শিরোনাম দেখে অনেকেই আৎকে উঠতে পারেন। রোগীর অধিকার, সেটা ঠিক আছে, কর্তব্যটা আবার কি!!
কর্তব্য তো সব হিপোক্রিটাস শপথের নামে ডাক্তারের কাধে চাপানো আছে!
রোগীর কাধে আবার কিসের দায়িত্ব!
বাংলাদেশের সংবিধান পড়েছেন কি?
অনেকেই পড়েছেন, পুরোটা না হলেও আংশিক হলেও পড়েছেন। নিজের ইচ্ছায় না পড়লেও স্কুল জীবনে পৌরনীতিতে পড়েছেন। অবশ্য ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।
সে যাই হোক। নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে আপনার অধিকারগুলো কি কি, জানা আছে কি?
কিছু কর্তব্যও কিন্তু আছে আপনার নাগরিক হিসেবে।
আর এই অধিকার-কর্তব্যগুলো একটা আরেকটার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
যেমন, আপনার যেটা অধিকার, কারো না কারো জন্য সেটা কর্তব্য। তেমনি আরেকজনের জন্য যেটা অধিকার, আপনার জন্যও সেটা কর্তব্য।
স্বাস্থ্য সেবাগ্রহীতা হিসেবে আপনার কিছু অধিকার রয়েছে স্বাস্থ্য সেবাদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নিকট।
তেমনিভাবে আপনারও কিছু কর্তব্য আছে স্বাস্থ্য সেবাদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি।
আমি সংক্ষেপে এই লেখাতে স্বাস্থ্য সেবাগ্রহীতা হিসেবে আপনার-আমার কি অধিকার ও কর্তব্য, সেটা তুলে ধরার চেষ্টা করব।
বিশ্বের প্রতিটি দেশের আইনেই এগুলো সুনির্দিষ্টভাবে প্রত্যয়ন করা আছে।
অতিসম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারও আইন কমিশনের মাধ্যমে উদ্যোগ নিয়েছে এই অধিকার ও কর্তব্যগুলোকে সুনির্দিষ্ট একটি নীতিমালায় আনতে। আশা করা যায় অচিরেই আমরা সেবাদাতা-গ্রহীতা উভয়ের জন্যই কল্যানকর এরকম একটি আইন পেতে যাচ্ছি ইনশাআল্লাহ্।
আমি এই লেখার পয়েন্টগুলোর মূল সূত্র হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল এথিক্স গাইডলাইন, জন হপকিন্স মেডিকেল হাসপাতাল ও অস্ট্রেলিয়ান নিউ সাউথ ওয়েলস হেলথ এক্ট এর তথ্যগুলো ব্যবহার করেছি। আপনারা চাইলে ইন্টারনেট থেকে আরো বিস্তারিত জানতে পারবেন।
মূল আলোচনায় চলে আসি।
স্বাস্থ্যসেবাগ্রহীতার অধিকার সমূহ :
১. ধর্ম-বর্ন-গোত্র-জাতি-লিংগ-রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার অধিকার আপনার রয়েছে।
২. স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে জরুরী ও রুটিন সব ধরনের প্রাথমিক সেবা পাওয়ার অধিকার আপনার রয়েছে।
৩. নিরাপদ পরিবেশে নিরাপদ সেবা পাওয়ার অধিকার আপনার আছে।
এখানে কিছু কথা বলা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার জন্য নিরাপদ পরিবেশ বলতে কি বুঝেন আপনি?
নিরাপদ পরিবেশ হল, আপনি ও আপনার সেবাদাতার নিয়মিত সেবা কাজে কোন প্রকার শারিরীক বা মানসিক প্রভাব কেউ খাটাবে না। অর্থাৎ কোন প্রকার ভীতি কারো মনে থাকবে না। আপনি নির্ভয়ে সেবা নেবেন আর আপনার সেবাদাতা নির্ভয়ে সেবা দেবেন।
আর নিরাপদ সেবা হল, সেবাদানকারী যথাযথ লজিস্টিকাল সাপোর্ট নিয়ে তার জ্ঞান ও দক্ষতার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করবেন তার কাছ থেকে সেবাগ্রহীতার স্বাস্থ্যের সর্বোচ্চ উন্নতির জন্য, সততার সাথে।
বাস্তবে এখন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কি দশা?
সেবাদাতা সেবাগ্রহীতার হাতে নিগৃহীত হবার ভয়ে থাকেন আর সেবাগ্রহীতা ভয়ে থাকেন অপচিকিৎসার!
এই ভয়টাই সেবাদাতাদের সাথে গ্রহীতাদের মাঝে দিন দিন একটা দূরত্ব তৈরী করছে। আর ফায়দা তুলছে তৃতীয় পক্ষ যেমন, কিছু তথাকথিত নাম স্বর্বস্ব হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক আর বিদেশী দালাল।
কিন্তু এই দূরত্ব কমিয়ে আনার দায় একা সেবা দাতার বা শুধু সেবা গ্রহীতারও না। দু পক্ষকেই সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
আপনাকে বিশ্বাস রাখতে হবে সেবাদাতার কথা ও কাজের ওপর, তাকে নিরাপত্তা দিতে হবে। আর সেবাদাতাকে মর্যাদা দিতে হবে তার প্রতি গ্রহীতার বিশ্বাসের।
৪. একজন রোগী হিসেবে এথিক্স অনুযায়ী আপনার প্রাপ্য মর্যাদা ও সদাচার আপনি পাওয়ার অধিকার রাখেন।
তার মানে এই নয় যে আপনি বড় কোন হোমরা-চোমরা বলে আলাদা খাতির প্রাপ্য হবেন। বরং এথিক্স অনুযায়ী সকল রোগীর ন্যায় একই মানবিক সুবিধাদি ও আচরন প্রাপ্য হবেন।
৫. আপনার চিকিৎসার সাথে সংশ্লিষ্টদের ব্যাপারে জানার অধিকার আছে আপনার। আপনি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মান, সেবাদানকারীর পেশাগত ডিগ্রী সম্পর্কে জানার অধিকার রাখেন।
৬. হাসপাতালে আপনি ভর্তি থাকাকালীন সময়ে আপনার সাথে সর্বোচ্চ একজন ব্যক্তি সার্বক্ষণিক অবস্থানের অনুমতি পাবার অধিকার রাখেন।
তবে, আপনি সেই ব্যক্তিকে রাখার অধিকার হারাবেন যদি সেই ব্যক্তি অন্য কোন রোগী/রোগীর অনুসংগী/সেবাদানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কারো জন্য হুমকি স্বরূপ হন বা অসদাচরন করেন।
৭. আপনার কোন আত্মীয় আপনি হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালে আপনাকে দেখতে হলে আপনার অনুমতি নিতে হবে। আপনি অনুমতি না দিলে দেখা করতে পারবেন না।
তবে অবশ্যই সেটা হবে হাসপাতালের স্বীকৃত স্বাক্ষাৎকালীন সময়ের মধ্যে।
৮. আপনি আপনার যে কোন একজন নিকটাত্মীয়কে আপনার “আইনগত অভিভাবক” নিয়োগ করতে পারবেন, যিনি আপনার সিদ্ধান্ত দিতে অক্ষমতার সময় আপনার পক্ষে আপনার চিকিৎসার বিষয়ে যে কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন।
৯. আপনার বা আপনার আইনগত অভিভাবকের লিখিত বা ন্যূনতম মৌখিক সম্মতি ব্যতীত কোন চিকিৎসক বা সেবাদানকারী আপনার চিকিৎসা শুরু করতে পারবেনা।
১০. আপনার চিকিৎসা বিষয়ক সকল তথ্যাদি যেমন, রোগের বিস্তারিত বিবরন, চিকিৎসা পদ্ধতি, সুবিধা-অসুবিধা, চিকিৎসা ব্যয়, ভবিষ্যত কি হতে পারে ইত্যাদি বিষয়ে সেবাদানকারীর নিকট থেকে জানার অধিকার রয়েছে আপনার ও আপনার আইনগত অভিভাবকের।
১১. আপনার স্বাস্থ্য ও রোগ বিষয়ক সকল তথ্য আপনার একান্ত গোপনীয় বিষয়। তাই এই তথ্যের যথাযথ গোপনীয়তারক্ষার দায়িত্ব সেবাদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের।
তাই যখন তখন, যাকে তাকে আপনার শারিরীক অবস্থা সম্পর্কে তথ্য দেয়া যাবে না। শুধুমাত্র আপনাকে ও আপনার আইনগত অভিভাবককেই এ ব্যাপারে অবহিত করা হবে।
শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে আদালতের আদেশে তা আদালতকে জানানো যাবে।
১২. আপনি ও আপনার পরিবার আপনার চিকিৎসার ব্যাপারে সবরকম সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার রাখেন। তবে এই ক্ষেত্রে, চিকিৎসকের পরামর্শ উপেক্ষা করে অন্য কোন ব্যবস্থা গ্রহন করলে বা হাসপাতাল থেকে নিজ থেকে চলে গেলে, সেবাগ্রহীতার কোন ক্ষতি হলে সেবাদাতা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এর কোন দায় দায়িত্ব বহণ করবে না।
১৩. সেবার বিষয়ে আপনার কোন উপদেশ-অভিযোগ থাকলে সরকার বা প্রতিষ্ঠানের যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর সমস্যা জানিয়ে আবেদন করুন, এটিও আপনার একটি অধিকার।
কিন্তু ভুলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। সেবাদানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উপর চড়াও হবেন না। তখন সমস্যায় পড়ে যাবেন আপনি নিজেই।
১৪. হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে আপনার ছুটি ও ছুটির পর বাড়িতে বাকি চিকিৎসা ও পরবর্তী ভিজিটের বিষয়ে জানার ও পরামর্শ করার অধিকার আপনার আছে।
১৫. আপনার চিকিৎসা সম্পর্কে কিছু জানার বা বোঝার থাকলে সেবাদানকারীর কাছে জানতে চাইবার অধিকার আপনার রয়েছে। যে কোন সমস্যা হলে সেটাও জানাবার অধিকার আছে।
সেবাদাতা সেই বিষয়ে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করবেন।
১৬. হাসপাতালে আপনার সম্পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা আছে। পারষ্পরিক শিষ্টাচার বজায় রেখে সবাই যে যার ধর্মীয় বিষয়াদি পালনের অধিকার রাখেন।
অনেক অধিকার, তাই না?
অবশ্যই।
বলা হয়ে থাকে যে, রোগীই হল মেডিকেল সায়েন্সের কেন্দ্র বিন্দু।
এবার আসি কর্তব্যের ব্যাপারে।
১. আপনার রোগ সংক্রান্ত সকল তথ্য সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারীকে অবশ্যই সম্পূর্ণভাবে অবহিত করা আপনার দায়িত্ব। কোন তথ্য গোপন করবেন না। আপনার গোপনকৃত তথ্যের কারনে আপনার চিকিৎসায় কোন ব্যত্যয় ঘটলে এর সম্পূর্ণ দায় আপনাকেই নিতে হবে।
২. আপনার পূর্ববর্তী সকল মেডিকেল রেকর্ড সেবাদানকারীকে দেয়া আপনার দায়িত্ব।
৩. হাসপাতাল একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। সর্বদা এর নিয়ম-কানুন মেনে চলা আপনার ও আপনার অনুসংগীদের জন্য দায়িত্ব। হাসপাতালের নিয়ম শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে আপনাকেই এর দায় নিতে হবে।
৪. হাসপাতালে আগত সকল সেবাগ্রহীতা এবং তাদের অনুসংগীদের প্রতি সদয় ব্যবহার করা ও কোনপ্রকার অসদাচরণ থেকে বিরত থাকা আপনার কর্তব্য।
৫. হাসপাতালের সকল স্টাফ, সেবাদানকারীর প্রতি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার করা আপনার ও আপনার অনুসংগীদের কর্তব্য।
৬. আপনার চিকিৎসা ব্যয়, চিকিৎসার ভবিষ্যত খরচ এবং আপনার সামর্থ্যের সামঞ্জস্যতা সম্পর্কে আইডিয়া রাখা আপনার দায়িত্ব। সামর্থ্যের ব্যাপারে সীমাবদ্ধতা থাকলে সেবাদানকারীকে খুলে বলুন, বিকল্প সেবাস্থলের ব্যবস্থা করার ব্যাপারে তাদের সহায়তা নিন।
৭. আপনার সুচিকিৎসার স্বার্থে সর্বদা চিকিৎসা বিষয়ে আপনার সেবাদানকারীর সকল উপদেশ সময়মত মেনে চলাও আপনার দায়িত্ব।
৮. রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রেসক্রিপশন ব্যতীত ফার্মাসী বা কোয়াকের পরামর্শে একটি ব্যথার ঔষধ এবং এন্টিবায়োটিক ও খাবেন না। এটি আপনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্তব্য, শুধু সেবাদানকারীদের প্রতি নয়, সমগ্র জাতির প্রতি।
স্বাস্থ্য একটি সমন্বিত বিষয়।
আপনার-আমার স্বাস্থ্যের সাথে একজন কৃষক-দিনমজুর থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী-আইনশৃংখলা রক্ষী বাহিনী-ব্যাংকার-চিকিৎসক-হাসপাতাল-জনপ্রতিনিধি সবাই কোন না কোন ভাবে জড়িত।
তাই, আসুন, সবাই যে যার যার জায়গা থেকে অধিকার ও কর্তব্য সচেতন হই, এদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতিতে সহায়ক ভূমিকা রাখি, আপনার-আমার ভবিষ্যত প্রজন্মের ভালোর জন্য, একটি সুখী-সুস্থ্য জাতি গঠনের জন্য।
সবাইকে শুভকামনা।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মে, ২০১৬ সকাল ৮:০৬