প্রাগের এক সচ্ছল ইহুদি মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৮৮৩ সালে কাফকা জন্মগ্রহণ করেন। প্রাগের জার্মান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের পাঠ সমাপ্ত করেন ১৯০৬ সালে এবং একটি বীমা কোম্পানিতে কয়েক বছর চাকরী করেন। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন। পরবর্তীতে জীবনের অনিশ্চয়তা, ক্ষুধা এবং দারিদ্রপীড়িত হয়ে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে। পরবর্তীতে ১৯২৩ সালে এক প্রতিভাময়ী ইহুদি অভিনেত্রী “ডোরা ডাইমান্ট” এর সাথে পরিচয় হবার সুবাদে তিনি এই বোধ কাটিয়ে উঠেছিলেন। প্রাগ ত্যাগ করে তিনি তাঁর স্ত্রী কে নিয়ে বার্লিনে বসবাস করা শুরু করেন। পরবর্তীতে তৎকালীন সময়ের দুরারোগ্য ব্যাধি যক্ষ্মায় অসহ্য কষ্ট এবং যন্ত্রণা ভোগের পড়ে মাত্র ৪১ বছর বয়সে ১৯২৪ সালের মাঝামাঝি প্রতিভাবান এই লেখক মৃত্যুবরণ করেন।
এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে তিনটি বিখ্যাত উপন্যাস ( দি ট্রায়াল, দি কাসল এবং আমেরিকা) ছাড়াও অত্যন্ত উচ্চমানের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ সমৃদ্ধ কিছু ছোটগল্প রচনা করেছেন। তবে বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গনে কাফকার নামের সাথে যে গল্পের (মূলত উপন্যাসিকা) নাম ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে তা হলো – “মেটামরফোসিস” বা “রূপান্তর”। কোন কোন বিদগ্ধ সমালোচক এই গল্পের প্রথম বাক্যটিকে বর্ণনা করেছেন আধুনিক বিশ্ব সাহিত্যর সবচাইতে চমক সৃষ্টি করা বাক্য হিসেবেঃ
“নানা আজেবাজে স্বপ্ন দেখার পর একদিন সকালে ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠে গ্রেগর সামসা দেখলো সে এক বিশাল পতঙ্গে রুপান্তরিত হয়ে তার বিছানায় শুয়ে আছে।“
গল্পের নায়ক গ্রেগর সামসা একজন ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কর্মী। মধ্যবিত্ত পরিবারে সে তার বাবা-মা এবং তরুণী ছোট বোনকে নিয়ে থাকে। সংসারের সব দায়িত্ব তার হাতে। কঠিন জীবনযুদ্ধ, একঘেয়ে নিরানন্দ কাজ, দুশ্চিন্তা এবং তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার উদাসীনতা শর্তেও গ্রেগরের একটি লুকায়িত গর্ববোধ রয়েছে কেননা সেই সংসারটা চালাচ্ছে। ছোটবোনকে সে অসম্ভব ভালবাসে এবং তাকে সঙ্গীতবিদ হবার সুযোগ করে দিতে সে বদ্ধপরিকর। অপ্রত্যাশিত বাক্যটি দিয়ে গল্পটি শুরু হবার পড়েই পাঠকের চোখে গল্পের অগ্রগতির সাথে সাথে এই বিষয়গুলো ধরা পড়বে।
গ্রেগর সামসা প্রথমে ভেবেছিল পতঙ্গে রূপান্তরিত হবার ব্যাপারটা হয়তোবা তার “স্বপ্নের সম্প্রসারণ”। কিন্তু না, গ্রেগর আসলেই বড় একটি আরশোলায় পরিনত হয়। এই সময় লেখক গ্রেগরের যে বর্ণনা দিয়েছেন ঃ আরশোলায় রুপান্তরের পড়ে গ্রেগরের কি কি পরিবর্তন হয়েছিলো, কিভাবে সে তার অঙ্গপ্রতঙ্গ নাড়াচাড়া করবার কৌশল রপ্ত করলো- তার উজ্জ্বল বর্ণনা এক কথায় বিস্ময়কর, অসাধারণ।
আরশোলায় রূপান্তরের পড়ে গ্রেগর তার চেনা জগত থেকে এক সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তার বাবার এবং বোনের আচরন দিনে দিনে তাকে হতাশাতে নিমজ্জিত করে। গ্রেগরের ট্র্যাজিক অবস্থার উজ্জ্বল চিত্র ফুটে উঠে তার আদরের ছোটবোনের আচরন এবং দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে দিয়ে। তার করুন পরিনতি ফুটে উঠে গল্পের শেষ বাক্যটির মধ্যে দিয়েঃ
“......তার মাথা আপনা থেকেই মেঝের উপর লুটিয়ে পড়লো আর তার নাক থেকে নির্গত হলো তার শেষ নিঃশ্বাসের মৃদু মন্থর বায়ু”।
গল্পটি এক পর্যায়ে হয়তো অবিশ্বাস্য; কারন কোন মানুষই বাস্তবে আরশোলাতে রূপান্তরিত হতে পারে না! মানুষের হতাশা, কষ্ট, দুর্দশার এক উজ্জ্বল চিত্র ফুটে উঠেছে নায়ক গ্রেগরের মাধ্যমে। পতঙ্গে রূপান্তরিত গ্রেগরের প্রাত্যহিক জীবনের হতাশা তাই পাঠককে মুহূর্তেই নিয়ে যায় পরাবাস্তবতার জগতে।
“কাফকার গল্পসমগ্র” অনেক আগেই সংগ্রহে ছিল।“মেটামরফোসিস” এর নাম অনেক শুনলেও আগে এই গল্পটি পড়া হয়ে উঠেনি। যারা এখনও পড়েননি তারা পড়ে ফেলতে পারেন। এক ভিন্ন রকম পরাবাস্তব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হবেন এটুকু বলতে পারি।