
কেজি স্কুল থেকে ক্লাস ৩ এ কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হলাম, নতুন জীবন শুরু হলো। কেজি স্কুল টা ছিল ছোট্ট একটা বাসার মত, আমরা খেলতাম ভেতরের উঠানে বা ফাঁকা ক্লাসরুমে, সেই তুলনাই কলেজিয়েট স্কুল আক্ষরিক অর্থেই বিশাল, বড় একটা সবুজ মাঠ, চারিদিকে বড় বড় বিল্ডিংএ ক্লাসরুম। মাঝখানে একটা পুরাতন একতলা ভবন, অনেক আগেই পরিত্যাক্ত ঘোষনা করা হয়েছে, আমরা সেটার বারান্দায় দৌড়ে বেড়াতাম। ৩ থেকে ৬ ক্লাস ছিল মর্নিংশিফ্ট, সকাল ৭ টা থেকে ১০টা পর্যন্ত যতদুর মনে পড়ে। সকালে স্কুলের মাঠে শয়ে শয়ে পিচ্চি আমরা ক্লাস অনুযায়ি লাইন দিয়ে দাড়াতাম, গলা ফাটায়ে গাইতাম “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি….” তারপর সবাই হাত তুলে প্রতি্গ্গা(ইউনিকোড ফোনেটিকে এই বানান টা কিভাবে লিখে! কোন কোন অক্ষর যোগ দিতে হবে?) করতাম যে আমরা কিভাবে সবসময় দেশের সেবা করবো, ভালো থাকবো ইত্যাদি ইত্যাদি। সকালের এই টর্চার শেষ হওয়ার পর লাইন ধরে যার যার ক্লাসে ফেরত যেতাম। স্কুলের ইউনির্ফম ছিল সাদা জামা খাকি প্যান্ট সাথে কালো চামড়ার জুতা, আমি তখন পর্যন্ত কেডস পড়ে অভ্যাস্থ, শক্ত চামড়ার জুতা পড়তে আমার অনেক অনিহা, প্রায়ি আমাদের লাল/সাদা কেডস পরা সবাইকে ধরে এসেম্ব্লির সামনে লাইন ধরে দাড় করে বেত মারা হতো সবার সামনে। খুব একটা খারাপ লাগতো না, নিজেদের বেশ একটা সাহসি সাহসি লাগতো বাকিদের তুলনায়, উচু ক্লাসের কমরেড রা আমাদের ফিস ফিস করে উপদেশ দিত হাত নরম করে রাখতে, অথবা যেই মুহুর্তে হাতে বেত পড়বে সাথে সাথে হাত নিচের দিকে নামায়ে নিতে হবে আর চোখে মুখে অনেক ব্যাথার ভাব ধরতে হবে। আমরা নিত্য নতুন উপায় বের করতাম মার খেলে ব্যাথা কম লাগানোর, অনেকটা ট্রায়াল এন্ড ইরোর পদ্ধতির মতো। তখন আমাদের একমাত্র ফ্যাশন ছিল জুতা আর ব্যাগে, জাম্প কেডস খুব ফ্যাশনের প্রতিক ছিল, কার জুতার কান কত লম্বা এটাও একটা গর্বের বিষয় ছিল (ফিতার নীচে যে অংশটা সেটাই কান)। ২/৩ বছর পর পেগাসার কেডস ছিল নেক্সট হিট। কার কেডস এ এয়ার সোল (শক এবসর্ভার টাইপ, ফাপা একটা সোল যেটা চাপ দিলে কিছুটা স্প্রিং করে) আছে সেটা একটা আলোচনার বিষয় ছিল। ক্লাস নাইনে উঠার পর কামাচি নামের কোরিয়ান এক জুতার আবির্ভাব হলো, খুবই উচ্চ বংশিয় জুতা, দাম ১২০০টাকা (ঐ সময় আমাদের দেশি জুতা সাধারনত ৩০০-৫০০ এর নীচে থাকতো), এই জুতার নীচে আবার লাইট জ্বলে হাঁটলে, খুবই চমকপ্রদ ব্যাপার। আমরা লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়া দেখি হাতে গোনা দুই তিনটা উচ্চ বংশিয় কামাচি জুতা।
ছোট ক্লাসে রংচঙা ব্যাগ ছিল আমাদের পিঠে, আস্তে আস্তে ফ্যাশন সচেতন হওয়া শুরু করলাম, একসময় হিট হলো জিনসের ব্যাগ, “নান/NAN” নামক ব্যাগ না থাকলে সমাজে মুখ দেখানো যায়না এমন অবস্থা, অন্য নামের জিনসের ব্যাগ হলেও হবে না, নান ই হতে হবে।
ক্লাস ৮ এর দিকে একসময় জিনসের প্যান্ট আসলো বাজারে যার পায়ের নীচের দিকে আধা ইন্চি মতো সুতা বের হওয়া, আমরা সাহসি কয়জন স্কুলের প্যান্টের নীচের সেলাই খুলে ঝুরি ঝুরি করে ফেললাম, বাসায় কিছু বলে না কিন্তু ব্যাকডেটেড স্যার ম্যাডামরা কি যেন কি কারনে এইসব ফ্যাশন সহ্যই করতেন না, বেত পড়তো ধরা খেলেই। আমরা বাধ্য হয়ে এসেম্লিতে প্যান্ট এক ফোল্ড করে রাখা শুরু করলাম, কিভাবে যেন কদিন পর এটাও স্যারদের নজরে পড়ে গেল, লাইনের মাঝে মাঝে একেকজনের প্যান্ট গুটানো, মোজা দেখা যায়, আবার শুরু ধর পাকড়। এই ফ্যাশন বেশিদিন আমরা এইসব অবুঝ টিচারদের জন্য ধরে রাখতে পারলাম না, নতুন ফ্যাশন হিসাবে প্যান্টের পা বেশ করে বানানো শুরু করলাম। ক্লাসে বা অন্য সময় আমরা প্যান্ট ঘশে ঘশে হাটতাম, এসেম্ব্লিতে ফোল্ড করা থাকতো সমান করে, কারো চোখে পড়তো না। কখনো যানতে চাইলে অবলিলায় মিথ্যা বলতাম যে বাসা থেকে বড় করে বানায়ে দিয়েছে কারন আগামি ২ বছর এই প্যান্ট পড়তে হবে সময়ের সাথে সাথে সব চেন্জ হতো, বাজারে স্কিন টাইট জিনস আসতো, আমাদের স্কুলের প্যান্ট স্কিন টাইট হয়ে যেত, বাজারের বেগি স্টাইল মুহুর্তে স্কুলের প্যান্টে। ভালো টেইলার ছিল যেখানে বাসার লোকের সাথে যেয়ে কাপড় কিনে অর্ডার দিয়ে আসার পরদিন আমরা যেয়ে স্টাইল/কাট এইগুলো বলে দিয়ে আসতে পারতাম।
কিছুদিন আগে একবার স্কুলে গেছিলাম, প্রায় ১৫ বছর পর। সবঠিক আছে, নতুন অনেক ভবন হয়েছে, মাঠ কমে গেছে, কিন্তু যেটা সবচেয়ে চোখে পড়লো তা হচ্ছে সাইকেলের অনুপস্থিতি। আমাদের সময় নীচতলার বারান্দা, সিড়িঘর বোঝাই হয়ে থাকতো সাইকেলে। স্কুলের বেশিরভাগ ছেলেদেরি সাইকেল ছিল। ক্লাস ফাইভের পরীক্ষার পর আব্বা বললো সাইকেল কিনে দিবে, একদিন ঢাকা রওয়ানা দিয়ে পরদিন সাইকেল নিয়ে হাজির। তখন ১২ ঘন্টারো বেশি লাগতো ট্রেনে ঢাকা-রাজশাহী ভ্রমন করতে, বাস ছিলনা ভালো কোন। মাঝখানে স্টিমারে নদী পার হতে হতো, এখন মাঝে মাঝে ভাবি কত কষ্ট করেইনা সাইকেলটা আব্বা এনেছিল। লাল টুকটুকা চাইনীজ সাইকেল, প্রতিদিন কাউকে না কাউকে ধরি সাইকেল শিখানোর জন্, পাড়ার বন্ধুরা যারা সাইকেল জানে তারা ধরে ধরে শেখানো শুরু করলো, এক সপ্তাহ পরে আমি শহর চক্কর দেয়া শুরু করলাম। আমাকে সাইকেল চালাতে সবচেয়ে হেল্প করেছিল ছোট সুমন আর বড় সুমন। ক্লাস ৭/৮এ পড়ি তখন, এক বড় ভাইয়ের ভাঙাচুরা অদ্ভুত এক সাইকেল চোখে পড়লো, হ্যান্ডেল বাকা, পাতলা পাতলা চাকা, জানতে পারলাম এইটা স্পোর্টস সাইকেল, মাত্র একটাই আছে রাজশাহীতে। শুরু হলো আম্মার সাথে ঘ্যান ঘ্যান করা, সাইকেল কিনে দাও নতুন। অবশেষে একদিন আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা, মিশন রেসিং সাইকেল। বংশাল থেকে মামার সাথে যেয়ে তাইওয়ানের সান-রেস নামক সাইকেল কিনে রাজশাহী ফিরলাম। স্কুলে যে দেখে সেই চালাতে চায় একবার করে, আমি বিচার বিবেচনা করে কাউকে দি কাউকে দি না….. ভাব।

ক্লাস ৫এ একদিন রুপক বললো বিকালে স্কুলের মাঠে আসতে, কি নাকি কাজ আছে, গেলাম, দুজন দুরে দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে দেখলাম স্কুলের কিছু ছেলে সুন্দর ভাবে লেফট রাইট করছে, কিছুক্ষন পরে সবাই তালে তালে হেঁটে মাঠ ঘুরে আসছে, আমাদের ঘুর ঘুর করতে দেখে ডাক দিল এক বড় ভাই, জানতে পারলাম এইটা স্কুলের স্কাউট দল, সামনে ক্যাম্প আছে তারই প্রস্তুতি। আমাদের কাছে ব্যাপারটা বেশ উত্তেজনাপুর্ন মনে হলো, ততদিনে আমরা তিন গোয়েন্দা খেলে খেলে মোটামুটি বিরক্ত, কেস পাওয়া যায়না কোন (একটা কেস পাওয়া গেছিল, সে গল্প পরে হবে)। জানতে পারলাম আমরা বেশি ছোট তাই স্কাউট দলে নেয়া যাবে না, আমাদের বললো ক্লাসের শেষে অপেক্ষা করতে। পরদিন দেখি সকালে স্কুল শেষে একই রকম আরেকটা দল, কিন্তু ছোটদের। আমি রুপক আর লাবন শুরু করলাম কাব স্কাউট করা। পরে সিক্স এ উঠে বয় স্কাউট এ আমাদের স্থান হয়। বছর শেষে ক্যাম্পের ৩/৪ মাস আগে শুরু হতো প্রস্তুতি, দল বেঁধে ক্যাম্প করা ছিল অসাধারন এক সময়। আমার মনে পড়ে তিতাস ভাই আর সুজন ভাইকে যারা হাতে ধরে পিচ্চি আমাদের শেখাতেন নট বান্ধা, মার্চপাস্ট করা, স্যালুট দেয়া। আমাদের প্রিয় বই ছিল শাহরিয়ার কবিরের “নিকোলাস রোজারিওর ছেলেরা”, যতদুর সম্ভব এইটা বাংলাদেশের একমাত্র গল্পের বই স্কাউটদের নিয়ে। স্কাউটিংএর ঘটনা নিয়ে পরে আরো লেখার ইচ্ছা আছে তাই আর বড় করলাম না।
যাদের মনে পড়ে: লাবন, রুপক, সুজন ভাই, তিতাস ভাই, পল্লব, সোহেল, আপেল, টুটুল এবং আমাদের স্কাউট দলের সবাইকে।
সময়কাল: ১৯৮৯-১৯৯৩