পেছনে ফিরে তাকালে আমি সবার প্রথমে যে ঈদটার কথা স্মরন করতে পারি সেই ঈদটায় আমি পরেছিলাম আমব্রেলা কাট নীলচে বলবল রং একটা জামা এবং জামাটা বানিয়ে দিয়েছিলেন আমার মা নিজে হাতে সেলাই করে। সেটা যে আমার কি ভীষন প্রিয় জামা ছিলো ঠিক যেন আমার গল্পের বই এর লাল দোলাই যে লাল রং ঘোমটা দেওয়া একটা জামা পরে থাকতো সারাক্ষন আর তাই সবাই তাকে ডাকতো লালদোলাই নামে সেই জামাটার মতই। পরে জেনেছিলাম ইংলিশ বই এ সেই লাল দোলাই রেড রাইডিং হুড।
যাইহোক আমি সেই জামা পরে সারাদিন ঘুরলাম টই টই পাড়ার সকল ছেলেমেয়েদের সাথে। তখন এটাই ছিলো নিয়ম। বাচ্চারা দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি যাবে। তাদেরকে দেওয়া হবে মিষ্টি সেমাই, পায়েস, জর্দা এই প্রায় একই রকম খাবার সব বাড়িতেই। কেউ তখনও নিত্য নতুন খানা পিনার প্রতিযোগীতায় নামেনি। সবার বাড়িতেই একই মেন্যু। তবুও একেক বাড়ির খাবারে একেক স্বাদ। কিছু কিছু বাড়িতে থাকতো ডিমের হালুয়া বা পুডিং। আহা কি আনন্দ! ঈদের দিনে আনন্দ করতেই হবে এমনই নিয়ম। তাই আনন্দ উপচে পড়তো, উড়ে উড়ে এসে পড়তো আমাদের গায়ে।
ঈদের সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে ছিলো এক নতুন রকম ভোর। মাইকে ভেসে আসছে ঈদের নামাজে ঈদগাহে যাবার ডাক। রান্নাঘর হতে পোলাও ঘি এলাচের এর গন্ধ! হাতে গতরাতে বা ২৭ রমজানে লাগানো মেহেদী। যার গোবর গোবর ঘ্রান তখনও বিরাজমান। কখনও হতের মধ্যিখানে শুধু একটা এতবড় গোল্লা বা কখনও কাঠি দিয়ে নক্সা করে দিত পাড়ার বা বাড়ির কানিজ বড় বোনেরাই। আর কোনো কোনো ছেলেদেরও মাঝে মাঝে শখ হত আর তাই হাতের কেনি আঙ্গুলের নখে তারা লাগাতো মেহেদী একটু বোনদের কাছে চেয়ে নিয়েই। মেহেদী কোন বা টিউব দেখিনি আমি আমাদের ছোটবেলায়। সব মেহেদি পাতা পাটায় বাঁটা হত। তাও পাটার উল্টো দিক দিয়ে। সেই পাটা ঘসা হত বরই না পেয়ারা কোন এক পাতায়। সকালেই সেদিন গোসল করতেই হবে। এটাই নিয়ম। গোসল মানে শ্যাম্পু দিয়ে গোসল। অন্য সময়গুলোতে অধিকাংশ সময় তেল দিয়ে চুল বেনী করে স্কুলে যেতে হত। এখনকার বাচ্চাদের মত শ্যাম্পু চুল ফুরফুরা করে স্কুলে যাবার রীতি ছিলো না বলতে গেলে।
ঈদের দিন সব স্পেশাল সেদিন শ্যাম্পু দেওয়া যাবে, হাতে নেইলপলিশ লাগানো যাবে। ফেসপাউডার বুলানো যাবে গালে, মাঝে মাঝে একটু হাল্কা রঙ লিপিস্টিক বা ছোট্ট একটা টিপ কপালের মধ্যখানে। এসব সেজেগুজে ঈদের নতুন জুতো পরে সারাদিন পাড়া বেড়িয়ে পায়ে ফোসকা নিয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে ক্লান্তিতে ভেঙ্গে পড়তো শরীর। তখন হত আনন্দমেলা। ঈদের বিশেষ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান তারপর এলো ইত্যাদি। সে সব দেখার আর উপায় থাকতো না সারাদিন ঘুরে ঘুরে টায়ার্ড হয়ে।
ঈদের দিন মায়েদের বেড়ানোর রেওয়াজ ছিলো না। শুধুই বাচ্চারা আর বড়োরা বেরোবে এমনই বুঝি ছিলো নিয়ম। মায়েরা বের হতেন পরদিন। নতুন শাড়ি হলেও গয়নাগুলো বের হত পুরোনোগুলোই বেশিভাগই। সেসব আমাদের মায়েরা পরতেন বছরের পর বছর ধরে। তবুও কত সুখে ছিলো সবাই......আর এখন কত শত নিত্য নতুন জামা কাপড় গয়না গাটির ভীড়ে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। তবও কোথায় সেই মায়া, কোথায় সেই ঈদের আমেজ!!
হ্যাঁ সব কিছু বদলায় ঈদের ধরন ধারণও বদলেছে ঠিকই তবুও ঈদ মানেই ঈদই!!!আমাদের এই সামুর ঈদেই কত শত পরিবর্তন!!! আজ এই ২০/২৫ জনের সক্রিয় ব্লগারদের কাছে জানতে ইচ্ছে করে তাদের জীবনের স্মরনীয় ঈদের ক্ষনটির কথা। জানি সবাই আজকে অনেক বেশি ব্যস্ত পরিবার পরিজন কেনাকাটা রান্না বান্না নিয়ে। তবুও ছুটির অবসরে একটু খানি সময় পেলে নিশ্চয় ঢু মেরে যাবেই এই আমাদের প্রিয় ব্লগে!
সবার জন্য ঈদের শুভেচ্ছা! সবাই যদি আর একটাবার ফিরে যেতে পারতাম আমাদের সেই সোনালী ছেলেবেলার ঈদগুলোতে!!!! কেউ বলুক না বলুক আমি চুপি চুপি বলে যাই আমার এক অতি স্মরনীয় ঈদের অতি গোপনীয় গোপন কথাটি। তখন ঠিক ছেলেবেলা না কৈশোর পেরুচ্ছি। সামনে এস এস সি। খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে উঠে আমাদের বাড়ির সামনে সবুজ লনে হাঁটাহাটি ছিলো আমার প্রিয় অভ্যাস। সামনের গেট প্রাচীরে ছিলো লোহার কারুকাজ। যার ফোকল গলে দেখা যায় বাহির এবং ভেতরের দৃশ্য। এক বালক প্রেমী সেই ভোর সকালেই গেইটের ফোকল গলে টুপ করে ফেলে দিয়ে গেলো এক গোলাপী এনভেলপ! এদিক ওদিক চেয়ে আমি লুকিয়ে ফেললাম জামার নীচে। সোজা দৌড়ে বাথরুমে ঢুকে ( সবচেয়ে নিরাপদ স্থান) সবার অগোচরে এনভেলপের মুখটা খুলতেই বেরিয়ে এলো অপূর্ব সুন্দর গোলাপী ঝাঁড়ের গোলাপফুলফুল মিউজিকাল ঈদ কার্ড।
আমি মুগ্ধ! ঈদের সেই সকালটা ভরে উঠলো এক ঝাঁড় গোলাপ ফুলের সুঘ্রানে!!! সারাদিন লুকিয়ে রাখলাম সেই কার্ড একটু পরে পরে পড়ার টেবিলের খাতার ভাঁজ খুলে লুকিয়ে লুকিে দেখি আর মনে মনে একা একাই হাসি। কই থেকে যেন মায়ের নজরে পড়ে গেলো শেষমেষ! তীরে এসে তরী ডুবে গেলো!
তখন প্রায় রাত ১০ টা ঈদের দিনের অতিথি বিদায় নিয়েছে কিছু আগে। মা কই থেকে এসে টেনে বের করলেন খাতার ভাঁজ থেকে সেই ঈদকার্ড!!! বিষম চোখ পাকিয়ে বললেন, ডুবে ডুবে জল খাও ভাবো শিবের বাবাও টের পান না না!!!!!!!! বল কই থেকে পেলি এই কার্ড ! বল বল বল !!!!!!
আমার চারিদিক থেকে গোলাপ ফুলের সুবাস কোথয় মিলিয়ে গেলো! আহা সুবাস সকলি সুবাস বিষাদে পরিনত হইয়া টপটপ জলধারার ন্যায় ঝরিতে লাগিলো!!!

আহা ঈদ কার্ড !!! আজও আমার স্কুলের বাচ্চারা নিজেদের ক্রিয়েটিভিটি দিয়ে বানিয়ে দেয় ঈদ কার্ড, কলিগেরা দেয় নানা রঙ্গের নানা ঢঙ্গের ঈদকার্ড কিন্তু সেই গোলাপী ফুলের গোলাপ ঝাঁড় ঈদ কার্ডটার জন্য মনে কাঁদে কিন্তু ঠিক তেমনটি কেউ নিয়ে আসে না আর কোনো বরষায়......