'তেত্রিশ বছর কাটলো
কেউ কথা রাখেনি।'..........সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
************
একদা কৈশোরে
বাবার হাত ধরে পাঠশালায় পড়তে গিয়েছিলাম পণ্ডিতজির কাছে,
যিনি তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য আর গাম্ভীর্য দিয়ে
গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন আমাদের দুঃখী পিতার সুখোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।
জীর্ণ কুঁড়েঘরে মলিন খেজুর পাতার পাটিতে শুয়ে শুয়ে
আমার পিতা স্বপ্ন দেখতেন সপ্ততলা অট্টালিকার।
পাঠশালায় পড়া শেষ হলো,
কৈশোর পেরিয়ে গেছে কবে,
স্কুল, কলেজ, অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারও পেরিয়ে এলাম;
আমাদের কুঁড়েঘর আজও দালান হয় নি,
এখনো সেখানে উঁকি দেয় দ্বিতীয়ার চাঁদ।
তবু সেই শীর্ণদেহী বৃদ্ধ পিতার স্বপ্ন এখনো ভাঙ্গে নি,
কোটরগত দুটি চোখে আশ্চর্য উজ্জ্বলতা তাঁর।
একদিন সন্ধ্যায় কোত্থেকে
ছাদের ওপর দিয়ে উড়ে এলো ফুটফুটে হলুদ পাখি,
তারপর একেবারে
আরো নিচে নেমে এসে আমার মায়ের মাথাখানি ছুঁয়ে গেলো।
কী আশ্চর্য দেখুন, অবুঝ বালিকার মতো
আমার সরলা জননী পাখিটার দিকে দু হাত বাড়িয়ে বললেন :
আমাকে ঐ হলুদ পাখিটা এনে দাও।
আমি আকুল হয়ে বন থেকে বনান্তর খুঁজে ফিরি হলুদ পাখির জন্য।
একদিন হয়তো পাখি ধরা দেবে,
আমার মা আর কোনোদিন সেই পাখিটাকে চাইবেন না, কেননা
এখন তিনি নিজেই হলুদ পাখিটার মতো কোথায় হারিয়ে গেছেন।
আধডোবা চাঁদের মতন মলিন মুখখানি তুলে একদিন
প্রমীলা বলেছিল, তোমার ঘরে আমাকে তুলবে কবে?
অনেক সোহাগে
মাথায় বুলিয়ে হাত বলেছিলাম, যেদিন বসন্তে
শজনে শাখায় ডাকবে সবুজ টিয়ে পাখি, তোমাকে বঁধু সেদিন ঘরে নেবো।
তারপর অনেক বসন্ত চলে গেছে, প্রমীলাকে ঘরে তোলা হয় নি।
নিগূঢ় অন্তর্চোখে আগামীর ছবি ভাসে :
অনিকেতের এ সংসারে এলো যেই অবাঞ্ছিতা নারী
অরসিকা হৃদয়হীনার মতো সে শুধু পৃথিবীর জৈবিক সুখই খোঁজে।
** ১৯৮৯