জানযুন (জানাযা) অর্থ ঢেকে রাখা, লুকিয়ে রাখা।(আরবি-বাংলা অভিধান, মা. মুহিউদ্দীন খান)। অর্থাত লাশের শেষকৃত্য করা। কোন কোন অভিধানে শব্দটির অর্থ ’জানাযার নামাজ, সালাত’ লেখা থাকলেয়ো তা সংগত নয়, কারণ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, শব্দত্রয় বংগানুবাদ বা অর্থয়ো নয়।
মানুষ-গরু, পশু-পক্ষির ইত্যাদির লাশ শিয়াল-কুকুর, বাঘে খাক! কি পুড়ে ফেলুক, মাটি দিক বা শুটকী করে রাখুক, তাতে লাশের কিছু যায় আসে না। যায় আসে জ্যাতা মানুষের। সুতরাং অভিন্ন মনুষ্য জাতির স্বার্থেই ভিন্ন গোত্র ভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় লাশের শেষকৃত্য (জানাযা)করে, যার উদ্দেশ্য-লক্ষ্যয়ো অভিন্ন।
মৃত্যুর পর লাশের পাপ মোচন/বেহেস্ত নছিবের ভ্রান্ত আশায় প্রচলিত শরিয়ত লাশ সতকারের নির্দিষ্ট কিছু নিয়মকানুন বেধে দিয়েছে যেমন: মৃত্যুর সাথে সাথে লাশের পার্শে বসে মোল্লা ভাড়া করে কোরান আবৃতি, দান-খয়রাত, দোয়া-দুরূদ, সতকারের (জানাযা) নামাজ এবং লাশ গোরস্থ করতে দোয়া নামে একটি আয়াত অনর্গল আবৃতি করা হয়; অতপর ৩/৪ দিন পরে মোল্লা ডেকে মৃতের নামে রাছুলের জন্মোতসব (মিলাদ)পালন; আবার ৪০ দিনপরে শ্রাদ্ধ/৪০শা অনুষ্ঠান পালন করা হয়। এতে বাধ্য হয়ে ধনি/গরীবের প্রচুর অর্থ খরচ করতে হয়।মূলত এ সকল অনুষ্ঠান/অর্থ খরচে কোনই ছোয়াব/ফায়দা নেই! কারণ লাশের অর্জিত বা দুনিয়ার সকল অর্থ সম্পদ দান অথবা হাজার/লক্ষ লোকের সুপারীশেয়ো লাশ বা তার পরিবার/আত্মিয়-স্বজনের তিল পরিমাণ লাভ/ছোয়াবের সুযোগ নেই (দ্র: ২: ৪৮, ১২৩, ২৫৪)। কিন্তু মরার উপরে খাড়ার ঘা দিয়ে (আরোপিত নিয়ম) লাভ হয় মাত্র ধর্ম ব্যবসায়ীদের। ব্যবসাটি এমনভাবে ফরজ/পাকাপোক্ত করেছে যে, যে কোন কারণে লাশ গায়েব হোক, কি গোল্লায় যাক! ২/ ১০মাস পরেই হোক! কিন্তু 'গায়েবানা জানাযা নামাজ' করতেই হবে; অন্যথায় শোকার্ত পরিবারকে এক ঘরা করার ফতোয়া দেয়। তবে ৪০শা অনুষ্ঠানটি কিছুটা অর্থ বহন করে এ কারণে যে, মৃত্যু খবরটা আনুষ্ঠানিকভাবে পাড়া প্রতিবেশীদের অবগত করান হয়; কিন্তু তা বাধ্যতামূলক নয়।
প্রচলিত শরিয়ত ‘জানাযা’ বলতে শুধুমাত্র নামাজটুকুকেই বুঝে থাকে এবং বিশ্বাস করে থাকে যে, উহার উপরেই প্রধানত লাশের/আত্মার বেহেস্ত/দোযখ নির্ভর করে। এই সুযোগে লাশ বে-নামাজী, মদখোর ছিল ইত্যাদি কারণ/অকারণে ইমাম জানাযার নামাজ পড়তে অস্বীকার করত শোকার্ত পরিবারকে আরো শোকার্ত করে তোলে, ঘন্টার পর ঘন্টা লাশ পড়ে থাকে, সমূহ পারিবেশকে অসহ্য ব্যথিত বিব্রতকর করে তোলে। ধর্ম/জানাযা সম্বন্ধে সাধারণের কোনই ধারণা না থাকায় কেহ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। আশ্চর্যের বিষয় হলো যে, এমন পরিস্তিতির উদ্ভব হলেয়ো এযাবত কোন লাশই শেষ পর্যন্ত প্রচলিত জানাযা বিহীন কবরস্থ/অকবরস্থ হয়নি। অর্থাত এ নিয়ে হয় দেন-দরবার এবং ক্ষেত্র বিশেষে দ্বিগুণ/দশগুণ অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে ইমামকে রাজী করাতে হয়। গ্রামে গঞ্জে অনুরূপ বিব্রতকর সমস্যা অহরহ দেখা যায়।
প্রতিবেনটি শুধু এ কারনেই লেখা যে, প্রচলিত দোয়া-দুরূদ, কথিত জানাযার নামাজ ইত্যাদি আনুষ্ঠানিকতা একেবারেই অর্থহীন, নিষ্প্রয়োজন; সুতরাং জানাযায় প্রচলিত নামাজ বা ইমাম/মোল্লার কোনই দরকার নেই। তবুয়ো ইমাম ধর্মের দোহাই দিয়ে জানাযায় রাজী না হলে সংগে সংগে লাশটি তার দুয়ারে ফেলে আসলেই উপযুক্ত শিক্ষা হবে।
লাশ যখন গর্তে রাখা হয় তখন যে দোয়াটি পড়া হয়:
মিনহা খালাকনাক্বুম অফিহা নুইদুক্বুম অমিনহা নুখরিযুক্বুম তারাতান উখরা। (২০: ৫৫) অর্থ: আমরা তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি এবং উহাতেই ফিরিয়ে দেই এবং উহা থেকেই আবার(পুন) বের করি।
সাধারণগণ আয়াতটির অর্থ জানেনা বলেই রক্ষা!অনুবাদে লক্ষনীয় যে, উহা মন্ত্র বা দোয়া-দুরূদী আয়াত নয়; সুতরাং লাশ ঢাকার সময় আয়াতটি পুন পুন উচ্চারণ করার অর্থ দাড়ায় জানাযাকারীগণই মাটি থেকে সৃষ্টি করে আবার মাটিতেই ফিরিয়ে দেয় অতপর উহা থেকে তারাই আবার পুন সৃষ্টি করে।এমন দোয়া মানুষের মূখে উচ্চারণ করা গুরুতর শিরকী পাপ বলেই ভাষাজ্ঞানে প্রমান করে।
লাশের নামাজ সম্বন্ধে কোরান:
তাদের কারো মৃত্যু হলে তুমি কখনো তাদের জন্য ‘জানাযার সালাত পড়বে’ না এবং উহার কবর-পার্শে দাড়াবে না (কবরস্থ করতে যাবে না); উহারা তো আল্লাহ য়ো তার রাছুলকে অস্বীকারী পাপাচার অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে।(৯: ৮৪)
স্মরণীয় যে, মূল আয়াতে `জানাযা, সালাত, পড়বে’ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলিই নেই; আছে মাত্র ’লা সাল্লে,’ যার প্রধান অর্থ লাশ সতকারে সহযোগীতা না করা, এখানে ‘সাল্লি’ অর্থ নামাজ নয় (সাক্ষি: ‘ইউছাল্লীউনা আলান্নাবি=আল্লাহ/মালাএকাত নবিকে সাহায্য (সাল্লি) করে- ৩৩: ৫৬)।
কাফের মুশরিকগণ রাছুলকে মান্তোই না! সুতরাং প্রচলিত জানাযার নামাজ পড়তে তিনি সেখানে অবশ্যই যেতেন না! তিনি যেতেন তাদেরই নিয়মে লাশ সতকারের (জানাযা)সাহায্য করতে। কিন্তু নিশেধ করা হয়েছে যেহেতু তারা আল্লাহ/রাছুলকে পাত্তাই দিত না; কিন্তু ইমাম সাহবেরা গ্রামে গঞ্জে যাদের লাশের জানাযা করতে অস্বীকার করেন, তারা যে পাপই করুক না কেন তারা অবশ্যই আল্লাহ/রাছুলকে মানতো!
তাছাড়া:
* রাছুলসহ ৪ খলিফার লাশ মোবারকের প্রচলিত নিয়মে জানাযার নামাজ পড়ছিল কি না! সে সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়োয়া দরকার। কারণ কথিত হয় রাছুলের মৃত্যুর পর সাহাবাদের মধ্যে ঝগড়া ফাসাদের কারণে ৩দিন পর্যন্ত লাশ মোবারক গোরস্থ করা হয়েছিল না।
* শাহদাতপ্রাপ্ত ৩য় খলিফা উসমানের লাশ গভীর রাতে গোপনে গোরস্থ করে।
* ৪র্থ খলিফা আলীর লাশ ঝগড়া/ফাসাদের কারণে গোরস্থ না করে লাশ উটের পিঠে নিরুদ্দেশে পাঠান হয়-।
* সৈনিকদের লাশের জানাযার দরকার হয় না কেন? ইমাম সাহেবের মৃত্যুর ভয়??
বিনীত।