পত্রলিখন বা চিঠি লিখা। মানুষের যোগাযোগ বা তথ্য আদান প্রদানের অতি পুরাতন এবং এক সময়কার বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি। কোন এককালে চিঠি দেওয়া বা চিঠি পাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ এক বিষয় ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে আজ সেই চিঠি আদান প্রদানের প্রথা নেই বললেই চলে। আমাদের এখন আছে টেলিফোন, মোবাইল, ফ্যাক্স, ই-মেইল, ইন্টারনেট। কি দরকার সেই মান্ধাত্তার আমলের পদ্ধতির।
যুগের পর যুগ পরিবর্তিত হবে। মানুষ পুরাতনকে বাদ দিয়ে নতুনকে গ্রহণ করবে। এটাই স্বাভাবিক। নতুন পদ্ধতিগুলো অনেক দ্রুত আর সহজ। কেন আর সেই চিঠি লিখালিখি করা। ওটাকে বাদ দেই। দিলামও না হয়। কিন্তু তাতে কিছু যেন হারিয়ে যায়। বিজ্ঞান আমাদের অনেক কাজ সহজ করে দিয়েছে। অনেক দ্রুত আমরা একজন আরেক জনের সাথে যোগাযোগ করতে পারছি, কথা বলতে পারছি, লিখে পাঠাতে পারছি, ছবি পাঠাতে পারছি, এমনকি গান, চলচ্চিত্র সব। কিন্তু বিজ্ঞান কিছু জিনিস আমাদের থেকে কেড়ে নিয়েছে। যেমন, অজানা আশংকা আর বিস্মিত হওয়ার ব্যাপারগুলো। চিঠি আসলে মানুষ আগ্রহী হয়ে যেত, কে লিখেছে, কী লিখেছে। না জানি কী লিখা ওর মধ্যে। ভয় আর আনন্দ এক সাথে কাজ করতো। এক একটি চিঠি এক একটি গুপ্তধন যেন। সবার আগ্রহ সেখানেই। কী আছে এর মধ্যে। কোন ভাল সংবাদ, নাকি কোন খারাপ খবর? এই যে ব্যাপার গুলো, খুব বড় কোন ঘটনা না। কিন্তু মানুষের মনের আনন্দ আর ভয়ের যে মিশ্রণ, এটা মোবাইল বা ইন্টারনেটে পাওয়াই যায় না। আমাদের বিস্মিত হওয়ার ব্যাপারগুলো আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। হয়তো আমরা এক সময় বিস্মিত হওয়া ভুলে যাব।
কেউ হয়তো বলতে পারেন, তুই তো এ যুগের এক বাচ্চা ছেলে, তুই নিজেই সারাদিন নেটে বসে থাকিস। তুই কী বুঝবি চিঠির মর্ম ! আসলেই তো, আমি কিভাবে বুঝবো? আমি আমরা যে যুগে বড় হলাম বা হচ্ছি তা তো Technology এর যুগ। আমরা ছোট থাকতেই বাসায় ফোনের লাইন। চিঠির কী দরকার ! আসলেই আমরা চিঠির যুগটাকে পাইনি। তবে খুব ছোট থাকতে মনে হয় একটু পেয়েছিলাম। তখনো বাসায় টেলিফোন আসেনি। কম্পিউটার কখনো সামনে থেকে দেখিনি। আর ইন্টারনেটের নামও জানতাম না। নানার বাসায় থাকতাম। তখন দেখতাম চিঠির মূল্য। বাসায় ডাক পিয়ন আসা মানে বিশাল ব্যাপার। কী এসেছে, কোথা থেকে এসেছে, কে পাঠালো, কী পাঠালো, নানান প্রশ্ন নানা, খালা আর মায়ের কাছে। দেখা যেত বিদেশ থেকে বড়খালা বা ছোটমামা চিঠি লিখেছেন। তাদের সাথে যোগাযোগ বলতে কয়েক মাস (বা তারও বেশি) পরপর এই চিঠি। বিদেশি চিঠি, বিস্ময়কর এক বস্তু। আমাদের ছোটদের ধরা নিষেধ। বড়দের সেই একপাতা দু’পাতা নিয়ে বিশাল গবেষণা। আর সেটা থাকতো গল্পের আসরের মূল বিষয়বস্তু। কে লিখেছে, কী লিখেছে, কেমন আছে ইত্যাদি, ইত্যাদি। আর এখন ! ফেসবুক আর ইন্টারনেট তো এখন সবার ঘরে ঘরে। Online এ তো সবাইকেই পাওয়া যায়। কেউ যত দূরেই থাকুক না কেন, তার সাথে যোগাযোগ করা কোন ব্যাপারই না। এতো সহজ হএয়ার কারণে এখন আর জিজ্ঞেস করা হয় না কেমন আছো, কী করছো, কী দিয়া ভাত খাইছো ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই চিঠি লিখার পিছনে হঠাৎ কেন পড়লাম তা এক মজার ব্যাপার (সাথে লজ্জারও)। এক জায়গায় লিখেছে এতো নম্বর জিপিও বক্সে চিঠি পাঠাতে হবে। তখন মনে হলো, আরে আমি তো কখনো কোন চিঠি লিখি নি। জীবনে কোন চিঠি পোস্ট করিনি। এমনকি পোস্ট অফিসে যাওয়ারও দরকার পড়ে নি। আমার জীবন যদিও বেশি দিনের না, তারপরও এই ক্ষুদ্র জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ থেকে গিয়েছে। আমি কাউকে কোনদিন চিঠি পাঠাই নি, কেউ আমাকে কোনদিন পাঠায় নি। ভেবে দেখলাম, শুধু আমি না, আমার আশে-পাশের অনেকের জীবন থেকে চিঠি লিখার বিষয়টি হারিয়ে গিয়েছে। সবার কাছেই মোবাইল আছে, শহর থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত। কী দরকার কাগজ আর কালি নষ্ট করার।
চিঠি যে একদম লিখিনি তা কিন্তু না। স্কুল আর কলেজে থাকতে পরীক্ষা পাশের জন্য চিঠি লিখতে হতো। বই কিনার নিমিত্তে টাকা চাহিয়া পিতার নিকট পুত্রের পত্র অথবা বন্ধুর নিকট স্মরণীয় ঘটনার বর্ণনা দিয়া পত্র – এই টাইপ। বাস্তবে এই রকম চিঠি আদৌ লিখা হতো কিনা বা লিখলে এর পরিণতি কী হবে তা জানি না। তবে পরীক্ষায় দশে যে পাঁচ পাওয়া যাবে তা নির্দ্বিধায় বলতে পারি।
চিঠি নিয়ে অনেক সাহিত্য আছে। আবার অনেক সাহিত্যের মাঝে চিঠির বর্ণনা আছে। বিখ্যাত ব্যক্তিদের চিঠির সংকলন বের হয়। আমরা ওইগুলো বইমেলা থেকে কিনে পড়ি। আবার বিখ্যাত সব চিঠির নিলাম হয়। একেকটার দাম লাখ টাকা, কোটি টাকা উঠে। আফসোস, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। কারণ আমরা চিঠি লিখি না। ভবিষ্যতে চিঠির সাহিত্যরস আস্বাদন বা নিলামে তুলে আয় করার সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত। তবে ই-মেইল বা এস.এম.এস. এর ব্যাপারটা মাথায় রাখা যেতে পারে।
চিঠির একটি গুরুত্বপূর্ণ ( ! ) প্রকারভেদ, প্রেমপত্র। সবাই নাকি একটা বয়সে তা লিখে। বড় বড় রুই-কাতলা থেকে শুরু করে মলা-ঢেলা সবাই। দুঃখের বিষয় আমার জীবনে এই চ্যাপ্টার এখনো শুরু হয় নি। আর হবে কিনা সন্দেহ। কারণ, একেতো লিখার মতো কেউ নেই। আর দুই, এই একবিংশ শতাব্দীতে কোন নারী জাতিকে সম্বোধন করে কাগজ কলমে চিঠি লিখলে তিনি বলে উঠতে পারেন, “খেত কোথাকার ! এই কালে কি কেউ চিঠি লিখে? কই থিকা উঠে আসছো? যাও এখান থেকে, দূরে গিয়া মরো।” অবশ্য আমি চিঠি লিখলে ওটা আমাকে নিজে গিয়ে পড়ে দিয়ে আসতে হবে। যারা আমার হাতের লিখা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল বা আমার হাতের লিখা দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন তারা এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত হবেন।
এই প্যারার শিরোনাম, আমার প্রথম চিঠি পোস্ট করার অভিজ্ঞতা। নতুন অভিজ্ঞতা মানুষের জন্য আনন্দদায়ক অথবা বেদনাদায়ক হয়। আমার জন্য এই অভিজ্ঞতা আনন্দদায়ক, আবার কিছুটা বিব্রতকর। সকালবেলা বের হলাম চিঠি আর খাম নিয়ে (ভয় পাবেন না, চিঠিটা কম্পিউটারে প্রিন্ট আউট করা, এমনকি খামের উপরের ঠিকানাও)। প্রথম সমস্যা, আমি তো আমার এলাকার পোস্ট অফিস চিনি না। চিনবো কিভাবে, কোন দিন যে দরকারই পড়েনি। কাউকে জিজ্ঞেস করতেও লজ্জা লাগে। তবে এটুকু জানি কোন এলাকায় পোস্ট অফিস আছে। গেলাম সেখানে। কিন্তু পোস্ট অফিসের কোন নাম-গন্ধ নেই। নিজে নিজে খুঁজতে লাগলাম। রোদে হাঁটছি, তবে ভালই লাগছে। নতুন একটা জিনিস খুঁজে বের করবো, আমার কাছে তো গুপ্তধন খোঁজার মতো বিশাল অ্যাডভেঞ্চার। কিন্তু কাংখিত গুপ্তধন তো আর পাওয়া যায় না। এক দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম। সে বললো ওমুক জায়গার তিনতলায়। গেলাম। কোথায় পোস্ট অফিস ! কিছুই তো নেই। আরেক জনকে জিজ্ঞেস করলাম। এই এলাকার পোস্ট অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দুঃখের ব্যাপার, আমার আর আমাদের পোস্ট অফিস দেখা হলো না। সুখের ব্যাপার, আমার মতো অনেকেই এই খবর জানে না। কেউ চিঠি লিখে না, তাই পোস্ট অফিস বন্ধ করে দিয়েছে। একেবারে সরল সমীকরণ।
কি আর করা ! কষ্ট করে আরেক পোস্ট অফিসে গেলাম। পোস্ট অফিসটা বড়সড়ই। আগেও তার সামনে দিয়ে অনেকবার আসা-যাওয়া হয়েছে। কিন্তু ভিতরে ঢোকা হয়নি। সেদিনই প্রথম ঢুকলাম। ঢুকে মনে হলো সময় যেন একশ-দেড়শো বছর পিছিয়ে গিয়েছে। অফিসের দীন-হীন অবস্থা। গ্রাহক বা যারা চিঠি পোস্ট করতে আসেন তাদের জন্য বসার তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। শুধু একপাশে দেখলাম তিনটে চেয়ার। আরেক পাশে অনেক দূরে উঁচু এক টেবিল রাখা। আর কোন কিছু নেই। সামনের পুরো প্লেসটা খালি। পিছনে অফিসের এ’মাথা থেকে ও’মাথা পর্যন্ত ব্যাংকের মতো লম্বা করে কাউন্টার বসানো। কাউন্টারের ওপাশে কিছু লোক কাজ করছেন। পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য নাকি আমার বোঝার ভুল জানি না, লোকগুলোকেও আমার সেই পুরনো আমলের মতো লাগলো। সময়ের সাথে সাথে যেমন পোস্ট অফিস বদলায় নি, তেমনি যেন পোস্ট অফিসের লোকগুলোও বদলায় নি। তবে যার কাছে খামটা দিয়েছিলাম, সেই বৃদ্ধ লোকটার ব্যবহার ভাল লাগল। ভাল ব্যবহারের সবাইকে শ্রদ্ধা করি। চিঠি পোস্ট করলাম। চিঠির ওজন নেওয়া হলো। আমাকে ছয় টাকা দিতে হলো। আমার চিঠি আরও কিছু চিঠির সাথে রাখা হলো। আমার আগে দুজন মহিলা চিঠি পোস্ট করে গেলেন। যাক, কিছু লোক এখনো চিঠি লিখে এবং পোস্ট অফিসে এসে পোস্টও করেন।
আমার জীবনের প্রথম চিঠি পোস্ট করে বের হয়ে আসলাম। ঢোকার সময় খেয়াল করি নি, বের হওয়ার সময় দেখলাম পোস্ট অফিসের গেটের পাশে তিনটে পোস্ট বক্স। তিনটার রং ভিন্ন ভিন্ন, ট্রাফিক লাইটের মতো। তিনটাতে চিঠি মনে হয় তিন জায়গায় যায়। কোনটা কোথায় যায় জানি না। তার পাশে দেখলাম এক লোক বিভিন্ন সাইজের খাম বিক্রি করছে। সাথে আরো কিছু আছে। খামগুলো দেখে মনে হলো কিছু একটা যেন বাদ রয়ে গিয়েছে। ওহ্, তখন মনে পড়লো চিঠি আর খাম শব্দ দুটোর সাথে আরেকটা শব্দ প্রায়ই শোনা যায়। “ডাকটিকেট।”
ডাকটিকেট বা স্ট্যাম্প। ভুলেই গিয়েছিলাম ওটার কথা। একসময় ডাকটিকেটের নেশা ছিল। ডাকটিকেট জমাতাম। কোন চিঠি বিদেশ থেকে আসলেই প্রথম লক্ষ্য থাকতো ওটার ডাকটিকেট। কে নিবে ওই ডাকটিকেট তা নিয়ে প্রতিযোগিতা হতো কাজিনদের মধ্যে। ডাকটিকেট ছিল অন্য একটি দেশ সম্পর্কে জানার একটা উপায়। এখন অবশ্য সেই অবস্থা নেই। কোন দেশ সম্পর্কে জানতে চাও? Google এ যাও, টাইপ করো আর Enter দাও। ব্যস, হয়ে গেল। পুরো দেশটা তোমার সামনে।
আমার একটা স্ট্যাম্প কালেকশন ছিল। ঠিক আমার না, আমার ছোট মামার। পরে আমার হয়ে গিয়েছিল। ডাকটিকেট বেশির ভাগই ছোট মামার জমানো, আমিও কিছু যোগ করেছিলাম। এখনো আছে সেই ডাকটিকেটের খাতাটা। বাসায় এসে খুঁজে বের করলাম খাতাটা। বুক শেলফের পিছনে কোন এক কোণায় ছিল খাতাটা। ৮-১০ বছর কারো হাত পড়েনি এর উপর। বেশি না, আঁটত্রিশটা দেশের মোট দুশ আটাশ টা ডাকটিকেট আছে। সংখ্যাটা বাড়ার আর কোন সুযোগ নেই।
লেখাটা মনে হয় অনেক বড় করে ফেলেছি। কোথায় শুরু করেছিলাম আর কোন দিক দিয়ে গিয়ে কোথায় যে আসলাম ঠিক বুঝতে পারছি না। আরেকটু লিখেই শেষ করে দিচ্ছি। অনেক গল্প-উপন্যাস পড়েছি চিঠি, পোস্ট অফিস, পোস্ট মাস্টার, পোস্টম্যান নিয়ে। আরো ছিল ডাক হরকরা বা রানার। সেই সাহসী রানার, রাতের বেলা একহাতে বর্শা, আরেক হাতে হারিকেন, কাঁধে চিঠির ব্যাগ নিয়ে একলা মাইলের পর মাইল পাড়ি দিত। আজকাল সেই রানার আছে কিনা জানি না। বোধহয় নেই। কালের বিবর্তনে তারা হারিয়ে গিয়েছে। এখন আর তাদের দরকারও নেই। ভবিষ্যতে হয়তো আরো কিছু হারিয়ে যাবে। কিংবা দেখা যেতে পারে নতুন প্রযুক্তি কাছে হার মেনে মোবাইল, ইন্টারনেটও অতীত হয়ে যাবে। এরকম অতীতেও হয়েছে, বর্তমানে হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। তবে কিছু জিনিস আমরা ধরে রাখতে চাই। অন্তত আমরা দেখাতে পারবো আমাদের পূর্বে যারা ছিলেন তারা কী করে গিয়েছেন, কেমন ছিল তাদের জীবন-ধারা। আমরা নতুনকে গ্রহণ করবো তবে পুরাতনকে ফেলে দেব না।
মার্চ ৩১, ২০১০।
১. ০১ লা এপ্রিল, ২০১০ রাত ৯:৩৮ ০