আমার পিসি অন থাকা মানে অবিরাম গান বাজতে থাকা।
অহনার সাথে যখন খুব বেশি বেশি কথা হতো, দীর্ঘ সময় ধরে, মাঝে মাঝে সে বলতো, তোর কাছে কি তোর গানই বড়ো, নাকি আমি বড়ো?
তুইই বড়ো। আমি ইন্সট্যান্টলি বলতাম।
তাহলে তোর গান বন্ধ কর। একটুসখানি ঝিম মেরে বসে থেকে গম্ভীর স্বরে অহনা অনুজ্ঞা করতো।
কিন্তু আমি ভলিয়্যুম আরো বাড়িয়ে দিয়ে বলতাম, তুই এই গানটা শোন। এমন মাধুর্যমাখা গান তুই জীবনেও শুনিস নি। তারপর, মোবাইলটা পিসির স্পিকারের সামনে বসিয়ে রাখতাম, যতক্ষণ গানটা বাজতো। গান শেষ হলে কানের কাছে মোবাইল নিতে গিয়েই দেখতাম লাইন কেটে দিয়ে অহনা পগার পার।
এরপর অভিমান করে অহনা আর কল করতো না; যে মেয়ে প্রতিটি নিশ্বাসের সাথে মিস্ডকল দেয়, আর মিস্ডকল দিতে দিতে মোবাইলের বাটন ক্ষয় করে ফেলে, সেই মেয়েই একটানা দু-তিনদিন ধরে আর মোবাইলই অন করে না।
ওর সাথে গান আর কবিতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা আর বিতণ্ডা হতো; মোবাইলেই। মোবাইল কোম্পানিগুলো প্রতি মিনিটে ২৫ পয়সা কলরেট করেছিল আমাদের কল্যাণের কথা ভেবে। হেন কোনো গান নেই যা ওর জানা নেই, কী সুর, কী তার অন্তরা। আমার পড়া হেন কোনো কবিতা নেই যা ওর আজও পড়া হয় নি; আর ও যেসব কবিতা পড়েছে আর আমি তা পড়ি নি, তার তালিকা অনেক অনেক দীর্ঘ। কথায় কথায় ও রেফারেন্স টেনে বলতো, তুই কি ঐ বইটা পড়েছিস?
কোনটা?
মেমসাহেব?
না?
মেঘনাদবধ?
না?
বঙ্কিমচন্দ্রের সব বই পড়েছিস?
না।
রবীন্দ্রনাথ? বিদ্যাসাগর? শরৎচন্দ্র?
শরৎচন্দ্রের অর্ধেকের মতো পড়েছি।
হুমম! এই পড়া নিয়েই তুই বই লেখা শুরু করেছিস?
আমি তো হুমায়ূন আহমেদের কোনো বই বাদ রাখি নি।
তুই একটা বাচ্চা পুলা। হুমায়ুন আজাদের বই পড়েছিস?
অল্প কয়েকটা।
তুই এক কাজ কর, আগামী ১০ বছর তুই লেখালেখি বন্ধ রাখ। এই দশ বছরে এদের বইগুলো আগে পড়। পড়াশোনা না করে লিখিস বলে তোর লেখা মাকাল ফলের মতো।
আমি ক্ষেপে গিয়ে বলি, ঐ পণ্ডিতনি, তুই তো অনেক পড়েছিস, তাহলে আমার মাকাল ফলের মতো একটা ফল প্রডিউস করে দে।
তখন তো তোর কপাল পুড়বে।
আচ্ছা, আমাদের জাতীয় সঙ্গীত কার লেখা যেন?
অহনা হেসে দিয়ে বলতো, তুই কি আমার টেস্ট নিচ্ছিস?
বল না।
কেন, রবীন্দ্রনাথের লেখা।
তাহলে শূন্যস্থান পূরণ কর : ওমা ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে.... এর পরের লাইনটা কী?
অহনা চুপ করে থাকে।
কী, পারিস না?
স্যরি রে, জাতীয় সঙ্গীত আমার পুরোটা মুখস্থ নেই।
পণ্ডিতনি! খুব তো ঝাড়লি এতক্ষণ। তোর তো দেখি ‘ষোলো আনাই মিছে।’
তোর কি পুরোটা জানা আছে?
শুধু জানাই না, পুরোটা সুর করে গাইতেও পারি।
আমাকে একটু শোনা না ভাই!
আমি পুরোটা গাই : আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি....
অহনার মুগ্ধতা আমায় কী যে অনুপ্রেরণা দিত! যে জিনিসটা ওর জানা নেই, অথচ আমি জানি, তা ওকে জানিয়ে আমি দিগ্বিজয়ীর সুখ পেতাম, আর তাতে ওর মুগ্ধতা বেড়ে যেত তরতর করে, আমার প্রতি। আমার ভাঙা আর কাঁচা কণ্ঠে ‘আমার সোনার বাংলা’ শুনে অহনা বললো, গানটা এর আগে অ্যাসেম্বলিতে অনেক শুনেছি। রেকর্ডেও শুনেছি। কিন্তু এত ‘সুন্দর’ লাগে নি। তুই খুব চমৎকার গেয়েছিস।
এই গানটা শুনেছিস?
কোনটা?
যেটা সবসময় তোকে শোনাই?
তুই তো কত গানই আমাকে শোনাস। কোনটার কথা বলবো?
তুই একটা কালা।
কেন? কেন বললি একথা?
কারণ, ইদানীং এই গানটা প্রায় রাতদিন ধরেই বাজিয়ে থাকি। আর এটা তোর কানে ঢুকলো না?
অসভ্যর মতো কথা বলছিস কেন?
স্যরি।
নে, গানটা আবার শোনা।
আমি গানটা আবার শোনাই।
গান শুনে অহনা যথারীতি মুগ্ধ হয় আর অবাকও হয়। বলে, এ গানটা আমি তোর কাছেই প্রথম শুনলাম। আরেকবার শোনা তো। আমি আরেকবার পিসিতে গানটা শোনাই, আর তৃপ্তিতে আপ্লুত হয়ে উঠি।
কার কণ্ঠ রে?
শিল্পীর নামটা জানা নেই।
সন্দীপন?
আমি তো সন্দীপনের কণ্ঠ চিনি না। ওর গান শোনা হয় নি।
পবন দাশ বাউলও হতে পারে।
আমি তাঁর গানও শুনি নি।
তুই কার গান শুনেছিস?
এত ঝাড়ি মারিস কেন, কথায় কথায়? তুই কি ঝাড়ুদার?
অহনা নরম হয়ে বলে, গানটা আমার খুব খুব খুবই ভালো লাগলো। আরেকবার ছাড় তো।
এভাবে অনেক অনেক বার, অনেক অনেকদিন শিল্পীর নাম না-জানা এ গানটা আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনেছি। একদিন অহনা জিজ্ঞাসা করে, তোর মনে কি খুব দুঃখ?
কেন?
এই গানটা যে এত শুনিস, তাই বললাম। আমার মনে হয় জীবনে কেউ তোকে ঠকিয়েছে, বা ঠকাচ্ছে। যাই হোক, মনে কোনো দুঃখ রাখবি না, বুঝলি?
হুম!
পিসিতে গানটা ছেড়ে দিই, সুরের ভুবনে হারিয়ে যেতে যেতে কাউকে-না-বলা দুঃখটা ভুলে যেতে চেষ্টা করি।
তোরে রাং দিল কি সোনা দিল, তুই পরখ কইরে দেখলি না
গুরু তোরে কী ধন দিল চিনলি না মনা
গুরু দিল খাঁটি সোনা
রাং বইলে তোর জ্ঞান হইল না, ওরে দিনকানা
ওরে উপাসনা বিনে কি তোর মিলিবে রে রুপাসোনা
গুরু তোরে কী ধন দিল চিনলি না মনা
তোরে রাং দিল কি সোনা দিল
চণ্ডীদাস আর রজকিনী
তারা প্রেমের শিরোমণি, রাং কইরাছে সোনা
তারা এক প্রেমেতে দুইজন মইলো, এমন মরে কয়জনা
গুরু তোরে কী ধন দিল চিনলি না মনা
তোরে রাং দিল কি সোনা দিল, তুই পরখ কইরে দেখলি না
গুরু তোরে কী ধন দিল চিনলি না মনা
৭ জুলাই ২০০৯