ডালাসের পাশে আমাদের Plano শহরের প্রধান দুইটি মসজিদের একটিতে (পৃথিবীখ্যাত East Plano ইসলামিক সেন্টার বা EPIC মসজিদ, যা ইয়াসির কাদির মসজিদ হিসেবে পরিচিত) গতকাল ঈদ উদযাপন করেছে। কিন্তু Plano'র আদি মসজিদ, মানে ওয়েস্ট Plano মসজিদ আজকে ঈদ উদযাপন করছে। একদিকে শহরের বিরাট অংশের মানুষ যখন চাঁদ রাত পালন করছিলেন, অন্যদিকে আরেক অংশ তারাবির নামাজ পড়ছিলেন। আমরা ঈদের জামাতে গিয়েছি, তো ওরা রোজা রেখেছে। এমনও হয়েছে, গতকাল রবিবার সাপ্তাহিক বন্ধের দিন থাকায় অনেকে বাড়িতে ঈদের আয়োজন করেছেন, কিন্তু ঘরেরই কিছু সদস্য কালকে রোজা ছিলেন। অফিসে আসার সময়ে মসজিদের পাশ দিয়ে ড্রাইভ করার সময়ে লক্ষ্য করলাম হাজার হাজার মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করতে আজকে ওয়েস্ট Plano মসজিদে যাচ্ছেন।
শুনেছি অস্ট্রেলিয়াতেও একই ঘটনা ঘটেছে। আমি নিশ্চিত, পৃথিবীর বহু দেশেই এমনটা হয়েছে।
প্রধান কারনটা হচ্ছে, গত পরশু কানাডা, আমেরিকা ইত্যাদি কোন দেশেই চাঁদ দেখা যায়নি। এদিকে সৌদি আরবে আগেরদিন চাঁদ দেখা গিয়েছে। তাই সৌদি সময় মতন নিয়ম মেনে ঈদ পালন করেছে।
কমন সেন্স বলে, পৃথিবীর ঘূর্ণন যেহেতু ধ্রুব, কাজেই সৌদির পরেরদিন আমেরিকা-ক্যানাডা-মেক্সিকো ইত্যাদি অঞ্চলে ঈদ পালন হওয়ার কথা এবং তারপরে বাংলাদেশে।
সাথে আরেকটি ব্যাপার সবাইকে বুঝিয়ে বলি, আধুনিক বিজ্ঞান গাণিতিক সূত্র ইত্যাদি দ্বারা অতি সূক্ষ্মভাবে নির্ভুলভাবে বলা সম্ভব পৃথিবীর কোন অঞ্চলে কবে ঈদের চাঁদ দেখা যাওয়ার কথা। হ্যা, আকাশ মেঘলা থাকবে কিনা, সেটা আলাদা বিষয়, কিন্তু চাঁদের অবস্থান ঐ অঞ্চলে ঐদিন কি হবে, সেটা বলা সম্ভব। আমরা যেমন জানি কোন অন্ধলে কয়টার সময়ে সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয় ঘটে। পুরোটাই গণিত, এবং খুবই সহজ সূত্র।
কিন্তু গোল বেঁধেছে একটি হাদিসের ইন্টারপ্রিটেশন নিয়ে। হাদীসটি হচ্ছে, "যদি ২৯ তারিখ রাতে ঈদের চাঁদ দেখা যায়, তাহলে পরেরদিন ঈদ। যদি কোন কারনে (আকাশ মেঘলা থাকার কারনে) চাঁদ দেখা না যায়, তাহলে পরেরদিন রোজা রেখে তার পরেরদিন ঈদ।" যেহেতু আরবি মাস ৩০ দিনের বেশি হয়না।
তা নবী (সঃ) জীবনকে সহজ করতেই এত সহজ নিয়ম করেছেন। তাঁর সময়ে এত সূক্ষ্ম গাণিতিক সূত্র ছিল না, আর মুসলিমরাও এতটা শিক্ষিত ছিল না। তিনি সেটাই সমাধান দিয়েছেন যা সেই যুগের জন্য বেস্ট সমাধান।
কিন্তু আমরা এত ভাল হলেতো সমস্যা ছিল না। আমরা ইন্টারপ্রিটেশনে প্যাঁচ বাঁধিয়ে ফেললাম। বিষয়টা খুবই সিরিয়াস, কারন ঈদের দিন রোজা রাখা হারাম। অন্যদিকে, রোজার মাসে রোজা বাদ দিয়ে ঈদ পালন করে ফেলাও গুনাহ।
গতকাল অনেকেই প্রশ্ন করছিলেন, তাহলে কোন পক্ষ সঠিক হলো?
উত্তর শুনে চমকে উঠতে পারেন, সেটা হচ্ছে, "দুই পক্ষই সঠিক।"
এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের দায়িত্ব হচ্ছে, নিজের মসজিদকে মেনে চলা। মানে, আমি তারাবীহ পড়লাম শহরের পূর্ব দিকের মসজিদে, আর যখন ওরা ঘোষণা দিল চাঁদ দেখা যাক বা না যাক, আমরা ঈদ পালন করবো রবিবারে, তাহলে আমাকে পূর্ব দিকের মানুষের সাথেই ঈদ পালন করতে হবে। পশ্চিম দিকের মসজিদের লোকদের বেলায়ও তাই। আগেরদিন ঈদ পালন করছে বলে আমি শেষ মুহূর্তে পূর্ব দিকের মসজিদে চলে এলাম, সেটা চলবে না। তবে, এখানে নিজস্ব ইন্টারপ্রিটেশনেরও ব্যাপার আছে। যেমন, আপনি থাকেন পশ্চিম দিকে, কিন্তু আপনি জানেন, পূর্ব দিকের মসজিদ সঠিক, তাহলেও আপনি পূর্ব কোণের মসজিদে এসে ঈদ পালন করতে পারবেন।
কিন্তু ইনটেনশন যদি হয় একটা রোজা কম রাখা, বা দাওয়াতের সুবিধা অসুবিধা ইত্যাদি বিবেচনা, তাহলে প্রব্লেম।
এখন বলি, দুই পক্ষই কিভাবে ঠিক হলো।
আমাদের প্রতিদিনের নামাজের সময়সূচির বিষয়টা খেয়াল করুন। আমরা কেউই দুপুরে বাইরে বেরিয়ে সূর্যের অবস্থান দেখে যোহরের নামাজে দাঁড়াই না। আসরের ওয়াক্তে মেঘলা থাকায় সূর্য ডুবে গেছে ভেবে মাগরিব শুরু করে দেই না। আমরা ঘড়ি দেখে বুঝি এই সময়ে এই নামাজের সময় হয়। আকাশে সূর্য আর মেঘের অবস্থা যাই হোক না কেন।
অথচ একশো বছর আগেও ব্যাপারটা এমন ছিল না। এই যুগে ঘড়ি সস্তা হয়ে যাওয়ায় আমরা জীবনকে এত সহজভাবে পেয়েছি। নবীর (সঃ) সময়েই একবার তাঁর স্ত্রী রোজা ছিলেন, আসরের সময়ে মেঘলা থাকায় সূর্য ডুবে গেছে ভেবে তাঁরা রোজা ভেঙ্গে ফেলেন (যেহেতু নবীজি(সঃ) দ্রুত ইফতারের নির্দেশ দিয়েছেন), রোজা ভাঙ্গার পরে তাঁরা মাগরেবের নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এমন সময় মেঘ সরে গিয়ে সূর্য আবার হেসে উঠে, এবং তাঁদের (রাঃ) মনে অন্ধকার নেমে আসে। নবীজি (সঃ) বাড়িতে ফিরলে তাঁরা (রাঃ) জানতে চান তাঁদের কি আবারও রোজা রাখতে হবে? নবীজি (সঃ) বলেন, "না। তার প্রয়োজন নেই।"
এবং বনু কুরাইজার বিখ্যাত হাদিস, যেখানে নবী (সঃ) সাহাবীদের বলেন "আসরের নামাজ বনু কুরাইজায় গিয়ে আদায় করবে" যেখানে তিনি বুঝিয়েছিলেন যে সময় নষ্ট না করে এখুনি রওনা হও। মাঝপথে একদল সাহাবী দেখেন আসরের ওয়াক্ত প্রায় শেষ হতে চলেছে। তাঁরা বলেন রাস্তাতেই নামাজ আদায় করবেন। তাঁদেরই একাংশ বলে উঠেন, "না। নবীর (সঃ) নির্দেশ, যাই ঘটুক না কেন, আসরের নামাজ বনু কুরায়জায় গিয়ে আদায় করতে হবে। নামাজ কাজা হলে হোক।"
"কাজা হলে হোক মানে? নামাজ সঠিক সময়ে আদায় করা আল্লাহর নির্দেশ। তোমরা বলতে চাও, নবী আল্লাহর চেয়ে বড় হয়ে গেছে? আস্তাগফিরুল্লাহ! অসম্ভব! আমরা সময় মতই আল্লাহর নির্দেশ পালন করবো।"
"আল্লাহর রাসূলের (সঃ) নির্দেশ অমান্য করাও কুফর। তিনি জেনে বুঝেই নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা তাঁর নির্দেশ অমান্য করবো না। আমরা ওখানে গিয়ে নামাজ পড়বো।"
দুই ভাগ হয়ে গেল। একভাগ অভিযান অব্যাহত রাখলেন। বনু কুরায়জায় গিয়ে ওয়াক্তের পরে আসর আদায় করলেন। আরেকদল সেখানে দ্রুত নামাজ আদায় করে তড়িৎ রওনা হলেন।
যখন বনু কুরায়জায় দুই দল পৌঁছে, তাঁরা নবীর (সঃ) কাছে সমস্যা তুলে ধরে কে সঠিক ছিল জানতে চান।
নবীর উত্তর ছিল, "দুই দলই সঠিক।"
খুবই গুরুত্বপূর্ণ হাদিস এগুলো। এই হাদিসগুলোর ইন্টারপ্রিটেশন যদি আমরা ঈদের চাঁদ দেখা বিষয়ক হাদিসে এপ্লাই করি, তাহলে আমার এলাকার আকাশ মেঘলা থাকলেও আমি যদি জানি আমার দেশের অমুক তমুক শহরে চাঁদ দেখা গেছে, বা পৃথিবীর মানচিত্রে এমন কোন দেশে চাঁদ দেখা গেছে যাদের ঈদ আমাদের একদিন আগে হয়ে থাকে, তাহলে আমি ধরে নিতে পারি আমার ঈদ পরেরদিন।
আবার আমি যদি ধরে নেই যে রাসূলের বাণীর উপরই আমল করবো, সৌদি কেন, পাশের দেশেও যদি চাঁদ দেখা যায়, এবং আমার দেশে না, তাহলেও সে ভুল না।
এই বিষয় নিয়ে গন্ডগোল পাকানোর কোন মানে নেই।
তবে হ্যা, সৌদি আরবে চাঁদ দেখা গেছে বিধায় বাংলাদেশে সৌদির সাথে একই দিনে ঈদ পালন পুরাই পাগলামি একটা কালচার। এইটা কোন অবস্থাতেই সঠিক না।
সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে মার্চ, ২০২৫ রাত ৯:৪৩