১.
রাত নেমে আসতে থাকে প্রাত্যহিক সাবলীলতায়, কিন্তু এই রাত অন্য কোনও সন্ধ্যা গড়ানো আকাশ কালো করা ঘুম আনা অভিজ্ঞতা না। যে সময়ে আলোর কোনও অভাব নেই, ঘুমের কোনও সাড়া নেই, এমনকি নেই ক্ষিধের বা তৃষ্ণার অনগ্রাহ্যনীয় বিরক্তিও। সেই সময়কে আমি রাত বলতে পারি না।
আবেগ? যৌবনের তাড়না? রক্তের নির্বোধ উন্মাদনা?
ভুল।
সবাই জানে কেনো সে বা তার বন্ধুরা এখানে এসেছে, বিন্দুমাত্র অভদ্র আচরণ করতে কাউকে দেখিনি। এমনকি আমার দেড়গুণ বয়সের একজন প্রৌঢ় আমাকে কনুই দিয়ে আকস্মিক টোকা দেয়ায় সনির্বন্ধ ক্ষমাও চাইলেন। প্রশ্ন করি এবার, কোথায় গেলে মানুষের চরিত্রের সবচেয়ে সুন্দর রূপটা বেরিয়ে আসে?
তীর্থে!
ঢোলে কেবল তেতালা বাজাচ্ছি দেখে একজন হাতে ধরিয়ে একতালা শিখিয়ে দিয়ে গেলেন। জীবনেও দেখিনি এমন পাঁচটা মানুষের সাথে সার্কেল করে ঘুরে ঘুরে বাজিয়ে বেড়ালাম। ভাস্কর তার অপ্রতিরোধ্য কণ্ঠে শ্লোগান হিরোর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। রাহাত আপু ঠিকই বলেছেন, যদি কোনও ভাবে ফের জামাত ক্ষমতায় আসে, ভাস্করের খবর আছে!!
রাত গাঢ় হচ্ছে। হালকা হয়ে আসছে শিববাড়ির জমায়েত। কিন্তু তার পরও মোমবাতির নিভু নিভু ঘেরার ধার ঘেসে এখনও দাঁড়িয়ে আছেন বয়:জ্যেষ্ঠরা। হয়তো তাঁদের কারও একটা কিশোরী মেয়ে বসে আছে প্রতিবাদ মিছিলে। কয়েকটা মাকে দেখলাম তাঁদের টডলার কাঁধে করে চলে এসেছেন। একজন বাবা মোমের আলোর সামনে বসে শাহবাগী বর্ণমালায় দীক্ষা দিচ্ছেন তাঁর বছর তিনেকের মেয়েকে।
সবচেয়ে তীব্র ভয়াবহ দৃশ্য হলো একজন মা, আমি যাকে বসতে অনুরোধ করেছিলাম লাইন ভেঙে যাচ্ছে দেখে- তিনি মিষ্টি হেসে বলেছিলেন তাঁর কোমরে ব্যথা, তাই বসবেন না। .... কিন্তু দুই মিনিট পরেই সেই মা কোমর দুলিয়ে হাত তালি দিয়ে শ্লোগান দিয়ে বসলেন-
'রাজপথ ঘেরাও করো
রাজাকার পালিয়ে যাবে?'
পুনশ্চ: যারা এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারোনি এ আন্দোলনে যোগ দেবে কি দেবে না অথবা, যাদের বিভিন্ন খোঁড়া কারণে দ্বিধা হচ্ছে। তাদের বলি, ইতিহাস প্রত্যেকদিন দরজায় এসে কড়া নাড়ে না। মনে রেখো।
২.
স্লোগানে রক্ত মুহুর্মুহ কেঁপে উঠছে, যে প্যারোডি শুনে আমাদের পেট ফেটে হাসি উপচে পড়ছে সেটা কারো কারো কানে বিষ ঢেলে দিচ্ছে এটা ভেবেও ভালো লাগছে!
ঢোল সংগত করেছি গান আর স্লোগানের সাথে, এখন আর ডান হাতের মাঝ বরাবর ভাঁজ করতে পারছি না, তালি বাজাতে গেলেই ঝিনিক দিয়ে উঠছে, কিন্তু থামছি কি খুব?
মানুষের সাথে পরিচয় হচ্ছে, যুবকদের দেখছি, ফিফটি ইয়ার ওল্ড, ফিফটি সিক্স ইয়ার ওল্ড ইয়াং মেন এন্ড উইমেন। এঁরা শিব বাড়ির ধুলোয় দাড়িয়ে স্লোগানের সাথে গলা আর শরীর মিলিয়েছেন।
আমি আমাদের পূর্বসূরীদের উপর নতুন আস্থা পেয়েছি, তাদের চোখের স্বপ্ন আর সাহস সত্যি অভূতপূর্ব!!
জয় বাংলা!