প্রতি বছর বিশেষ বিশেষ রাষ্ট্রীয় দিবস আসলেই আমাগো দেশের আবহাওয়া পুরা চেঞ্জ হইয়া যায়। তখন আমাগো দেশের মানুষগুলিরে মোটামুটি দুইখান ক্যাটাগরীতে ফালান যায়। এক হইলো এইসব দিবসে যাগো কিছু আইবো যাইবো না, যারা দিন আনে দিন খায়, মোট কথা এই দিনগুলিতে যাগোর জীবনযাত্রার কুনো চেঞ্জ হইবো না। আর এক হইলো যাগো এইসব দিবস লইয়া ছোট বড় বিভিন্ন পরিকল্পনা থাকে, মানে হ্যাগো কাছে এই দিনটা "নয় অন্য সবদিনের মত"। এর মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের এর নেতা-কর্মী, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্য ও কর্মী আর বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি আর তাদের সেবা গ্রহীতারা তো আছেই, এগো লগে আরো আছে ছাড়া গরুর মত এই দেশের "নবীন প্রজন্ম" মানে আমরা।
এই দেশে পলিটিকাল অর্গানাইজেশনের সংখ্যা নেহাৎ কম না। কথায় বলে, দুনিয়ায় কোন বিষয়ে দুইজন পন্ডিত কখনো একমত হইতে পারেনাই, আর বাংগালীর মত পন্ডিত দুনিয়ায় আর কই পাইবেন, এল্লেইগাই তারা প্রায় প্রতি বিষয়ে দ্বিমত পোষন করে। আর যখন দেখে আরেকজনের লগে আর বনতাছে না তখন নিজেগো কিছু সাঙ্গোপাঙ্গো লইয়া নতুন দল খুইলা ব'য়।
বাঙ্গালীর মধ্যে মনে হয় শিয়াল স্বভাব অতি প্রবল, ঐ যে এক শিয়ালের ডাক শুনলেই আর কথা নাই, সব শিয়াল একলগে ডাক পাইড়া উঠে, তাই দেশে বিশেষ বিশেষ দিবসের "ডাক" আসলেই এইসব রাজনৈতিক নেতা-পাতি নেতারা গা ঝাড়া দিয়া উঠে,তা সেই দিবস হ্যাগো রাজনৈতিক আদর্শের লগে মিলুক আর নাই মিলুক। তখন হ্যারা বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে লয়-মিটিং মিছিল, আলোচনা সভা আরো কত কি! আর ফুল দেওয়া তো আছেই(লগে ফোটু খিঁচার কতাডা ভুইলা যাইয়েন না, হের লিগাই তো এত কষ্ট কইরা...)। তা, হ্যাগো কুনো দোষ দেখিনা, হাজার হোক পলিটিকাল লোক বইল্যা কথা, দেশের এত গুরুত্বপূর্ণ দিনে হ্যারা ঘরে বইসা থাকবো, তাও হয় নাকি?
এর পর ধরেন সাংস্কৃতিক সংগঠন গুলির কথা, এইসব দিনে তারাই বা পিছায়া থাকবো ক্যান? তাই তারাও গান, নাটক আবৃত্তি এইসব নানা অনুষ্ঠান নিয়া জনগনকে সচেতন করতে ঝাঁপায়া পড়ে। পাব্লিকেরও দু'শো মজা, খোলা ময়দানে, সঙ্গী বা সঙ্গিনীর হাত ধইরা, বাদাম-ফুচকা খাইতে খাইতে তাগো কি চৈতন্যোদয় হয় তা খোদাই মালুম। ফলাফল, যেই লাউ হেই কদু। তবে তা বইলা কি আর সংগঠনগুলি চেষ্টা করবো না? আর আমরাই বা এত নিমকহারাম কবে হইলাম যে অগোর এত কষ্টের অনুষ্ঠানে একটা "ক্ল্যাপ" পরযন্ত দিমু না?
এতো গেল পলিটিক্যাল আর কালচারাল গোষ্ঠীগো কথা। ভাবতাছেন এই সব দিবসের মধ্যে বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আইলো ক্যাম্নে? আছে, আছে, এইখানে তাগোও "ভাত" আছে। ক্যান, প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারী, ২৬শে মার্চ, আর ১৬ই ডিসেম্বর দেশের "ফ্যাশন হাউজ" গুলা কি বইস্যা থাকে? এই সব দিন আসার আগেই 'ঈদ কালেকশন', 'পূজা কালেকশন' এর মত হ্যারা বাইর করে "বিজয় দিবস কালেকশন", "মাতৃভাষা দিবস কালেকশন"-আর সেইগুলা চলেও সেইরকম। মোবাইল কোম্পানীগুলাও বইস্যা নাই, তারাও আছে এইসব দিনে তাগো স্পেশাল অফার নিয়া। টিভি চ্যানেল আর পত্রিকা গুলিও আসে 'বিশেষ আয়োজন' নিয়া, আর আল্লায় দিলে দেশে চ্যানেলের তো আর অভাব নাই, কোনটা থুইয়া কোনটার প্রোগ্রাম দেখমু-এই ধন্দে পইড়াই দর্শকের দিন শেষ। তা আমাগো আলুনি জীবনে আনন্দের বড় অভাব- ফুর্তিবাজ বাঙ্গালীরে যারা এক দুইটা এক্সট্রা উৎসব 'গিফটো' করলো, তাগো 'থ্যাঙ্কু' দেওয়াই উচিত আমাগো, তাই না?
একটা কথা, বাঙ্গালী যে 'হুজুইগ্যা' জাতি, একথা সবাই স্বীকার করবেন। আমাগো জাতিগত বৈশিষ্ট্য হইলো, যখন-তখন যে কোন একটা বিষয় লইয়া মাইত্যা উঠা। যেমুন, যে কোন কারনেই হোক গত ২-৩ বছর ধইরা বিশেষ বিশেষ দিবসে দাবি উঠে যুদ্ধাপরাধীগো বিচারের। তা, যুদ্ধাপরাধীরা তো এই দেশে হঠাৎ কইরা উদয় হয় নাই, গত ৪০ বচ্ছর ধইরা তারা এই দেশেই আছে, দেশের সম্পদ ধ্বংস কইরা যাইতাছে, তখন তো কারো মাথায় হ্যাগো শাস্তি দেওয়ার কথা আসে নাই। জানি, কি কইবেন, আরে, দেশে তো তখন উপযুক্ত পরিবেশ আছিলো না, তখন তো যুদ্ধাপরাধীরাই দেশের ক্ষমতায় আছিলো। তা যাউক, এতদিন পরে যে সবাই আবার এই দাবিতে সরব হইছে, সেইটা দেইখ্যা যারা সেই মুক্তিযুদ্ধের আমল থিকা যুদ্ধাপরাধীগো বিচার চাইয়া আসতেছে, হ্যাগো বুকটা নিশ্চয় আনন্দে ভইরা যাইতাছে।
কিন্তুক এর লগে ভয়ের কথাটাও আছে। কইতাছিলাম যে, আমাগো রাজনৈতিক নেতারা তো তাগো বিরোধী দলের করা কুন কাজ সইহ্য করতে চায় না। অখন সময় থাকতে থাকতে এই ভালা কাজটা শেষ কইরা যাইতে না পারলে যে পুরা খাটনীটাই মাঠে মারা যাইবো, এইটা মনে হয় গবরমেন্ট ছাড়া বেবাকেই বুঝে। বিচারের ক্ষেত্রে গবরমেন্ট এর গড়িমসি দেইখা সকলেরই এই কথাই মনে আইবো। আর একবার বিচারের কাম বন্ধ হইয়া গেলে তা কত বছর পরে আবার শুরু হইবো, আর এই সময়ে বিচারের কাজ যারা করতাছে যুদ্ধাপরাধীদের হাত থিকা তাগো নিরাপত্তা কে দিব, এই বিষয়গুলিও ভাইবা রাখন দরকার। যাউক গা, মনের মধ্যে অযথা কুডাক ডাইক্যা কুনো লাভ নাই। আমরা সবাই এক্কেরে অন্তরের ভিতর থিকা চাই যে, যারা যুদ্ধের সময় দেশের লগে বেঈমানী করছে, হ্যাগো বিচার বাংলাদেশের মানুষখুব তাড়াতাড়িই দেখতে পাইবো।
এখন বিচারের 'উপযুক্ত পরিবেশ' তৈরী হওয়া নিয়া দুইখান কথা কই, এখন যেই গবরমেন্ট ক্ষমতায় আছে, হেরা যহন ইলেকশন করছিলো, তহন পাব্লিকরে 'ওয়াদা' করছিলো যে ক্ষমতায় আইলে হ্যারা এই বিচার করব। এই ইলেকশনে 'নতুন ভোটার' ই আছিলো অনেক, তাই বলা হয় যে এই ইলেকশনের মাধ্যমে 'নতুন প্রজন্ম' যুদ্ধাপরাধীদের বিপক্ষেই তাগো রায় ঘোষণা করছে, মানে হইলো নতুন প্রজন্ম মানে আমরাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের 'পরিবেশ' সৃষ্টি কইরা দিছি। আহা, কত সুন্দর কথা, শুনলেও কত শান্তি লাগে, দ্যাশের এত বছরের ঋণ শোধ করার ব্যবস্থা কিনা কইরা দিলাম আমরা-এই হেইদিনকার পোলাপান?
এখন এইখানে দুইখান কথা আছে। এই ইয়ং জেনারেশনের মধ্যেও দুইটা ভাগ আছে, একভাগ-পুরাই আন্ধারে, এইসব বিশেষ দিবসে তাগো কিছুই আসে যায় না, তারা এইগুলিরে দেখে 'ক্লাশ শিডিউলের' মাঝে একটা ছুটির দিন হিসাবে, তাগো আচরণ দেইখা আপনার আমার যে কারো মনে হইতে পারে, যে '৭১ সালে যে মুক্তিযুদ্ধ কইরা দেশ স্বাধীন হইছিলো, আর এই জন্য যে ৩০লক্ষ লোক শহীদ হইছিলো, এইটাও তাগো 'ইয়াদ' নাই। এগোরে নিয়া চিন্তা কইরাও আমাগো কুন লাভ নাই।
এইবার আসি দুই নাম্বার ভাগে। এরা আবার বেশ সচেতন, এরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানে, বুকের মইধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশাল মমতা এবং রাজাকারগো জন্য ঘৃণা লালন করে, এবং রাজাকারদের বিচার চায়। বিচার তো চাইবোই, এত মানুষ বিচার না চাইলে কি এখনকার গবরমেন্ট ক্ষমতায় আইতে পারতো? এগো অনেকেরই 'ফেসবুক' নামের দুনিয়ায় বিশাল 'সংসার' আছে, এবং এইসব বিশেষ দিবসে তারা 'ফেসবুক' এর দুনিয়ায় শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ কইরা প্রকাশ্য দিবালোকে রাজাকারগো মুন্ডুপাত করে(আহা, কী সাহস!!)। অবশ্য সত্যিকার দুনিয়ায় এরা কোন কাজ করার মধ্যে নাই, ভাবটা এমন "রায় তো দিয়া দিছি(ইলেকশনে), এখন বাকি কাজটা তোমরা কইরা লও না..."
আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কম-বেশী জানি, তারা জানি যে দেশরে শত্রুর হাত থিকা ছিনায়া আনছেন যেসব বীর মুক্তিযোদ্ধা, তারা কেউ ঘরে বইসা যুদ্ধ করেন নাই, তাদের হাতে ছিলো অস্ত্র, বুক ভরা ছিলো সাহস। এই শেষেরটাই দরকারী বেশী, কারণ, হাতের অস্ত্র কাইড়া নেয়া যায়, কিন্তু বুকের সাহস কেউ কাইড়া নিতে পারবো না, যতক্ষন জান আছে।
যাই হোক, লেখার শেষ দিকে আইস্যা পড়ছি। আমি নিজে এই ব্যাপারে কাজ করে এমন একখান সংগঠনের সাথে যুক্ত আছি, তবে এর জন্য আমি কখনই মনে করি না যে আমি বা আমরা দেশের জন্য বিশাল কিছু কইরা ফালাইছি, আমি শুধু মনেপ্রানে মানি যে আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাস করি তাগো উচিত অসম্পূর্ণ যুদ্ধটা নিজে নিজে ঘরে বইসা না কইরা, সবাই মিলা একসাথে করা, কারণ একশজন মানুষ যখন একসাথে হয়, তখন তাদের সাহসটাও একশগুন হইয়া উঠে, সফল হওয়ার সম্ভাবনাও একশ' গুন বাইড়া যায়।
বিঃদ্রঃ কাউরে ব্যক্তিগত আক্রমন করার জন্য এইটা লেখা না, কেউ কষ্ট পাইয়া থাকলে আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। --- প্রসেনজিৎ মন্ডল
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১০ রাত ৮:৫৫