somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গনি মিয়ার গুপ্তধন

০১ লা এপ্রিল, ২০২৫ দুপুর ১:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভাদ্র মাসের শেষ রাত। গাঁয়ের পাশের বিলটি তখনও হাঁটু-পানিতে ভরা। বর্ষার শেষে এখনও জলে থইথই করছে—জলজ ঘাস, শাপলা, আর শত শত ব্যাঙের ডাকে মুখরিত সেই জলাভূমি। পাশেই ছোট্ট একটি পুকুর, তার ধারে লাল ইটের পুরোনো মসজিদ। মসজিদের পাশেই এক কুঁড়েঘর, যেখানে থাকে গনি মিয়া।

গনি মিয়ার বাবা ব্রিটিশ আমলের বড় অফিসার ছিলেন। দাদা ছিলেন জমিদার। গনি মিয়ার দাদা এই গ্রাম পত্তন করেছিলেন, মসজিদ বানিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে সব হারিয়ে গেছে। এখন গ্রামের কয়েকজন পুরোনো লোক তাকে খাওয়া-পরার যোগান দেয়। সকালে মসজিদ পরিষ্কার করাই তার প্রধান কাজ। সারাদিন সে মসজিদের পাশেই বসে থাকে, কোনোদিন লটারি জিতবে, কোনোদিন গুপ্তধন পাবে—বাপ-দাদার জমিদারি আবার ফিরিয়ে আনবে—এই স্বপ্নে বিভোর হয়ে।

ভোর রাত তিনটা। আকাশে তখন ঝিলিক দিয়ে বেড়াচ্ছে অসংখ্য তারা। গনি মিয়া পুকুরপাড়ে বসে তামাক টানছে। হঠাৎ—আকাশ যেন ফেটে গেল! আগুনের এক গোলক তীব্র বেগে নেমে এলো, আলোয় ভেসে গেল চারপাশ। গনি মিয়ার চোখ ঝলসে গেল সেই তীব্র আলোয়।

বিলের পানিতে আছড়ে পড়ল সেই আগুনের পিণ্ড। পানির নিচে যেন আগুন জ্বলছে—সবুজ জলজ ঘাস, শাপলা ফুল, ব্যাঙের দল—সব যেন একসঙ্গে উজ্জ্বল হয়ে উঠল সেই অদ্ভুত নীল-সবুজ আলোয়।

গনি মিয়া বিলের ধারে গিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। বিলের পানিতে নেমে আরও খানিকটা এগিয়ে গিয়ে অনুসন্ধান করার ইচ্ছা হল। কিন্তু ঘুমের ক্লান্তি এসে যাওয়ায় আপাতত চিন্তাটা বাদ দিয়ে তার কুঁড়েঘরে ফিরে ঘুমানোর সিদ্ধান্ত নিল।

----------------------------------------------------------------------------------------------------------

বেড়ার ফাঁক দিয়ে সকালের রোদ চোখে পড়তেই গনি মিয়া তার কুঁড়েঘরের দরজা খুলল। গত রাতের সেই অদ্ভুত আলোর ঝলকানি এখনও তার মনে বাজছে। পুকুরের পানিতে ওজু করে ফজরের নামাজ কাজা আদায় করল। আজ তার নামাজে একটুও মনোযোগ ছিল না। বারবার চোখ যেন বিলের দিকে চলে যাচ্ছে। নামাজ শেষে সে সরাসরি চলে গেল বিলের ধারে।

বিলের পানিতে তখন সকালের রোদের আলো ঝিলিক দিচ্ছে। হাঁটুসমান জলে ভেসে আছে শাপলা আর কচুরিপানা। গনি মিয়া ধীরে ধীরে পানিতে নামল। ঠান্ডা জল তার হাঁটু ছুঁয়ে গেল।

"কুনহানে জানি পইড়ল হেইডা?" গনি মিয়া মনে মনে নিজেকে জিজ্ঞেস করল।

অনুমান করে বিলের মাঝখানে এক জায়গায় গিয়ে গনি মিয়া হাত দিয়ে পানির নিচে খুঁজতে শুরু করল। কাদা, জলজ উদ্ভিদ, পচা পাতা—সবই তার আঙুলের ডগায় আসছে। একসময় তার হাত একটা শক্ত কিছু স্পর্শ করল। হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত হলো।

"পাইয়া গেছি!"

কিন্তু তুলে দেখল সেটা একটা সাধারণ পাথর। হতাশ হয়ে সেটা ছুড়ে ফেলে দিল।

গ্রামের লোকজন একে একে জাগতে শুরু করেছে। কৃষকরা তাদের কাজে বের হচ্ছিল। কেউ কেউ তাকে জিজ্ঞেস করল, "কি খুঁজতাছ চাচা?"

"মাছ... মাছ ধরতাছি," গনি মিয়া অস্বস্তির সঙ্গে উত্তর দিল।

দুপুরের রোদ যখন প্রখর হয়ে উঠল, গনি মিয়া একটা কচুরিপানার ঝাড়ের কাছে হাত দিল। হঠাৎ তার আঙুলে একটা তীক্ষ্ণ ব্যথা। তুলে দেখল একটা ভাঙা বোতলের টুকরো তার আঙুল কেটে ফেলেছে। রক্ত ঝরছে। গনি মিয়া গামছার ছেঁড়া টুকরো দিয়ে ক্ষতটা বেঁধে ফেলল।

সন্ধ্যা নেমে এল। সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে গনি মিয়া শুধু পেয়েছে—কয়েকটা সাধারণ পাথর, একটা মরা কাঁকড়া, আর কাটা আঙুল। ক্লান্ত হয়ে সে বিলের পাড়ে বসে পড়ল।

আকাশে একে একে তারা ফুটতে শুরু করেছে। গনি মিয়া তার ভিজে লুঙ্গি শুকাতে দিয়ে ভাবছে—"কাইলকা আবার চেষ্টা করমু। মনে লয় ভুল জায়গায় বিচরাইছি।"

----------------------------------------------------------------------------------------------------------

পরের দিন ফজরের নামাজ শেষ হতে না হতেই গনি মিয়া তার বাঁশের লাঠি কাঁধে নিয়ে বিলের দিকে হাঁটা দিল। গতকাল যেহেতু ব্যর্থ হয়েছিল, আজ সে বিলের অপর কোণ থেকে খোঁজ শুরু করবে, যেখানে জল হাটু পানির চেয়ে আরেকটু বেশি গভীর।

সকালের কুয়াশায় ভেজা ঘাসে তার পায়ের চপ্পল ভিজে যাচ্ছিল। লাঠি দিয়ে পানির তলায় খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এগোতে লাগল। হঠাৎ লাঠির ডগায় ধাতব কিছুর সঙ্গে ধাক্কা লাগল।

"এইবার তো!"

হাত দিয়ে কাদা সরাতে লাগল। একটা পুরনো তামার কুপি বেরিয়ে এল, গায়ে আরবিতে কিছু লেখা। গনি মিয়া কুপিটা ভালো করে মাজল।

"এইডা কি জিনিস?"

কাছেই কাজ করছিল রহিম মিয়া। সে এসে বলল, "মামা, এইডা তো অনেক পুরান জিনিস দেহা যায়! লেহাডা পইড়তাম পারতাছি না, মনে লয় কলেমা লেহা।"

গনি মিয়ার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। তার দাদার আমলে এই এলাকায় মুসলিম সাধকদের আসা-যাওয়া ছিল। হয়তো এটা তাদের ফেলে যাওয়া কোনো পবিত্র জিনিস!

গনি মিয়া সারাদিন জলের নিচে হাতড়ে বেড়াল। দুপুর গড়াতেই চোখে পড়ল দূরে এক জায়গায় নীলচে আভা! গনি মিয়া হুশ করে দৌড় দিল। কাছাকাছি পৌঁছে দেখল, সেখানে পানির তলায় নীলচে আভা দেখা যাচ্ছে। গনি মিয়ার বুক ধকধক করতে লাগল।

"এইবার তো পাইলাম!"

কিন্তু সে যেই কাছে গেল, আলোটা মিলিয়ে গেল। দেখা গেল সূর্যের আলো জলের উপর পড়ে আর ভাসমান নীল পলিথিনে প্রতিফলিত হয়ে এমন অদ্ভুত শোভা তৈরি করছিল। গনি মিয়া হতাশ হয়ে মাথা চুলকাতে লাগল ...

--------------------------------------------------------------------------------------------------------------

দুপুরের রোদে বিলের পানি পর্যন্ত যেন ফুটতে শুরু করেছিল। গনি মিয়ার গায়ের গামছা ঘামে ভিজে কাঁধে লেগে ছিল। তার ঠোঁট শুকিয়ে খসখস করছিল, তবুও সে হাল ছাড়েনি।

সকাল থেকে সে তিনবার বিলের পানিতে হাতড়ে বেড়িয়েছে। প্রথমবার ভেবেছিল পেয়ে গেছে—যখন তার হাতে লাগল ভারী একটা কালো পাথর। কিন্তু কাদা মুছেই দেখল, সেটা শুধু পোড়ামাটির টুকরো, হয়তো পুরোনো কোনো চুলার অংশ।

দ্বিতীয়বার তার চোখে পড়েছিল পানির নিচে চকচকে একটা জিনিস। হাত কাঁপতে কাঁপতে তুলে দেখে, সেটা একটা ভাঙা কাচের বোতলের তলার অংশ, যাতে সূর্যের আলো পড়ে রংধনু তৈরি করছিল।

"আর না... আইজকা শেষ চেষ্টা," গনি মিয়া ক্লান্ত হয়ে বিলের পাড়ে বসে পড়ল। তার পিঠে ব্যথা করছিল, হাতের আঙুলের কাটা জায়গাটা টনটন করছিল। চারপাশে বিলের শাপলা ফুলগুলো বিকেলের তাপে মুখ লুকিয়েছে। দূরে কাশবনে বসা একটা বক ধীরে ধীরে পানিতে মাছ খুঁজছিল।

হঠাৎ তার চোখ পড়ল পশ্চিম পাড়ের একটা অদ্ভুত জায়গায়। সেখানে পানির রং যেন একটু আলাদা, যেন নিচে কিছু আছে। শেষ শক্তি জড়ো করে গনি মিয়া আবার পানিতে নামল। পুরো বিলটা হাঁটু পানির বেশি না হলেও এই জায়গাটা অনেক গভীর, প্রায় বুকসমান পানি। আশপাশে গোলাকার অনেকখানি ফাঁকা, কোনো জলজ উদ্ভিদ নেই, শুধু বিলের পানি টলটল করছে।

কাঁদার ভেতরে পায়ের আঙুলে শক্ত কিছু একটা লাগতেই সে থমকে দাঁড়াল। পা দিয়ে খোঁচা দিতেই আঙুল জ্বলে উঠল! ডুব দিয়ে পাথরটা হাতে নিতেই মনে হল, যেন কেউ তার হাতে একটা ছোট্ট রাতের আকাশ তুলে দিয়েছে। একটা বড় ডিমের মতো কালো পাথর, কিন্তু এর গায়ে যেন কে সোনার সুতো দিয়ে জ্যোতিষ্কের ছবি এঁকেছে।

"এই... এইডাই তো হেই জিনিস!"

পাথরটা স্পর্শ করতেই গনি মিয়ার ক্লান্তি উধাও হয়ে গেল। এতদিনের স্বপ্ন সত্যি হচ্ছিল! কেউ দেখে ফেলার আগেই সে তাড়াতাড়ি পাথরটা গামছায় মুড়ে নিল। বিলের পানিতে শেষবার মুখ ধুয়ে যখন ফিরছিল, তখন সন্ধ্যার প্রথম তারা উঠছিল আকাশে। মনে হচ্ছিল, সেই তারা যেন আজ একটু বেশি উজ্জ্বল...

ঘরে ফেরার পথে তার পায়ের নিচে শুকনো পাতা খসখস করছিল। গনি মিয়া জানত না এই পাথর নিয়ে কী করবে, কিন্তু আজ রাতে তার ঘুম হবে না। কলসির নিচে পাথরটা লুকিয়ে রাখতে রাখতে তার মনে হচ্ছিল, এই বিলের পানিতেই তার পূর্বপুরুষের জমিদারি ফিরে পেয়েছে সে...
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা এপ্রিল, ২০২৫ দুপুর ১:৩২
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিএনপি সংস্কার চায়না"- সত্যের অপলাপ!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৫ সকাল ১০:৩২

"বিএনপি সংস্কার চায়না"- সত্যের অপলাপ ....


জা-শি এবং জানাপা সমস্বরে ম্যাতকার করে- "বিএনপি সংস্কার চায়না!" আমাদের ম্যাড মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টা চাউর হয়েছে। এটাই টক অফ দ্যা কান্ট্রি! এবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ায় আজ মন ভালো নাই নরেন্দ মোদী জীর।

লিখেছেন নতুন, ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৫ দুপুর ২:৩৪



আজ শেখ হাসিনা এবং আপসোসলীগের সবার মন খারাপ। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়েছেন।

আজকের এই বৈঠক বাংলাদেশের জন্য একটি কূটনৈতিক অর্জন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ মোদীজির মন ভালো নেই!

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৫ বিকাল ৪:০০

আজ মোদীজির মন ভালো নেই!

ছবি কৃতজ্ঞতা দৈনিক আমাদের সময় অনলাইন, শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানালেন নরেন্দ্র মোদি

হাসিনাকে ফেরত চাওয়ায়
আজ মোদীজির মন ভালো নেই!
মোদীজীর আজ দুঃখ ভারী
কি যেন এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ: ব্যাংককে মোদি-ইউনূস বৈঠক

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৫ বিকাল ৪:৪০

[


ছুটির দিনে সুন্দর একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে, যা আমাদের এই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনবে, ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের বিরোধিতাকারীদের মুখে ঝামা ঘঁষে দেবে এবং জঙ্গীদের ঘুম হারাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতিবাদ: ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিকৃত চিত্রণ ও দালালি মানসিকতার জবাব

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৫ সন্ধ্যা ৭:০৫

প্রতিবাদ: ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিকৃত চিত্রণ ও দালালি মানসিকতার জবাব

ছবি প্রথম আলোর সৌজন্যে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাথে আজ থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মাদ ইউনুসের দ্বিপাক্ষিক একটি বৈঠক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×