নায়লার পায়ের নিচে মন্দিরের মেঝে ক্রমাগত কাঁপতে আরম্ভ করল। সেই বিকট গর্জন আরও প্রবল হয়ে উঠল, যেন বহু শতাব্দী ধরে শৃঙ্খলিত কোনো দানব অবশেষে মুক্তি পেয়েছে। মন্দিরের গভীর থেকে কালচে লাল আলো ছড়িয়ে পড়তে আরম্ভ করল, ধুলো ও ধ্বংসাবশেষ বাতাসে উড়ে উঠল। এটা ধীরে ধীরে উপরে উঠছে—একটা বিশাল, বিভীষিকাময় অবয়ব, অন্ধকারের চেয়েও কালো, আগুনের মতো লালচে আভা তার গায়ে খেলে যাচ্ছে। শরীরটা যেন স্থির না, প্রতি মুহূর্তে আকার পাল্টাচ্ছে—একবার ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে, আবার পরক্ষণেই পাথরের মতো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বিশাল, কঙ্কালসার হাত বেরিয়ে আসছে ধুলো-ধোঁয়ার মধ্যে থেকে, যার চারপাশে কালো বিদ্যুতের মতো কিছু খেলে যাচ্ছে।
ছায়ামূর্তিরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের শরীরের চারপাশে কালো শিকল জড়িয়ে যাচ্ছে, বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে বিদ্যুতের মতো এক তীব্র কম্পন।
"ও ফিরে এসেছে..." তাদের একজন ফিসফিস করে বলছে।
নায়লার মাথার ভেতর হাজারটা সাইরেন বাজছে। এটা এখনই ওদের আবার বন্দী করে ফেলবে!
একটা ছায়ামূর্তি দ্রুত তার সামনে এসে দাঁড়াল, হাতে গভীর লাল রঙের পাথর সহ একটা আংটি। ।
"এই আংটিটা নাও!"
"কিন্তু এটা কী?" নায়লার গলা শুকিয়ে আসছে।
"আমাদের শেষ শক্তি। এটা হারিয়ো না! যদি তুমি এটাকে তোমার জগতে নিয়ে যেতে পারো, তাহলে হয়তো একদিন... আমরা আবার মুক্ত হতে পারবো।"
মন্দিরের ভেতরে গর্জন আরও তীব্র হচ্ছে, দেয়ালের ফাটল চওড়া হচ্ছে, ছাদ ধসে পড়ছে, ধুলোর ঝড়ে দৃষ্টিসীমা ঝাপসা হয়ে আসছে।
"তুমি এখনই পালাও!" আরেকজন ছায়ামূর্তি চিৎকার করে বলল।
নায়লা শক্ত করে আংটিটা হাতে ধরে দৌড়াচ্ছে নিজের ক্রাফটের দিকে।
""আলিজা! ওয়ার্প সিকোয়েন্স এক্টিভেট করো! এখনই!"
"গ্যাভিটন ড্রাইভ চার্জ হচ্ছে, ১৫ সেকেন্ড প্রয়োজন," আলিজার কণ্ঠ ধীর, অথচ অবিচল।
"আমাদের ১৫ সেকেন্ড নেই!" নায়লার গলা চিৎকার করে উঠছে।
সে দরজা খুলে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, হাঁপাতে হাঁপাতে কন্ট্রোল প্যানেলে হাত রাখছে, হাত কাঁপছে, মাথা ঝিমঝিম করছে।
বাইরে, অন্ধকারের কারারক্ষী পুরোপুরি মুক্ত হয়ে গেছে। তার বিশাল কালো বাহু আকাশ ছুঁয়ে ফেলছে, চারপাশের মন্দিরের পাথরগুলো একের পর এক আকাশে উঠে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, আর সেই কালো বিদ্যুতের শিকলগুলো ছায়ামূর্তিদের গিলে নিচ্ছে।
নায়লা চোখের সামনে দেখছে তাদের ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যেতে, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেতে, আবারও এক শাশ্বত বন্দিত্বের শৃঙ্খলে জড়িয়ে যেতে।
"না!" তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে, কিন্তু সে জানে কিছুই করার নেই।
"তুমি আমাদের শেষ আশা..."
শব্দগুলো ভেসে আসছে বাতাসে, যেন তারা ধুলো হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে সময়ের অতল গহ্বরে।
"ওয়ার্প সিকোয়েন্স ৮০% সম্পন্ন," আলিজা জানাচ্ছে।
নায়লা জানে, আর এক সেকেন্ডও দেরি করা যাবে না।
তার চোখ ভিজে আসছে, কিন্তু সে শক্ত করে আংটিটা চেপে ধরে, হৃদয়ের গভীরে ছায়ামূর্তিদের শেষ অনুরোধ গেঁথে নেয়।
"ওয়ার্প সিকোয়েন্স একটিভ!"
চারপাশে উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়ছে, আর মুহূর্তের মধ্যে, তার যান বাস্তবতাকে ভেদ করে এক নতুন মাত্রায় প্রবেশ করে।
তার হাতে ধরা আংটির লালচে পাথরটা ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হচ্ছে, যেন তার ভেতরে কেউ এখনো শ্বাস নিচ্ছে, বেঁচে আছে, আশা করছে…
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মার্চ, ২০২৫ রাত ৮:৩৮
১. ২৭ শে মার্চ, ২০২৫ দুপুর ১২:২২ ০