ষায় থাকি।
(Tomas Tranströmer, The Tree and Sky.Translated by Robin Fulton)
প্রাণচাঞ্চল্য
অশুভ দিনের শেষে, হাইডেনের সিম্ফনি বাজিয়ে
হাতে সামান্য উষ্ণতা অনুভব করি
বাদ্যযন্ত্রের চাবিগুলো তৈরী। দয়ালু হাতুড়ি পড়ে
উজ্জীবিত হয় সেই সুর, সবুজ, নীরবতাপূর্ণ।
সেই সুর বলে দেয় স্বাধীনতা আছে
কেউ একজন আছে যে সিজারকে তোয়াক্কা করে না
হাইডেনের পকেটে হাত ঠেলে দিই
জগতের সবকিছুতেই মাথা ঠাণ্ডা রাখা লোকের মতো আচরণ করি
আমি আমার হাইডেনপতাকা উত্তোলন করি। সংকেত হল:
“আমরা আত্মসমর্পণ করি না। তবে শান্তি চাই।“
সঙ্গীত হচ্ছে ঢালুতে দাড়িয়ে থাকা কাচের ঘর;
শিলাখণ্ড ওড়ে, শিলাখণ্ড গড়ায়
সোজা সেই বাড়িটার দিকে
তবু প্রতিটি জানালার কাচ এখনও সম্পূর্ণ অক্ষত।
(Tomas Tranströmer. Allegro. Translated by by Robin Fulton.)
জাতীয় নিরাপত্তাহীনতা
আন্ডার সেক্রটারী সামনে ঝুঁকে একটা এক্স আঁকলেন
এবং ডেমক্লিসের তরবারির মতো দুলতে থাকে তার কানের দুল।
যেহেতু মাটির রঙের সাথে মিশে গিয়ে রঙিন প্রজাপতিটা নয় দৃশ্যমান
দানব বেরিয়ে পড়ে খোলা সংবাদপত্র থেকে।
হেলমেটটা কেউ পরলো না, একজন ক্ষমতা নিয়ে নিল।
জলের গভীরে উড়াল দিয়ে মা-কচ্ছপ যায় পালিয়ে ।
(Tomas Tranströmer. National Insecurity. Translated by Robin Fulton.
শহরতলী
সবমিলিয়ে মানুষ নালা থেকে উঠে আসা পৃথিবীর রঙের মতোই।
এ একটা অন্তর্বতীকালীন স্থান, অবস্থা এমন, না শহর না গ্রাম।
চারিদিকে নির্মাণ কাজে নিযুক্ত ক্রেন, সবকিছু গ্রাস করে ফেলতে চায়
কিন্তু সময় এর বিপক্ষে।
চারিদিকে ছড়ানো-ছিটানো কংক্রিটের পাইপগুলি পড়ে আছে আলোআঁধারীতে শীতল নীরব।
খামারবাড়ির পুরনো ঘরগুলো দখল করে আছে গাড়ীর বডি তৈরির কারখানা।
পাথরগুলো ছায়াবিস্তার করে আছে যেন তীক্ষ্মচাঁদের কলঙ্ক।
এবং জায়গাটা ক্রমশঃ বাড়তে থাকে
যেন বিশ্বাসঘাতক জুডাসের রৌপ্য দিয়ে কেনা জমি: পটাররের মাঠ
আগন্তুকদের কবরস্থান।
(Tomas Tranströmer. Outskirts.translated by Robert Bly)
শীতের মাঝামাঝি
নীল আলো ঠিকরে পড়ে
আমার পোশাক থেকে।
শীতের মাঝামাঝি।
বরফের খঞ্জনী বাজে ঠনঠন।
আমি চোখ বন্ধ করি।
দেখি একটা নীরব পথিবী
সেখানে ফাটল
যেখানে মৃতরা
পাচার হয়ে যাচ্ছে সীমান্ত বরাবর।
(Tomas Tranströmer, Midwinter,Translation: 2002, Robin Fulton.)
ট্রেন
দুটো বাজে। জ্যোৎস্না। ট্রেন থেমে গেছে
মাঠের ভিতরে। মিটিমিটি আলো জ্বলে
দূর শহরে ।
যখন কোনো মানুষ চলে যায় তার স্বপ্নের গভীরে
সম্বিৎ ফিরে পেলে
ভাবতে পারে না সে কোথায় ছিল।
কঠিন অসুখে পড়লে
তার দিনগুলো যেন কম্পমান আলোর শিখা, আকীর্ণ,
নিস্তেজ, শীতল দিগন্তে।
ট্রেনটা সম্পূর্ণ নিশ্চল।
রাত দুটো: জ্যোৎস্না প্লাবিত, গুটিকয় নক্ষত্র।
(Tomas Tranströmer. Track. Copyright © 1997 by Robin Fulton.
রাত্রিপুস্তকের একটি পাতা
মে’র এক রাতে সমুদ্রতীরে হাঁটছিলাম
হিম-শীতল চন্দ্রালোকে
যেখানে ঘাস আর ফুলগুলো ধূসর
কিন্তু তাদের ঘ্রাণ সবুজ।
তরতর করে ঢাল বেয়ে নামি
রঙকানা রাতে
যখন শ্বেত পাথরগুলো ইশারা করে চাঁদের দিকে।
সময়ের বিচারে তা
কয়েক মিনিট
কিন্তু তার ব্যাপ্তি দীর্ঘ আটান্ন বছর।
এবং আমার পিছনে চিকচিকে সীসারঙ জল ছাড়িয়ে গেলে
দেখা মেলে সমুদ্রের অন্য তীর
আর তার শাসকদের।
লোকজন অবয়বহীন
কিন্তু ভবিষ্যৎপূর্ণ।
(Tomas Tranströmer, A page of the night-book. Translation: 2002, Robin Fulton)