মূলত তারা দুটি তালিকা তৈরি করে। একটি সমালোচকদের দৃষ্টিতে সেরা ১০, আরেকটি পরিচালকদের দৃষ্টিতে সেরা ১০। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সেরা চলচ্চিত্র সমালোচক ও পরিচালকদের কাছ থেকে মতামত নিয়ে তৈরি হয় সেরা ১০ ছবির তালিকা। সবাই মানেন যে এই তালিকা সব ধরণের বিতর্কের বাইরে, সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। সর্বশেষ তালিকা হয়েছে ২০০২ সালে। বিভিন্ন ফিল্ম সোসাইটিই ছিল দেশে এসব চলচ্চিত্র দেখার একমাত্র উপায়। এখন ডিভিডির প্রসার বেড়েছে। তালিকার অনেকগুলো ছবিই এখন দেখা যাবে ঘরে বসেই। সে কারণেই পাঠকদের জন্য সমালোচকদের দৃষ্টিতে সেরা ১০ ছবির সেই তালিকা।
১। সিটিজেন কেইন: ১৯৫২ থেকে যতবার তালিকা হয়েছে প্রতিবারই সেরা ছবির তালিকায় শীর্ষে থেকেছে সিটিজেন কেইন। এমনকি সমালোচক এবং পরিচালকরা এই একটি ছবির েেত্রই সম্পূর্ণ একমত, অর্থাৎ সর্বকালের সেরা ছবি সিটিজেন কেইন। ১৯৪১ সালে মুক্তি পেয়েছিল অরসন ওয়েলস এর এই ছবি।
প্রথম দৃশ্যেই দেখা যাবে মিডিয়া জগতের দিকপাল চার্লস ফসটার কেইনের মৃত্যুদৃশ্য। মারা যাওয়ার ঠিক আগে তাঁর উচ্চারিত শেষ কথা ছিল ‘রোজবাড’। সাংবাদিক থমসনকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তিনি কেন এই কথা বলেছিলেন, কি তার অর্থ। এর পর থমসন কথা বলতে থাকেন ফসটার কেইনের পরিচিতদের সঙ্গে। আর এভাবেই উম্মোচিত হতে থাকে ফসটার কেইনের রহস্যঘেরা জীবনের নানা অধ্যায়।
একটা গল্প চলচ্চিত্রের ভাষায় কিভাবে প্রকাশ করা হবে তার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ সিটিজেন কেইন। ১৯৪১ সালের তৈরি ছবিটিকে আজও কারিগরি দিক থেকেও সেরা ছবি বলা হয়। পরিচালক অরসন ওয়েলস-এর প্রথম ছবি ছিল এটি এবং তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৬। ছবির মূল চরিত্রও ওয়েলস-এর করা। তার অভিনয়কেও বলা হয় ‘মেথড অ্যাক্টিং’-এর শুরুর দিকের বড় উদাহরণ।
সিটিজেন কেইন ব্যবসা সফল ছবি ছিল না। এই ছবি করতে গিয়ে পরিচালক আর্থিক কষ্টে পড়েগিয়েছিলেন। এরপরেও ওয়েলস আরো ছবি তৈরি করলেও সবগুলোই করেছেন নিজের মতো করে। এমনকি এই ছবি অস্কারেও তেমন সুবিধা করতে পারেনি। মৌলিক চিত্রনাট্য শাখায় একটি পুরস্কার জুটেছিল। পরে অবশ্য জীবিত অবস্থাতেই তিনি দেখে গিয়েছিলেন যে, তার ছবি কিভাবে বিশ্বের সেরা চলচ্চিত্রের মর্যাদা পায়।
২। ভার্টিগো: ১৯৫৮ সালে মুক্তি পায়। সত্যজিতের যেমন সৌমিত্র তেমনি হিচককের জেমস স্টুয়ার্ট। স্টুয়ার্টের অভিনয় জীবনের সেরা অভিনয় এই ছবিতেই। ছবিতে আরো আছেন কিম নোভাক। রহস্য, প্রেম, আকাঙ্খা আর ঈর্ষার ছবির ভার্টিগো।
স্টুয়ার্ট এখানে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা, প্রেমে পড়ে এক রহস্যময়ীর। ছবিটি প্রথমে সমালোচক বা দর্শকদের আনুকূল্য পায়নি। কিন্তু এখন এটিকে ধরা হয় সর্বকালের সেরা ছবির একটি হিসাবে। ১৯৮৩ সালে ছবিটিকে পুনরায় মুক্তি দেওয়া হলে সারা বিশ্বে হৈ চৈ পড়ে গিয়েছিল।
৩। দ্য রুলস অব দ্য গেম: ছবিটির ফ্রেঞ্চ নাম ‘লা রেগলে দু জিউ’। জঁ রেনোয়াঁরের এই ছবি মুক্তি পায় ১৯৩৯ সালে। ট্রাজেডির সঙ্গে কমেডির মিশ্রন রেনোয়ারের ছবির বড় বৈশিষ্ট্য আর এই ছবিটি তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে সমাজের উচ্চ শ্রেনীর চালচলন নিয়ে বিদ্রুপাÍক ছবি দ্য রুলস অব দ্য গেম। কমেডি ছবির মূল সুর হলেও শেষটা ট্রাজেডি। ফ্রান্সের অভিজাত শ্রেনী বলাই বাহুল্য এই ছবি পছন্দ করেনি। ফলে সরকার ছবিটি নিষিদ্ধ করে। বিশ্বযুদ্ধের পরে অবশ্য ছবিটি অবার আলোর মুখ দেখে এবং ছবিটি এর পর থেকেই সর্বকালের অন্যতম সেরা ছবির মর্যাদা পায়।
৪। দি গডফাদার (প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব): মারিও পুজোর উপন্যাস থেকে ছবি করেছিলেন ফ্রান্সিস ফোর্ড কাপালা। ১৯৭২ সালে মুক্তি পায় অপরাধ জগতের মানুষগুলো নিয়ে তৈরি গডফাদার। কার্লিওন পরিবারের কাহিনী। অভিনয়ে ছিলেন মার্লোন ব্রান্ডো, আল পাচিনো ও রবার্ট ডুভাল। এর দ্বিতীয় পর্ব মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালে। দ্বিতীয় পর্ব মূলত ভিটো কার্লিওনের মাফিয়া হওয়ার কাহিনী। এই পর্বে ভিটো কার্লিওনের চরিত্রে অভিনয় করেন রবার্ট ডি নিরো। সাধারণত দ্বিতীয় পর্ব বানানো হলেও তা বেশিরভাগ সময়েই ভাল কিছু হয় না। সেদিক থেকে গডফাদার-২ ছিল ব্যক্তিক্রম। সেরা দ্বিতীয় পর্ব বলা হয় এই ছবিকে। বিশেষ করে যারা প্রথম পর্বের মার্লোন ব্যান্ডো এবং দ্বিতীয় পর্বেন রবার্ট ডি নিরোর অভিনয় তুলনা করে দেখবেন তাদের জন্য সেটি হবে দারুণ এক অভিজ্ঞতা।
মজার ব্যাপার হলো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের পছন্দ ছিল পরিচালক হিসাবে সার্জিও লিওন এবং অভিনেতা হিসাবে লরেন্স অলিভার। কিন্তু গল্পটি ভাল না লাগায় সার্জিও লিওন পরিচালক হতে রাজি হননি আর লরেন্স অলিভিয়ার স্বাস্থ্যগত কারনে রাজি ছিলেন না। অথচ বিকল্প অভিনেতা ও পরিচালক এই এক ছবির জন্যই কিংবদন্তী হয়ে আছেন।
৫। টোকিও স্টোরি: জাপানি ছবি টোকিও স্টোরির পরিচালক ইয়াসুজিরো অজু। মুক্তি পায় ১৯৫৩ সালে। দুই বাবা-মার ছবি। পারিবারিক সম্পর্কের ছবি। গ্রাম থেকে তারা টোকিও আসেন দুই বৃদ্ধ বাবা-মা। ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে সময় কাটানোই উদ্দেশ্য। কিন্তু অতিব্যস্ত ছেলে-মেয়েরা সময় দিতে পারে না তাদের বাবা-মাকে।
৬। ২০০১: এ স্পেস অডিসি: সেরা ছবির তালিকায় স্ট্যানলি কুবরিককে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। বৈজ্ঞানিক কল্পবাহিনী ভিত্তিক এই ছবি মুক্তি পায় ১৯৬৮ সালে। আর্থার সি কার্কের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি এই ছবি। ছবির বড় সম্পদ এই বিন্যাস ও স্পেশাল এফেক্টস। যে কোন সেরা ছবির তালিকায় থাকবেই এই ছবির নাম।
৭। ব্যাটেলশিপ পটেমকিন: রাশিয়ার ছবি, পরিচালক সার্গেই আইজেনস্টাইন। ১৯২৫ সালের মুক্তি পায় এই নির্বাক ছবিটি। ১৯০৫ সালের গৌরাবাজ্জল সময়ের কাহিনী নিয়ে ছবি। জারের সময়ে যুদ্ধজাহাজে বিদ্রোহের কাহিনী নিয়ে এই ছবি। বিপ্লবের প্রোপোগান্ডামূলক এই ছবিটি বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ ছিল। নাজি জার্মানিতেও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ২০০৪ সালের ছবিটি ডিভিডিতে মুক্তি দেওয়া হলে এখন সবাই দেখতে পারছেন এটি।
৮। সানরাইজ: নির্বাক যুগের আরেকটি ছবি, মুক্তি পায় ১৯২৭ সালে। জার্মানির পরিচালক এফ ডব্লিউ মুরনাউয়ের ছবি সানরাইজ। এই ছবির আরেকটি নাম আছে-সানরাইজ: এ সং অব দু হিউম্যানস। এক বিবাহিত কৃষকের গল্প, যে প্রেমে পড়ে শহরের এক ধনী নারীর। সেই নারী বৃদ্ধি দেয় বউকে মেরে ফেলার। সানরাইজকেই নির্বাক যুগের সেরা ছবি বলা হয়।
৯। ৮ ১/২: ইতালির ছবি, মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬৩ সালে। ফেদেরিক ফেলিনির এই ছবি সমালোচকদের অত্যন্ত প্রিয় একটি ছবি। এক পরিচালকের কাহিনী যিনি আর ছবি করতে পারছেন না। ছবি করতে না পারার বেদনা নিয়ে এই ছবি, যাকে বলা যায় ডিরেক্টর ব্লক।
১০। সিঙ্গিং ইন দ্য রেইন: বাজি ধরে বলা যায় এই ছবিটা দেখা শুরু করলেই মুখে ছোট্ট একটা হাসি চলে আসবে এবং ছবি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই হাসি একবারও মুছে যাবে না। নাচে-গানে ভরপুর ছবি মানেই চোখে ভাসে বাংলা ও হিন্দি কিছু ছবি। এক সময় হলিউডেও এই জাতীয় ছবি খুব হতো। তবে এই ঘরানার ছবির মধ্যে সেরা সিঙ্গিং ইন দ্য রুম।
ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৫২ সালে। বিষয়- নির্বাক যুগ থেকে সবাক যুগে হলিউডি ছবির প্রবেশ। এই বিষয়টিই এতো অসাধারণভাবে প্রকাশ আর কোনো ছবিতেই এতো ভালো ভাবে হয়নি। শেষ দিকের পরিবেশনা ব্রডওয়ে মেলোডি ব্যালে- চোখে লেগে থাকার মতো।