পরী বিবির স্মৃতি পুরোপুরি ফিকে হয়ে যায়নি। লোক এখনও মাঝে মধ্যে কথা প্রসঙ্গে পরী বিবির রুপের তুলনা দেয়। তবে নওয়াব মহল পরিত্যক্ত হয়ে গেছে বহুদিন হল। যত্নের অভাবে মেঝেতে শ্যাওলা জমেছে, দেয়ালে ইতস্তত অশবথ। উড়িষ্যা থেকে বানিয়ে আনানো মহার্ঘ সেগুন কাঠের পালঙ্কটার ও অবস্থা প্রায় যায় যায়। এক কোনে সেটি ক্যাঁতরে পড়েছিল যক্ষ্মা রোগীর মত।
পরী বিবির খাস কামরাটা দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই পড়ে আছে। সুপারী বাগানের সাথে লাগোয়া খড়ি প্যাটার্নের জানালাটা দীর্ঘদিন জমাটই ছিল। সময়ের ঘুনপোকারা ক্রমান্বয়ে তাতে চিড় ধরায়। একদিন একটুকরো নবীন রোদ্দুর সেই ফোকর দিয়ে উকি মেরে ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। পাশের বর্ষীয়ান সুপারী গাছটা সেটা বুঝতে পেরে সন্ত্রস্ত কিশোরের চোখ চেপে ধরে।
পরদিন খুব প্রভাতে সেই কিশোর রোদ্দুরটি পা টিপে টিপে আবার ফিরে এল, সাথে কজন ভাইবেরাদর।
সারারাত ইনসমনিয়ায় ভুগে বুড়ো সুপারী গাছটা সে সময় অল্প অল্প ডুলছিল। নবীন রোদ্দুরের পায়ের শব্দ শুনে সে বিরক্তভাবে চোখ মেলে চেয়ে দেখে, তারপর পাশ ফিরে শোয়।
এরপর থেকে নবীন রোদ্দুর প্রায় প্রতিদিন নিয়ম করে পরী বিবির কামরায় আসা শুরু করলো। দীর্ঘদিনের আবদ্ধ কামরা প্রানের স্পর্শ পায়। নবীন রোদ্দুর সারাদিন ঘুরে ঘুরে কচি হাতে কামরার আসবাবপত্র ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে। পুরোনো রঙচটা পিয়ানোটায় মাঝে মধ্যে টুংটাং শব্দ হয়। সারাদিন-দুপুর পর্যন্ত চলে কিশোর রোদ্দুরের দুরন্তপনা।
বিকেলের দিকে তার দুরন্তপনা কিছুটা কমে আর সন্ধ্যা হলেই সে দলবল সমেত থুড়থুড়ে বটগাছটার ঝুরির ফাঁক দিয়ে ভোঁ দৌড় দেয় গড়ের মাঠটার দিকে।
নবীন রোদ্দুরে বিদায়ের পর ধূলিকণার দল ও আর সেখানে থাকার সাহস পায়না। হুড়মুড় করে ওরাও সব দলবেঁধে বের হয়ে আসে, বুড়ো সুপারী গাছটা কাশতে কাশতে অস্থির হয়ে পড়ে।
এরপর রাত নেমে আসলেই সবকিছু একেবারে নিঝুম, সুনসান।
নবীন রোদ্দুর কখনো সেগুন কাঠের সেই পালঙ্কটার নিচ পর্যন্ত যেতে পারেনি। বহুকাল ধরে সেখানে কোন প্রানের স্পন্দন কিংবা কম্পন অনুভূত হয়নি। এই যে আটলান্টিক সাগরের তলদেশ- লোকালয় থেকে সেটি কতদূর, কত অনতিক্রম্য। অথচ সেখানেও দিনরাত কত মাছ, বালিকনা কিংবা ক্ষুদ্র শৈবাল দিনরাত ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু নওয়াব মহলের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত পরী বিবির অতি প্রিয় সেগুন কাঠে বানানো পালঙ্কের নিচের জায়গাটির কোথাও এতটুকু আলোড়ন নেই। সময় এখানে একেবারেই বাকহীন, বধির... অর্থহীন।
বহুকাল আগে একবার অবশ্য এক নির্বোধ ইঁদুর কোথা থেকে যেন গটগট করে হেঁটে এসেছিল। পালঙ্কের ঠিক নিচটায় এসে গম্ভীরভাবে কি যেন একটা ভাবলো, তারপর যেমনটা এসেছিল, ঠিক তেমনটাই চলে গিয়েছিল।
আপাতদৃষ্টিতে সেই মাথামোটা ইঁদুরের আগমন-প্রস্থানের চিত্রটি এ গল্পে অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে, তবে সেই স্বল্পবুদ্ধির অপরিণামদর্শী ইঁদুরই কিন্তু আমাদের এ পর্যায়ে গল্পের মূল স্তরে প্রবেশ করাবে।
সেদিন সেই ইঁদুরটি তার যাত্রাপথের একপর্যায়ে একমুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল। খালি চোখে ব্যাপারটি অহেতুক কিংবা অকিঞ্চিৎকর মনে হলেও আপনি যদি চোখ কচলে আরেকটু গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করতেন, তবে দেখতে পেতেন পালঙ্কের নিচের জমাট আঁধারের মাঝে একটা অতি প্রাচীন সিলভারের কৌটো পড়েছিল।
এরপর দীর্ঘদিন ধরে আবার সবকিছু সুনসান। ইঁদুরটা আর কোনদিন ভুলেও এদিকটায় ফিরে আসেনি। নবীন রোদ্দুর যৌবনের সূচনালগ্নেই মেঘের প্রেমে মশগুল হয়েছে। পরী বিবির খাস কামরার প্রতি তার আর কোন আগ্রহ নেই।
বেয়ারা অসবথের শেকড় ক্রমান্বয়ে জানালার সেই ফোকরখানি বুজিয়ে দিতে থাকে। পরী বিবির খাস কামরা একসময় পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। নবীন রোদ্দুর, শিশু ধূলিকণা কিংবা স্বল্পবুদ্ধির মূষিকছানা- কেউই আর সেখান পর্যন্ত পৌছুতে পারেনা।
তবে মাঝে মধ্যে গভীর নিশীথে পশ্চিমের ঘাট থেকে তরুন বাঁশির সুর দুঃসাহসিক অভিযানে বের হয়ে সেই কৌটোর ধাতব দেয়াল পর্যন্ত পৌঁছে যেত। কিন্তু ততদিনে সেই নিঃসঙ্গ কৌটোটি যে একেবারে নিরাসক্ত হয়ে গেছে।
অশথের দলও এতোদিনে বুঝে গেছে- এ রাজ্যে তাদের আর কেউ আটকাতে আসবেনা। সর্বভুক রাক্ষসের মত গগনবিদারী উল্লাসে ওরা সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দেয়, সাঁড়াশির মত শক্ত শেকড়ে পিষে ফেলে মহলের বুড়ো ঝুরঝুরে ইটগুলোকে।
মহলের পতন একেবারে আসন্ন হয়ে গেছে, পুরোনো সিলভারের কৌটোটি ও বুঝতে পারে খুব শীঘ্রই সে চাপা পড়ে যাবে ইট কাঠের স্তুপের নিচে।
মাঝে মধ্যে খুব গোপনে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, আক্ষেপ করে। বহুদিন আগে ষোড়শী পরী বিবি কোন এক একান্ত দুপুরে এই কৌটোর ভেতরে এক টুকরো রেশমের রুমাল ভরে রেখেছিলেন, আর সেই সাথেই কৌটোর ভেতর বন্দি হয়ে গিয়েছিল পরী বিবির একটুখানি নিঃশ্বাস, চোখের জল আর আত্মার ছোট একটি অংশ।
এরপর প্রাসাদের পতন হয়েছে দীর্ঘদিন হল, বন্দী নওয়াবকে পাঠানো হয়েছিল আরাকান রাজ্যের জেলে আর পরী বিবি সম্ভ্রম বাঁচিয়েছিলেন প্রাসাদের পাঁচিল থেকে লাফিয়ে পড়ে।
শুধু সিলভারে সেই কৌটোটির কোন মুক্তি নেই, অন্তহীন সময় ধরে সে যেন কিশোরী রাণীর দীর্ঘশ্বাস বুকে ধারন করে বসে আছে।
ফার্সি ঠিকাদার ইমারত পোক্ত করার অভিপ্রায়ে ছাদের মাঝে মাঝে রেললাইনের স্লিপার বসিয়ে দিয়েছিলেন। সেগুলোই আজ প্রকানতরে ভীষণ বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাকশক্তিহীন দৈত্যের মত সেগুলো চাপা স্বরে গজরাচ্ছিল।
এমন সময় কামরার পুরোনো ভারী দরজাটা হঠাৎ নড়ে ওঠে, বহুদিনের জমাট নিরবতা ভেঙ্গে যায়।
আধবোজা দরজার একটুখানি ফাক দিয়েই আলতোভাবে কামরায় ঢুকে পড়ে দ্বাদশবর্ষী এক কিশোরী। দীর্ঘদিনের পথপরিক্রমাতেও তার মুখে পূর্বপুরুষদের মুখের আদল অক্ষুণ্ণ থেকেছে। লঘুপায়ে কয়েক তাল নেচেই সে নির্ভুলভাবে পৌঁছে যায় জমাট আঁধারে পড়ে থাকা কৌটোটির কাছে।
নিঃসঙ্গ কৌটোর ধাতব বুকের স্থির বায়ুতে ঘূর্ণন সৃষ্টি হয়। আবদ্ধ কামরার জমাট বাতাসে সুগন্ধি রেণুরা নেচে উঠে। দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে, মুক্তি এখন কেবল সময়ের ব্যাপার ...
১. ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৩ বিকাল ৪:৫৪ ০