সামুতে অনেক লেখিয়ে কবিতা লেখেন। সময়াভাব ও আলসেমীর কা্রণে সবার কবিতা পড়া হয় না বা বেশীর ভাগ কবিতাই চোখ এড়িয়ে যায়। তারপরও বিশেষ যে কয়েকজনের কবিতা আমাকে টানে, ভালো লাগে এবং অনুসরন করার চেষ্টা করি, তাঁদের মধ্যে আনন্দ লীলা মজুমদার , শিরীষ , শেখ জলিল ও স্বদেশ হাসনাইন আছেন।
সেদিন স্বদেশ হাসনাইনের পুরোন লেখা ঘাটতে ঘাটতে কবিতা: কবি ও কবির দায়বদ্ধতা কবিতাটি আমার দৃষ্টি আকর্ষন করলো। কবিতাটিতে হাসনাইন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ এনেছেন, আর তা হলো কবির “দায়বদ্ধতা বা commitment”। ব্যাপকার্থে একে আমরা কলাকৈবল্যে ব্যাপৃত শিল্পের যে কোন শাখার শিল্পীর দায়বদ্ধতার প্রশ্ন আকারেও হাজির করতে পারি। হাসনাইনের সেই কবিতা পড়তে যেয়ে আমাকে নতুন করে এই ধুন্ধুমার প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেঃ সমাজে একজন শিল্পীর (এখানে ‘কবি’ পড়ুন) দায়বদ্ধতা বলতে আমরা কি বুঝি, দায়বদ্ধ থাকাটা জরুরী কি না, বা কতটুকু জরুরী, ইত্যাদি। সেই সূত্র ধরেই হাসনাইনের ওই পোস্টে একটি দীর্ঘ মন্তব্য করেছিলাম, যা পরবর্তীতে মনে হলো মন্তব্যটি একটি আলাদা পোস্ট আকারে দিলে মন্দ হয় না, কেননা তাহলে আরো দশজনের অংশগ্রহনে এটি একটি আলোচনার প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। কবিতায় যাঁরা কবির “দায়বদ্ধতা” নিয়ে ভাবতে চান, তাঁদের প্রাণবন্ত মতামত কামনা করছি। নীচে হাসনাইনের সেই কবিতার প্রেক্ষিতে আমার মন্তব্যটি এখানে তুলে দিলামঃ
"আমরা যে কবি চাই তাকে চিনিয়ে দিতে হবে পথ,
আশার কপাট খুলে পবিত্র ইচ্ছেগুলোর কথা বলতে হবে
বিচ্ছেদের উল্টো পিঠে মানুষের ফিরে আসা বলে দিতে হবে,
ইস্পাতের শব্দ যদি সে জানে, শিকারের বল্লম করে তুলে দিতে হবে পাঠকের হাতে"
উপরের চারটি লাইন (নাকি স্তবক?) পড়ে আমার কিছু ভাবনার কথা বলি। লাইন চারটিতে সরাসরি ভাবেই একজন কবির দায়বদ্ধতা বা commitment-এর কথা বলা হয়েছে। শিল্প, বিশেষ করে কবিতা চর্চায় কমিটমেন্ট নিয়ে আমার বুদ্ধিবৃত্তি বলে যে, প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন নন্দনতত্ত্ব রূপকের চাতুর্য্যে, উৎপ্রেক্ষার উদ্ভাবনী ও ছান্দসিকতার মূর্ছনায় অতি সুন্দর ও অতি উৎকৃষ্ট হতেই পারে কিন্তু বৃক্ষ যদি কবির কবিতার শ্রোতা না হয়, কৃষকের পিঠে খরতাপে যখন লবণ উৎপাদিত হয়, তখন কবিতা যদি প্রেরণা না হয়, তাঁতি যদি টানা-দোটানায় কবিতার ভেতর নিজেকে খুঁজে না পায় তা’হলে কবিতা লিখার দরকার নাই। নজরুল-রবীন্দ্রনাথের যুগের পরে বাংলা কবিতা কবিরা লিখছেন নিজেদের জন্য। এই নিজ মানে তাঁর তৈরি অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন জনগোষ্ঠির এক ক্ষুদ্রাংশ। বাংলা কবিতায় অসংখ্য রূপক ক্লিশে হয়ে গেছে। রূপকের বাহাদুরি কবিতার প্রাণ নয়। এতে শব্দের,ভাষার ক্ষমতা খর্ব হয়। জোর করে ভাব তৈরি হয় না। চিন্তার চর্চা করতে হয়। চিন্তা কোনো গায়েবী ব্যাপার না। নিজেকে- নিজের স্ব ও অপর- অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে চিন্তা চর্চার প্রাথমিক পাঠ নেয়া যায়। শুধু ভাবালুতা দিয়ে কবিতা হয় না। মধ্যবিত্তের ভাবালুতা কবিতাকে বিনষ্ট করেছে(দ্রষ্টব্যঃ মহাদেব সাহা টাইপ কবিতা)। বাংলা কবিতার সঙ্গে বাংলা কবিতা প্রধান ধারার সাথে কোন সম্পর্ক নাই। কারণ প্রধান ধারা গ্রামে- কুষ্টিয়ায়, মৈমনসিংহে কিংবা অন্য কোন অঞ্চলে। শহরে খুব কম বাংলা কবির জন্ম হয়েছে। আসল পদ্য ভাষার শব্দরত্নরাজি জালালুদ্দিন পড়লে বুঝবেন। রবীন্দ্রনাথ এই ভাষার সবচেয়ে বিকশিত রূপ বলে এক অর্থে গণ্য হতে পারেন। অন্য অর্থে নয়। তিনি ভাব ও ভাষা অকাতরে নিয়েছেন বটে কিন্তু আবার পয়দা করেছেন যে ভাব তার প্রতি অনেক সমালোচনা থাকতেই পারে। তিনি ভাষার ক্ষেত্রে প্রথম বিপ্লবী। আমরা এখনও তার কবি হয়ে উঠার সাথে বাংলার জনজীবনের ভাব ও ভাষার দিক তলিয়ে দেখি নাই।
এর বিপরীত ভাবনাও আমাকে তাড়িত করে। যেমন, “কবিতা” মনে হয় প্রজ্ঞা, মনন, অনুভূতি, দার্শনিক আকুতির শব্দনির্ভর এক সংবেদনশীল নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ। এই “দার্শনিকতায়” উৎপাদনশীলতা আর ভাবুকতা থাকবে, থাকতে পারে, না-ও পারে। তাই বলে কি মানুষের সংবেদনশীলতাকে কমিটমেন্টের বেড়াজালে আটকে রেখে মাথার দিব্যি দিয়ে কবিতা লিখতে হবে?
একজন শব্দনির্মাতা তথা কবির কাজ নয় নির্দিষ্ট কোন কমিটমেন্টে দস্তখত করে নিজের প্রজ্ঞা, মনন ও আবেগানুভূতিকে খাঁচাবন্দী করা। কবি তাঁর নিজের আনন্দের জন্য লিখবেন, তাতে বর্তমান, নিকট বা দূর ভবিষ্যতে প্রাণ ও প্রকৃতিকে কতটুকু “সাহায্য” করলো- সেটা কাল বা সময়ের আবর্তে ঐতিহাসিকভাবেই নির্ধারিত হয়, হয়ে যাবে, হয়ে যেতে বাধ্য। একজন লেখিয়েকে যে কোন ধরনের কমিটমেন্টের বেড়াজালে আবদ্ধ হবার তকমা এঁটে দেয়ার ঘোর বিরোধী আমি।
কোনো কবির গায়ে রাজনৈতিক বা দার্শনিক তকমা বা ব্র্যান্ডিং করার কারণেই বহু কবিকে আমরা হারিয়েছি। আর এটা কবিতার জন্য খুবই ভয়ংকর। বাংলা কবিতার ইতিহাসে এটা বহুবার ঘটেছে। একসময় বামপন্থিরা কবিদেরকে “প্রগতিশীলতার” সনদপত্র বিতরণ করতেন। তার ফল বাংলা কবিতাকে ভোগ করতে হয়েছে। প্রজ্ঞার সাথে কাব্যের সুগভীর সম্পর্ক রয়েছে। সে-কারণে কাউকে মাঠে নেমে হাল বাইতে হবে, শ্রমনির্ভর উৎপাদনশীলতার মধ্যে থাকতে হবে এটি নিশ্চিতভাবে একটি পেটি-বুর্জোয়া ধারণা। ঘাম ঝরলেই শ্রম হয় না, খুন করলেই বিপ্লব হয় না। চিন্তা স্বয়ং একটি কাজ। চিন্তা ও কাজকে আলাদা করার অর্থ হলো, বস্তু ও ভাব আলাদা করা। বিশ্লেষণের দরকার, প্রাণ ও তার রসায়নের, বস্তু ও তার বিকাশের জন্য সব কিছুকেই ভাগে-ভগ্নাংশে, বিক্রিয়া- প্রতিক্রিয়া-মিথষ্ক্রিয়ার মধ দিয়ে ভেঙে-চুরে দেখা দরকার। সেই দিক থেকে বলছি, জনজীবন ও প্রকৃতির সবচেয়ে খারাপ সময়ে- যখন প্রাণ আর প্রকৃতির প্রতিকৃতি নয়- এটা আমি মানি যে নন্দনতত্ত্ব মানুষ বা প্রকৃতির ন্যারেশন নয়, মনন ও অনুভূতির মধ্য দিয়ে মেটাফোরিক ও সিম্বলিক করে তোলা। বিশ্লেষণ বা বর্ণনা নয়, মেটাফোরই ট্রান্সিড্যান্টাল সারমর্ম ধারণ করে। বিপ্লবের বীজ মেটাফোরিক। অবশ্যই “কবিতা” মনে হয় প্রজ্ঞা, মনন, অনুভূতি, দার্শনিক আকুতির শব্দনির্ভর এক সংবেদনশীল নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ।
এখন আমি কি করি বলেন তো? কোন রাহ্-এ যাই খোদা কি করি গো সাঁই?
** ভাষা ও তার বহিঃপ্রকাশকে কবিতার নন্দনতাত্বিক বাক্যবন্ধে আবদ্ধ করায় যে আপনি ভীষণ শক্তিশালী, উপরের কবিতাটাই তার প্রমাণ। তাই আমার সশ্রদ্ধ অভিবাদন রইলো আপনার প্রতি।
----------------------------------------------------------------------------------
কবিতা ও কবির দায়বদ্ধতা প্রশ্নে কারও কোন ভাবনা থাকলে শেয়ার করবেন আশা রাখি।