এই করোনায় বাসে আমরা অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ঠেলাঠেলি করে চলি। ১৫ হাজার টাকার চাকরি আর ৫০০টাকার হাজিরা ভাতা পেতে শত কিলোমিটার হেটে রওনা দেই কর্মস্থলে যোগ দিতে। ট্রাকের পিছনে, পোনা মাছের ড্রামে করে যাতায়াত করি। মার্কেটে ঈদ শপিংয়ে দুধের বাচ্চা কোলে নিয়ে যাই। ঈদের আমেজে বেড়াতে বের হই, সাংবাদিক জানতে চাইলে বলি "আজ ঈদের দিন, প্রশাসনের লোক রাস্তায় নাই তাই একটু শান্তিতে বের হলাম"। মসজিদের জামায়াতে নামাজের জন্য উদগ্রীব থাকি। মাস্ক পুলিশের ভয়ে ঝুলিয়ে রাখি থুতনিতে। কেউ জানতে চাইলে মাস্ক কোথায়? উত্তর দেই বাসায় ধুয়ে রোদ্রে শুকাতে দিয়েছি। শিল্পপতি মারা গেলে বলি, টাকা দিয়ে পারলানা তো বাচতে। কেউ ত্রাণের ছবি দিলে ভুল ধরি, দান করার ছবি দিতে নাই।
"এইযে আমি এতো সাচেতন, এতো উদাসিন" এই আমিই কেন করোনা আক্রান্ত মৃত দেহের প্রতি এতো আক্রোশ?
করোনায় মারা যাওয়া মুক্তিযোদ্ধার অন্তিমযাত্রায় পদে পদে বাধা, শ্মশানে লাশ আনার আগেই বাঁশ, কাঠ ফেলে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে বাধা পেরিয়ে কোনোমতে শ্মশানে নেওয়া হয় লাশ। সেখানেও বাধা। কেউ চিতা সাজাতে রাজি নয়। আগেই চিতার কাঠ পাঠানো হলেও তা ফিরিয়ে দেয় এলাকাবাসী। একে–ওকে ধরে পুলিশ সদস্যরাই সব ব্যবস্থা করেন। নিয়ম অনুযায়ী দাহ করা ব্যক্তির নাম শ্মশানের খাতায় লিপিবদ্ধ করার কথা। সেখানেও বাধা, শ্মশানের কেউ নামটিই লিপিবদ্ধ করতে রাজি নন।
করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত মুক্তিযোদ্ধা কমলেশ চক্রবর্তী ফরিদপুর শহরের নিলটুলী মহল্লার বাসিন্দা। তিনি শুধু মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন না, ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের নেতাও। ওষুধ ব্যবসার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। কমলেশ ফরিদপুর সদরের মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার ও সদর উপজেলা পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতিও ছিলেন।
ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) রাশেদুল ইসলাম জানান, শ্মশানঘাটে ঢোকার পথে তাঁরা এলাকাবাসীর প্রতিরোধের মুখে পড়েন। শ্মশানে যাওয়ার সড়কটি এলাকাবাসী আগে থেকেই বাঁশ ও কাঠের গুঁড়ি ফেলে আটকে রাখে। ওই সড়কে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় একজন মানুষের পক্ষে হেঁটে ওই সড়কটি অতিক্রম করার সুযোগ ছিল না। পরে এলাকাবাসীকে বুঝিয়ে রাজি করিয়ে মৃতদেহটি শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়।
রাশেদুল ইসলাম বলেন, কিন্তু এলাকাবাসী দাহ কাজের বিরোধিতা অব্যাহত রাখেন। লাশ দাহ করার জন্য পৌরসভার দায়িত্বরত কোনো ব্যক্তিকে সেখানে খুঁজে পাওয়া যায়নি। আগে কাঠ পাঠানো হলেও এলাকাবাসী সে কাঠ ফিরিয়ে দেন। তাঁরা কোনোভাবেই কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তিকে শ্মশানে দাহ করতে দেবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেন।
কীভাবে ধর্মীয় রীতি মেনে চিতা সাজাতে হয়, কীভাবে মরদেহ চিতায় তুলতে হয়, এসবের কোনো কিছুই তাঁদের জানা ছিল না। পরে এ কাজে নিয়োজিত পৌরসভার কর্মচারী পরিতোষ সরকারকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে আসা হয়। তিনি দূরে দাঁড়িয়ে থেকে নিয়মকানুন জানান এবং পুলিশ সদস্যরা তা অনুসরণ করেন। পরে মুখাগ্নি দেন মৃতের ছেলে উজ্জ্বল চক্রবর্তী। বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।