'ওরা অল কিলার' : সাবেক সংসদ সদস্য ও সাভারের আওয়ামী লীগ নেতা আশরাফ উদ্দিন খান ইমু কালের কণ্ঠকে বলেছেন, 'সাভারে সোহেল রানার অপকর্মের প্রতিবাদ করার কেউ নেই। জমি দখল, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসা, হত্যাকাণ্ড_সব অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার ওই রানা প্লাজার বেসমেন্ট হলো সাভারে ফেনসিডিলের প্রধান কেন্দ্র। রানা প্লাজা পাশের যে ভবনের ওপর ধসে পড়ে সেই ভবনের মালিক রবীন্দ্রনাথই হলেন রানা প্লাজার জায়গার মূল মালিক। তাঁর জায়গা দখল করে মামলা-মোকদ্দমা ফেঁদে এখন মালিক হয়ে গেছে রানা। এখনো এ নিয়ে মামলা আছে।'
আশরাফ উদ্দিন আরো বলেন, 'গত ২৬ মার্চ দেখলাম, চিহ্নিত খুনি ও থানা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক মুক্তার হোসেন ও সোহেল রানার ছবির সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি দিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত পুরো সড়ক ভরে ফেলা হয়েছে। অথচ এই মুক্তারের বিরুদ্ধে খুনের মামলা আছে। সে দুই মাস আগে একজন বালু ব্যবসায়ীকে হত্যা করেছে। ওরা অল কিলার। আর স্থানীয় সংসদ সদস্য মুরাদ জং তাদের শেল্টার দেন। তাহলে বলেন, আমরা এখন আওয়ামী লীগ কিভাবে করব? এখন তো আওয়ামী লীগ করতেও লজ্জা পাই। এসব কারণেই অনেক পুরনো আওয়ামী লীগার এখন বসে আছেন।'
'একটা চরম বেয়াদব' : সাভার উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ফিরোজ কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, 'সোহেল রানা ভালো হলে তো বলতাম নামাজ-কালাম পড়ে। তা তো বলতে পারছি না। ও একটা চরম বেয়াদব। ওর বডি ল্যাংগুয়েজই সেটা বলে দেয়। এমন কোনো অপকর্ম নাই যে সে করে না। কিন্তু ওর বিরুদ্ধে মামলা নেবে কে? সব কিছু সে ম্যানেজ করে ফেলে। সম্প্রতি অস্ত্রের লাইসেন্সও পেয়েছে।' তিনি বলেন, 'ওর বাবা ছিল খুব গরিব। বিগত আওয়ামী লীগের সময় হিন্দু এক ভদ্রলোকের জমি দখল করে সেখানেই গড়ে তুলেছে রানা প্লাজা।'
সাভার পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী আবদুল হালিম বলেন, 'একটা মানুষের জীবনে বাজে যেসব দিক থাকতে পারে, তার সবই সোহেল রানার ভেতরে আছে। আমি তার ভেতরে কোনো ভালো গুণ দেখি না। বাবা ছিল কলু। মানুষের জমিজিরাত দখল করা শিখিয়েছে। ছেলে এখন সেটা করছে। দলের লোক হিসেবে আমরা এখন লজ্জা পাই।'
সাভার পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল গনি বলেন, 'এত দিন শুনে এসেছি সোহেল লোক হিসেবে ভালো না। এবার যা দেখলাম তার বিচার যেন বাংলার মাটিতে হয়, সে যে দলেরই হোক না কেন।'
সাভার থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলী হায়দার বলেন, 'ও একসময় রাজীব-সমরের (সাবেক ছাত্রলীগ নেতা) সাথে চলত। এখন এমপির সাথে চলে। আমার চেয়ে অনেক জুনিয়র। এ জন্য তার সম্পর্কে আমি বেশি কিছু জানি না। তবে ওরে চিনি। ওর বাবাকেও চিনি। আজও বাপ-বেটার মোবাইলে ফোন দিয়েছিলাম। দেখলাম মোবাইল বন্ধ।'
তবে সাভারের স্থানীয় সংসদ সদস্য তালুকদার তৌহিদ জং মুরাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, 'সোহেল রানা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কেউ না। আমার সাথেও তার কোনো সম্পর্ক নেই। কেউ যদি পোস্টার ছেপে সেখানে আমার ছবি সাঁটিয়ে দেয়, তাহলে আমার করার কী আছে? এ ছাড়া নিজেকে যদি সে পৌর যুবলীগের স্বঘোষিত সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে পরিচয় দিয়ে বেড়ায়, তাহলে সেটা ঠেকাবেই বা কে? সে যদি অন্যায় করে থাকে তাহলে তার শাস্তি হবেই। এই মুহূর্তে আগে প্রয়োজন উদ্ধার তৎপরতা চালানো। সেটা শেষ হোক, তারপর দেখেন আমি কী করি।'
অভিশপ্ত ভবন : রানা প্লাজার বেসমেন্টে রয়েছে একটি কারপার্কিং। কিন্তু কোনো গাড়ি পার্ক করা হয় না। সেখানে তৈরি করা হয়েছে ছোট ছোট গোটা ত্রিশেক কক্ষ। প্রতি কক্ষে রয়েছে দুজনের শোয়ার মতো একটি খাট। এ ছাড়া রয়েছে একটি বোর্ডরুম। ওই বোর্ডরুমেই চলে জুয়া ও মাদক সেবন। সাভারের আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ সব দলের অঙ্গসংগঠনের মাদকসেবীরা প্রতিদিন সেখানে মাদক সেবন করেন এবং যতসব ফুর্তি করে। সোহেল রানা নিজেও মাদকসেবী এবং এসব অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাভার যুবলীগের এক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের সীমান্তবর্তী জেলা নওগাঁ, যশোর, রাজশাহী থেকে ট্রাকে ও নাইট কোচে যত ফেনসিডিলের চালান আসে, রাতের অন্ধকারে সেগুলো রানা প্লাজার সামনেই খালাস হয়। বেজমেন্টে রয়েছে ফেনসিডিলের গোডাউন। এখান থেকেই সাভারের ফেনসিডিল ব্যবসা পরিচালিত হয়। আরেকজন যুবলীগকর্মী বলেন, সাভারের উঠতি বয়সী মাদকসেবীরা সবাই সোহেল রানার অনুসারী। রানা প্লাজায় সব সময় এক-দেড় শ উঠতি বয়সী ছেলেপুলে থাকেই। যেকোনো মিছিল-সমাবেশে রানার লোক হিসেবে তারা যোগ দেয়। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক কর্মী সরবরাহের ক্ষমতার কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছে রয়েছে রানার বিশেষ কদর।
বিভিন্ন সময়ে বেসমেন্টে যাতায়াতকারী একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০০৮ সালে নবাবগঞ্জের গাজী আবদুল্লাহ নামের এক যুবলীগকর্মী রানা প্লাজার বেসমেন্টে খুন হন। এ সময় সোহেল রানা বেসমেন্টে থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। অন্য পাঁচজনের নামে মামলা হলে পরে থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে মামলাটি তামাদি করে ফেলেন সোহেল। আরেকজন বলেন, সোহেল রানার এক বোনের সঙ্গে প্রেম-ভালোবাসার কারণে ১৯৯৯ সালে সাভারের জাকির নামের এক যুবক খুন হয়ে যান। ওই খুনের পেছনেও সোহেল রানার নাম আসে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, 'সাভারের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও ঢাকা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ফখরুল আলম রাজীব ও ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মঞ্জুরুল আলম সমরের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত ছিল সোহেল। রাজীব-সমর পলাতক থাকার পর সে স্থানীয় এমপি মুরাদ জংয়ের লোক হয়ে যায়। দলীয় যেকোনো কর্মসূচিতে সামনের লাইনে থাকে সোহেল। যেকোনো সন্ত্রাস-নাশকতায়ও সামনের সারিতে তাকে দেখা যায়।'
সোহেল রানার একজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বলেন, সোহেল সব কিছু ম্যানেজ করার ক্ষমতা রাখেন। থানা পুলিশকে আয়ত্তে রাখেন। যে কারণে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয় না। কেবল বিগত জোট সরকারের আমলে তিনি সন্ত্রাসের মামলায় জেলে ঢুকেছিলেন। ওই সময় তাঁর বাবা আবদুল খালেক তৎকালীন বিএনপিদলীয় এমপি দেওয়ান সালাউদ্দিন বাবুর হাতে ফুলের তোড়া উপহার দিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন। এর পরই জেল থেকে ছাড়া পান সোহেল রানা। গত ফেব্রুয়ারিতে আবদুল খালেক স্থানীয় আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি তালুকদার তৌহিদ জং মুরাদের হাতেও একইভাবে ফুলের তোড়া দিয়ে বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন।
সম্পত্তির পাহাড় : বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই স্থানীয় ছাত্রদল নেতা ও সাভার কলেজের সাবেক ভিপি মো. হেলালের বাজার রোডের প্রায় এক বিঘা জমি দখল করে নেন সোহেল। দখলের কয়েক দিন আগেই হেলাল নিখোঁজ হয়ে যান। এরপর হেলালের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের ধারণা, সোহেল রানাই গুম করে দিয়েছেন হেলালকে। পরবর্তী সময়ে ওই জায়গায় ছয়তলা একটি ভবন গড়ে তোলেন। নাম দেন রানা টাওয়ার। বর্তমানে সেটির নিচতলায় রয়েছে বাটার শো রুম। দোতলায় এঙ্মি ব্যাংকের একটি শাখা। তিনতলায় দুটি লাইফ ইনস্যুরেন্স কম্পানির অফিস। অন্য তলায় বসবাস করত সোহেল রানার পরিবারের সদস্যরা। ওই রানা টাওয়ারেই ফাটল দেখা দিয়েছে বলে গতকাল খবর ছড়িয়ে পড়ে।
এ ছাড়া বাজার রোডের তিনটি বাড়ির মালিক সোহেল। গত পাঁচ বছরে এসব বাড়ির মালিক হয়েছেন তিনি। এর একটিতে তিনতলা ভবন বানিয়ে সেটি ব্যাংক এশিয়ার কাছে ভাড়া দিয়েছেন। এ ছাড়া দুই বছর আগে ধামরাইয়ে বিশাল জায়গা কিনে সেখানে একটি ইটের ভাটা করেছেন। নাম দিয়েছেন মেসার্স আবদুল খালেক ব্রিকস ফিল্ড। ইটের নাম এমএকে।
বাবা 'কলু খালেক' : সোহেল রানার বাবা আবদুল খালেকের বাড়ি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে। আশির দশকে চলে আসেন সাভারে। কাজ নেন বাজার রোডের বাসিন্দা মো. ইয়াছিনের ঘানি ভাঙানো তেলের কারখানা মিয়া অয়েল মিলে। কারখানার তেল বিক্রি ও মালিক ইয়াছিনের ফুটফরমাশ খাটা শুরু করেন আবদুল খালেক। সেই থেকে তিনি সাভারে কলু খালেক হিসেবেই পরিচিত। ১৯৯৬ সালের দিকে ছেলে সোহেল রানা ছাত্রলীগ করার ক্ষমতা দেখিয়ে সাভার বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন রবীন্দ্রনাথ সরকারের ৫২ শতক জায়গা দখল করে বসিয়ে দেন রানা অয়েল মিল। জমি নিয়ে শুরু করেন মামলা। দখল আর ফিরে পাননি রবীন্দ্রনাথ সরকার। এরপর ব্যবসার সব তদারকি শুরু করেন সোহেল রানা।
ওই জায়গায়ই সোহেল ২০০৮ সালে গড়ে তোলেন ছয়তলা রানা প্লাজা। সংসদ সদস্য তালুকদার তৌহিদ জং মুরাদ সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। রবীন্দ্রনাথ সরকারের ভাতিজা পিন্টু কালের কণ্ঠকে বলেন, 'জায়গাটি আমাদের, কিন্তু সোহেল রানা দখল করে নিয়েছে। আমরা আর দখল ফিরে পাচ্ছি না।
সাভার পৌর বিএনপির সভাপতি ও পৌর মেয়র রেফায়েত উল্লাহ বলেন, 'সে জোর করে রানা প্লাজার অনুমোদন নিয়েছে। কিন্তু নির্মাণকাজ ঠিকমতো করছে কি না সেটা আমার পৌরসভার ইঞ্জিনিয়াররা দেখতে পারেনি। পৌরসভার লোকজনকে রানা প্লাজার পাশে ঘেঁষতে দেওয়া হয় না। তারা সরকারি দলের লোক। ক্ষমতা খাটিয়ে যা ইচ্ছা তা-ই করে। আমরা তার কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে পারি না।'
রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর রানার বাবা আবদুল খালেকেরও কোনো হদিস নেই।
রিলেটেড স্টোরি
ছিঁচকে সন্ত্রাসী থেকে বহু সম্পত্তির মালিক
রানা প্লাজার মালিক কে এই যুবলীগ নেতা রানা
কলু থেকে কোটিপতি রানা
যেভাবে উত্থান সোহেল রানার
সাভারে ধসে পড়া রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা যুবলীগের কেউ নয় বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অথচ আওয়ামী লীগের আরেক নেতা ইস্রাফিল আলম গতকাল বুধবারই গণমাধ্যমের সামনে স্বীকার করেছেন, সোহেল স্থানীয় যুবলীগের নেতা। স্থানীয় লোকজনরাও বলছেন, তিনি সাভার যুবলীগের নেতা। সাভার পৌর যুবলীগের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সাভার থানা যুবলীগের আহ্বায়ক হিসেবে তার নামে ছাপানো কিছু পোস্টারও পাওয়া যাচ্ছে।
যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেই যে রানা যুবলীগ নেতা নয়, তাহলে কেন তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না? রানা যদি যুগদল বা শিবিরের কোনো নেতা হতো তাহলে কি তাকে গ্রেপ্তার করা হতো না? বলা হচ্ছে- এটা বিচার করার সময় নয়। অথচ আমরা দেখেছি ২০১১ সালের ২৩শে মে তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়ায় ইমপালস মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নির্মাণাধীন ভবন ধসের ঘটনার দিনই বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ডা। জাহিদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। অথচ পরে প্রমাণিত হয় যে, তিনি নন তার নামে অন্য এক ব্যক্তি ওই ভবনের মালিকদের অন্যতম।
ডা। জাহিদকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করতে পারলে খুনি রানাকে কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না? কেন নাজরীন ফ্যাশনসের মালিক ও আওয়ামী লীগ কর্মী দেলোয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়নি?
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে এপ্রিল, ২০১৩ রাত ১২:৩৬