Click This Link
---------------------------------------------------------------------------
৩
কবিতা বিষয়ে আমার আগ্রহ প্রচুর।কবি বিষয়েও । সম্প্রতি ঢাকা সফর করে গেলেন কলকাতার বিশিষ্ট লেখক ভূমেন্দ্র গুহ। তাকে নিয়ে আড্ডায় মেতেছিলেন ঢাকার কবি- লেখক বন্ধুরা। সেই আড্ডা নিয়ে একটি চমৎকার লেখা প্রকাশিত হয়েছে বাংলামাটি ডট নেট এ । এপ্রিল ২০০৯ সংখ্যায়। লিখেছেন মারুফ রায়হান। ঢাকার কড়চা এর শেষাংশ টি এখানে তুলে দিচ্ছি।
....................ভূমেন্দ্র গুহ এক সময় থামলেন। আহবান জানালেন উপস্থিত সুধিমণ্ডলীর কাছে যদি কোনো জিজ্ঞাস্য থাকে তবে তার সদুত্তর দেয়ার চেষ্টা করবেন তিনি। শুরুতেই ফ্লোর নিলেন কবি ইকবাল আজিজ। কবিতা নয়, কবির ব্যক্তিজীবন নিয়ে প্রশ্ন করলেন। কবির মৃত্যু আত্মহত্যা কিনা। জীবনানন্দ দাশ কি জানতেন, তিনি কত বড় কবি? এই প্রশ্নের উত্তরে ভূমেন্দ্র গুহ বললেন- ‘হ্যাঁ। জানতেন তো বটেই! জীবনানন্দ দাশ কবিই ছিলেন, অন্য কিছু নয়। সৃষ্টি ও সৃজনকল্পনা ছাড়া আর অন্য কিছুর প্রতি তার মনোযোগ ছিল না। নিজের প্রতিভা নিয়ে তিনি ছিলেন সজাগ। জীবনান্দ দাশ জানতেন প্রকৃতি তার মধ্যে অনন্য সৃজনক্ষমতা দিয়েছে।’
স্ত্রী লাবণ্য দাশ সম্পর্কে অনেক কথাই বলা হলো। ‘লাবণ্য দাশ ছিলেন খুবই সুন্দরী। নিজের রূপসৌন্দর্য সম্পর্কে তিনি সব সময় সচেতন থাকতেন।’ জীবনানন্দ দাশ নাকি স্ত্রীর মৃত্যুকামনাও করেছেন। কারণ স্ত্রী মারা গেলে তাঁর লেখালেখি প্রতিবন্ধকতাহীন হবে।
আমরা আরো জানলাম, জীবনানন্দ দাশ উৎকৃষ্ট স্বামী ছিলেন না। উৎকৃষ্ট পিতাও ছিলেন না। কাব্য নিয়েই ছিল তার যত সাধনা। তিনি চাকরিহীন বা উপার্জনহীন থাকতেন প্রায়শই। সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতেন স্ত্রী লাবণ্য দাশ। আবার এটা জাহির করাও ছিল তাঁর স্বভাব।
পরে যে-ক’জন প্রশ্ন করলেন প্রত্যেকেই যেন কবির কবিতা এবং জীবনাবসান পরবর্তী তাঁর সাহিত্যপ্রাচুর্য বিষয়ক কৌতূহল বা জিজ্ঞাসা এড়িয়ে কবির ব্যক্তিগত/সাংসারিক জীবনের ভেতরেই ঘুরপাক খেতে লাগলেন (প্রশ্ন করেছিলেন আলী আহমদ, কাজী রোজী, মাহবুব তালুকদার, আনিসুল হক প্রমুখ)। ফলে খুব একটা সমৃদ্ধ হলো না জানা ও জানানোর এই আয়োজন।
ব্যক্তিগতভাবে আমাকে একটু ধসিয়েই দিয়ে গেলেন ভূমেন্দ্রবাবু। পৃথিবীর জন্যে যে-কবি সর্বক্ষণ ভাবিত ছিলেন তিনি নাকি বউকে খুন করার কথা ভাবতেন! মৃত্যুর আগে-আগে আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে চাকরির জন্য হত্যে দিয়ে পড়েছিলেন! বাইপোলার সিনড্রোমকেও স্বাক্ষী মানলেন ভূমেন্দ্রবাবু। তিনি যে ডাক্তার! এই মানসিক অসুখটা থাকলে নাকি ব্যক্তি একবার যান প্রতিভার চূড়োয়, অন্যবার রসাতলে! অসুখটা থাকায় জীবনানন্দ একবার এক মাসে একখানা ঢাউশ উপন্যাস লিখে ফেলেন, অন্যবার ট্রামের নিচে শরীর পেতে দেন! বাংলা কবিতার আদি শুদ্ধবাদী দেবতার সৃজনমেধার এমন একটি বিশ্লেষণ আমি মানি না। মানবো না। আমি জানি, জীবনানন্দের জীবনীকাররা জীবদ্দশাতেই মরে ভূত হয়ে যান। আর জীবনানন্দ বেঁচে থাকবেন মৃত্যুর এক কোটি বছর পরেও! জয়তু জীবনানন্দ।
আচ্ছা কবিরা কি খুনী হতে পারে ? কেন খুনী হতে চায়? আমার মানসে
এমন অনেক প্রশ্ন দানা বাঁধে। আমি পড়ে যাই তানভীর রাতুল এর
কবিতা ..........
অস্ত্র আর ছেলের তুলনা - নিজেরাই যখন মানুষ, বড় বড় কথা বলা উচ্চস্বর -চলে তখনি কেবল
দূরে এসে দেখ, যেখানে যেখানে ধাতবগুলির মৃতদেহ, ধাতুতে আবদ্ধ কাঠ, তারা যত ছোট কিম্বা বড়ই হোক না কেন, গাণিতিক ক্ষয় পড়ে আছে ঠিকঠাক
এই ভয় শুনতে কি যাওয়াই লাগে স্বপ্নের ভেতর
খাদ্য আর সুতার চাহিদা ছাড়িয়েও যে ইঁদুর কামড়ের বিলাস বসিয়ে দেয় আনাচেকানাচে, নেতা যেন সজাগ চোখেও বসে থাকা সেই দৃশ্য, যেখানে সেখানে, ব্যক্তির সতীর্থ সেই আচরণ
তাই শুধু স্বপ্নে ধাতুর প্রণয় দেখাই সহজ, গুলিবিদ্ধ অস্ত্র আর গাণিতিক ক্ষয় নামে খোলা চোখ যেসকল বস্তুগত বিষয় কুড়ায়...
( অন্ধগান/ তানভীর রাতুল )
কবিতা বিষয় কুড়াবার প্রান্তর কি না , তা নিয়েও মতপার্থক্য থাকতে পারে।
তবে কবিতা যে কালের সতীর্থ - সে সত্যই পরম।
৪
কবিতা কে পুনর্জনম দিতে পারেন কবিরাই। তারা চারা বুনে যান। সেই চারা থেকে গাছ হয়। গাছ আবার জন্ম দেয় বীজ। শিশুরা বীজ নিয়ে খেলা
করে। বয়স্করা তুলে রাখেন আবার মাটিতে পুঁতে দেবেন বলে।
এই ব্লগে যারা কবিতা লিখেন , তাদের মাঝে বেশ শাণিত দুটি বাহুর নাম
আন্দালীব। আমি তার কবিতার পাঠক দীর্ঘ দিনের । অন্য একটা কবিতা
ফোরামে আমি তার কবিতা পড়েছি নিয়মিত। পাঠ করা যাক তার একটা কবিতা......
মদের দোকানের নিচে
------------------------
মদের দোকানের নিচে সমবেত হতে হতে আমরা ভাবি -মেঘ সঞ্চিত হতে
কতোটা আর সময় নেয়! হ্যাংওভার থেকে যখন খুলে আসে দিগ্ভ্রান্তি,
নৈর্ঋত-বালকের দ্বিধা! নাচের-স্কুল থেকে সারবেঁধে বেরিয়ে আসে অসংখ্য
প্রমিত যন্ত্রের ময়ূর। বিদীর্ণ পেখম সবার। মদের দোকানের পাশে জর্জর একটা বালবের ফিলামেন্ট জ্বলে, ধী-রে, ফলে মাথাপিছু প্রতিজনের ছায়া তৈরী হয়। সেইখানে আমরা নিচুস্বরে কথা বলি, হাসি। সমুদ্রের ঢেউ এসে
আমাদের পায়ে' লাগে। দৃষ্টি ও চুম্বন বিনিময় শেষে বায়ুপ্রবাহের মতো আমরা দশদিকে চলে যাই।
(মদের দোকানের নিচে / আন্দালীব )
আমরা দৃষ্টি ও চুম্বন বিনিময়ের জন্য সমবেত হয়েছিলাম। যদি বলি , এই
বিশ্বগ্রহটিই একটি মদের দোকান তবে কি ভুল হবে ? না, হবে না।
আমরা তো যাবোই যার যার দিকে। দশ দিকে।
আহা ! দশদিক । আহা প্রমিত যন্ত্রের ময়ূর !!!!
আগেই বলেছি , আমি বিবর্তনে বিশ্বাসী। এবার একটা কবিতা আমি
আপনাদেরকে পড়াবো । দেখুন কবি কিভাবে এর ছন্দপ্রকরণের বিন্যাস
ঘটাবার প্রত্যয়ী হয়েছেন। কি বিগলিত চিত্তে তিনি বলেছেন , প্রঘাঢ় প্রেমপদাবলি।
এতো যে সরল মাঝি এতো যে সরল। তাদের বেদনা দেয় দালাল মোড়ল ।।এই যা সুবিধা তার শোষনে ভাষা। কিছুই বোঝে না সে মনে রাখে আশা ।।
ছেঁড়া জাল নিয়ে বসে পাল দিয়ে ঘর। তৈরী করেছে মাঝি পাতিলার চর ।। আবার গাঙে যাবে ঠিক হলে জাল। পাহাড়ের মত ঢেউ আঁকে মহাকাল।।
ছোট ছোট নাও গুলো লোক সাত আট। নৌকা যেন বা এক দোলনার খাট।। আকাশে মাছের ছবি বর্ষা এ কাল। বিষন খানকি মাগি মাঝি দেয় গাল ।।
দালাল বেপারি আর জোতদার শালা। জেলের জীবন ঘরে দিয়ে রাখে তালা ।। মাছের দামকে তারা কমায় ভারায়। এখনও তারাই প্রভূ জেলের পাড়ায়।।
জেলের জীবন তাই যেন গুটি পাশা। কিছুই বোঝে না সে মনে রাখে আশা ।। তাদের বেদনা দেয় দালাল মোড়ল। এতো যে সহজ মাঝি এতো যে সরল।।
( সরল মাঝি / ইমরান মাঝি )
এই কবিতায় সমাজচিত্র যেমন পুষ্ট , তার চেয়েও পরিপুষ্ট কবির সৃষ্টিদৃষ্টি।
আর তার বিশেষত্ব সেখানেই।
একজন কবিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য খুব বেশী কবিতার দরকার আছে বলে
আমি মনে করিনা। তবে কবিকে লিখে যেতে হয়। কারণ তিনি জানেন না,
কখন জন্ম নেবে তার শ্রেষ্ট কবিতাটি।
দৃশ্যকল্পে রঙিন রাংতা মোড়ানো একটি কবিতার প্রথমাংশ দিচ্ছি এখানে
.......
ফুলে ওঠা লাশ ভেসে আছি জলে-- এমত পঙ্ক অনুভূতি বিষ, কলম ডগায় নিয়ে বসে থাকা, শাদা শাদা পাতা, শাদা রয়ে যায়, পদ্মপাতায় বসে টলটল ধ্যান-- ধ্যান ও অস্থিরতা
টিলার পেছনে ধ্যানের প্রতিমা, সারি সারি জ্বলা শাল মহুয়ায় সূর্যের মতো-- লেখা আছে সব, ব্যাধিদের কথা। ব্যাধিতে ব্যাধিতে গোলকধাঁধায় পাক খায় মাথা, এতোটা মাতাল আর দিশেহারা আশ্রয় তার! জমাট পাথরে শায়িত রাত্রি ঘেমে নেয়ে উঠে, আচমন জ্বলে; অথচ দাঁড়াই ভিন্ন মুখের-- মুখোশ আড়ালে। উজানের রাত; বিবমিষা চোখ, চোখের পরতে খেলা করে নীল, লাল হলুদাভ বাতাবরণের ওপারে আকাশ নক্ষত্র কি আকাশ প্রদীপে-- ভুলো আনমনে তাকিয়ে শুধানো; ভুলে থাকো যারা, উত্তর দাও-- ‘‘কখনো কি কাঁদে জগতের নায়িকারা?”
(কবি / শিমুল সালাহ্উদ্দীন )
যাপনচিত্রের আড়ালে যে মন বাস করে , আমরা কি সেই জমাট পাথরটিকে
অস্বীকার করতে পারি ? না, পারি না।
একটি কবিতা তাই উজানের রাতকে আমাদের সামনে যেমন করে নিয়ে আসে,ভাটি পথে ভাসিয়ে নেয় মনের কান্নাকেও সমান ভাবে।
.....................( ক্রমশ

ছবি - জন হলমেস
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই মে, ২০০৯ ভোর ৪:৩৬