সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে পুরনো দিল্লির আকাশে। গোধূলির নরম লালিমা মিশে গেছে ধোঁয়ার মতো কুয়াশায়। আবিদ ধীর পায়ে উঠছিলেন জামা মসজিদের মিনারের সরু প্যাঁচানো সিঁড়ি বেয়ে। তার নিঃশ্বাস ভারী হচ্ছিল, তবে তার মন অন্য কোথাও।
মিনারের প্রতিটি ধাপে সময়ের ছাপ লেগে আছে। পাথরের গায়ে ছোট ছোট খোদাই, হয়তো কোনো মিস্ত্রির নাম কিংবা একান্ত গোপন প্রেমের চিহ্ন। এসব পাথরই তো দেখেছে শায়েস্তা খানের জমানা, দেখেছে মুগল সম্রাটদের গৌরব আর পতনের দিন।
শেষ ধাপে উঠে যখন চোখের সামনে খুলে গেল গোটা শহরের দৃশ্য, আবিদ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
পুরনো দিল্লি পায়ের নিচে যেন একটা জীবন্ত গল্প। হাজারো ছোট ছোট ছাদের সারি, কাঠের বারান্দা ঘেরা সরু দোতলা বাড়ি, আর তাদের দেয়ালে এখনো অক্ষত সেই মেহগনি আর ধূসর রং। অনেক ছাদের এক কোণে পান পাতার রসের দাগ শুকিয়ে রং হয়ে গেছে।
কোথাও একটা লোহার গ্রিলে শুকোতে দেওয়া ধোপদুরস্ত কুর্তা, কোথাও টিনের ছাদে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা নীল ছাতার নিচে পাখিদের খাঁচা। সরু গলির ভেতর থেকে মৃদু আসছে ইমামবাড়া থেকে পড়া শের-কবিতার আওয়াজ, মাইলের পর মাইল পুরনো ইট আর কাঠের জানালা দিয়ে মোড়া ঘরগুলো যেন অতীতের ঘ্রাণ ধরে রেখেছে।
একটা ছাদে রংচটা পিতলের পানির হাউজ এখনো রোদে চিকচিক করছে, তার পাশেই ছোট্ট গাছের টব — হয়তো কোনো বয়স্ক বৃদ্ধা প্রতিদিন তাতে জল দেন।
আবিদ তাকালেন দূর থেকে দেখা গলি বেয়ে চলে যাওয়া মানুষদের দিকে। যেন শহরটা একইসঙ্গে বেঁচে আছে এবং মৃত।
কিন্তু তার দৃষ্টি সবকিছু পেরিয়ে থেমে রইল সেই পূর্বদিকে — যেখানে যমুনার জল এককালে আকাশের রঙ মিশিয়ে বয়ে যেতো। তার ঠোঁট ফিসফিস করে বলে উঠল,
"নদী তো ওখানেই থাকার কথা..."
অথচ সেই জায়গায় কেবল দিগন্তজোড়া ধোঁয়া আর কংক্রিটের ঘর। আবিদের বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন খালি হয়ে গেল।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মার্চ, ২০২৫ সন্ধ্যা ৬:০৪