শনিবারের বিধ্বংসী ভূমিকম্পে বিধস্ত হিমালয়কন্যা নেপাল। রিখটার স্কেলে ওই ভূকম্পনের তীব্রতা ছিল ৭ দশমিক ৮। আর এর ফলেই মৃত্যুর মিছিল যেন ছুঁয়েছে এভারেস্ট।
ভূকম্পনের কেন্দ্র লামজুং ও পোখরা থেকে দেশটির রাজধানী কাঠমান্ডু। মাত্র দেড় মিনিটের তাণ্ডব। আর তাতেই দেশজুড়ে ধ্বংসের করাল ছায়া। আক্ষরিক অর্থে নেপালে মাটির সাথে মিশে গেছে গ্রামের পর গ্রাম। মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ২২০০ ছাড়িয়েছে। প্রাণহানীর পাশাপাশি খোঁজ মিলছে না বহু মানুষের। সরকারী হিসেব অনুযায়ী নিঁখোজের সংখ্যা তিন হাজার। উদ্ধারকারীদের আশঙ্কা, এদের অধিকাংশই ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবনের শেষ ঘুমে শুয়ে আছে।
গুরুতর জখম হয়েছেন চার হাজারেরও বেশি মানুষ। কাঠমান্ডুতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে একাধিক ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট, বাড়ি, হোটেল।
কাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ওই ভূমিকম্পের পর আরও প্রায় ২৪ দফা ভূকম্পন হয়েছে নেপালে। আজ রোববার দুপুরেও রিখটার স্কেলে ৬ দশমিক ৭ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী নেপালে এখনও ভূকম্পন পরবর্তী আফটার শক চলছে। এর ফলে বার বার কেঁপে উঠছে পুরো নেপাল।
টাইম অনলাইন ও ইণ্ডিয়ান এক্সপ্রেস ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞের বরাতে জানিয়েছে, জাপানের হিরোশিমায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে পরমাণু বোমাটি বিস্ফোরিত হয়েছিল, তাতে ছিল প্রায় দশ হাজার টিএনটি (শক্তির একক) শক্তি। আর শনিবার রিখটার স্কেলে ৭.৮ মাত্রার নেপালের ভূমিকম্পে শক্তি বিচ্ছুরণের পরিমাণ দশ কোটি টনেরও বেশি টিএনটির শক্তি। ২০০৪ সালে সুনামি ও ৯.১ মাত্রার ভূমিকম্পটি প্রায় একই পরিমাণ শক্তির ছিল।
কোথায় এবং কেন এই প্রবল ভূমিকম্প?
নেপালে গতকাল শনিবারের প্রবল ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল কাঠমান্ডুর ৭০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে নির্জন পাহাড়ি এলাকা লামজুং । ওই এলাকাতেই বছরে পঁয়তাল্লিশ মিলিমিটার হারে, কাছাকাছি এগিয়ে আসছে ভূগর্ভস্থ ভারতীয় ও ইউরেশিয়া প্লেট। আর এই দুটি প্লেটের সংঘর্ষেই মাটির ১১ কিলোমিটার গভীরে বিধ্বংসী এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের বরাতে টাইমস অব ইণ্ডিয়া জানায়, হিমালয় পর্বতমালা তৈরি হওয়ার সময় থেকেই ভারতীয় প্লেট এবং ইউরেশিয় প্লেটের মধ্যে কে কার নীচে যাবে এটা নিয়ে তুমুল প্রতিযোগিতা চলছে ।
বিশেষজ্ঞরা আরো জানান, নেপাল, চীন ও ভারতের সীমান্তে ইউরেশিয় প্লেটের নীচে ভারতীয় প্লেটটি পিছলে ঢুকে যায়। তখন এই দুই প্লেটের সংঘাতে কেঁপে ওঠে নেপালসহ বাংলাদেশ, ভারত ও চীন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) একটি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বিশেষজ্ঞরা আগে থেকেই জানতেন বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ ওই ওই এলাকায় ইউরেশিয় প্লেটের নীচে আস্তে আস্তে ঢুকে যাচ্ছে ভারতীয় প্লেট। এর ফলে করণীয় ঠিক করতে গত সপ্তাহেই বিশ্বের তাবৎ ভূমিকম্প ও উদ্ধার বিশেষজ্ঞরা কাঠমাণ্ডুতে বৈঠকও করেছিলেন।
শতকের ভয়াবহতম ভূমিকম্প
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন ভূপৃষ্ঠের গভীরে ভারতীয় ও ইউরেশীয় এই দুই দুই প্লেটের সংঘাতে গত এক শতাব্দীতে ওই এলাকায় রিখটার স্কেলে ছয় বা তার বেশি তীব্রতার ভূমিকম্প হয়েছে মোট চারবার। আর এর সবগুলোই হয়েছে গতকালের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের আড়াইশো কিলোমিটার এলাকার মধ্যে। তবে ওই ভূমিকম্পগুলোর পরিধি কখনোই এত বিস্তৃত ছিল না।
নেপালে সর্বশেষ ১৯৮৮ সালের আগস্ট মাসে বিপুল প্রাণঘাতী ভূমিকম্প হয়। রিখটার স্কেলে ওই ভূমিকম্পের তীব্রতা ছিল ছয় দশমিক নয়। এতে প্রাণহানি হয়েছিল পনেরোশ জনের। আর ওই দুটি প্লেটের সংযোগ এলাকায় সবচেয়ে বেশি তীব্রতার ভূমিকম্প হয়েছিল ১৯৩৪ সালে। রিখটার স্কেলে আট তীব্রতার ওই ভূমিকম্পে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কাঠমান্ডু। ভূমিকম্পের ফলে নেপাল-বিহার সীমান্তে মৃত্যু হয়েছিল প্রায় এগারো হাজার মানুষের।
ধেয়ে আসতে পারে আরও ভূকম্পন
ইউএসজিএসের একটি গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী হিমালয় পর্বতমালা এবং সমুদ্রে বিভিন্ন প্লেটের মধ্যে প্রতিনিয়ত রেষারেষি চলছে। এর ফলে প্লেটের ফাটলের নিকতবর্তী যে কোনও স্থানে যে কোনও সময় ভূমিকম্প হতে পারে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গবেষকদের বরাতে জানিয়েছে, এই দুটি প্লেটের অন্তর্ভূক্ত এলাকায় আগামী দুই মাসে এর চেয়েও শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে।
তবে টাইমস অব ইণ্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভূমিকম্পের আশু পূর্বাভাস ব্যাতিক্রম কিছু ক্ষেত্রেই কেবল দেওয়া সম্ভব। পৃথিবীর অভ্যন্তরের এই প্লেটগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী বিভিন্ন বিচ্যুতির খবর দেওয়া যায়। তবে কবে, কোথায়, কত মাত্রার ভূমিকম্প হবে, তা কেউ বলতে পারে না। কারণ এই চ্যুতিগুলো যেমন দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে, আবার তেমনি ঘটতে পারে হঠাৎ করেই।