সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ। যুগের পর যুগ ধরে আমাদের এই মাটি সম্প্রীতির পূণ্যভুমি হিসেবে পরিচিত। এই মাটিতে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সহ সকল জাত ধর্ম বর্নের মানুষ একই ঘাটের জল খেয়ে জীবন পার করছে । আজো বাংলাদেশে মুসলমানের কবর স্হানের জন্য হিন্দু আর হিন্দুর মন্দিরের জন্য মুসলমান জমি দানের ঘটনা অহরহ । হিন্দুর শবদেহ মুসলমানের কাঁধে চরে চিতায় যায় মুসলমানের লাশ হিন্দুর কাঁধে চেপে ও গোরস্থানে যাওয়ার নজির কম নয়। তবে আমাদের এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভাতৃত্বের বন্ধন অনেকেরই পছন্দ বা অনেকেই আমাদের এই ভাতৃত্বের বন্ধনকে সহ্য করতে পারে না। বিশেষ করে আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারত। আর এই ভারতের কখনো প্রত্যক্ষ আবার কখনো বা পরোক্ষ মদদেই আমাদের এই সম্প্রীতির পুন্যভুুমি মাঝে মাঝেই কিছু বুঝে উঠার আগেই কলংকিত হয় ধর্মীয় উগ্রবাদীদের কালো থাবায়। ঘটে যায় অপ্রত্যাশিত এমন ঘটনা যা কোন ভাবেই কাম্য নয় এমন কি আমাদের সম্প্রীতির সাথে মানায় না। গত ৫ শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও শেখ হাসিনার পলায়নের পর থেকেই নতুন করে সাম্প্রদায়িক উস্কানির অশ্লীল খেলায় মেতে উঠেছে ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপির মোদি সরকার। এই কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে মোদি সরকার ও শেখ হাসিনার আর্থিক সুবিধা ভোগী কিছু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম। যা ভারতে গোদি মিডিয়া নামে ব্যপক পরিচিত।
স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন কেন শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতের মোদি সরকার আর তার গোদি মিডিয়া বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে আদাজল খেয়ে নেমেছে? এই ষড়যন্ত্র কোন সাধারণ ষড়যন্ত্র নয়। ভারত সরকার ও সেই দেশের গোদি মিডিয়ার ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্য বাংলাদেশকে এক ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মুখে ঠেলে দেওয়া। তারা ভাবছেন কোন ভাবে যদি বাংলাদেশে একটি সম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানো সম্ভব হয় তাহলে হয়তো তাদের প্রিয় শেখ হাসিনাকে আবার ক্ষমতার আসনে বসানোর স্বপ্ন বাস্তব হতে পারে।
তবে আমাদের বাংলাদেশের সাধারন মানুষ যে সহিষ্ণু, অস্প্রদায়িক ও ভাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ একটি দেশ প্রেমিক সভ্য জাতি তার প্রমান ভারত সরকার ও তার গোদি মিডিয়ার নানান উস্কানিমূলক বাংলাদেশ বিরোধী প্রচার ও ষড়যন্ত্রের পর ও আমাদের দেশে এখনো শান্ত ও শান্তির আবহাওয়া বিরাজ করছে। ভারতের মোদি সরকার গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গনঅভ্যু্ত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের যে এমন শোচনীয় পতন ঘটবে তা হয়তো কোন ভাবেই কল্পনা করতে পারে নাই। তাই শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন কোন ভাবেই মানতে পারছেন না ভারত। আর এটা মানার ও কথা না কারন শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ ছিল ভারতের জন্য সোনার ডিম দেওয়া একটি হাঁস। আর এই সোনার ডিম দেওয়া হাঁস কি কেউ হাত ছাড়া করতে চায়। ২০১৮ সালের ৩০ মে মোদির আমন্ত্রনে ভারত থেকে ফিরে শেখ হাসি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, " ভারতকে যা দিয়েছি সেটি তারা সারা জীবন মনে রাখবে "। তা হলে একটু দেখে নেই শেখ হাসিনা গত পনের বছর অবৈধ ভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে রাখতে তার প্রভু ভারত কে কি কি বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। গত পনের বছরে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে অন্তত ২০টি চুক্তি ও ৬৬টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। বর্তমান অন্তবর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের দাবি এসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের অধিকাংশতেই উপেক্ষিত হয়েছে আমাদের বাংলাদেশের স্বার্থ। ২০০৯ সালে ভারত- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ প্রযোজনায়র নির্বাচনে শেখ হাসিনা ক্ষমতা এসেই প্রথমে সুপরিকল্পিত ভাবে ২৫শে ফেব্রুয়ারী তথাকথিত বিডিআর বিদ্রোহের নামে ৫৭ জন দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তা সহ ৭৪ জনকে হত্যার মধ্য দিয়ে ভারতের দাসত্বের প্রথম অধ্যায়ের সূচনা করেন। আর এ ন্যাক্কারজনক হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রকাশ্যভাবে প্রতিবেশি দেশ ভারতের ইন্ধন ছিল বলে অভিযোগ ওঠেছিল বিভিন্ন মহল থেকে। এ কারণেই এ ঘটনার আর আন্তর্জাতিক কোনো তদন্ত হয়নি বলেও অভিযোগ ওঠে। বিডিআর অর্থাৎ বিজিবি হত্যাকাণ্ডের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের সীমান্তকে অরক্ষিত করে তোলা ও সেই সাথে আমাদের বিজিবি জওয়ানদের প্রতিরোধে বিভিন্ন ভাবে অবৈধ ভাবে দখল করা বাংলাদেশের বিওপি ভারতীয় বিএসএফকে ছাড়তে বাধ্যকরা।
২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের তৎকালীন ভারতেরনপ্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের একটি চুক্তি সই হয়েছিল। সেটি হাসিনা-মনমোহন চুক্তি নামে পরিচিত। এ চুক্তির নামে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিটের নামে করিডর নিয়েছে ভারত। যেই ট্রানজিটের জন্য বাংলাদেশে থাকা ভারতীয় দালালরা আমাদের সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, দুবাইয়ের মতো হয়ে উঠার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আবার অনেকে ইউরোপ-আমেরিকার দেশের সঙ্গেও তুলনা হবে বলে প্রচারণা করগে ভুল করেন নাই। এছাড়াও শেখ হাসিনার সরকার নিজের অবৈধ ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে ভারতকে চট্রগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেয়। তিস্তার পানি না পেয়েও ভারতকে আমাদের ফেনীর নদীর পানি দিতে কৃপণতা করেন নাই শেখ হাসিনা। ভারতের স্বার্থ রক্ষায় দেশের মানুষের নিরাপত্তা ও ভাবিষ্যতের কথা না ভেবেই ভারতের সঙ্গে একপাক্ষিক রেল চুক্তি। মোদি তথা বিজেপির স্বার্থ রক্ষায় মাসে ৭০০ কোটি টাকার ক্ষতি করে মোদির বন্ধু গৌতম আদানির ব্যবসায়ি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি করে খুশি রাখা হয়েছে ভারতের মোদি সরকারকে। ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশনের (এনটিপিসি) সেই দেশের ছত্তিশগড়ে ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছিল। সেই দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের গ্রিন প্যানেলের ইআইএ রিপোর্ট প্রকল্পটিকে পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি বলে প্রতিবেদন দাখিল করায় ভারত সরকার এ প্রকল্পটি সেদেশের পরিবর্তে বাংলাদেশে করার প্রস্তাব করে। আর ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশনের স্বার্থ রক্ষায় আমাদের ঐতিহ্য সুন্দর বনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে রামপালে স্হাপন করা হয় রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্পটি।
আমাদের স্বার্বভৌমত্বকে হুমকিতে রেখে ভারতের সঙ্গে করা হয় প্রতিরক্ষা ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়চুক্তি। এমকি ভারত থেকে আমাদের পাঠ্যপুস্তক ছাপানো সহ ২৬ লাখ ভারতীয় নাগরিকের বাংলাদেশে কাজের অবাধ ব্যবস্হা করে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সহ আমাদের দেশে বেকারত্বে হার বৃদ্ধি করে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করেছিল শেখ হাসিনার সরকার। এছাড়া ভারতীয় পন্যের অবাধ বাজার ছাড়াও সীমান্তে অবাধে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশীদের লাশের মিছিলতো ছিলই। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের এক গোলামির রাজ্যে পরিনত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে এক প্রকারে ভারতের হাতে তুলে দিতে কাজী লেন্দুপ দর্জি খাংসারপার ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল শেখ হাসিনা।
আগেই বলেছি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পূণ্যভূমি বাংলাদেশ। এখানে সাম্প্রদায়িক অসন্তোষের ঘটনা খুবই কম। যাও হয়েছে তার সুত্রপাত ভারতের উগ্রবাদী হিন্দুদের থেকেই ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট কলকাতার গড়ের মাঠে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ আয়োজিত সমাবেশকে পন্ড করতে উগ্রবাদী হিন্দু সন্ত্রাসীরা একটি দাঙ্গার সুত্রপাত ঘটায়। এই দাঙ্গায় এক দিনেই কলকাতা শহরে চার হাজারের বেশি মানুষকে জীবন দিতে হয়। পরে এই দাঙ্গা নোয়াখালী, বিহার ও পাঞ্জাবের মুসলিম ও হিন্দু-শিখদের মধ্যে বেশ কয়েকটি দাঙ্গার সূত্রপাত করেছিল। ১৯৬৪-এর তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান বর্তমানে বাংলাদেশের দাঙ্গার সুত্রপাত ভারতের ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর থেকে। এর পর ১৯৯২ সালে ভারতের বাবরি মসজিদ ধ্বংসকে কেন্দ্র করে ভাতরে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয় তার প্রভাব এসে পরে বাংলাদেশে ও। ২০০১ সালে বিএনপি জামাত জোট ক্ষমতায় আসলে দেশের বিভিন্ন স্হানে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা হয় যা ছিল সম্পুর্ন ভাবে রাজনৈতিক। তবে ২০০১ ঐসব ঘটনাকে আমাদের তথাকথিত প্রগতিশীলরা সাম্প্রদায়িক রুপ দিতে মোটেও দ্বিধা করেন নাই। তবে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার পূর্ব দেলুয়া গ্রামের ১৪ বছর বয়সী পূর্ণিমা রানী শীল ধর্ষণের ঘটনাটি ছিল সত্যিি মর্মান্তিক ও দুঃখজনক ঘটনা।
৫ আগস্ট স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর ও ভারত সরকারের পরিকল্পনাও ছিল কোন ভাবে বাংলাদেশে একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানো। এর জন্য তারা মুল চাবিকাঠি হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু বিপদগামী ব্যক্তিদের। তাদের মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশের সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোট নামক নব্যগঠিত একটি তথাকথিত সংগঠনের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস। এই চিন্ময় কৃষ্ণ দাস আসল নাম ছিল চন্দন কুমার ধর। চিন্ময় কৃষ্ণ দাস এক সময় ইসকনের নেতা থাকলেও শিশুদের উপর যৌন হয়রানি, সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গ সহ নানা কারণে তাকে ইসকন থেকে বহিষ্কার করা হয় বলে জানিয়ে ছিলেন ইসকন বাংলাদেশের সাধারণ সম্পদক চারু চন্দ্র দাস ব্রহ্মচারী। গত পনের বছর আওয়ামী লীগের শাসনামলে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের উপর অনেক হামলা হয়েছে। অনেকের বাড়ী ঘর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ভাংচুর ও হয়েছে। বদা যায়নি ধর্মীয় উপাসনালয় থেকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পর্যন্ত। কুমিল্লার দানব আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্যই ২০২১ সালের শারদীয় দূর্গা পূজার সময় কুমিল্লার নানুয়া দীঘির পাড়ে পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরীফ রাখাকে কেন্দ্র করে ১৩ অক্টোবর ভোর ৬টা থেকে প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী চলা সহিংসতা। দরবারে পরবর্তীতে এই সহিংসতা দেশের অনেক স্হানেই ছড়িয়ে পরে। এবং হতাহতের ঘটনাও ঘটে। এছাড়া শেখ হাসিনার শাসনামলে গত পনে বছরে রামুর বৌদ্ধ পল্লী ও প্যাগোডায় হামলা, অগ্নিসংযোগ, ব্রাহ্মনবাড়ী, সিলেট, রংপুর, গোপালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ সহ দেশের বিভিন্ন স্হানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষ হামলা ও খুনের শিকার। এই নিয়ে তৎকালীন সময় ভারত সরকার ও তাদের মিডিয়ার কোন ভুমিকাই ছিল না। বর্তমানে যখন আমাদের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে আছে তখনই শুধু মাত্র নিজের স্বার্থ হারানোর ব্যাকুলতায় ভারতের মোদি সরকার ও তার গোদি মিডিয়া একের পর এক নানান মিথ্যা তথ্য প্রচার করে আমাদের দেশে একটি অস্থিতিশীল পরস্হিতি সৃষ্টির পায়তারা লিপ্ত। তাদের এক মাত্র লক্ষ্য বাংলাদেশে একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশে ও বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন করে আমাদের জুলাই- আগস্টের ছাত্র-জনতার গনঅভ্যুত্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠত করে। তবে বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ কখনোই ভারতের মোদি সরকার ও তাদের গোদি মিডিয়ার উস্কানিতে কান দিবে না এমনকি তাদের পাতা ফাঁদে ও পা দিবে না।