দাবানলে পুড়ে যায় যদি পুরো আমাজন
তবু জেনো, আছে নিরাপদ কোনো জলাধার;
শ্মশানে পোড়ানো টুকরো টুকরো কয়লা হওয়া
অচেনা শবদেহের কাঁচা নাভীর মতন।
আগুন যখন অন্যকে পোড়ায়
তখন কি সে নিজেও জ্বলে না?
পোড়া বনে পড়ে থাকে অগণিত ছাই
তবু থাকে কিছু প্রাণ অসংখ্য মৃতের ভীড়ে।
এভাবেই আমি বেঁচে থাকি, বঞ্চিত, প্রতারিত;
চোরাবালি আর হীরকের সম্মোহনে
আত্মমগ্ন যেমন মৃত্যুদূত; তেমন করেই
বেদনাকে প্রতিবার দেখিয়েই যাবো কাঁচকলা।
বুঝে নিও সখি, যতটা পোড়াবে আমাকে
তুমিও পুড়বে ততোধিক; পোড়াতে পোড়াতে
পুড়তে পুড়তে নিজ কক্ষপথে কতকাল
উড়াবে প্রতিশোধের বেদনা রঙের ছাই?
তারচেয়ে ভালো এসো গোপনে রোপন করি চার হাতে মিলে
বৃক্ষের যত চারা; রুগ্ন পৃথ্বী আবারও ফিরে পাক সবুজ আবাস।
এটা আমারই লেখা। ভালো মন্দের বিচার পরে। কবিতা হলো কি হলো না, সেটাও তর্ক সাপেক্ষ। কিন্তু এটাও যে এক ধরনের লেখা তা তর্কাতীত।
আমি লেখক। ভালো লিখি বা খারাপ লিখি, লিখি তো? এটা আমার অহংকার। পতনের মূলের মতো তেমন কোনো ব্যাপার নয়। আমি লেখক বলেই লিখছি। বিষয় যতদিন কাগজ কলম নিয়ে আমাকে লিখতে বসাবে, লিখতে বাধ্য করবে, ততদিন লিখতেই থাকব। এটাই একজন লেখকের আনন্দ। কখনও আত্মগোপনের পথ। আত্মতুষ্টির উপায়। নিজেকে হাজারো রকমে মেলে ধরার প্রকৃষ্ট পথ। নিজের যাবতীয় দুঃখ, বঞ্চনা, ক্রোধ আর ঘৃণা উগড়ে দেবারও একটি সহজ মাধ্যম।
যিনি লেখালেখি করেন, তিনি কখনও একাকীত্বে ভোগার কথা নয়। এ সত্য আমি নিজের ভেতর উপলব্ধি করি। কোনো মানুষ যদি সুদীর্ঘকাল কোনো ঘরে জনসংযোগহীন ও গণমাধ্যমহীন অবস্থায় বাস করেন, তাহলে তার পক্ষে ভাষা ও বর্ণ দুটোই ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে শতভাগ। কিন্তু তিনি যদি লেখালেখি করেন তাহলে বাকি জীবন এভাবে কাটিয়ে দিলেও সে সম্ভাবনা থাকছে না। কারণ লেখার মাধ্যমে তিনি ধ্বনির পর ধ্বনি, শব্দের পর শব্দ, বাক্যের পর বাক্য সাজিয়ে পরিচ্ছেদের পর পরিচ্ছেদ সাজিয়ে রাখছেন। তার পক্ষে কি অক্ষর-শব্দ-বাক্য ভুলে যাওয়া সম্ভব? তিনি এসবের চর্চাতেই নিয়োজিত।
এত কথা কেন বলছি? বলছি এ কারণেই যে, লেখালেখির মতো কঠিন আর সাধকের মতো একটি বিষয়ে মনকে নিবদ্ধ রাখার মতো যোগ্যতা অর্জনের পরও যদি কেউ ভাবেন তার লেখা কেউ পড়ে না আর এ নিয়ে মন খারাপ করেন তাহলে বলবো আপনি ভুল ভাবছেন। আপনি যে লেখেন এটাই তো অনেক বড় ব্যাপার! কে পড়লো, কে পড়লো না তাতে আপনার কী আসে যায়? লিখেছেন এটাই যথেষ্ট। তারপরও যদি চান আপনার লেখার পাঠক হোক, সংখ্যায় বাড়ুক। তাহলে পাঠককে আপনার সময় দিতে হবে। পাঠক পড়ার জন্য মুখিয়ে থাকেন। তৃষ্ণার্ত থাকেন। আপনার লেখাটাকে খুঁজে নিতে তাকে সময় বা সুযোগ দেবেন না? তা ছাড়া আপনার লেখায় যদি পাঠককে আগ্রহী করবার মতো বিষয় ভাব বা বাক্যের উৎকর্ষ না থাকে, তাহলে পাঠক হতাশ হবেন। সে ক্ষেত্রে আপনি লেখাটাকে উন্নত করতে, ত্রুটিমুক্ত করতে চেষ্টা করতে পারেন। ভাল হয় আগের লেখাটা ভুলে গিয়ে নতুন একটা লেখা শুরু করা।
এবার বলি, নৃ-মাসুদ রানা ফেসবুকে লিখলেন যে, তার লেখার পাঠক নাই। মন্তব্যের ঘরে আমি লিখলাম, তবু লিখতে থাকেন।
কেন বললাম, তবু লিখতে থাকেন? পরিষ্কার হলো না কিছু? তাহলে বলি, একজন লেখক যখন কোনো একটি লেখা লিখতে আগ্রহী হন, তার আগে কিন্তু নানা রকম দৃশ্য, ঘটনা, ভাব, ভাবনা, বিশ্লেষণ ও যুক্তি দিয়ে তাড়িত হন। তখন সবগুলো মিলে মিশে যখন একটি পূর্ণ সিদ্ধান্ত বা ভাবনাগুলো পরিণত হয় অথবা পূর্ণতা পায়, তখনই তা প্রকাশের জন্য মনে মনে তাড়িত হন আর যতক্ষণ না তিনি সেই তাড়না বোধকে একটি আকৃতি অর্থাৎ বাক্যের সমষ্টি বা সুরে প্রকাশ করতে না পারছেন, ততক্ষণ এক ধরনের অস্থিরতা বা অস্বস্তি বোধ করেন। এক সময় সেই অস্থিরতা বা অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতেই তিনি গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ হিসেবে তা লিখতে বা বলতে আরম্ভ করেন। তিনি যখন তার ভাবনা বা চিন্তার সমষ্টিকে লিখতে আরম্ভ করেন তখন তার পার্শ্বীয় ভাবনায় থাকে না যে, তা কেউ পড়বে বা ছাপা হবে। তখন তার উদ্দেশ্য থাকে মস্তিষ্ক ভারমুক্ত করা। আর এভাবেই একটি পরিপূর্ণ বা আংশিক লেখার সৃষ্টি হয়। এর পর আসে পাঠক বা ছাপানোর ব্যাপার। কিন্তু শুরুতে যে ভাবনাটা ছিল না, তা নিয়ে পরে আক্ষেপের কোনো কারণ দেখি না। আপনি যে লেখাটার ভেতর দিয়ে মস্তিষ্ক ভারমুক্ত করতে পারলেন, এটাই আপনার সুখ বা স্বস্তি।
জীবনভর আমি একজন ব্যর্থ লেখক হিসেবেই নিজেকে জানি। এটা স্বীকার করেই নিয়েছি। অবসর থাকলে বা এমনিতেও হাজার রকমের ভাবনা মাথায় গিজগিজ করতে থাকে। সেসবের ভেতর থেকেই পরিণত হয়ে কোনোটা ছড়া, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ বা কোনোটা কবিতার রূপ ধরে আসে। আবার কখনও দেখা যায় ভিন্ন কিছু একটা যেটার কোনো নাম দিতে পারি না। তবু লেখাটা শেষ করার পর এক ধরনের সুখ, স্বস্তি বা আরাম নামের কোনও বোধে আক্রান্ত হই। কিছুদিন মস্তিষ্কে কোনও চাপ বোধ করি না। যেমন এই লেখাটা একটা সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের প্রকাশ বলেই বেছে নিয়েছু সামুকে। এখানে অনেকেই নিজের লেখাটি নিয়ে আক্ষেপ করতে পারেন। কষ্ট পেতে পারেন পাঠক নেই বলে। কিন্তু তারা তো এ কথা জানেন যে, অফলাইনেও অনেকে পড়েন। লগিন না করে বা ব্লগার না হয়েও অনেকে ব্লগ পড়েন। যাদের মন্তব্য করার সুযোগ থাকে না। লগিন না করেও মন্তব্য করার অপশনটা যোগ করতে পারেন প্রিয় সামু। যাই হোক, আপনার লেখায় নির্দিষ্ট বা আপনার পছন্দের ব্লগারের মন্তব্য নেই বলে দুঃখিত হবার কারণ দেখি না। "এই অমুক লেখাটায় মন্তব্য কর একটা। অমুক পোস্টে একটু মরিচ লাগিয়ে আয় তো! এই অমুকের কোনো লেখায় ক্লিক করবি না কিন্তু! এসব থাকলেও পাশ কাটিয়ে যান। এরা ঝরে পড়াদের দলে। আপনি যে লিখেছেন এটাই আপাতত গুরুত্বপূর্ণ।
হতে পারে আপনার পরিবারে আপনি একাই লেখালেখি করেন। আবার এমনও হতে পারে যে আপনি আপনার বংশে একমাত্র লেখক। যার আগে বিষয়টি নিয়ে কেউ ভাবেন নাই। সুতরাং পাঠক নেই ভেবে দুঃখিত হবার কিছু নেই। এমনিতেউ আপনি স্পেশাল একজন। এজন্য আর কেউ না থাকুক, আমার পক্ষ থেকে আপনাকে অভিনন্দন জানাই।
আমার পিতার সন্তানদের মাঝে আমি সহ আরও তিনজন লেখালেখির চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ১৯৮৬থেকে শুরু করে এখনও আমি লেখালেখিতে টিকে আছি। নাম কাম হলো না। লেখা বিক্রি হলো না। অর্থ এলো না। তাতে কি বা ক্ষতি? ব্যবসা কি সবাই পারে? সবাই বোঝে? মূলধন হারিয়ে ব্যবসা লাটে উঠে যাবার পরও অনেকের চেষ্টা জারি থাকে। তারপরও লেখালেখি করে মানসিক দিক দিয়ে অনেকের চেয়ে ভালো আছি না? লেখালেখি সুস্থ থাকারও একটা চমৎকার পথ।
প্রশ্ন হতে পারে এতটা লম্বা সময় ধরে লেখালেখির চর্চা করেও কেন পাঠকের কাছে বা লেখক সমাজে অজানা অচেনা থেকে গেলাম? এক কথায় জবাব, আমি পারি নাই। ছোটবেলা স্কুলের দৌড় খেলায় সবার পেছনে থাকতাম। এখনও তাই। সবাই সব কিছুতে সমান শ্রম দিলেও প্রাপ্তি এক রকম হয় না। পারা বা না পারার ব্যাপারটাকেও সময় দিতে হবে। এমন মুক্তিযোদ্ধা আছেন যিনি জীবদ্দশায় পাত্তা পান নাই সমাজে। কিন্তু মরে যাওয়ার পর ঠিকই রাষ্ট্র তাকে সম্মান দিয়েছে। সেদিকটাও দেখতে হবে। আর যদি আত্মতুষ্টির কথা বলেন, তাহলে বলবো যে, আমি লিখে অতৃপ্ত। অসন্তুষ্ট। তবে খুশি। সুখি।
একটা ঘটনার কথা বলি, তাহলেই হয়তো পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, আমার সাফল্যটা কোথায়? ২০০৬ সালে যখন সৌদি আরব যাই, তখন অফিস করার পর ঘুমানোর আগে লম্বা একটি সময় আমার কিছু করার থাকে না। কেবল ছটফট করি পড়তে। কিছু লিখতে হাত নিশপিশ করে। আমার চার পাশে খেটে খাওয়া প্রচুর পরিশ্রম করা মানুষ। যাদের বিনোদন বলতে টেলিভিশন, ভিডিওতে গান বা সিনেমা দেখা আর কিছু না হলে তাস খেলে সময় কাটানো। এত লোকের ভিড়ে থেকেও আমি একাকীত্বে ভুগি। লিখতে হলে আমার জন্য পরিবেশ চাই। যত সুনসান হবে ততই ভালো হয় আমার জন্য। একদিন আবিষ্কার করি যে, কিচেনে রাতভর আলো জ্বলে। সবাই রান্না খাওয়া শেষ করে চলে গেলে চারপাশ নিঝুম হয়ে আসে। কিন্তু কিচেনে তো এসি থাকে না। প্রচণ্ড গরম। তাতে কি! কাগজ কলম নিয়ে বসে যাই। সবার অগোচরে লিখে বেরিয়ে আসি। এভাবেই আবার আমার নিজের একটা জগত পেয়ে গেলাম। এই যে লেখাটা টাইপ করছি মোবাইলে। আমি আনন্দ পাচ্ছি।
২০০৭এর দিকে অফিসে ইন্টারনেট সংযোগ এলো। কাজের ফাঁকে লুকিয়ে লুকিয়ে ব্রাউজ করি। বাংলা লেখার মাধ্যম খুঁজি। পিডিএফ আকারে বই খুঁজি। বাংলাবুক ডট কম নামে একটি সাইটে আমার লেখা বেশ কটি উপন্যাস আপ করি। আর সুখি সুখি ভাব নিয়ে নতুন নতুন উপন্যাস লিখতে থাকি। কিন্তু পাঠকের কোনো রেসপন্স পাই না। রাতে গরমে সিদ্ধ হতে হতে লিখতে থাকি। ততদিনে অবশ্য বুঝে গেছি যে, আমিও স্ক্র্যাপ মাল। আমাকে দিয়ে কিছু হওয়া অসম্ভব। তবু না লিখে থাকতে পারি না।
২০০৮ - ২০০৯এ পেয়ে যাই সচলায়তন আর সামুকে। নিক্বণ নামের উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে পোস্ট করতে থাকি সেখানে। পাঠকের চোখে আমার লেখার ত্রুটিগুলো দেখতে পাই। আমি আবার সরব হয়ে উঠি। সামুতেও বিভিন্ন লেখা পোস্ট করতে থাকি। নিজে হালকা বোধ করি। বই মেলায় বই বের করি। বিক্রি নাই। তাতে আক্ষেপও নাই। বইয়ের জগতে নিজের অবস্থান পরিষ্কার দেখতে পাই। তবু লেখালেখি বন্ধ করতে পারি না। জুলিয়ান সিদ্দিকী লিখে গুগুলে সার্চ দিলে অনেক কিছুই আসে। আপাতত এটাই আমার সান্ত্বনা।
সামুতেই একদিন লেখক ব্লগার মুরাদুল ইসলাম জানালেন, তার প্রবাস জীবনে আমার প্রথম দিককার সে সব পিডিএফ সাহিত্য তার বাংলা পড়ার তৃষ্ণা মেটাতে ভালো ভূমিকা রেখেছে। এমন তৃষিত অনেক পাঠকের কথা আমি না জানলেও তাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করবো কীভাবে? তাই লেখালেখিতে আমার ক্লান্তি নেই।
কাজেই আবারও বলি, আপনি লেখালেখি চালিয়ে যান। ফলাফল প্রত্যাশা না করেই। আপনার লেখা ভালো না খারাপ তা বিচারের দায় আপনার না। আমি জানি আপনি আপনার সেরা লেখাটাই দিচ্ছেন। লিখে যে আনন্দ পাচ্ছেন, সাময়িক ভাবে তৃপ্ত হচ্ছেন, এটাই আপনার বড় প্রাপ্তি। এ কথাটা তো জানেন যে, সময় অনেক অলস আর খেয়ালীও কম না। বিচার করতে অনেক সময় নেয়। এই দেখেন না, আন্তন চেখভ ভেবেছিলেন, তার লেখাগুলোর আয়ুকাল বছর সাতেক হতে পারে। কিন্তু তিনি যদি মৃত্যুলোক থেকে এসে নিজের সাহিত্য কর্মের অবস্থা দেখতে পেতেন, তাহলে নিজের প্রতি অবিচার করা বা হীন ধারণা পোষণের জন্য কিছুটা হলেও লজ্জিত হতেন বলে মনে করি।
তো লেখক, আপনি কি এখনও এই ভেবে কষ্ট পাবেন যে, আপনার লেখার পাঠক নাই? তাহলে শুরুতে যে কবিতাটি লিখেছি, তার শেষের দুটো লাইন আবার দেখে নিতে পারেন এবং কবিতাটির জন্য একটি চমৎকার শিরোনাম দিলেও দিতে পারেন।
(ঘষামাজা ছাড়া মোবাইলে কম্পোজ করে ব্লগর ব্লগর ক্যাটেগরিতে লেখাটি প্রকাশ করা হলো।)
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২০ বিকাল ৫:৫০