নোট: কোনো প্রাণীর ব্যবচ্ছেদ করতে চাইলে সেই প্রাণীকে স্ব-শরীরে থাকতে হবে, অন্যথায় ব্যবচ্ছেদ করা সম্ভব নয়। কোনো সাহিত্যিকের লেখার বিশ্লেষণ বা সমালোচনা করতে চাইলে সেই সাহিত্যিকের লেখা বই-পত্র থাকতে হবে। অনুরূপভাবে, বিজ্ঞানের কোনো বিষয় নিয়ে সমালোচনা করতে চাইলে সেই বিষয়ে লিখিত দলিলের উপর ভিত্তি করেই করতে হবে, কান কথা কিংবা মৌখিক কথার উপর ভিত্তি করে নয়। কিন্তু নাস্তিকতার যেহেতু কোনো লিখিত দলিল নাই সেহেতু নাস্তিকতাকে ব্যবচ্ছেদ বা বিশ্লেষণ কিংবা সমালোচনা কোনোটাই করা সম্ভব নয়। ফলে নাস্তিকতা একটি অবাস্তব বা অবৈজ্ঞানিক ডগমা হওয়াতে নাস্তিকদের মৌখিক কথা বা বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই নাস্তিকতা সম্পর্কে বলতে হবে।
যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে নাস্তিকতা: নাস্তিকদেরকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, টিভি'র কারিগর কে? উত্তরে তারা বলবেন, জন বেয়ার্ড। এর পর যদি জিজ্ঞেস করা হয়, জন বেয়ার্ড এর কারিগর কে? এবার তারা বলবেন, জন বেয়ার্ড এর কোনো কারিগর নাই (!) বা কারিগর থাকার দরকার নাই (!) যদিও তারা নিশ্চিতভাবেই জানেন যে জন বেয়ার্ড নিজেই নিজের কারিগর বা স্রষ্টা হতে পারেন না।
নাস্তিকদেরকে যদি আবারো জিজ্ঞেস করা হয়, প্রথম জীবের কারিগর কে? উত্তরে তারা অনেক ভেবেচিন্তে বুদ্ধিমানের মতো জবাব দেবেন, প্রথম জীবের কোনো কারিগর থাকার দরকার নাই! তার মানে তারা প্রথম জীবকে স্বয়ম্ভূ হিসেবে বিশ্বাস করেন – এমনকি মহাবিশ্বকেও – যদিও তারা নিশ্চিতভাবেই জানেন যে নিজে থেকে কোনো জীব সৃষ্টি হতে পারে না।
মজার বিষয় হচ্ছে নাস্তিকরা নিজেদের যুক্তিতে অটল থাকতে পারেন না। যেমন ধরা যাক তারা ইসলামে বিশ্বাসীদেরকে জিজ্ঞেস করেন, এই মহাবিশ্বের কারিগর কে? উত্তরে ইসলামে বিশ্বাসীরা বলেন, আল্লাহ। এর পর নাস্তিকরা নিজেদেরকে 'যুক্তিবাদী' প্রমাণ করার জন্য [বার্ট্রান্ড রাসেল থেকে ধার করা] পাল্টা প্রশ্ন করেন, আল্লাহর কারিগর কে? উত্তরে ইসলামে বিশ্বাসীরা বলেন, আল্লাহর কোনো কারিগর নাই। এবার নাস্তিকরা বিজয়ের হাসি দিয়ে বলেন, হাহাহা এই মহাবিশ্বের কারিগর থাকলে আল্লাহর কারিগর থাকবে না কেনো? এর পর তারা উপসংহার টানেন এই বলে যে, আল্লাহ বলে কিছু নাই বা থাকতে পারে না! নাস্তিকদের আত্মঘাতী যুক্তি দেখলেন তো। তাদের যুক্তি দিয়ে তারা নিজেদেরকেই ভুল প্রমাণ করেন, যাকে বলে সেলফ-রেফিউটেড। সংক্ষেপে তাদের যুক্তিগুলো এরকম-
টিভি'র জন্য বুদ্ধিমান কারিগর দরকার হলেও টিভি'র কারিগরের জন্য কোনো কারিগর থাকারই দরকার নাই। কৃত্রিম প্রাণ (!) তৈরির জন্য বুদ্ধিমান কারিগর দরকার হলেও প্রথম জীবের কোনো কারিগর থাকারই দরকার নাই। প্রথম বীজেরও কোনো কারিগর থাকার দরকার নাই। সর্বোপরি, এই মহাবিশ্বের কোনো কারিগর থাকার দরকার নাই। তবে এই মহাবিশ্বের কারিগরের যেহেতু কারিগর থাকার দরকার আছে সেহেতু এই মহাবিশ্বের কারিগর বলে কিছু নাই!
যাহোক, যুক্তিবিদ্যা অনুযায়ী সবচেয়ে ভাল ব্যাখ্যার কোনো ব্যাখ্যা দরকার হয় না (The best explanation does not need an explanation)। উদাহরণস্বরূপ, ধরা যাক সম্পূর্ণ নতুন ও জটিল একটি মেশিন দেখিয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করা হলো, এই মেশিনটির কারিগর কে হতে পারে বলে মনে হয়? অনেক চিন্তাভাবনা করে সে জবাব দিল, মেশিনটির কারিগর আইনস্টাইন হবেন। তবে মেশিনটির কারিগর প্রকৃতপক্ষেই আইনস্টাইন কি-না – এই প্রশ্নকে এক পাশে রেখে যা দেখতে হবে তা হচ্ছে এক্ষেত্রে আইনস্টাইন-ই হচ্ছেন উক্ত মেশিনের জন্য সবচেয়ে ভাল ব্যাখ্যা। এর পর যদি নাস্তিকদের 'যৌক্তিক ফর্মুলা' অনুযায়ী আবার প্রশ্ন করা হয়, আচ্ছা বলো তো আইনস্টাইনের কারিগর কে? যদিও নাস্তিকরা এই প্রশ্ন করতে পারেন না তথাপি এই প্রশ্নের জবাব যদি সে নাও দিয়ে সক্ষম হয় তাহলেই কি "আইনস্টাইন-ই উক্ত মেশিনের জন্য সবচেয়ে ভাল ব্যাখ্যা" কিংবা "মেশিনটির জন্য একজন কারিগর দরকার" বক্তব্যটি ভুল বা অযৌক্তিক প্রমাণ হবে? নিশ্চয় না।
অতএব, টিভি'র কারিগর জন বেয়ার্ড এর কোনো কারিগর আছে কি-না তার উপর "টিভি'র জন্য একজন কারিগর দরকার" বক্তব্যটি ভুল প্রমাণ হচ্ছে না। অনুরূপভাবে, এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার কোনো স্রষ্টা আছে কি-না তার উপর "এই মহাবিশ্বের জন্য একজন স্রষ্টা দরকার" বক্তব্যটিও কোনো ভাবেই ভুল প্রমাণ হয় না।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নাস্তিকতা: মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সবারই একদিন-না-একদিন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার হবেই। একমাত্র যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সমর্থক ছাড়া বাংলাদেশের মানুষ যেমন প্রায় চল্লিশ বছর ধরে ৭১'র যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য দিন-ক্ষণ গুণছেন আর অপেক্ষা করছেন, যদিও ইতোমধ্যে অনেকেই মারা গেছে এবং পার্থিব জগতে ন্যায়বিচার করাও সম্ভব নয়, মুসলিমরাও তেমনি সকল প্রকার অপরাধীদের চূড়ান্ত বিচারের জন্য শেষ বিচার দিবসের আশায় অপেক্ষা করছেন। অতএব, নৈতিক ও যৌক্তিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই মুসলিমদের বিশ্বাসের মধ্যে সামান্যতমও কোনো ভেজাল বা দুর্বলতা নেই।
অপরদিকে নাস্তিকরা অপরাধী ও তাদের ভিকটিমদের চূড়ান্ত ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করেন না, যাহেতু তারা স্রষ্টা ও মৃত্যুপরবর্তী জীবনকে অস্বীকার করেন। নাস্তিকদের বিশ্বাস অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধী, খুনী, ধর্ষক, সন্ত্রাসী, গণহত্যাকারী'রা মারা গেলে তাদের কোনো বিচার হবে না। অতএব, অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে যে, নাস্তিকতা ও মানবতাবাদ একে-অপরের বিপরীত। প্রকৃত অর্থে কেউ একই সাথে নাস্তিক ও মানবতাবাদী হতে পারে না। একদিকে নাস্তিকতা প্রচার অন্যদিকে মুখে মানবতাবাদের বুলি কাঁঠালের আমসত্বের মতোই শুনায়। প্রকৃত মানবতাবাদী হতে হলে ন্যায়-অন্যায়ের চূড়ান্ত বিচারে বিশ্বাস করতেই হবে। আর ন্যায়-অন্যায়ের চূড়ান্ত বিচারে বিশ্বাস করতে হলে মৃত্যুপরবর্তী জীবন ও স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাসী হতেই হবে। এর বিকল্প কোনো পথই যে খোলা নেই!
হিটলারের মতো গণহত্যাকারীর কেনো বিচার হবে না - এই প্রশ্নের যৌক্তিক জবাব না দিয়ে (অপ)বিজ্ঞান আর (কু)যুক্তিবাদ এর খোলসে নাস্তিকতা প্রচার সম্পূর্ণরূপে অযৌক্তিক ও অমানবিক। এদের থেকে সাবধান।
বাস্তবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নাস্তিকতা: নাস্তিকতা কোনো বাস্তবধর্মী বা সার্বজনীন পন্থা হতে পারে না।
প্রথমত, মানব জাতির শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রত্যেক ধর্ম বা দর্শন এর উপর ভিত্তি করে একেকটি সভ্যতা গড়ে উঠেছে। কিন্তু নাস্তিকতার উপর ভিত্তি করে কোনো সভ্যতা গড়ে ওঠেনি। মজার ব্যাপার হচ্ছে হ্যান-মনা ত্যান-মনা [মানে সুবিধাবাদী] নাস্তিকরা কম্যুনিস্টদেরকে প্রকৃত নাস্তিক মনে করে না – খুব সম্ভবত স্ট্যালিন, মাও, ও পল পটের মতো গণহত্যাকারীদেরকে এড়ানোর জন্য – যাতে করে ইসলামে বিশ্বাসীদেরকে [বিখ্যাত পিএইচডি-মনা ও আনাস্তিক বিপ্লব পালের স্ট্যাইলে] উলঙ্গ হয়ে গালিগালাজ আর আক্রমণ করা যায়। ফলে কম্যুনিজমের উপর ভিত্তি করে যদি কোনো সভ্যতা গড়েও ওঠে সেক্ষেত্রে সেই সভ্যতাকে নাস্তিকতা-ভিত্তিক সভ্যতা বলা যাবে না।
দ্বিতীয়ত, কিছুদিন ধরে মৃতদেহ মেডিক্যালে দান করার কথা বলে ব্লগীয় নাস্তিকরা একদিকে নিজেদেরকে 'মানবতাবাদী' বলে দাবি করছে অন্যদিকে আবার মৃতদেহকে কবর দেয়া নিয়ে সমালোচনা করা হচ্ছে। তিনটি কারণে ব্যাপারটা পুরাই হাস্যকর ও অবাস্তব:
এক. মেডিক্যালে মৃতদেহ দান করার ব্যাপারে ইসলামে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কেউ চাইলে দান করতে পারেন।
দুই. নাস্তিকরা যেহেতু মৃত্যুপরবর্তী জীবন, আত্মা, ও স্রষ্টার অস্তিত্বেই বিশ্বাস করে না সেহেতু মৃত্যুর পর তাদের মৃতদেহ মেডিক্যালে দান করা হলো নাকি নর্দমাতে ফেলে দেয়া হলো নাকি আগুনে পোড়ানো হলো নাকি কুকুর-শিয়াল দিয়ে খাওয়ানো হলো, তা কিন্তু তারা কোনোদিন এবং কোনো ভাবেই জানতে পারবে না! মানুষের উপর কী অগাধ [অন্ধ] বিশ্বাস নিয়ে তারা মারা যায়!
তিন. সারা পৃথিবী জুড়ে প্রতিদিন যত মানুষ মারা যাচ্ছে তাদের সবাইকে যদি মেডিক্যালে দান করা হয় তাহলে অতি অল্প সময়ে পৃথিবীটা জীবন্ত নরকে পরিণত হবে! ডাক্তার ও রুগীদেরকে আর মেডিক্যালে থাকতে হবে না! ফলে মেডিক্যালে মৃতদেহ দান সার্বজনীন কোনো সমাধান হতে পারে না। সবচেয়ে যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক সমাধান হচ্ছে মৃতদেহকে মাটির নিচে কবর দেয়া, যদিও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মাঝে মাঝে দু-একটি মৃতদেহ মেডিক্যালে দান করা যেতে পারে। এর চেয়ে অধিকতর যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক সমাধান কেউ দিতে পারবে না। উল্লেখ্য যে, মৃতদেহকে আগুনে পোড়ানো হলে পরিবেশ দূষণ ও বন-জঙ্গল নিধন সহ প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হয়। তাছাড়া মৃতদেহকে আগুনে পোড়ানো একটি ভয়ঙ্কর ও অমানবিক প্রথা মনে হতে পারে।
যৌক্তিক, মানবিক, ও বাস্তবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নাস্তিকতার ব্যবচ্ছেদ দেখাতে যেয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে বুঝার জন্য দু-একটি করে উদাহরণ দেয়া হয়েছে মাত্র। নিজে থেকে একটু চিন্তা করলেই এরকম আরো অনেক উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে।
আরো পড়ুন-
নাস্তিকতা একটি অমানবিক বিশ্বাস
প্রকৃত মানবতাবাদী ও প্রগতিশীল হতে হলে…
নাস্তিকদের আত্মঘাতী যুক্তি
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জানুয়ারি, ২০১৩ দুপুর ২:০১
১. ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১২ সকাল ১০:৪৩ ০
তারা গভীর ভাবে চিন্তা করে না আর অনেক নিদর্শন দেখতে পেয়েও তারা দেখে না।
পোস্টটি সুন্দর হয়েছে।ধন্যবাদ।