উনার সাথে পরিচয় বোধহয় মিনিট দশেকেরও হবেনা। প্রচন্ড বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে দৌড়ে চারুকলার ভেতরে ঢুকে পড়েছিলাম। সময় কাটানোটাই যখন প্রশ্ন, তো ঠায় দাঁড়িয়ে অসময়ের ঝুম বৃষ্টিকে জোর করে উপভোগ করার অভিনয়ের চাইতে জয়নুল গ্যালারিতে চলমান একক চিত্রপ্রদর্শনীতে ঢুঁ-মারাটাই কাজের কাজ বলে মনে হলো।
চিত্রকলা ব্যাপারটাই ঠিক এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। খুবই খারাপ আঁকিয়ে ছিলাম সহপাঠি অন্যদের চেয়ে, ড্রয়িং স্যারের হাতে মারও খেতাম বেদম, তবুও কেন জানি ভালোলাগাটা তৈরি হয়েছিল সেই ছোট্টবেলাতেই, নিজে থেকেই অনেকসময় কিছু কিছু পড়ার চেষ্টা করেছি, বিভিন্ন সাইট ঘেঁটেছি, জীবনী পাঠ করেছি মহান শিল্পী অনেকের, ভ্রমনকাহিনি পড়েছি গোগ্রাসে তবুও আজো কোন ছবির সামনে দাঁড়ালে নিজেকে কেমন বোকা বোকা মনে হয়। তথাপি আকর্ষনটা কমেনি কখনো।
বাহ, আমার চোখে বেশ ভালোই লাগছে ছবিগুলো। গ্রামীণ পটে আঁকা ছবিতো অবশ্যই চোখজুড়ানো, কয়েকটা ছবির শিরোনাম পড়েই খুব সুন্দরভাবে ছবির বক্তব্যের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নেয়া যাচ্ছে, অনেক আঁকিবুকি আছে রঙের, বেশ লাগছিল। বেশ কয়েকটা ফিগার স্কেচ ছিল, কিউবিজমেও মনে হলো শিল্পী হাত মকশো করেছেন, নাহ বেশ ভালোই লাগলো।
শেষে এসে শিল্পীর নামটা দেখে ভ্রু কুঁচকালো আমার, নিজের মাঝে গেঁড়ে বসা পুরুষ মানসিকতা আমাকে অবাক হতেই বাধ্য করলো, ড্রয়িংগুলো তাহলে একটা মেয়ের!! এবার আরেকটু ভালো করে দেখার জন্য ন্যুড স্কেচ সেকশনের দিকে এগিয়ে গেলাম, (নাকি শেষবিন্দু থেকে পিছিয়ে)! যা হোক, মাথায় মূহুর্তেই দুষ্টবুদ্ধি খেলে গেল একটা, তেমন খোঁজার দরকার হলোনা, শিল্পী হলের মাঝামাঝি একটা টেবিল পেতে গোটা চারেক চেয়ার নিয়ে আরেকজনের সাথে গল্প করছেন। আমি গিয়ে দাঁড়ানোর মূহুর্তখানেক আগে ভদ্রলোক উঠে গেলেন, মিষ্টি হাসিতে শিল্পী জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে।
হালকা দু'চারটা কথার পরে আমি প্রশ্নটা করেই ফেললাম আর কৃত্রিম খেদে জানালাম, আপনি নারী হয়েও আরেকজন নারীর ন্যুড স্কেচ করেছেন, তা নিয়ে আমার কোন আপত্তির প্রশ্নই আসেনা, কিন্তু ফিগার ড্রয়িংয়ে বিশেষ করে ন্যুড ছবির ব্যাপারে পুরুষের অংশগ্রহন এত কম হলে চলবে কেন? উনি খুব স্বাভাবিকভাবেই অনেকটা আমার তথ্য সংশোধন করে দিচ্ছেন এমন ভঙ্গিতে বললেন, পুরুষের অংশগ্রহন একদম কম এটা কিন্তু ঠিক হলোনা। তবে আমাদের দেশে এমনতরো মডেল পাওয়াটাই মুশকিল, সে নারী-ই হোক বা পুরুষ
সেটা অবশ্য জানাই আছে আমার। এমন সময়েই এলো সেল্ফ প্রোর্ট্রেটের কথা, ফ্রিদা কাহলোর প্রসঙ্গেও আলাপ হলো, স্বনামধন্য চিত্রকর ডিয়েগো রিভেরির সাথে ফ্রিদার ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ অথচ আবেগময় সম্পর্ক নিয়েও কথা হলো, এল নারীর নানান সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গে, বিশেষ করে যখন চারুকলার মতোন বিষয়ে এদেশে কেউ তার ক্যারিয়ার গড়তে চান।
তো তেমন সময়েই অনেকটা আলাপে আলাপে জবাবের ধরনেই বেরিয়ে এল প্রশ্নটা আমার মুখে, "যদি আমি রাজি হই?", ফিক করে হেসে ফেললেন উনি। আর মূহুর্তের মধ্যেই বদলে ফেললেন মুখে ধরে রাখা কোমলতার ছাপটা, আমি কি বুঝতে পারছি, উনার উত্তরটা ঠিক কি আসছে এক্ষুণি?? তবে আমার মাথাটা শুন্য হয়ে গেল তাঁর কথার তীক্ষ্মতায়, "ধরুন, সবকিছু ঠিকঠাক মতোই এগুলো, একজন ন্যুড-মডেল হিসেবে আপনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে, তখন আমার নিরাপত্তাটা কি আপনিই নিশ্চিত করবেন?"

এতক্ষন আমি উনার সাথে চোখে চোখ রেখেই কথা বলে চলছিলাম, কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম কোন জবাব নেই জেনেই হঠাৎ করে আমার মাথা নিচু হয়ে যাচ্ছে আর শিল্পীর ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপের হাসি ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে, উনি কি করুনা করে বলছেন, হায়রে পুরুষ!!
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে অক্টোবর, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:০৫