একটা দেশের পুলিশ বাহিনী যতই রাজনৈতিক প্রভাবের ভেতরে থাকুক না কেনো, তবুও সে দেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য পুলিশই শেষ ভরসা। যদিও স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকার কারণে, দেশের প্রধান আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘পুলিশ’ বরাবরই রাষ্ট্রীয় নিপীড়ক বাহিনীর ভূমিকা পালন করেছে। তবুও নাগরিক নিরাপত্তায় পুলিশের বিকল্প নাই।
গত এক সপ্তাহে পর পর এমন তিনটি বড় ঘটনার জন্ম দিয়েছে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা, যা সহজেই বলে দেয় সাধারণ মানুষের বন্ধু বলে যাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়, সেই পুলিশের কাছেই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ সাধারণ মানুষ। দিনে দিনে সে আশঙ্কা আরও বাড়ছে। যেন এক অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে দেশের পুলিশ!
চলতি বছরের শুরুতেই অন্যতম আলোচিত ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীর ওপর পুলিশি নির্যাতনের ঘটনাটি। ৫ লাখ টাকার দাবিতে গোলাম রাব্বিকে হত্যার হুমকি দেয় মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ শিকদার। প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরে মিডিয়ায় ব্যাপক লেখালেখির চাপে এসআই মাসুদ শিকদারকে প্রত্যাহার করা হয়। যে দেশে বিরোধী দলীয় চিপ হুইপকে রাস্তায় ফেলে পিটিয়ে পুলিশ সদস্য রাষ্ট্রীয় পদক পায়, সে দেশে এ ধরনের ছোট বিষয় ধামাচাপা পড়ে যাবে। এমনটা আশা করা দোষের কিছু নয়।
এরপর রাজধানীর পুরান ঢাকার খুদে ব্যবসায়ী অজয় শীলকে বাসা থেকে বের করে পায়ে গুলি করে পুলিশ। যদিও পুলিশ বলছে, অজয় শীল একজন সন্ত্রাসী, তার কাছে অস্ত্র ছিল। কিন্তু তার কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না, গণমাধ্যমে বার বার এমন দাবি করেছে অজয়।
সর্বশেষ ঢাকা করপোরেশনের (দক্ষিণ) পরিচ্ছন্নতা বিভাগের পরিদর্শক বিকাশ চন্দ্র দাসের ওপর নির্যাতন চালায় পুলিশ। ভোরে চারটার দিকে পরিচ্ছন্নতা কাজ তদারক করতে বেরিয়ে ছিলেন বিকাশ। এক জায়গায় তদারক শেষে মীর হাজিরবাগ খাল-সংলগ্ন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকজন লোক তাকে থামতে বলেন। বিকাশ তাদের ছিনতাইকারী ভেবে মোটরসাইকেল ঘোরানোর চেষ্টা করেন। এ সময় তারা বিকাশকে তাড়া করেন। বিকাশ মোটরসাইকেল থেকে পড়ে গেলে লোকগুলো বিকাশকে ধাওয়া করে ধরে মারধর শুরু করে। বিকাশকে মারার সময় সেখানে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা বলছিল, "মাছের রাজা ইলিশ, দেশের রাজা পুলিশ।"
পরে জানা যায়, তারা সাদাপোশাকের পুলিশ। এ সময় আশপাশে কর্মরত সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা দৌড়ে এসে বিকাশকে তাদের কর্মকর্তা বলে পরিচয় দেন। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সামনেই তারা বিকাশকে বন্দুকের বাঁট দিয়ে পেটায় এবং বুট দিয়ে পা থেঁতলে দেয়। একপর্যায়ে আহত বিকাশকে পুলিশ ভ্যানে তোলা হয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা পুলিশের ভ্যানটিকে ঘেরাও করেন। পরে পুলিশ বিকাশকে নামিয়ে দিয়ে চলে যায়।
নানা সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মী বা সরকারবিরোধীদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে নানাভাবে বিতর্কিত হয় পুলিশ। কিন্তু দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশের আচরণ এবং কর্মকাণ্ড এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, সন্ত্রাসীদের চেয়ে এখন পুলিশকেই বেশি ভয়ের দৃষ্টিতে দেখে সাধারণ মানুষ। রাতের ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরগুলোতে ছিনতাইকারী বা চাঁদাবাজের চেয়ে বেশি ভীতিকর তারা। আর গ্রাম এলাকায় প্রায় স্থানীয় সকল অপরাধের সাথেই জড়িত এ বাহিনীর সদস্যরা। নাগরিক হয়রানি চরমে ঠেকেছে।
রাজনৈতিক পেটুয়া বাহিনী হিসেবে ব্যবহার হলেও পুলিশ বাহিনীর ভেতরে একটা চেইন অব কমান্ড ছিল। কিন্তু সেটাও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। এখন রাজনৈতিক কারণ ছাড়াই সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হচ্ছে পুলিশ। ব্যক্তিগত কারণেও পুলিশ সদস্যরা ব্যবহার করছে নিজেদের ক্ষমতাকে। সম্প্রতিক ঘটনাগুলো সে প্রমাণ দিয়েছে। এ তিনটি ঘটনা কোনোভাবেই রাজনৈতিক ঘটনার সাথে সম্পর্কিত না। ঘটনাগুলোকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস না বলে পুলিশি সন্ত্রাস বলাটা বেশি যথার্থ।
প্রশ্ন হলো, পুলিশের এমন ড্যাম কেয়ার আচরণেও সরকার কেনো চুপ। এটা খুব পরিষ্কার যে আওয়ামী লীগ সরকার পুলিশের ওপর ভর করেই ক্ষমতায় টিকে আছে। ৫ জানুয়ারির একটা ভুয়া নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে পুলিশের ওপর অনেক বেশি পরিমাণে নির্ভরশীল। তাই সরকারও গদি হারানোর ভয়ে মুখ বন্ধ রেখেছে। ফলে দিনে দিনে সরকারেরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে পুলিশ। সম্প্রতি পুলিশের হাতে আওয়ামী লীগ নেতারাও পিটুনি খাচ্ছে এমন অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।
ব্যক্তিগত কারণে যে সকল পুলিশ সদস্য নিজেদের ক্ষমতার অব্যবহার করছে, তাদের ওপর খোদ পুলিশ বাহিনীর কতটা নিয়ন্ত্রণ আছে? এ প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে যে উত্তর পাওয়া গেছে, সেটা আরো আশঙ্কাজনক! নিজেদের নিয়ন্ত্রণহীনতাকে আড়াল করে পুলিশ বাহিনী তার দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টায় আছে, তা বোঝা গেছে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বক্তব্যে।
শনিবার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে বলছেন, পুলিশের চেইন অব কমান্ড ঠিক আছে। এ ধরনের ঘটনার জন্য কিছু সংখ্যক পুলিশ সদস্য দায়ী। পুলিশ বাহিনী কারো ব্যক্তিগত দায় নেবে না।
পুলিশের চইন অব কমান্ড ঠিক থাকলে ডিউটিরত অবস্থায় একজন পুলিশ কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডের দায়ভার কেনো পুলিশ বাহিনী নেবে না? তাহলে এসব কর্মকাণ্ডের দায় কে নেবে? অন্যদিকে এসব ঘটনার তদন্ত করছে পুলিশ বাহিনী নিজেই! নিজেদের নির্যাতনের তদন্ত যদি নিজেরাই করে তাহলে সেটা কতটা স্বচ্ছ হবে?
এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নাই কারো কাছে। না সরকার, না পুলিশ বাহিনী কেউই সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারছে না। এদিকে গদি বাঁচাতে এসব ঘটনায় দৃষ্টি না দিয়ে সরকার শোনাচ্ছেন উন্নয়নের গল্প। সরকার অবশ্যই জানে, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকলে পুলিশ বাহিনীর কর্মকাণ্ড আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। তবু তারা পুলিশের বিরাগভাজন হতে চায় না। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে পুলিশ পরিণত হবে জনগণের সবচেয়ে বড় শত্রুতে।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে এপ্রিল, ২০১৬ দুপুর ১:৫৮