বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা সামনে আসতে শুরু করেছে। বিশেষ করে, ১৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ মাত্র ছয় মাসে তিনগুণ বেড়ে ১,৫২,৮৮৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে, যার মূল বোঝা বইতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের এই ভয়াবহতা সৃষ্টি হওয়ার পেছনে রয়েছে অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ, তদারকির অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাব। বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, বিশেষ করে এস আলম ও বেক্সিমকোর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করেনি, বরং নানা কৌশলে ব্যাংকের মূলধন ফাঁপিয়ে তুলেছে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক নিয়োগ ও স্বজনপ্রীতি ব্যাপক অনিয়মের সুযোগ তৈরি করেছে, যার ফলে দায়িত্বপ্রাপ্তরা ঋণ পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ সমস্যা মোকাবিলায় যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি, বরং দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাগুলো আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংক ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন করে গঠন করেছে। কিছু ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমলেও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে। শুধু বোর্ড পুনর্গঠনই যথেষ্ট নয়, খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা ঋণের অপব্যবহার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে ঋণ অনুমোদন ও পুনরুদ্ধারের জন্য স্বচ্ছ নীতিমালা কার্যকর করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে টেকসই করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রমে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম আর না ঘটে। জনগণ এখন শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চায়। ব্যাংক ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করা না গেলে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।