সাম্প্রতিক দাঙ্গা এবং অসুস্থ সমাজ
গত ৬ আগস্ট থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত ব্রিটিশ সমাজব্যবস্থার একটা করুণ হাল বিশ্ববাসী দেখেছে। কৃষ্ণাঙ্গ যুবক মার্ক ডুগান হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ বাঁধে। পরবর্তিতে সারা দেশে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়া অরাজকতা দেখে সাম্প্রতিক আরব বিশ্বের কথা স্মরণে এলেও ব্রিটেনের এ আন্দোলনÑঘটনাপ্রবাহ ছিল ব্যতিক্রম। অর্থনৈতিক মন্দা, চাকরির অভাব কিংবা টিউশন ফি বৃদ্ধির কারণে হতাশাগ্রস্ত তরুণ যুবকদের এ দাবানলে ছিল লুটপাট, ভাংচুর আর জ্বালাও-পোড়াওয়ের তান্ডব। শত মিলিয়ন পাউন্ডের ক্ষয়ক্ষতির কথা বলা হলেও এর মাত্রা আরো বৃদ্ধি পাবে এটা নিশ্চিত।
সাম্প্রতিক আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল একটি হত্যাকান্ডের জের ধরে। এই হত্যাকান্ড ব্রিটিশ সমাজ ব্যবস্থার সুপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক অসমতা-বৈষম্যের প্রমাণ, না অপরাধী দমনে পুলিশের স্বেচ্ছাচারিতা- এ ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে এ বিষয়টি নিয়ে ইন্ডিপেন্ডেন্ট পুলিশ কমপ্লেইন কমিশন তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রাথমিক তদন্তে মার্ক ডুগান যে আগে থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়েন নি, এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে । কিন্তু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এ ক‘দিন যা ঘটেছে এগুলোকে কি আন্দোলন-প্রতিবাদ হিসেবে ভাবা যায়। কিংবা বিষয়টিকে এভাবেও দেখা যেতে পারে যে, একটি অন্যায়ের প্রতিবাদে ন্যায্যা এ আন্দোলন-প্রতিবাদ-বিক্ষোভ কার ইঙ্গিতে, কিভাবে ভিন্নখাতে প্রবাহিত হল? অর্থাৎ প্রতিবাদ কর্মসূচী লুটপাট-দূবৃত্তপনায় যে পরিণত হল এটা কারা করলো, কেমন করে হলো।
২.
তরুণমনে যে হতাশা তৈরি হয়েছে, যে হতাশা সামাজিক বিপর্যয় তৈরি করছে তা দূরীকরণে রাষ্ট্রকেও এগিয়ে আসতে হবে বলিষ্ঠভাবে। উন্নত ভবিষ্যতের জন্য সর্বাগ্রে তরুণ-যুবকদের ভাবনায় থাকে উচ্চতর লেখাপড়া, লেখাপড়া শেষে চাকরির নিশ্চয়তা। এই মুহুর্তে ব্রিটিশ সমাজে এ দু’টি বিষয় সরকারী পলিসির কারণে চরম অনিশ্চিত বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এমতাবস্থায় তৈরি হওয়া হতাশাগ্রস্থতা থেকে উদ্দেশ্যহীন দূবৃত্তপনায় তারা মেতে উঠেছে। উল্লেখ্য সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিছক মার্ক ডুগানের হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না কারণ লুটপাট যারা করেছে তাদের অনেকেরই অজানা ছিল লন্ডনে দাঙ্গা তৈরি হওয়ার মূল হেতু। সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শপিং মল লুটপাটের সংবাদই তাদের রাস্তায় বের হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এটা লুটপাটে যারা অংশ নিয়েছে তাদের বর্ণ থেকেও বুঝা গেছে।
তরুণ-যুবকদের এ দূর্বৃত্তপনায় প্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহার দেখা গেছে। ব্ল্যাকবেরী, ফেইসবুক, টুইটার ব্যবহার করে দ্রুত তারা সংঘটিত হয়েছে। বিশেষ করে লুটপাটের সংবাদ সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়াতে নৈতিক-মূল্যবোধবর্জিত-শিক্ষাহীনভাবে বেড়ে ওঠা তরুণ-যুবকরা সুযোগ নেয়াকে হাতছাড়া করতে চায় নি। তারা সদলবলে ঝাপিয়ে পড়েছে শপিংমল-সুপারমার্কেটে। অপ্রাপ্ত বয়স্কদের গায়ে এদেশের পুলিশের হাত না দেয়ার আইনী সুযোগ তাদের করেছে আরো বেপরোয়া। এক্ষেত্রে কিছু অভিভাবকদের দায়িত্বহীনাতাকে উদ্বেগজনক না বলে উপায় নেই।
উল্লেখ্য আপাত পরিস্থিতি শান্ত। কিন্তু ইতোমধ্যে ক্ষয়ক্ষতি অর্থের হিসেব ছাড়িয়ে বার্মিংহামে তিনটি তাজা প্রাণের বিনিময়ে রক্তের সীমাও ছাড়িয়ে গেছে। নিজেদের-প্রতিবেশীদের সম্পদ পাহাড়ারত জনতার উপর লুটপাটকারী-দূবৃত্তরা গাড়ী তুলে দিলে এই তিনজন প্রাণ হারায়।
৩.
প্রযুক্তি আধুনিক সমাজব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ। প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন উপেক্ষা করা যায় না। তেমনি এর অপপ্রয়োগের ব্যাপারেও অসচতেন থাকা যায় না। সুতরাং ঘরে শিশুরা টিভি-ইন্টারনেট-মোবাইল-আইফোন-ব্লাকবেরী-ফেইসবুক-আইপ্যাড ইতাদির মাধ্যমে কী করছে তা প্রতিটি দায়িত্বশীল পিতামাতার জন্য পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। তাছাড়াও সন্তান বাইরে কোথায় যাচ্ছে, কাদের সাথে সম্পর্ক রাখছে। এমনকি সমাজের বিভিন্ন মূল্যবোধ-ইস্যুতে সন্তান কী ধরণের চিন্তাভাবনা নিয়ে বেড়ে ওঠছে। ধর্মীয় শিক্ষা-নৈতিক শিক্ষার মান কেমন- এ সব কিছু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি মাতাপিতা-অভিভাবকদেরকে পৃথকভাবে তাদের সন্তানদের প্রদান করা-পরখ করার প্রয়োজনীয়তা-গুরুত্ব রয়েছে।
প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় পৃথিবী মানুষের হাতের মুঠোয়। মানুষ এখন সব কিছু প্রযুক্তির ছোঁয়ায় করতে চাইছে। কিন্তু প্রযুক্তি মানুষের জন্য অনেক কিছু সহজতর করলেও প্রযু্িক্ত-ভার্চুয়ালমুখী জীবনযাত্রা মানুষকে নৈতিকতা, শ্রদ্ধাবোধ, সামাজিক, পারিবারিক, ধর্মীয় মূল্যবোধ বিমুখও করছে। আমাদেরকে প্রযুক্তি-ভার্চুয়াল নির্ভরতা থেকে অন্তত কিছু বিষয়কে মুক্ত করে রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য-পারিবারিক-সামাজিক সংস্কার-মূল্যবোধ-সংস্কৃতি শিক্ষা দিয়ে সন্তানদের বাস্তবমুখী-বাস্তব অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হতে হবে। অর্থাৎ সন্তানদের বাস্তবতা থেকে প্রকৃতি থেকে শেখাতে হবে। মনে রাখতে হবে অতি মাত্রায় টিভি-ইন্টারনেট-গেইম আসক্তি আমাদের একটি প্রজন্মকে বাস্তব অনুভূতিবর্জিত করে দিচ্ছে। এর ভায়বহ পরিণামেই উদ্দেশ্যহীন এই সাম্প্রতিক লুটপাট-অরাজকতা।
৪.
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন- সমাজের কিছু অংশ অসুস্থ হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। নৈতিক অধঃপতন ও অসুস্থ সমাজের যে বিপর্যয় আমরা দেখলাম এ থেকে ঘুরে দঁড়াতে এবং আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে বাঁচাতে এই মুহুর্তে সমাজবিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ, মনোবিজ্ঞানী সহ সকল স্তরের প্রতিটি মানুষের করণীয় নির্ধারণ খুবই জরুরী। অন্যথায় ভবিষ্যতে সমাজের বেঁচে যাওয়া সুস্থ অংশ-মূল্যবোধ পুরোপুরি ভেঙে পড়বে, নেমে আসবে আরো ঘন ভয়াবহ বিপর্যয়।