বইমেলা থেকে পকেট ঝেড়েঝুড়ে খালি করে বইয়ের ব্যাগ কাঁধে করে হেঁটে হেঁটে টিএসসির দিকে যাচ্ছি। ঘড়িতে প্রায় পৌনে দুইটার মত বাজে। বিশেষ(!!) এক বন্ধুকে আগে থেকেই বলা ছিল, সাঈদীর রায় শোনা মাত্র আমাকে ফোন দিয়ে জানাতে। ঠিক এই সময়ে ফোনটা বেজে উঠল। পকেটে হাত দিতে দিতে মনের ভেতরে ঘুরপাক খেতে থাকে অনেক কিছু। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি যার ফোন করার সেই ফোন করেছে।
ফোন হাতে নিয়ে বললাম, হ্যালো ওসামা।
- তারিফ ভাই, ফাঁসি!
- আরে সাব্বাস!
- তুমি তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসো। প্রবলেম হইতে পারে। আজকে ডেটিং ফেটিং থাকলে বাদ দাও।
- আচ্ছা ঠিক আসে, আমি রওনা দিচ্ছি।
ফোনটা কেঁটে দিয়ে আশেপাশে তাকালাম। দেখি লোকজন চুপচাপ, হয়ত তেমন কেউ এখনো জানে না। ভাবলাম, সবাইকে ধরে ধরে বলি, ভাই, সাঈদীর ফাঁসি হইসে। তবে নিতান্ত গোবেচারা গোত্রীয় মানুষ হওয়ার কারণে এই "বিপ্লবী" কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকলাম। তার বদলে এক কাজ করা যায়। ভাবলাম, একবার শাহবাগটা একটু ঢুঁ মেরে আসি। দেখি ঐখানে কি হচ্ছে, লোকজন নিশ্চয় আনন্দ করছে, জিনিষটা দেখা দরকার! এই ভেবে হাঁটা ধরলাম শাহবাগের দিকে।ততক্ষণে লোকজন আস্তে আস্তে জানতে শুরু করেছে খবরটা। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল বোলিং করার সময় উইকেট ফেললে যেমন জোর গলায় উল্লাস শোনা যায়, এই রকম উল্লাস এখন চারপাশ দিয়ে থেমে থেমে আসছে। অনেককেই দেখলাম শাহবাগের মোড়ের দিকে যেতে। দুইটা ছেলেকে দেখলাম, রিক্সায় চড়ে স্লোগান দিতে দিতে যাচ্ছে। দুইজন মিলেও যে সফলভাবে স্লোগান দেয়া যায়, ব্যাপারটা আগে জানা ছিল না! একটা স্লোগান দুর থেকে শুনলাম, "দিয়েছি তো ফাঁসি, আরো দেব ফাঁসি!" স্লোগানটা পরিচিত আরেকটা স্লোগানকে নকল করে বানানো, শুনে হেসে ফেললাম।
শাহবাগে যেতে না যেতেই আরেক কাণ্ড। লোকজন দৌড়াদৌড়ি, লাফালাফি করছে। কেউ খুশিতে মিছিল বের করছে, কেউ ফুল, পানি, ডিসপোজেবল গ্লাসসহ হাতের কাছে যা পাচ্ছে সব উপরের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে। আমিও মজা দেখার জন্য রাস্তার উপরে ঘাপটি মেরে বসে পড়লাম। ইমরান সরকার ছোটখাট একটা ভাষণ দিয়ে বসল। সবাইকে উল্লাস করতে বলল, আইন শৃঙ্খলা মেনে চলতে বলল, এইসব যা যা বলে আরকি। তারপর একটা মিছিলের ঘোষণা দিয়ে তিনবার জয় বাংলা বলে ভাষণ শেষ করে দিল। মিছিলে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল, তবে তিনটার ভিতরে বাসায় ফিরতে হবে, তাই রিক্সা নেওয়ার জন্য উঠে পড়লাম। যেতে যেতে ভাবলাম, একটা ছোট পতাকা কিনে নিলে কেমন হয়। দশ টাকা দিয়ে মানচিত্র দেওয়া একটা পতাকা নিয়ে রিক্সায় উঠলাম।
রিক্সাওয়ালার মুখে আনন্দ দেখা যাচ্ছে। হরতালের ফাঁকা রাস্তায় সপাটে রিক্সা হাঁকাতে হাঁকাতে সে আমাকে বলে বসল, মামা, সাঈদীর নাকি ফাঁসি হইসে?আমি হেসে বললাম, হ্যাঁ মামা হইসে।
রিক্সাওয়ালা: রায়টা হইল কখন?
আমি: সেইটা তো জানি না, তবে একটু আগেই খবর পেলাম, দেড়টার দিকে বোধহয়।
- মামা, এই ফাঁসি কার্যকর হবে কবে?
- সেইটাও জানি না।
- আচ্ছা মামা ফাঁসি দিলে কি টিভিতে দেখাবে?
- নাহ, আমাদের দেশে তো টিভিতে এইসব দেখায় না।
- ও আচ্ছা, তা মামা, কাদের মোল্লার ফাঁসি হবে না?
- দেখা যাক, আবার বিচার করতে হবে, এরপর যদি দেয়।
- কাদের মোল্লা আর গোলাম আযমরে আগে ফাঁসি দেয়া উচিত কি বলেন।
- হাহা, আসলে ওদের বিচার পরে শুরু হইসে তো। আর সাঈদীও কিন্তু বড় রাজাকার!
- তা তো ঠিকই আসে।
আমার রিক্সাওয়ালা উত্তর বঙ্গের লোক, তার কথা শুনে বোঝা যাচ্ছে। একটু পর দেখি, মোবাইলে তার কাছে ফোন এসেছে, সে ফোন ধরে বলে উঠছে, "ভাই শুনসেন? সাঈদীর ফাঁসি হইসে।" কাঁটাবনের সামনের চৌরাস্তায় পুলিশ দাঁড়িয়ে পাহাড়া দিচ্ছে, রাস্তায় লোকজন আছে, তবে ঢাকার মানদণ্ডে এইদিকের এলাকাকে ফাঁকাই বলা যায়। সাইন্সল্যাবের সামনে রিক্সা থেকে নেমে চলে আসছিলাম, পিছনে ফিরে আবার রিক্সাওয়ালাকে বললাম, ভাল থাইকেন মামা। সে হেসে বলল, আআচ্ছা মামা! আমি দ্রুত পায়ে ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হয়ে বাসে উঠে বসলাম।
দশ টাকা দিয়ে কেনা পতাকাটার সদ্ব্যবহার করার জন্য সেটাকে বাসের জানালা দিয়ে বাইরে ধরে রাখলাম। তারপর সেটার দিকে তাকিয়ে থেকে নিজেই সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে থাকলাম। মিরপুর রোড বলতে গেলে প্রায় পুরোটাই ফাঁকা। এর মধ্যে দিয়ে আমার বাস মৃদু ঝড়ের বেগে এগিয়ে যাচ্ছে। সহযাত্রী দেখি উতসাহী হয়ে আমাকে বলছেন, সামনে দেখেন অনেক বিপদ আছে। আমি সম্মতি জানিয়ে হাসলাম আর দেখি কি হয় টাইপের কিছু একটা বললাম।
মনে মনে ভাবলাম, জয়টা একদিনে আসেনি, এবং আসেওনা। যুদ্ধও কখনো একবারে শেষ হয়ে যায় না।