ম্যানেজম্যান্টের অন্যতম সফল সূত্র হস্তীভক্ষণ আমাদের বিদ্যুৎখাতে প্রয়োগ করা ভীষণ জরুরী। হস্তীকায় এ সেক্টরটি নিয়ে হিমসিম খাচ্ছে সরকার। আমাদের বিদ্যুৎখাত হস্তীভক্ষণের মতো ছোট ছোট করে ফেলা ছাড়া আর কোন পথ খোলা নাই।
কিভাবে করা যাবে সেটা ---
০১) প্রতিটি উপজেলায় একটি শিল্প পার্ক স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই শিল্প পার্কগুলোর জায়গার পরিমাণ নির্ধারণ করবে ওই উপজেলার জনপ্রতিনিধি, শিল্প-মালিক, ব্যবসায়ী ও জনগণ। গণশুনানির মাধ্যমে এই জায়গা নির্ধারণ করতে হবে।
০২) উপজেলাভিত্তিক শিল্প পার্কগুলো আপাতত কয়েকটি জেলায় করা যেতে পারে। যে সব জেলায় গার্মেন্টস শিল্প আছে, সে সব জেলায় উপজেলাভিত্তিক এসব শিল্প পার্ক এখনই স্থাপন করা সম্ভব। শহরের ভিতরে যে সব গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি আছে , এগুলো উপজেলা শিল্প পার্কে সরিয়ে নিতে হবে। অনেক আগেই সরকার গার্মেন্টগুলোকে শহরের বাইরে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এই সিদ্ধান্তটি কার্যকর করতে হবে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও চট্ট্রগ্রাম জেলায় আপাতত উপজেলা শিল্প পার্ক শুরু করা যেতে পারে।
০৩) বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সহ অন্যান্য গার্মেন্টভিত্তিক সংগঠনগুলোতে একত্রিত করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, তারা সরকারের সাথে নতুন শিল্প পার্ক ও বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপনে আর্থিক সহযোগিতা করবে। প্রতিটি ইউডির বিপরীতে বিজেএমইএ এবং বিকেএমইএ শিল্পপার্ক ও বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপনের জন্য একটি সারচার্জ নির্ধারণ করে দেবে। এই সারচার্জ আরোপের মাধ্যমে শিল্পপার্ক ও বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপনের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা হবে। তাছাড়া কোন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ইচ্ছা করলে এই খাতে যত খুশি টাকা বিনিয়োগও করতে পারবে। এই বিনিয়োগের বিপরীতে সে শিল্প পার্ক ও বিদ্যুৎ প্লান্টের মালিকানা লাভ ও ব্যবসা থেকে লাভ পাবে। এই টাকায় প্রতিটি উপজেলায় শিল্প পার্ক ও শিল্প পার্কে একটি করে পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করা হবে।
০৪) কালো টাকা প্রতি বছর সাদা করা হয়। কেবল শিল্প পার্ক ও বিদ্যুৎখাতে বিনিয়োগের শর্তে এসব টাকা সাদা করা যেতে পারে। এই টাকা উপজেলা শিল্প পার্ক স্থাপন ও বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপনে বিনিয়োগ করা হবে।
০৫) যে কোন ধনী ব্যক্তি এবং প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা এ সব শিল্প পার্ক ও বিদ্যুৎ প্লান্টে টাকা বিনিয়োগ করতে পারবে। টাকা বিনিয়োগ করার জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট শিল্প পার্ক কর্তৃপক্ষ পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিনিয়োগ আহবান করবে।
০৬) শিল্প পার্কগুলোতে স্থাপিত বিদ্যুৎ প্লান্ট থেকে কেবল শিল্প পার্কেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। শিল্প পার্কের কারখানাগুলো বাইরে থেকে বিদ্যুৎ নেবে না। এর ফলে সরকারের বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে।
০৭) উপজেলা শিল্প পার্কের বিদ্যুৎ প্লান্ট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পুরোপুরি বেসরকারী খাতের। ওই শিল্প পার্কের কারখানার মালিকরাই এ বিদ্যুৎ প্লান্টের মালিক। তাদের দ্বারা সৃষ্টি একটি কোম্পানী হিসেবে এই বিদ্যুৎ প্লান্ট পরিচালিত হবে। বলা বাহুল্য, এই বিদ্যুৎ প্লান্ট থেকে অর্জিত মুনাফা তাদেরই।
উপজেলাভিত্তিক হওয়ায় এসব শিল্প পার্ক সারা দেশে সুষম উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে, যা ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করবে এবং বদলে দেবে আমাদের দেশের রুগ্ন অর্থনৈতিক চেহারা। তাছাড়া এসব শিল্প পার্ক আবাসিক এলাকার বাইরে হওয়ায় পরিবেশ দূষণও কমবে।
এসব শিল্প পার্ক স্থাপনে আপতত গার্মেন্টস খাত টার্গেট হলেও পরবর্তী সময়ে যে কোন শিল্পখাত ভিত্তিক শিল্প পার্ক গড়ে এভাবে তাদের নিজস্ব বিদ্যুৎ প্লান্ট তৈরি করে দিলে বিদ্যুতের চাহিদা খুব ভালোভাবেই সামাল দেয়া যাবে। এ কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে, কেবল সরকারের পক্ষে এ খাতের চাহিদা পূরণ করা কখনই সম্ভব হবে না।
পুনশ্চ : অনেক ব্লগার ভাইদের পরামর্শ, সমালোচনা, মন্তব্য ও আমার কিছু চিন্তাভাবনার ফলে সামান্য কিছু মডিফিকেশন :
০১) উপজেলা পর্যায়ে শিল্প পার্ক করা অসম্ভব বলেছেন অনেকে। তাহলে জেলা পর্যায়ে করা হোক। তাও সব জেলায় এক সাথে না করে একটি একটি করে জেলায় করার পরিকল্পনা করাই ভাল। হাতি একবারে খাওয়া তো সম্ভব না। ধীরে ধীরেই খাওয়া হোক।
০২) জেলা পর্যায়ে শিল্প পার্ক করার ক্ষেত্রে যে সব জেলায় গার্মেন্টস বেশি আছে, সে সব জেলাকে বেছে নিতে হবে। যেমন, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রাম। ঢাকা জেলা থেকেই শুরু হোক। তারপর চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর।
০৩) বলা হচ্ছে এত ছোট পাওয়ার প্লান্ট করা হলে উৎপাদন খরচ বাড়বে। তাহলে ৪/৫টি জেলা মিলে একটি পাওয়ার প্লান্ট বসানো হোক। মোট কথা পাওয়ার প্লান্ট এমন আকারেই হোক, যে আকারে হলে উৎপাদন খরচ সবচেয়ে কম পড়ে।
০৪) ঢাকা শহর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হোক। ঢাকা শহরের আশে পাশে কোন খালি জায়গায় শিল্প পার্ক করা হোক। ঢাকা শহর থেকে গার্মেন্টসগুলো সরালে যে উপকার হবে ---
(ক) যানজট কমবে। গার্মেন্টস শ্রমিক ও গার্মেন্টেসের মাল পরিবহণের জন্য প্রচুর গাড়ি ব্যবহার করা হয়। সেগুলো আর ঢাকা শহরে থাকবে না। ফলে যানজট যে কমবে তা নিশ্চিত।
(খ) বিদ্যুতের চাহিদা কমবে। ফলে লোডশেডিং কমবে। হয়তো থাকবেই না।
(গ) লোডশেডিং এর জন্য পানির পাম্প বন্ধ থাকে। পানির পাম্প আর বন্ধ রাখতে হবে না। ফলে পানির সমস্যাও থাকবে না। তাছাড়া পানির চাহিদাও কমবে।
০৫) এক বার ভাবুন আমাদের দেশে ঢাকা ছাড়া বিভিন্ন জেলায় কর্মসংস্থানের অভাবের কথা। উত্তর বঙ্গের মঙ্গার অন্যতম কারণ কর্মসংস্থানের অভাব। কর্মসংস্থান না হওয়ার কারণ সেখানে শিল্প কারখানা না থাকা। কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুযোগ সুবিধার আশায় সারা দেশের মানুষ আজ ঢাকামুখী। এ ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমানোর একমাত্র উপায়, জেলায় জেলায় শিল্প কারখানা স্থাপন করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। নাগরিক সুযোগ সুবিধা ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে দেয়া। এ কারণে শিল্প কারখানা জেলায় জেলায় করতে হবে।
০৬) অনেকে বলেছেন, কেবল সরকারেরই দায়িত্ব। আমি অস্বীকার করি না। কিন্তু চিকিৎসা, শিক্ষা, সমাজ কল্যাণের মতো বিষয়ে যদি সরকারের বাইরে বেসরকারী খাত সম্পৃক্ত হতে পারে তবে বিদ্যুৎ খাত নয় কেন ? যারা বলছেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাবে, সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে, তাদের বলছি, এ শিল্প পার্কের বিদ্যুৎ সাধারণ মানুষ ব্যবহার করবেন না। যারা এ খাতে বিনিয়োগ করবেন, তারাই ব্যবহার করবেন। অর্থাৎ ক্রেতা ও বিক্রেতা একই ব্যক্তি হবেন। ফলে সাধারণ মানুষের উপর এই পাওয়ার প্লান্টের কারণে কোন অতিরিক্ত চাপ পড়বে না। কেননা সাধারণ মানুষ সরকারী বিদ্যুৎই ব্যবহার করবেন।
০৭) বেসরকারীভাবে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনে সরকার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন বলেছেন অনেকে। আমি কোথাও বলিনি, বেসরকারী খাতে উৎপাদিত এসব বিদ্যুৎ সরকারকে কিনতে হবে। বরং যারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, তারাই ব্যবহার করবে এই বিদ্যুৎ। ফলে সরকারের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নাই।
০৮) জেলায় জেলায় বিসিক শিল্প নগরীর বেহাল দশা নিয়ে কথা বলেছেন অনেকে। এ সব বেহাল দশার কারণগুলো কি কখনও খতিয়ে দেখা হয়েছে ? আমরা সবাই জানি, আমাদের সকল ভালো উদ্যোগ দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলায় শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। দুর্নীতি ও অব্যবস্থপনা আমাদের বিদ্যুৎখাতে চরমভাবেই আছে। খাম্বা আছে বিদ্যুৎ নাই বলে একটি ব্যাপার কেবল আমাদের দেশেই সম্ভব। সম্পূর্ণ সরকারী খাতে বলেই এ সব দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা সারা দেশকে ডুবিয়েছে। এসব দুর্নীতি বন্ধ করার পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলকভাবে বেসরকারী খাত পরিপুষ্ট করলে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা কমবে। বিদ্যুৎখাতের গ্রাহক সেবা বাড়বে।
একটি উদাহরণ দেই। পুরো মোবাইল ফোন ব্যবসাটা যদি কেবল সরকারী টেলিটকের হাতে থাকত, তবে আমরা কত জন মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারতাম ?
০৯) শিল্প পার্ক স্থাপন করার আরেকটি ভালো দিক আছে। সেটা হল শিল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধা। এখন শহরের ভিতরে যে যেখানে পারছে কম্পোজিট গার্মেন্টস বানাচ্ছে। এসব গার্মেন্টস থেকে ভয়াবহ সব কেমিক্যাল ছেড়ে দেয়া হচ্ছে ড্রেনে, খালে ও নদীতে । জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর এসব বর্জ্য বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানি ইতিমধ্যেই ব্যবহার অনুপযোগী করেছে। তাই এক জায়গায় এসব শিল্প কারখানা নিয়ে গেলে তাদের শিল্প বর্জ্য একটি বড় ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন করে শোধন করা যাবে। তাতে করে আমাদের পরিবেশ দূষণ হবে না।
১০) আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা বলে আমরা তো বহু আগে থেকেই আলাদা করে রেখেছিলাম। আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থে আমরা যদি যে কোন এলাকায় শিল্প কারখানা গড়ে তুলে বসবাসের শান্তি নষ্ট করি, তবে তার দায় কার ? আমাদেরই।
১১) এসব শিল্প পার্ক স্থাপনের জন্য এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ সকল ব্যবসায়ী সংগঠনের সাথে সরকারের আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারও একক সিদ্ধান্ত বা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে এ কাজ করা সম্ভব না।
আরেকটি কথা, অনেকে বিদ্যুৎ খাতে গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের এই বিনিয়োগ করার ধারণাটিকে ভয়াবহ ক্ষতিকর বলেছেন। তাদের প্রতি প্রশ্ন, তাহলে সরকার যে বিদ্যুৎ খাতের জন্য কোটি কোটি টাকা বিদেশী ঋণ নেয়, সেটা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত ? এই সব ঋণ নেয়ার কারণে আমরা তাদের কাছে সব সময় মাথা নুয়ে থাকি। তাদের প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোন উন্নয়ন করতে পারি না। বিদেশী ঋণের চেয়ে দেশি সম্মিলিত বিনিয়োগ কি বেশি ভালো নয় ?
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে এপ্রিল, ২০০৯ বিকাল ৫:৫১