এটা সত্য যে বাংলাদেশে পাকিস্তান সাপোর্টারদের সংখ্যা যুক্তিসংগত সংখ্যার চাইতে অনেক বেশী। এই সংখ্যা থেকে এটা অনুমান করা কঠিন নয় যে, আমাদের সমাজে এখনও কুসংস্কারের প্রভাব প্রকট। কিন্তু একটা খেলার সাপোর্টের সাথে কিভাবে কুসংস্কার জড়িত হতে পারে?
পড়ালেখার জন্য কোরিয়া আর নরওয়েতে কিছুটা সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা হয়েছে। বাংলাদেশের মতই, এই দুটি দেশও, অন্য কোন দেশের শাসনে ছিল বেশ কিছু বছর। কোরিয়া ৩৫ বছর (১৯১০-১৯৪৫) জাপানী দখলে ছিল (সুত্র:১), সুইডিশ রাজাগণ ৯১ বছর (১৮১৪-১৯০৫) নরওয়ে শাসন করেছে (সুত্র:২)। স্বাধীনতার ৬৫ বছর পরেও, যে কোন খেলায় কোন কোরিয়ান আমি পাইনি যে জাপানীদের সাপোর্ট করে। আর নরওয়েজিয়ানরা অনেক ভদ্র, কিন্তু এতটা না যে তারা স্বাধীনতার ১০৫ বছর পরেও সুইডিশদের সাপোর্ট করবে। যাই হোক, বাঙ্গালীরা হয়ত অনেক উদার, শিক্ষিত ও উচ্চ সংস্কৃতির যার করানে রক্তের দাগ শুকানর আগেই আমরা বন্ধুত্ব করে ফেলতে সঙ্খম হয়েছি।
দেখা যাক, শিক্ষায় বাংলাদেশ অন্য দুটো দেশ থেকে কতটা এগিয়ে।
বাংলাদেশে সই করতে পারে, এমন মানুষ আছে ৭৩%, আর নরওয়েতে ৭৩% মানুষ কমপক্ষে ইন্টারমিডিয়েট পাস। নরওয়ের বাকি ২৭% মানুষ, হয় স্নাতক অথবা তার চাইতেও উচ্চশিক্ষিত [৩]।. কোরিয়ানরাও শতকরা হারে নরওয়ের চেয়ে কম শিক্ষিত না [৪]।. হুম তাহলে একশ বছর পরেও তারা শাসক দেশকে সাপোর্ট করতে পারে না অথচ আমরা কিভাবে পারি?
অন্ধত্ব:
আমরা পারি কারন আমাদের চোখ অন্ধ।
আমরা পারি, কারন আমরা বিশ্বাস করি লাল পিপড়া হিন্দু আর কাল পিপড়া মুসলমান, কারন আমরা বিশ্বাস করি পবিত্র কুরআন শরীফ হাতে নিয়ে মিথ্যা বল্লে সাথে সাথে সে তিন মাথা ওয়ালা পশুতে পরিনত হয়, কারন আমরা বিশ্বাস করি একজন দাড়ি ওয়ালা মানুষ কখনও মিথ্যা বলতে পারে না, কারন আমরা বিশ্বাস করি হিন্দুরা বাংলাদেশের সবচাইতে শত্রু, কারন আমরা বিশ্বাস করি মুসলমান আর হিন্দু ২জন মারামরি করলে মুসলমানকে সাপোর্ট করা আমাদের ঈমানী দ্বায়িত্ব, কারন আমরা বিশ্বাস করি আমি স্কুলে যাব কিন্তু ভিক্ষারীর বাচ্চা মাদ্রাসায় যাবে। সবচাইতে বড় কথা, আমরা বিশ্বাস করি, এক দড়িতে ফাঁসিতে যাব তবুও আমরা মুসলমান-মুসলমান ভাই হব। কেউ ভাই হতে না চাইলেও তাকে ভাই বানাব। ভাই খুন করেছে, ধর্ষণ করেছে? তাতে কি, ভাই তো!
আমাদের দুটো চোখ আছে, কিন্তু আমরা দেখতে পাইনা, ইরাক-ইরান যুদ্ধ করেছে, ইরাক কুয়েত দখল করেছে, কাতার লিবিয়াকে বোমা মারছে, সিরিয়া মিশোর ইসরায়েলকে সুবিধা দিচ্ছে প্যালেস্টাইনি দের মারার জন্য, সৌদি আমেরিকাকে বলছে ইরান দখল কর, ভাই-দেশ আফগানিস্তান কে জিহাদের নামে দোযখ বানিয়ে দিয়েছে । ভাই-দেশ বলেছে, আজ থেকে কাশমির আজাদ! কিন্তু তার পকেটের অংশটা বাদে। এগুলো কি? ভাই-ভাই খেলা? কোন আরব/পাকি কি বাঙ্গালীকে মুসলমান বা ভাই ভাবে [৫]?
তবে, এটা খুবই স্বাভাবিক যে, একজন বাঙ্গালী আরেকজন বাঙ্গালীকে সাপোর্ট করবে, একজন এশিয়ান আরেক জন কে সাপোর্ট করবে, আর যেহেতু আমরা ধর্মভীরু, একজন মুসলমান অবশ্যই অন্য আরেকজনকে সাপোর্ট করতে পারে, যদি তাদের মধ্যে অস্বাভাবিক কোন ঘটনা না ঘটে। কিন্তু বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের মধ্যে অনেক বড় অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে। একটা যুদ্ধ হয়েছে, তাতে ৩০ লক্ষ বাঙ্গালীকে হত্যাকরা হয়েছে। চীন-ভারত যুদ্ধ হয়েছে ১৯৬২ সালে, ৫০ বছর আগে। কই, এশিয়ান হওয়ার পরও তো তারা একে অপরকে সাপোর্ট করে না! মুল কথা হলো, ধর্মীয় কুসংস্কার যদি স্বাভাবিক যুক্তিকে অতিক্রম করে, তবেই বাংলাদেশের মতো অবস্থা হতে পারে।
(বাকি টুকু বাসায় যেয়ে লিখব।)
হ্যাঁ এখন বাসায় ফিরেছি, বাকিটুকু নীচে লিখলাম।
এখন প্রশ্ন হলো আমরা কি এই কুসংস্কার থেকে বের হয়ে আসতে চাই কিনা, আর বের হতে হলে কি করা উচিত। প্রথম প্রশ্নের উত্তর যদি না হয়, তাহলে কিছুই করতে হবে না, কিন্তু যদি আসলেই কুসংস্কার থেকে বের হতে চাই তাহলে অনেক কাজ করতে হবে।
প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষার উপর জোর দিতে হবে, যেন ছাত্রছাত্রীরা ধর্মের পাশাপাশি অন্য বিষয় গুলিও শেখে। প্রাথমিক শিক্ষকদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ইতিহাস ও ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে, যেন তারা ছাত্রছাত্রীদের মনের অন্ধধারনা গুলো শুরুতেই দুর করে দিতে পারে।
এই লেখার উদ্দেশ্য পরিস্কার, তুমি যদি ফাঁকিস্তানের সাপোর্টার হও, তাহলে নিজেকে জিজ্ঞাসা কর তুমি কেন শ্রীলংকা, ও.ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, কেনিয়া, সাউথ আফ্রিকা, সৌদিয়ারব, কে সাপোর্ট করনা। তাহলে অন্যদল সাপোর্ট করলেও কি এই প্রশ্ন নিজেকে করতে হবে? আমি জানি না। তবে, তুমি যদি ফাঁকিস্তানের সাপোর্টার হও আর নিজেকে ওই প্রশ্ন করে যুক্তি সংগত উত্তর না পাও, তাহলে ধরে নিতে হবে
"অন্ধত্ব" প্যারাতে যে কুসংস্কারগুলোর কথা বলা আছে, তুমি তার বেশীর ভাগই সত্য বলে মনে কর। তোমার জন্য দুঃখ।
১।http://en.wikipedia.org/wiki/Korea_under_Japanese_rule
২।http://en.wikipedia.org/wiki/Union_between_Sweden_and_Norway
৩। Click This Link
৪।http://countrystudies.us/south-korea/42.htm
৫।http://www.youtube.com/watch?v=m6p3LpwqgTE&feature=related ইংরেজীতে ট্রাস্লেট করে দেখেন, টাইটেল/কমেন্টে কি লেখা।