somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রথম `শহীদ মিনার' ভেঙেছিল সরকার! লালনের ভাস্কর্য ভাঙল কে?

২৩ শে নভেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৪:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ক্ষমতা কি না পারে! রাতকে দিন, দিনকে রাত। সব, সব পারে। সব সম্ভবের দেশ, এই দেশ। সবকিছুই এখানে সম্ভব। অসম্ভব বলে কিছু নেই। কি যৌক্তিক, কি অযৌক্তিক, কি বাস্তব, কি পরাবাস্তব। এটিকে পরাবাস্তব কিংবা যাদুবাস্তব বলাই বোধকরি ভালো। যদিও বহুদিন আগে থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই ভূখণ্ডের সীমারেখায় এমন সব ঘটনা ঘটে চলেছে, যা বাস্তবত ভেবে বিস্মিত হওয়ার মতোও আর কিছু অবশিষ্ট নেই।
বরাবরই রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত `প্রভুরা' এদেশের মেহনতি মানুষের অধিকার নিয়ে শুধু খেলাই করেনি, করেছে ধর্ম ও অর্থনীতির নিরিখে বিভেদরেখার নির্মাণও। সম্প্রতি লালনের ভাস্কর্য ভাঙার বিষয়টিও এর বাইরের নয়। এটিও নতুন ঘটনা নয়, এর আগে পাকিস্তান সরকার এদেশে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার পর্যন্ত ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছিল। দুটো ঘটনার বাস্তবতা ভিন্ন হলেও মূলগত সাদৃশ্য আছে। সাম্রাজ্যবাদী আশীর্বাদপুষ্ট, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে জারিত, বেড়ালস্বভাবী `সুশীল' জ্ঞানপাপী পরিবেষ্টিত এইসব রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছ থেকে এর থেকে ভালো আর কি আশা করার আছে! এরা যে শহীদ মিনার ভাঙবে, লালনের ভাস্কর্য ভাঙবে, প্রগতিশীলতার পথে কাঁটা বিছিয়ে দেবে, অসাম্প্রদায়িক চিন্তার গলা চেপে ধরবে, এটাই স্বাভাবিক। কেননা এরা প্রগতিশীলতাকে ভয় পায়, এদের মেরুদণ্ডের জোর কম, তথাপি এরা ক্ষমতার লোভ ত্যাগ করতে পারে না। যদিও গণআন্দোলনের মুখে সবসময়ই এদের পট পরিবর্তন ল্ক্ষ্য করা যায়, কিন্তু এদের প্রেতাত্মারাই আবার সেই স্থান দখল করে রাখে। ভবিষ্যতেও হয়তো তাই ঘটতে থাকবে! ৪৭ এর পর থেকে দেখলেও দেখা যায়, এদেশের গণমানুষের দাবিকে, মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িকতার পথকে রুদ্ধ করতে `ক্ষমতাসীন যন্ত্র' দানবের মতো এগিয়ে এসেছে বারবার। তারই উদাহরণস্বরূপ ৫২তে প্রথম শহীদ মিনার ভেঙে দেয় সরকারের পুলিশ বাহিনী আর ২০০৮ সালে অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী বাউল লালন শাহের স্মরণে নির্মিতব্য ভাস্কর্য ভেঙে দিল কয়েকজন মাদ্রাসা ছাত্র ও ধর্মীয় মৌলবাদী ব্যক্তি! অথচ রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতা সরকারের নিয়ন্ত্রণে। এই `মৌলবাদী বাহিনী' তাহলে কার শক্তিতে শক্তিমান? সরকারের? নাকি বিদেশি কোনো শক্তির? এখানেই মূল প্রশ্ন দানা বাঁধে, লালনের ভাস্কর্য ভাঙল তবে কে? মৌলবাদী বাহিনী? নাকি সরকার? নাকি বিদেশি কোনো শক্তি?

প্রথম `শহীদ মিনার' ভাঙার কাহিনী:

৫২'র ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের যেসকল কর্মী পুলিশের গুলিতে নিহত হন, তাঁদের স্মরণে ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে একটি শহীদ স্মৃতিসৌধ বা শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। এটিই ছিল শহীদদের স্মরণে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার। ভাষা শহীদদের লাশ সরকার পুলিশ কর্তৃক সরিয়ে গোপনে দাফন করার পর থেকে আওয়াজ উঠেছিলো `শহীদ স্মৃতি অমর হোক'। এই আওয়াজকে আরও নির্দিষ্ট রূপ দেওয়ার জন্য যে জায়গায় ছাত্রেরা গুলির আঘাতে প্রথম শহীদ হন সেখানে, সেই ১২ নং শেডের পাশে, মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা একটি শহীদ মিনার নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং তাঁদেরই সক্রিয় উদ্যোগে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে ২৩ ফেব্রুয়ারি রাত্রের মধ্যেই সেখানে শহীদ মিনারটি গড়ে ওঠে। এ বিষয়ে শহীদ মিনারের নকশা প্রণয়নকারী মেডিক্যাল কলেজের তৎকালীন ছাত্র সাঈদ হায়দার বলেন :
``এটাকে স্বতঃস্ফূর্ত একটা পরিকল্পনা বলা চলে। দলমত নির্বিশেষে সকল ছাত্র শহীদ মিনার তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ২২ ফেব্রুয়ারির রাত থেকেই শহীদ মিনার তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে শহীদ মিনার তৈরির কাজ শুরু হয়। ২৩ তারিখ বিকেল থেকে শুরু করে সারারাত সেখানে কাজ হয় (কার্ফু থাকা সত্ত্বেও)... ইট-বালির কোন অভাব ছিল না। মেডিক্যাল কলেজ সম্প্রসারণের জন্য প্রচুর ইট-বালি ছিল। ছাত্ররাই ইট বয়ে এনেছে। বালির সঙ্গে মিশিয়েছে। দুজন রাজমিস্ত্রী ছিল। তাদের নাম বলতে পারব না। আমাদের মেডিক্যাল হোস্টেলে প্রায় তিনশ ছাত্র ছিল। তাদের সকলেই সেদিন কোন না কোন কাজ করেছিল। আর শহীদ মিনারের নকশা তৈরি করেছিলাম আমি। শহীদ মিনারের কাজ শেষ হলে দড়ি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছিল এবং নকশাটি সেখানেই টাঙিয়ে দেয়া হয়েছিল।... শরফুদ্দীন (তাকে আমরা ইঞ্জিনিয়ার বলতাম। সে অঙ্ক ভালো জানতো...) শহীদ মিনার নির্মাণের কাজে যথেষ্ট যত্ন নিয়েছিল। এছাড়া মাওলা, হাশেম, জাহেদ, আলিম, জিয়া আরও অনেকে শহীদ মিনার নির্মাণে প্রাণপাত পরিশ্রম করে। এছাড়া ছিল আমাদের অনেক বয়-বেয়ারা। এরাই ছিল সেদিনকার বড় কর্মী। নকশায় ৯ ফুটের পরিকল্পনা হয়েছিল, কিন্তু শেষ হওয়ার পর দেখা গেল মূল পরিকল্পনাকে তা ডিঙিয়ে গেছে। মিনারটি সম্ভবত ১১ ফুট তৈরি হয়েছিল। বদরুল আলমও মিনার নির্মাণে সাহায্য করেছিল। তার হাতের লেখা ছিল চমৎকার। কাগজে লিখে মিনারের গায়ে সেঁটে দিলে মর্মর পাথরের মতো দেখাতো। আজকের শহীদ মিনার যেখানে, প্রায় তার কাছাকাছি মিনারটি তৈরি করা হয়েছিল। ...শহীদ শফিউর রহমানের পিতাকে এনে ২৪ ফেব্রুয়ারি মিনারটি উদ্বোধন করা হয়েছিল। আমি সেখানে ছিলাম।''
পরে পরিষদ সদস্যপদ থেকে ইস্তফাদানকারী তৎকালীন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক, আবুল কালাম শামসুদ্দীনকে দিয়ে শহীদ মিনারটি দ্বিতীয়বার উদ্বোধন করা হয়। এবং একটি সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়।
কিন্তু সেই শহীদ মিনারটির আয়ু ছিল খুবই অল্প। তৎকালীন সরকার ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলের দিকে পুলিশ দিয়ে সেটি ভেঙে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। এরপর বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি ভাস্কর হামিদুর রহমানের দ্বারা নির্মিত হয়।

(তথ্যসহযোগিতা নেওয়া হয়েছে : পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি -বদরুদ্দীন উমর)

১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এই দিশেহারা মেঘ কোথায় চলেছে?

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৫ দুপুর ১২:২৫

এটা আমার নিজের লেখা প্রিয় গানগুলোর একটা। অতীতে অনেক বার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমার মূল সুরের কাছাকাছি পৌঁছতে পারি নি। এবার সুরটা ধরা পড়েছে ভালোভাবে।



৫টা ভার্সন হয়েছে। ২টা ভার্সনটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংস্কার VS নির্বাচন

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৫ সন্ধ্যা ৭:৪২



সোস্যাল মিডিয়ায় এখন ডক্টর ইউনুসের কমপক্ষে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার পক্ষে জনগন মতামত দিচ্ছে। অন্তবর্তী সরকার এক রক্তক্ষয়ী অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা গ্রহন করেছে। তাই এই সরকারের কাছে মানুষের... ...বাকিটুকু পড়ুন

কী অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জন্য

লিখেছেন হিমন, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৫ রাত ৯:৪৫

বাংলাদেশে সাড়ে খোলাফায়ে রাশেদিন- ইউনুসের সরকার আসার পর থেকে আজ অব্দি দেশ নিয়ে এখানে সেখানে যা অনুমান করেছি, তার কোনটিই সত্যিই হয়নি। লজ্জায় একারণে বলা ছেড়ে দিয়েছি। এই যেমন প্রথমে... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রসঙ্গঃ নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় বাংলাদেশ চ্যাপ্টার.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০২ রা এপ্রিল, ২০২৫ রাত ১০:৫৮

বাংলাদেশ সম্পর্কে নিউইয়র্ক টাইমস এর নিউজটা যথাসময়েই পড়েছিলাম। নিজের মতো করে রিপোর্টের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট লিখতেও শুরু করে ছিলাম। কিন্তু চোখের সমস্যার জন্য বিষয়টা শেষ করতে পারিনি।

এবার দেখা যাক বাংলাদেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

এই দেশ থেকে রাজনৈতিক অন্ধকার দূর করা যায় কিভাবে?

লিখেছেন গেঁয়ো ভূত, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৫ সকাল ১০:১৪

রাজনৈতিক অন্ধকার দূর করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং চ্যালেঞ্জিং বিষয়, যা দেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য অপরিহার্য। এই সমস্যা সমাধানে দেশের নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল, শিক্ষাব্যবস্থা, এবং প্রশাসনের যৌথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×