‘মাত্র ১০০টি ক্লিক করে আয় করুন এক ডলার, স্বল্পশিক্ষিতদের জন্য ঘরে বসে অনলাইনে আয়, ঘরে বসে মাসে ২১ হাজার ডলার আয়, ক্লিক করলেই টাকা’ আউট সোর্সিং কোম্পানিগুলোর এমন চটকদার অফারে রাজধানীসহ সারাদেশে চলছে ডিজিটাল প্রতারণা। কোন কিছু যাচাই না করেই এসব হায় হায় কোম্পানির জমজমাট ব্যবসার ফাঁদে পা দিচ্ছে অসংখ্য মানুষ। বিশেষ করে যুবসমাজ। প্রযুক্তি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতাকে পুঁজি করে ডিজিটাল এমএলএম (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং) ব্যবসার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একশ্রেণীর প্রতারকচক্র। ডেসটিনি, ইউনিপেটুএ, যুবক, গ্লোবাল নিউওয়েসহ বন্ধ হয়ে যাওয়া একাধিক এমএলএম কোম্পানির শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা এখন আউটসোর্সিং ব্যবসা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় আউটসোর্সিংয়ের নামে প্রতারণার অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইন্টারনেটভিত্তিক স্কাইল্যান্সার, ডোল্যান্সার, এ্যাফারি ট্রাক, অনলাইন এ্যাড ক্লিক, বিডিএস ক্লিক সেন্টার, অনলাইন নেট টু ওয়ার্ক, বিডি এ্যাডক্লিক, শেরাটন বিডি, নিউ শেরাটন বিডি, সিওয়াক লিমিটেড, কুইকপেবিডি, মাইক্রোক্লিকার, নেসহোয়ার-টনবিডি, অনলাইননেটটুওয়ার্ক, বেস্টঅনলাইনসোর্সিং, অনলাইন-এ্যাডক্লিক, অনলাইন আউটসোর্সিং কনসালট্যান্ট, ব্রাভো আইটি, ল্যান্সটেক, পেইড টু ক্লিক, সেফটি ক্লিক, পিটিসি ফর বিডি, এ্যাডসোর্সিং, ক্লিক টু পেইড, রিয়েল সার্ভে অনলাইন, এ্যাড আউটসোর্সিং, স্কাই ওয়াকার, মাস্টার ক্লিকার, পয়সা. কম, ইউনিক রেঞ্জ, আর্ন টু অনলাইন, অনলাইন এ্যাড ক্লিক ও ইপেল্যান্সারের মতো কমপক্ষে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান ফেসবুকসহ সামাজিক সাইটগুলোতে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে আকৃষ্ট করছে সাধারণ মানুষকে। এসব কোম্পানির এজেন্টরা এমএলএম কোম্পানির মতো এমন জাল বিস্তার করছে যে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার কোন পথ আর খোলা নেই। এসব কোম্পানির প্রায় সকলেই ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব বিভাগ থেকে নিয়েছে ‘ট্রেড লাইসেন্স।’ অনেকেই নিচ্ছে এবং প্রকাশ্যে ব্যবসা করছে। কোম্পানিগুলো সদস্য ফি বাবদ নিচ্ছে ১০০ ইউএস ডলার বা সাত থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকা। প্রত্যেক সদস্যকে ১০০টি ওয়েবসাইট লিঙ্ক দিয়ে এমএলএম ব্যবসার মতো আরও সদস্য বানাতে বলা হচ্ছে। লিঙ্কগুলোতে ক্লিক করলে প্রতিদিন এক ডলার করে পাওয়া যাবে। এভাবে একটা এ্যাকাউন্টের বিপরীতে মাসে ৩০ ডলার। প্রতারিত অনেক গ্রাহক এমন অফারে উদ্বুদ্ধ হয়ে এক-দেড় লাখ টাকা খরচ করে ১০-১৫টি করে এ্যাকাউন্ট খুলেছে বেশি ডলার কামানোর আশায়। এর বাইরে আবার নতুন গ্রাহক বানানোর ওপর আছে কমিশন। দেখানো হয় মার্কিন ডলারের লোভ। গ্রাহকদের বলা হয়, এ টাকা বাংলাদেশের যে কোন ব্যাংক থেকে তুলতে পারবেন তাঁরা।
নিজ উদ্যোগে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করছেন এমন কয়েকজন জনকণ্ঠকে জানান, আউটসোর্সিংয়ের জন্য অগ্রিম কোন টাকা জমা দিতে হয় না। কাজ করার পর নিজের অনলাইন এ্যাকাউন্টে সরাসরি ডলার জমা হয়, যা পৃথিবীর যে কোন দেশ থেকে ব্যাংকের মাধ্যমে ওঠানো যায়। কিন্তু রাজধানীর ওই সব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করার সদস্যদের ডলার শুধু কম্পিউটারে দেখাচ্ছে। আর প্রতিষ্ঠানগুলো বিল দিচ্ছে টাকায়। এরা আসলে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী আসিফ আনোয়ার জনকণ্ঠকে বলেন, তিনি প্রথমে সাত হাজার টাকা দিয়ে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে সদস্য হন। প্রতিদিন ১০০ ক্লিক করে ১০ দিন পরে প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় কার্যালয়ে টাকা উঠাতে গেলে তাঁকে বলা হয়, তিনি নতুন সদস্য না করলে টাকা দেয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে তিনি নিজের নিবন্ধন ফির টাকা উঠাতে এ পর্যন্ত তিনজনকে সদস্য করেছেন। তিনি জানান, দেড় মাস আগে সদস্য হয়ে তিনি এখনও তাঁর নিবন্ধনের টাকা তুলতে পারেননি। তিনি আরও বলেন, সকাল ৯টার পরে ক্লিক করতে গেলে ১০০টি ক্লিক করতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লেগে যায়। প্রলোভনে পড়ে এসব প্রতিষ্ঠানের সদস্য হওয়া রাজধানীর কয়েকটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে তাঁদের একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানা গেছে। তাঁরা বলেছেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর এই ফাঁদে পড়ে তাঁরা সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
কয়েকদিন আগে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার মডার্ন ছাত্রাবাসে একটি কক্ষে অনলাইন আউটসোর্সিং কনসালট্যান্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠান কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, দেয়ালে ঢাকা সিটি দক্ষিণ কর্পোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স ঝুলছে। ভেতরে গিয়ে এর স্বত্বাধিকারী ইকবাল হাসিবকে পাওয়া যায়। কার্যালয়ে দুটি কম্পিউটার ও একটি ল্যাপটপ রয়েছে। তিনি অবশ্যই নিজেকে প্রতিষ্ঠানের একজন সদস্য দাবি করে বলেন, তাঁর হাতে যেসব সদস্য রয়েছেন তাঁদের কাজের সুবিধার জন্য তিনি কক্ষটি ভাড়া নিয়েছেন। সেখানে গিয়ে কথা হয় একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হেলালের সঙ্গে। তিনি জানান, বেশ কয়েকটি আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানে তিনি কাজ করছেন। তাঁর অধীনে প্রায় ২৫০ সদস্য রয়েছেন। আউটসো-র্সিংয়ের কাজ করলে ডলার সরাসরি নিজের অনলাইন এ্যাকাউন্টে জমা হয় না কেন এমন প্রশ্নের জবাবে আরও দু’জন সদস্য জানান, প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় পান্থপথে যাঁরা আছেন, এগুলো তাঁরা বলতে পারবেন। এরপর রাজধানীর পান্থপথে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় দুজন পিয়ন ছাড়া আর কেউ নেই। তাঁরা জানান, এখানে শুধু অফিসিয়াল কাজকর্ম হয়। মালিক বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনলাইন আউটসোর্সিং কনসালট্যান্ট নামে এই প্রতিষ্ঠানের মালিক ইউনিপেটুএর এক কর্মকর্তা।
এমএলএম কোম্পানির প্রতারকরা
আউটসোর্সিং ব্যবসায় ॥ অনুসন্ধানে জানা যায়, ডেসটিনি, ইউনিপেটুএ, যুবক, গ্লোবাল নিউওয়েসহ বন্ধ হয়ে যাওয়া একাধিক এমএলএম কোম্পানির শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা বহু ধাপ বিপণন পদ্ধতিতে (এমএলএম) আউটসোর্সিংয়ের ব্যবসা করছেন। এসব কোম্পানি ট্রেড লাইসেন্সে ব্যবসার ধরনে সফটওয়্যার আমদানি, রফতানি ও সরবরাহকারীর কথা উল্লেখ করে কাজ শুরু করে। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এ্যাফারি ট্র্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইশরাক কবীর এর আগে ডেসটিনিতে কাজ করেছেন। ডোলেন্সারের স্বত্বাধিকারী রোকন ইউ আহমেদ যুবকে, স্কাইল্যান্সারের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম নিউওয়ে গ্লোবাল কোম্পানিতে কাজ করেছেন। বিডিএসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইফতেখার আহমেদও কাজ করেছেন একাধিক এমএলএম কোম্পানিতে। এছাড়া অনলাইন আউটসোর্সিং কনসালট্যান্ট, ব্রাভো আইটি, ল্যান্সটেক, পেইড টু ক্লিক, সেফটি ক্লিক, পিটিসি ফর বিডি, এ্যাডসোর্সিং, ক্লিক টু পেইড, রিয়েল সার্ভে অনলাইন, এ্যাড আউটসোর্সিং, স্কাই ওয়াকার, মাস্টার ক্লিকার, পয়াসা. কম, ইউনিক রেঞ্জ, আর্ন টু অনলাইন, অনলাইন এ্যাড ক্লিকসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারগণ বন্ধ হয়ে যাওয়া এমএলএম কোম্পানিতে জড়িত ছিলেন।
প্রতারণা করে পলাতক ॥ সম্প্রতি ডোল্যান্সার নামে বাংলাদেশের একটি আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে আত্মসাত করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগে শতাধিক গ্রাহক ডোল্যান্সারের এমডি রোকন ইউ আহমেদ ও তাঁর স্ত্রী বর্তমানে সিঙ্গাপুরে পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। এর আগে ১ জুন আউটসোর্সিংয়ের নামে প্রতারণার অভিযোগে রাজধানীর কলাবাগান থেকে স্কাইল্যান্সারের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান নীলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারের পর খলিলুর রহমান আউটসোর্সিংয়ের নামে এমএলএম ব্যবসা করে ৯০ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে ৭শ’ কোটি টাকা সংগ্রহের কথা স্বীকার করেন। এছাড়া এ্যাফারি ট্রাক লিমিটেড নামে একটি আউটসোর্সি কোম্পানি গত জুনে কার্যালয় বন্ধ করে দিয়ে পালিয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। জানা গেছে, ওই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৫ হাজার গ্রাহক নিবন্ধিত হন। গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বিডিএসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইফতেখার আহমেদসহ অন্য কর্মকর্তারা এখন পলাতক। এদিকে চলতি মাসেই সাতক্ষীরা থেকে একটি প্রতিষ্ঠান ১০ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে ২১ কোটি টাকা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আরেকটি প্রতিষ্ঠান কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে যায়।
আউটসোর্সিংয়ের প্রতারণা রোধে রুল জারি ॥ সম্প্রতি ফ্রিল্যান্সিংয়ের নামে অনলাইনে ক্লিক (ক্লিক টু আর্ন, পেইড টু ক্লিক) করার মাধ্যমে হাজার হাজার ডলার আয় করার প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়া রোধে একটি কার্যকর নীতিমালা করতে হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি একে এম সাহিদুল হকের অবকাশকালীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করে।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়ার ইনফরমেশন সার্ভিসেস বা বেসিসর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ফাহিম মাশরুর জনকণ্ঠকে জানান, বাংলাদেশে এখন আউটসোর্সিংয়ের দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান আছে। আইটি শিক্ষিত তরুণরা এখন ব্যক্তিগত উদ্যোগেই ঘরে বসে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করছে, যা আশার দিক। তাদের সংখ্যা এখন ৩০ হাজারের কম হবে না? তবে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, তরুণদের এই আগ্রহের জায়গাকে পুঁজি করে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী অনলাইনে আউটসোর্সিংয়ের মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের নামে প্রতারণা শুরু করেছে? তারা একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নিবন্ধন করাচ্ছে এবং বলছে যে কিছু ওয়েবসাইটে নির্দিষ্ট সংখ্যক ক্লিক করলেই প্রতিমাসে তারা দ্বিগুন টাকা দেবে? ফাহিম বলেন, এতে এই ব্যবসার ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হতে পারে? এছাড়া প্রতারকরা আসলে নিবন্ধনের টাকার একটি অংশ ফেরত দিয়ে আগ্রহ বাড়াচ্ছে? পরে তারা টাকা-পয়সা নিয়ে পালিয়ে যাবে। তিনি এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রতারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারকে অনুরোধ জানান।