বিএনপি'র আমলে ক্রস ফায়ার চালু করা হয়েছিল দাগী সন্ত্রাসীদেররা যা'তে আইনের দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগ নিয়ে জেল-হাজত থেকে বেড়িয়ে এসে আবার সন্ত্রাসী কার্যকলাপে লিপ্ত হতে না-পারে। শুরুতে অধিকাংশ জনগণ এর পক্ষে ছিল কারণ ক্রস ফায়ার প্রকৃতপক্ষেই কেবলমাত্র "মারাত্মক সন্ত্রাসী" হিসেবে চিহ্নিত কতিপয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়েছিল। তবে সমাজবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে আমি শুরু থেকেই এর বিরুদ্ধে ছিলাম। কারণ, অপরাধী যত জঘন্য অপরাধই করুক না কেন, বিচারকের আদালতে তার নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করার অধিকার পৃথিবীর সকল সমাজে স্বীকৃত, তা সে নামকাওয়াস্তে আদালত হলেও। অসংখ্য মারাত্মক অপরাধ করার কারণে আদালত অপরাধীকে হাজার বছর জেল, অগণিত ফাঁসীর আদেশ দিলেও তাকে "বিনা বিচারে" হত্যা করার অধিকার নিজে নেয়নি, কোন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে দেওয়া ত' দূরের কথা!
আমার এই লেখাটা তাদেরকে উদ্দেশ্য করে লেখা যারা বর্তমানে ক্রস ফায়ারের পক্ষে ব্লগের পর ব্লগ লিখে চলেছেন। ভাই, আল্লাহ প্রদত্ত (যদি বিশ্বাস করে থাকেন) অথবা প্রকৃতি প্রদত্ত (নাস্তিক/নিধার্মিকরা) যে বিবেকবোধ আপনার আছে, তাকে একবার জিজ্ঞাসা করে দেখুন ত' "বিনা বিচারে হত্যা" করার কোন বিধান কোথাও আছে কি না, এমনকি অপরাধটা যদি নিরপরাধ মানুষকে খুনও হয়ে থাকে?
- এরশাদ শিকদারকে কি বিনাবিচারে হত্যা করা হয়েছিল?
- যে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে একাধিক খুন এবং ধর্ষণের অপরাধ আদালতে প্রমাণ হয়েছে, তাকে কি "বিনা বিচারে" ফাঁসীতে ঝুলানো হয়েছে?
এইসব চিহ্নিত অপরাধীদেরকে যদি আদালতে নিয়ে প্রচলিত প্রক্রিয়া আনুসরণ করে তারপর শাস্তি দেওয়া হতে পারে, তাহলে এখন যারা বোমা-হামলা করে নিরপরাধ মানুষ পোড়াচ্ছে ও হত্যা করছে, তাদেরকে আদালতে নিতে সমস্যা কোথায়? দেশের আদালত কি নাই হয়ে গেছে?
আসলে অপরাধীর সাজা নয়, আপনারা ক্রস ফায়ারকে সমর্থন করছেন কারণ এটা আপনাদের অপছন্দের রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের হত্যা করতে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে। অর্থ্যাৎ, আপনারা বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক খুনকে সমর্থন করছেন!
আর পুলিশ কেন এত উৎসাহী ক্রস ফায়ারে? শুধুই কি অপরাধ দমন, নাকি অন্য ধান্দাও আছ? দেশব্যাপী চরম আতঙ্ক তৈরী করে পুলিশ যে এখন লাখে লাখে গ্রেফতার-বানিজ্য শুরু করেছে, সেইটা খেয়াল করেছেন তো? আজকের প্রথম আলো দেখেন ক্রস ফায়ার ও পুলিশের গ্রেফতার বানিজ্য । এভাবে যে এক দুইজন করে কত মানুষ পুলিশের হাতে "খুন" হচ্ছে সেই হিসাবটাও বিবেচনায় রাখবেন যখন ক্রস ফায়ারের সাফাই গাইবেন।
বোমা মেরে, পুড়িয়ে মানুষ হত্যা নিঃসন্দেহে জঘন্য অপরাধ; এর শাস্তিও হওয়া উচিত কঠোরতম; কিন্তু সেইটা হতে হবে আদালতে, সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যেন একজন নিরপরাধ ব্যক্তিও অভিযুক্ত না-হয়। তাছাড়া কাউকে ক্রস ফায়ারে হত্যার আগে পুলিশ যদি এতোই নিশ্চিত হয় যে ধৃত-ব্যক্তি সত্যিই বোমা হামলা করেছে, তাহলে সরাসড়ি আদালতে দাখিল করলেই ত' ঝামেলা শেষ হয়ে যায়; হত্যার শাস্তি মৃত্যদন্ড ত' আছে; আছে দ্রুত বিচার আইন।
ভাই, জীবনের জন্য রাজনীতি, রাজনীতির জন্য জীবন নয়। এই কথাটা কেন যে আমাদের মনে থাকেনা!
বিএনপি বলি, জামাত বলি, আর আওয়ামীলীগই বলি, কেইই জীবনের থেকে বেশি দামী নয়। আপনারা যারা ক্রস ফায়ারকে সমর্থন করছেন, তাদের কাছে হয়তো একটা 'যুদ্ধাপরাধী/পাকিস্তানের দোসর' (জামাত-শিবির) অথবা জামাতের আশ্রয়দাতা বিএনপি'র কর্মী সমর্থক নিহত হলো, কিন্তু এরা আমাদেরই কারো কারো সন্তান, ভাই, বন্ধু। ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থে অন্ধ হয়ে যে অপরাধ সরকার করে চলেছে, তা' কিন্তু ১৯৭১ এর মানবতাবিরোধী অপরাধের চেয়ে কম কিছু নয়!
সব থেকে বড় কথা সভ্য মানুষ বিচার চায়, প্রচলিত আইনে যথাযথ বিচারের ব্যবস্থা না থাকলে আইন সংশোধন করে হলেও বিচার চায়। বিনা বিচারে হত্যা চায় না। শাহবাগ মাত্র সেদিনই এটা শিক্ষা দিল। মাত্র এক বছরের সেটা ভুলে গেলেন?
দল বলেন, দেশ বলেন, সবার আগে মানবতাবোধ। আলাদতে বিচারের অধিকার সেই মানবতাবোধেরই একটা দাবী। অবশ্য সেটা মানা না মানা ব্যক্তির পছন্দ। কারণ, মানবতাবোধ না থাকলে বা না-প্রয়োগ করলে মানুষের আদালতের কিছু করার নাই। কিন্তু আল্লাহর বা প্রকৃতির বিচার বলে একটা বিষয় অবশ্যই আছে, ক'দিন আগে বা পরে।
তাই দয়া করে মানবিক হোন, নিজের মনুষ্যত্বের কাছেই নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করুন, কোন দল বা ব্যক্তির কাছে নয়।