অভিশাপ
যখন সকল সম্পর্ক ছিন্ন তখন মায়া থাকে। এই মায়াই আমার সকল সংকট। আমার এই দশার জন্য দায়ী। সকল মুশকিল যাদের কদমবুচি ও দোয়ায় দূর হবার কথা তারা আমাকে জাত বেয়াদব বলে জানে। আমাকে খোদার কাটা বলে বলে খ্যাতিমান করে তোলে।
যা আমি হাস্তরও করি নাই, যার সাথে আমার কল্পনার জগতেরও কোনো সম্পর্ক নাই, সে-ই রকম অভিযোগের বলি প্রায়ই হতাম আমি। মার খেতাম। প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য কারণে। মারের ভয়ে কখনও কখনও গায়েব নিতাম। কুঁই-লুকান-লুকাই খেলায় কিংবা রুপ বদলের বহুরূপী, আঁতকা ডাকে কিংবা স্বরবদলের মত সব খেলা আমরা খেলতাম। সোন্দর দিন কাটাইতাম।
হঠাৎ বিপন্ন-বিপাক। কোথায় যেন, কীভাবে জানি না,কেউ কেউ শুনল, তালাক। গাছ তখনো মরে নাই। কাক আর কোকিল ঝাঁকে ঝাঁকে, কা কা, কুহু কুহু তালাক। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ… তালাক। বিশাল রোদন, বিলাপ আর সংঘবদ্ধ যুক্তির তোলাপাড়, তালাক যারা যারা শুনেছে, তাদের মাটির দিকে তাকানো, এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য। শ্রুতি কিংবা দর্শন সাক্ষির একমাত্র শর্ত নয়। সাক্ষি মানে মিথ্যা না বলার প্রতিশ্রুতি ও সকল কিছু বোধনের-বয়ানের ক্ষমতা ও সম্মতি।
অনেকেই বলল, তালাক হয়ে গেছে। এ বিষয়ে কোন দ্বিধা-দ্বন্ধ নাই। বিবি তালাকের সামাজিক দিক ধর্ম কীভাবে সামাজিকভাবে আত্মস্থকৃত হয়, কীভাবে শরীয়ার ব্যাখ্যা একেক ইসলামী সমাজের বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করে তার উৎকৃষ্ট নজির তালাক পরবর্তি সামাজিক বিশ্লেষণ। এই ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে। কারো কারো ভাষ্য, না এই তালাক হয় নাই। চন্দ্রমল্লিকা ভাণু নিশ্চুপ। তাঈন আর গলা চড়াচ্ছেন না। যদিও গলা চুলকানি থামাতে পারছেন না। নিঁচু স্বরে বললেন, বেঁচে গেলাম। তিনি কী আসলে বেঁচে গেলেন না কী বাঁচার লড়াইয়ের শপথ নিলেন বোঝা গেলো না। এর টীকা-ভাষ্য পরে পাওয়া যাবে।
তুই মানুষের জাত না। কুত্তার মত জিহ্বা কত লম্বা, লোল পড়ে… তুই আয়, এইমুখো আয়, মেরে ফেলবো। সারা জীবন জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাক খাক করেছিস। তোর মুখে পঁচা রোগ ধরবে। দেখ না, দেখ না, ভাদ্র মাসের কুত্তার মত দৌড়ায়। তুই আমার জীবন নষ্ট করেছিস। [চন্দ্রমল্লিকা ভাণু]
আকাশে মেঘ আছে। বৃষ্টিই থামাতে পারে এই ঝগড়া। দলে দলে মেঘ এসে পড়ে, আসমানি পিঁপড়া। বৃষস্কন্ধে বৃষ্টি, মহিশের পিঠে চড়ে মেঘ চরাচরে, ভাদ্র-আশ্বিনের আধপেটা খাওয়া গ্রামবাসী এই জোজাজুঝি, অবিরাম ঝগড়া দেখতেই থাকে। তালাকের উৎস বা কারণ বয়ান হচ্ছে এখন।
তোর এই ছেলে আমার না। তুই আমার দহন। তোর একশ প্রেম ছিলো। আমি বিয়ের রাতে টের পেয়েছি। তোর শরীরে অন্য ব্যাটার গন্ধ। ভোটকা গন্ধ। এতোদিন মানুষেরে জানাই নাই। তোর শরীরের বিষ, তোর মুখে বিষ। তুই কার কার সাথে শুয়েছিস, তার তালিকা দিলাম না। [স্বামী]
কিছু মেঘ সংঘবদ্ধ। কিছু মেঘের চুলছাড়া। কিছু মেঘ একা। বৃষ্টি থামাবে না এই ঝগড়া। এই ঝড়ো-ঝগড়া চলতেই থাকবে।
আমার বয়স ছিলো চৌদ্দ। কোথায় পাবো নাগর, কে লাগাবে পেট। ছিলি ছিলি, তুই ছিলি আমার প্রথম খদ্দের। পারিবারিক খদ্দের। বিয়ের রাতে তুই আমাকে তালাকের হুমকি দিয়েছিস। তুই অসুস্থ। তুই পাগল। তুই হার্মাদ। তোর সাথে বাসরে দেখা হবার আগে তুই আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলেছিস। কী অপরাধ ছিলো আমার!
[চন্দ্রমল্লিকা ভানু]
এই সময় মহামতি লোঙ্গা জেগে উঠলেন। জলাভূমির সমস্ত বক এসে বাঁশঝাড়ে এসে দোলাদুলি, ঠাসাঠাসি করে বসলেন।
কোন কোন নিভৃতচারী ভদ্র পাখি আমগাছের পাতার আড়ালে।চন্দ্রমল্লিকা ভাবে চুর, বিলাপ ক্লান্ত তার কণ্ঠস্বর। তিনি কিন্তু বিলাপ করেন নাই। দুখের সুরেলা প্রকাশ যে বিলাপ, সে-রকম কিছু না। তবে অন্তরে অবিনাশী সঙ্গীতের মত বিলাপ বাজে, শুধু ভল্যুমটা ছোট করে রাখা। এই ছোট ভল্যুমটা এখনো ছোট করে রাখা। দুষ্কের গুনগুনানি। চন্দ্রমল্লিকা আবারও তার কথা পাড়ার আগে স্বামী মঞ্চে প্রবেশ করলেন। মঞ্চ বাড়ির উঠান। এই গৃহ, মাটির ঘর, কাকে চিরজীবনের জন্য ছেড়ে যেতে হবে তা তখনও নির্ধারিত হয় নাই। গল্পের শেষে হবে।
তুই যা করিস, কাক-পক্ষিও টের পাবে না। তুই এতো বড়ো ছিনাল। তোর বৈতালির কথা আমি ফলাও করে সবাইরে ক’ব।তোর পয়লা ছিনালি। তুই অই লোচ্চা শরৎ, অর উপন্যাস পড়স। তোর দেবদাস না থাকলে কী করে তুই দেবদাস পড়ে কাঁদিস। তোর দ্বীতীয় ছিনালগিরি, তুই সব সেক্সি শব্দ শিখলি কোথা থেকে, তোর বয়স না চৌদ্দ। তোর সাথে খেলতে গেলে তুই যা করিস, প্রফেসনাল ছিনাল-মাগিরাই তা’ করে। আরো বলব, বলি। তুই কালা।
এই সময় চন্দ্রমল্লিকা দেখে একটা দাঁতাল শুয়োর ঘোঁৎ ঘোঁৎ করছে। আনন্দময় ফসলের ক্ষেত তছনছ করছে। মনে মনে দোনালা বন্দুকের কথা ভাবছে। একটা এলজি খাসে মারা দরকার। তখন চন্দ্রমল্লিকার জোসনা রাতের দুইখানা শিকারের গল্প মনে পড়ে গেলো। সাথে সাথে একটা গানও মনে পড়ে যায়। গানটা সে গুনগুনিয়ে গায়। আর শোনে হৈ-চৈ, শোরগোলের মাঝখানে কী সব যুক্তি দিচ্ছে লোকে। বেশির ভাগ লোক বলেছে, আহারে তালাক দিয়া দিলো। অতএব, সমষ্টির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়ে যাচ্ছে। গীত মনে মনে চলছে।
বাপ নাই, চাচা নাই, মা আছেন নীরবে। তিনি আমার দুখে নীরলে কাঁন্দেন। নামাজের মোছল্লা মায়ের রোদনে ভিজিবে। যে নারী অন্তরে কাঁদে তার চোখের জল। ভাবে সব বেয়াক্কল, এ যেন মাগির আজল। নারী দুষ্ক নারী ছাড়া বুঝিবে কে আর? সংসার কী শুন্য ভিটা, সংসার আলেয়ার। আমি তো একতারা ভাই, লাউয়ের দোতারা। একতারা ফল আমি খাবো, কাউকে দেবো না।
চন্দ্রমল্লিকা ভাণু আসমানে একটি খন্ডিত তারা দেখেন। তার মাথার মধ্যে সে-ই তারা ফাটলো। দাঁতাল বউন্যা বরাহ দাঁত দিয়ে মাটিতে চাষ করছে। জঙ্গলের মাটি যে কতবার চাষ করেছে শুয়োর, আর লোকালয়ের কত চাষ নাশ করেছে, তার কোন ইয়ত্তা নাই। আজ তার জীবনে সকল আনন্দময় মূহুর্ত যখন এই ভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেয়া হয়, তখন সে নিজেকে শুধু ধিক্কার দেয়। তার শুধু মনে হয়, ভবিষ্যৎ কাটা গাছের গুড়ির মত। শালগাছের গোড়ার মত। প্রতিটি শালগাছের কাটা গোড়া থেকে কি অপূর্ব কুঁড়ি গজায়। কুড়ালের কোপ পুরা প্রাণ নিতে পারে না। তার আনন্দ বৃক্ষ কোপ দিয়ে আজ কাটা হল। চন্দ্রমল্লিকার আনন্দবৃক্ষ থেকে আনন্দের কুঁই-কুঁড়ি গজাবেই।
আমার আনন্দ তুই কেড়ে নিতে পারবি না। আমার নিজের শরীর তুই নিতে পারবি না। তুই কী মাটির নীচে লুকানো কাঁকড়ল গাছের উত্থান ঠেকাতে পারবি। পারবি না। আমার ডেঙার প্রতিটি গাছ বর্ষার শুরুতে বংশানুক্রমিক জাগরণ। আমাকে যতোই ভোগ কর, আমি বাগানের পুনরুৎপাদনশীল সব্জির মত জেগে উঠি। সন্তান আমার। তুই পিতৃত্ব অস্বীকার করলেই কিছু আসে যায় না। সন্তান আমার। আমার জাদু, আমার প্রাণ আমার। তুই বিষ ঢেলেছিস। আমি বিষকে অমৃত করেছি। মাতৃগর্ভ সকল বিষ অমৃত করে। মায়ের গর্ভ। তুই কী জানিস। আমার সন্তানের জন্ম ফালগুনে।
চন্দ্রমল্লিকার মনে পড়ে যায় ১৯৬৩-১৯৬৫ সালের কথা। ১৯৬২ সালে তার বিয়ার কথাবার্তা চলছিল। বাবা ভীষণ অসুস্থ। যক্ষ্মা আক্রান্ত। সে-ই সময় যক্ষ্মার কোন চিকিৎসা ছিল না। পুষ্টিকর খাবারই ছিলো মৃত্যু দীর্ঘায়িত করার উপায়। তার পিতার জীবদ্দশায় দুই কন্যার বিবাহ দেখার স্বাদ ছিলো। (১)
অতএব, কন্যার ফর্দ তৈরির জন্য এলাকার সবচে’ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে ডাকা হল। তার সাথে বসলেন আরো অনেকে, জুলফু, লুতু, ইব্বি, ইব্রাহিম, হাজী সা’ব সহ আরো অনেক শরীফ মানুষজন। সর্দার ও আম্বিয়ার বাপও এসেছিলেন। কালা মিঞা ও জেদন রাগ করেছে। তাদেরকে আনার জন্য গেলেন কে যেন, মনে পড়ে না। সম্ভবত ললিত বাবু।
এই সময় কেরেঙ্গাল চরম আকার ধারণ করেছে। তবে একতরফা। স্বামীর চিৎকারে টিকা দায়। কিছু কাক কা কা করে উঠলো। বক ডানা ঝাপটাচ্ছে। বাঁশঝাড় তোলপাড়। আকাশের কিছু মেঘ হালকা ঝরে চলে গেলো। শিয়াল বৃষ্টি। ছাগল বৃষ্টি। ঝগড়া বিকাল পর্যন্ত গড়াচ্ছে। সে-ই সময় হাজার হাজার তোতার আবির্ভাব। পাশের ফসল-বিরান মাঠ তোতাময়। এই সময় চন্দ্রমল্লিকা ভাণু বিলাপ সুরে গান ধরে। তিনি কিছুই শুনছেন না। তার স্বামীর শোরগোল, কেরেঙ্গাল ধ্বনি তার কানে ঢুকছে না।
[চন্দ্রমল্লিকার সুর বিলাপ]… ও তোতারে! কালা মেয়ের গায়ে তোর রঙ ছড়ায়ে দে। আমার গায়ে বিষের জ্বালা, বিষ আনিয়া দে। তোর শিসে ডাক ভাইরে আমার। কিংবা চলে যা…। কালা মেয়ের রঙ করে দে রাঙা। বাংলাদেশের কালা মেয়ের সকল দুষ্ক আমার। আমার কি পাপ, না দিবো শাপ, খোদা নিরাকার।