
ট্যুর প্লানিং এ একটু পরিবর্তন আনতে হল। সবাই যখন ব্যস্ত তখনতো আমাদেরও একটু ব্যস্ততা দেখানো দরকার। আসলে পরে ভেবে দেখলাম আমরাও ব্যস্ত তাই রাঙ্গামাটি বাদ দেয়া হলো। আসলে বাদটা আমিই দিয়েছি, দুইদিনের ট্যুরে দুই জেলা ঘোরা শৌখিন পর্যটকদের মানায় আমাকে না। আমি আগেও এই দুই জেলায় গিয়েছি এবং আমার কাছে খাগড়াছড়ি জেলাটাকেই বেশি ভালো লেগেছিল। তাই বন্ধু ফাহিমকে জানিয়ে দিলাম আমার ইচ্ছার কথা। আমি নিয়মিত অনেক জায়গায় ঘুরি বলে এবং এই জেলায় আমার যাবার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে বলে ফাহিমও আমার কথায় না করল না। তবে বেচারা ফটোগ্রাফার তার আরেক ফটোগ্রাফার বন্ধু প্রণয়কে বলে রেখেছিল এই ট্যুরের কথা, তাদের ইচ্ছা ছিল ভোরে পাহাড়ি জনপদের ফটোগ্রাফি করা। কিন্তু সময় আর লোকবলের অভাবে তাদের ইচ্ছাটাকে মাটি চাপা দিতেই হলো।
আমার সমস্যা হলো আমি ট্রাভেল ব্লগ লিখতে গেলেই আমার ট্রাভেলের ইতিহাস-পাতিহাস সামনে নিয়ে আসি। জানি এতে পাঠকেরা বিরক্ত হন। তারা চান ওই যায়গায় যাবার ভালো তথ্য যাতে তারা সহজেই একটা গাইড লাইন পেয়ে যান। তাই চেষ্টা করব যত কম বকবক করে খাগড়াছড়িতে আমি যে জায়গা গুলোতে গিয়েছি সেগুলোতে যাবার জন্য গুরুত্বপুর্ণ তথ্য দেয়ার।
আলুটিলার রহস্যময় গুহা ও রিসাং ঝরনা
খাগড়াছড়িতে ঘোরার জায়গা কতগুলো সে সম্পর্কে আমার ধারণা গুগলে “খাগড়াছড়ি” লিখে সার্চ দিয়ে যতগুলো পাওয়া যায় ততগুলোই। তার মধ্যে “আলুটিলার রহস্যময় গুহা”, “রিসাং ঝরনা” এই দুটোই বেশি সমাদৃত। বাংলাদেশ সরকারও এই দুটি স্থানকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ভালই সমাদর করেছে। রাস্তা বানিয়ে দিয়েছে, ঝরনাতে নামার জন্য পাকা সিড়ি করে দিয়েছে। কাজেই এই দুটো জায়গা নিয়ে আমার বেশি কিছু বলার নেই। তারপরও যারা কখনো খাগড়াছড়ি যাননি তাদের জন্য বলছিঃ-
ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি গামী যেকোন বাসে উঠলে সেই বাস আপনাকে খাগড়াছড়ি শহরে নামিয়ে দেবে। সময় লাগবে সাত থেকে আট ঘন্টা, বর্তমান ভাড়া ৪০০ টাকা। আমাদের যাত্রা ছিল ঢাকার কলাবাগান থেকে স্টার লাইন পরিবহনের বাসে রাত ১০.৩০ এর। একটু লেট করে ছাড়া, রাস্তায় চাকা পাঙ্কচার হওয়া এই নিয়ে ঘন্টা দেড়েক সময় নষ্ট হওয়াতে আমরা সকাল ৮ টায় খাগড়াছড়ি শহরে পৌছাই। সেখানে স্থানীয় হোটেলে সকালের নাস্তা করে করে রওয়ানা দিই “আলুটিলার রহস্যময় গুহা” ও “রিসাং ঝরনা” দেখার জন্য। অবশ্য রাতে থাকার জন্য “নিলয় আবাসিক হোটেলে” রুম বুকিং দিই, ডাবল বেড ৫০০ টাকা, সিঙ্গেল বেড ২৫০ টাকা। তবে শহরের আশেপাশেই আরো কয়েকটি আবাসিক হোটেল আছে তাই চাইলে আপনি আরো কম টাকায় রুম পেতে পারবেন। আমি সর্বোচ্চটাই বললাম।
খাগড়াছড়িতে উপজেলা আছে ৮ টি, তার মধ্যে মাটিরাঙ্গা উপজেলাতেই আছে এই দুটি পর্যটন স্থান। খাগড়াছড়ি শহর থেকে জনপ্রতি ৫ টাকা অটো রিক্সা ভাড়ায় চলে যাবেন খাগড়াছড়ি বাসস্ট্যান্ড, সেখান থেকে জনপ্রতি ১০ টাকা বাস ভাড়ায় চলে যাবেন “আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে”। তারপর জনপ্রতি ৫ টাকার টিকিট কেটে ঢুকে যাবেন ভেতরে। সামান্য উচু-নিচু পাকা পথ ধরে হেটে নাক বরাবর সোজা গেলে পাবেন একটা দোতলা ছোট টাওয়ার। এটাতে দাড়ালে অবশ্য বিশেষ কোন কিছুই দেখা যায় না, একটু বিশ্রাম নিতে পারবেন এই যা। তাই সোজা না গিয়ে হাতের বামে চলে যান। একটু এগুলেই দেখবেন পাকা ছাউনি একটা জায়গায় টুকটাক কিছু খাবার-দাবার বিক্রি হচ্ছে। আপনি চাইলে কিছু কিনতে পারেন তবে অবশ্যই যেটা কিনতে হবে সেটা হচ্ছে মশাল।


আলুটিলার রহস্যময় গুহা দেখা শেষ, এবার এখান থেকে বের হয়ে আবারো বাসের জন্য অপেক্ষা করুন রিসাং ঝরনায় যাবার জন্য। এবার আপনাকে আরেকটু সামনে যেতে হবে অর্থাৎ আপনি বাসে যে পথে এসেছিলেন সে পথেই আরেকটু সামনে যাবেন, ভাড়া জনপ্রতি ৫ টাকা। বাস থেকে নেমে হাতের বামে চলে যাবেন। ঝরনা যাবার রাস্তা বলে দেয়াই আছে। ইটের পাকা রাস্তায় মাইক্রো/চাদের গাড়ি দিয়ে ২.১ কিলো পথ সরাসরি চলে যেতে পারবেন ঝরনার দোরগোড়ায় কিন্তু মিস করবেন রাস্তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। মাইক্রো/চাদের গাড়ি আপনাকে শহর থেকেই রিজার্ভ করে আনতে হবে, ভাড়া সম্পর্কে আমার কোন ভালো ধারণা নেই। আমরা হেটেই পথে ছবি তুলতে তুলতে গেছি। পথটা বেশ উচু-নিচু, একটু কষ্ট হবে তবে ঢালটা নিচের দিকে হওয়ায় আপনি কম কষ্ট পাবেন। আরেকটা পথ অবশ্য আছে তবে সেই পথটা ঝরনা থেকে ফেরার পথেই ব্যবহার করা যুক্তিযুক্ত। ঝরনাটা বেশি বড় নয় তবে পানির বেগ ভালোই। আর মজার বিষয় হচ্ছে ঝরনার পানি নামার পথটা প্রায় কৌণিক বলে আপনি ওয়াটার রাইডের মত বেশ মজা করে স্লিপ খেতে পারবেন। তবে সাবধান!! প্যান্ট পাথরে ঘষা খেয়ে ছিড়ে-ফেটে গিয়ে আপনার ইজ্জত পাংচার করে দিতে পারে (প্রথমবার আমার ইজ্জত প্রায় পাংচার হয়ে গিয়েছিল তাই এবার সাবধান ছিলাম)। তাই সাবধানতা হিসেবে ভারী কোন কাপড় বা প্লাস্টিকের ছালা নিয়ে নিতে পারেন। অবশ্য অনেক ছিড়া-ফাটা প্যান্ট ওখানে পড়ে থাকতে দেখবেন সেগুলো পশ্চাৎ দেশের পেছনে রেখে ইচ্ছেমত স্লিপ খেতে পারবেন।


এই দুটি স্পট ঘুরে দেখতে খুব বেশি সময় লাগে না তাই যদি দুপুরের পরপরই হোটেলে চলে আসতে পারেন তবে বিকালে ঘুরে আসতে পারেন পানছড়ি বৌদ্ধ আশ্রম থেকে। এটা পানছড়ি উপজেলায়। অবশ্য এবারের ট্যুরে আমরা সেখানে যেতে পারিনি কারণ আমাদের হাতে সেই পরিমাণ সময় ছিল না ওই দিনের জন্য।
তৈদুছড়া ঝরনা
লিখে কিংবা ছবি দেখিয়ে আপনাদের এই জায়গায় যাবার জন্য কতটুকু অনুপ্রাণিত করতে পারব তা আমি বলতে পারছি না। তবে যারা সত্যিকার অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন তারা তো অবশ্যই যাবেন সেখানে সেটা আমি চোখ বন্ধ করে বাজি ধরে বলতে পারি, অনেকে হয়তো গিয়েছেনও। আগেই বলে রাখি এটা নতুন আবিষ্কৃত কোন ঝরণা নয়। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় ঘুরুঞ্ছিরা মাঝে মাঝে সেখানে যান কিন্তু এতটা বেশি নয়। এর একটা কারণ হতে পারে এটা নিয়ে প্রচার কম হওয়া আর আরেকটা কারণ পথের দুর্গমতা। আপনি শৌখিন ভ্রমনকারী হলে তৈদুছড়া ঝরণা আপনার জন্য নয়। পাহাড়ী উচু-নিচু পথে, হাটু-কোমর পানি ভেঙ্গে, খাড়া পাহাড় বেয়ে পথ তৈরি করে আপনাকে এগুতে হবে এই পথে। বেশ কিছু সহজ পথও আছে সেখানে যাবার তবে সেগুলোও কম নয়। আপনি যদি স্বাভাবিক গতিতে হাটেন এবং এদিক-ওদিক না তাকিয়ে সময় নষ্ট না করেন তবে আপনাকে আসা-যাওয়ার জন্য কমপক্ষে ৫ ঘন্টা হাটতে হবে। তবে ভ্রমণ পিপাসুরা ছবি না তুলে শুধুই হাটবেন সেটা তো বলা অন্যায় তাই আপনাকে আরো বেশি হাটতে হবে।


খাগড়াছড়ি শহর থেকে ভোর বেলাতেই বাস বা চাদের গাড়ি করে চলে যাবেন দিঘীনালা উপজেলায়। শহর থেকে ১৯ কিলো দূরে এই উপজেলায় যেতে সময় লাগবে ঘন্টা খানেক। চাদের গাড়ির ছাদে করে গেলেই বেশি মজা পাবেন কারণ গাড়িতে বসে রাস্তার সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব না। ভাড়া জনপ্রতি ৩৫ টাকা, এটা চাদের গাড়ির ভাড়া, বাস ভাড়া আরো কম হবার কথা। দিঘীনালার বাসস্ট্যান্ডে নেমে জনপ্রতি ৫ টাকা অটোরিক্সা ভাড়ায় চলে যান দিঘীনালা বাজার। (তবে ভুলেও বাসস্ট্যান্ডের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অটোরিক্সাদের ঝরণা যাবার কথা বলবেন না, এরা ৩৫০/৪০০ টাকা ভাড়া চেয়ে আপনাকে ঠকাতে চাইবে। আপনাকে হাটতে হবেই আর গাড়ি আপনাকে যেখানে নামিয়ে দেবে সেখানকার ভাড়া সবমিলিয়ে ১০০ টাকার বেশি নয়)। যা হোক দিঘীনালা বাজার থেকে স্থানীয় দোকানদার-ব্যবসায়ীদের জিজ্ঞেস করে তৈদুছড়া ঝরণা যাবার জন্য একজন গাইড ঠিক করে নিন।







বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ আপনার ব্যবহার্য ফেলনা জিনিস দিয়ে পরিবেশের কোন ক্ষতি করবেন না। সঙ্গে থাকা পানির বোতল, বিস্কুটের প্যাকেট ইত্যাদি যেখানে সেখানে না ফেলে ব্যাগে করে নিয়ে আসুন। কষ্ট করে যেহেতু ওইগুলো বহন করতে পেরেছেন আশা করি সেই খালি প্যাকেট গুলো আরেকটু কষ্ট করে ফিরতি পথেও বহন করতে পারবেন। প্রকৃতির রূপ দেখেই আপনার দায়িত্ব শেষ নয় এই প্রকৃতিকে হেফাজত করার দায়িত্বও আপনার।
ফাহিম হোসাইন ও রাফাত প্রণয় কে ছবি গুলোর জন্য ধন্যবাদ ।
ভ্রমণকালঃ ২৭/১০/১১, বৃহস্পতিবার রাত ১০.৩০ থেকে ৩০/১০/১১, রবিবার ভোর ৫.৩০ পর্যন্ত।