আমাদের বাসা থেকে থোচাল যেতে আধা ঘন্টার মত লাগে। জায়গাটা তেহরান শহরের উত্তরে শেষ প্রান্তে পাহাড়ের ওপর। পুরো তেহরান আপনি ওখান থেকে দেখতে পাবেন।
থোচাল থেকে দেখা তেহরান শহর...
গ্রীষ্মে ঘুরতে যাওয়ার জন্য খুব ভাল একটা জায়গা, কারণ তেহরানে যখন বেশ গরম, ঐ পাহাড়ের ওপর তখন খুব আরামদায়ক শীতল আবহাওয়া। গ্রীষ্মে তাই সারারাত ওখানে মানুষ থাকে। বাঞ্জি জাম্পিং এর ব্যবস্থা আছে, খোলা জায়গায় লোকজন/বাচ্চারা ব্যাডমিন্টন, ফ্রিজবি খেলে। আর কেবল কারে করে উঠে যাওয়া যায় আলবোরজ পর্বতের ওপরে।
তেহরানে তখন মোটামুটি শীত, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নীচে। কিন্তু বরফ পড়ার মত কোন অবস্থা নেই। সবাইকে গুছিয়ে নিয়ে যেতে প্রায় এগারটা বেজে গেল। আমরা সবাই গিয়ে সরাসরি কেবল কারে ওঠার লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। কেবল কারের ৭ টা স্টেশন আছে, আমরা সবাই যাব ৫ নম্বর স্টেশন পর্যন্ত। আর শুধু হামিদ, সোহান আর লিমন যাবে ৭ নম্বর স্টেশন পর্যন্ত, মানে সবচেয়ে ওপরের স্টেশনে।
সত্যি কথা বলতে আমার কোন ধারণাই ছিল না যে আমি কি দেখতে যাচ্ছি সামনে বা কি ধরণের আবহাওয়ার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। কেবল কারে উঠে পরলাম স্ত্রী এবং দু’পুত্রসহ। কেবল কার একটু এগুতেই মনে হল ভিন্ন কোন জগতে চলে এলাম। চারিদিকে বরফে ঢাকা পর্বত, হালকা তুষার ঝড় !
একটু আগেই তো তেহরানে রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়াতে ছিলাম, আর কয়েক মিনিটের ব্যবধানেই মনে হল ভিন্ন কোন জায়গায় চলে এসেছি! আমার স্ত্রী এবং বাচ্চাদের জন্য এ ধরণের অভিজ্ঞতা প্রথম, তাই ওরা অনেক বেশী রোমাঞ্চিত! অবশ্য আমার জন্যও এ ধরণের অভিজ্ঞতা নতুন, আমি আগে তুষারপাত দেখেছি মানালিতে কিন্তু তুষারাবৃত পর্বতের ওপর কেবল কারে ভ্রমনের অভিজ্ঞতা এই প্রথম!
যাহোক, ৫ম স্টেশনে আমরা সবাই নামলাম। নেমেই পুরো সাইজ। কি ঠান্ডারে বাবা ! হিম শীতল বাতাসের তোড় আর সাথে তুষারপাত! তাপমাত্রা অন্ততঃ -১০ ডিগ্রী সেলসিয়াসতো হবেই ! জমে যাবার অবস্থা!
আমার বড় ছেলে একটু ভীতু প্রকৃতির, তাই সে এই পরিবেশে মহা বিরক্ত, কেন তাকে এখানে নিয়ে এসেছি, এ নিয়ে তার বিস্তর অভিযোগ।

ছোটটাও শীতে কাবু কিন্তু অতটা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। আমাদের তখনো হাত মোজা কেনা হয়নি, কারণ মাত্রই আগে সপ্তাহে এসেছি। খালি হাতে বরফ নিয়ে একটু ছোড়াছুড়ি করলেও পরমুহুর্তে মনে হচ্ছে হাত দুটো আর শরীরে নেই! সাথে থাকা বন্ধু বান্ধব আর ভাবীরাও চেষ্টা করছেন বরফ নিয়ে একটু আনন্দ ফূর্তি করতে।
ছোট পুত্র কারো বানানো বরফের পুতুলের সাথে...
এই স্টেশনেই একটা কমপ্লেক্স আছে যেটার ভেতর রেস্টুরেন্ট, কফি শপ এর ব্যবস্থা। তাড়াতাড়ি সেখানে ঢুকে পড়লাম, আহ কি শান্তি! ভেতরে হিটার আছে।
বাইরে বেরুলেও ২/৩ মিনিটের বেশী থাকা যায় না। দুপুরের খাওয়া সারলাম সবাই, চির চেনা আইটেম, জুজে, কুবিদে আর ভাত।
খাওয়া শেষে ৭ম স্টেশনের টিকেট কাটা তিনজন হামিদ, সোহান এবং লিমন চলে গেল ৭ম স্টেশনে। আমরা ৫ম স্টেশনেই মাঝে মাঝে বাইরে বের হই, আবার ঢুকে পড়ি কম্পাউন্ডে।
৫ম স্টেশন থেকে দূরে রৌদ্রোজ্জ্বল তেহরান শহর...
প্রায় বিকেল হয়ে আসছে, সেই তিনজনের খবর নেই। ভাবীরা সবাই চাচ্ছে ওরা এলে পাহাড় থেকে নীচে নেমে যেতে। অবশেষে সেই তিনজনের দেখা মিলল সূর্যাস্তের একটু আগে। বলল, অবস্থা খুব খারাপ ! ওপরে এত ঠান্ডা আর তুষারঝড় যে ফেরার জন্য কেবল কারে বিশাল লাইন পড়ে গিয়েছিল। সোহান আগের সপ্তাহে চায়না থেকে ইরান এসেছে, ওর শীতবস্ত্রও পর্যাপ্ত ছিল না। ও এখনো বিয়ে করেনি। ওর অবস্থা নাকি খারাপ হয়ে গিয়েছিল ঠান্ডায়, বলছিল, “ভাই এখনো বিয়ে করি নাই, আল্লাহ এ যাত্রায় বাচিয়ে দাও !!”

যাহোক, অল্প সময়ের জন্য হলেও একেবারে ভিন্ন এক জগতে চলে গিয়েছিলাম! ঠান্ডা কাকে বলে টের পেয়েছি। তারপরেও স্মৃতির মনিকোঠায় ঐ সময়গুলো অনেক খানি জায়গা নিয়ে থাকবে সমসময়...

আমার যত ভ্রমন ব্লগ...