নিরাপত্তাজনিত কারণে ইন্টারনেটে বিনামুল্যে কথা বলা ও বার্তা আদানপ্রদানের জনপ্রিয় সেবা ভাইবার ও ট্যাঙ্গো বন্ধ করেছে সরকার। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) দেশের সব মোবাইল ফোন অপারেটর ও আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) অপারেটরদের চিঠি পাঠিয়ে এই দুটি সেবা বন্ধের নির্দেশ দেয়। ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে এসব ওভার দ্য টপ (ওটিটি) সেবার মাধ্যমে কথা বলা এবং ভিডিও কল করা যায়।
বিটিআরসি সচিব সরোয়ার আলম বিভিন্ন গণমাধ্যমকে আজ রোববার এ খবর নিশ্চিত করেছেন। বিভিন্ন দূতাবাসে চিঠি পাঠিয়েও জানানো হয়েছে ভাইবার ও ট্যঙ্গো সার্ভিস রোববার দুপুর ১২ টা সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। পরে সোমবার দুপুর ১২ টা পর্যন্ত এই সময়সীমা বাড়ানো হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বে ফ্রি মেসেঞ্জার ও ভয়েস এর মাধ্যম হিসেবে ভাইবার ও ট্যাঙ্গো তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। এটি মুলত ইন্টারনেটে যুক্ত স্মার্টফোন থেকে বিনামুল্যে কথা বলা আর এসএমএস করার অ্যাপ্লিকেশনস বা অ্যাপস।
শনিবার মধ্যরাত থেকে বাংলাদেশের ব্যবহারকারীরা হঠাৎ করেই ভাইবার ব্যবহার করতে পারছিলেন না। এর আগেও ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে সরকার জনপ্রিয় ভিডিও শেয়ারিং সাইট ইউটিউব বন্ধ করেছিল।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ সালাহউদ্দিন বিভিন্ন গণমাধ্যমকে খবরটির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছেন, সাময়িক সময়ের জন্য এ সেবা বন্ধ করা হয়েছে। ‘সফটওয়্যার সম্পর্কিত কারিগরি পরীক্ষা’ শেষ হলেই সেবা চালু করা হবে।
তবে একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে এই সেবা বন্ধ করেছে সরকার। এই সেবাগুলোর উপর বিভিন্ন যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার কারণে সরকারের কোনও নজরদারি নেই। ফলে এ মাধ্যমটি ব্যবহার করে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের অপরাধ সংঘটনের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। ইতোমধ্যেই সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হাতে এ বিষয়ে কিছু তথ্য-প্রমাণও এসে পৌঁছেছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে এনক্রিপটেড ফরম্যাট বলে বেশিরভাগ ওটিটি মাধ্যমে কথা এবং ভিডিও কলের কোনও রেকর্ড থাকে না। এই সুযোগে সন্ত্রাসী ও জঙ্গি সংগঠনগুলোর সদস্যরা এই মাধ্যম ব্যবহার করে দেশে-বিদেশে যোগাযোগ করছে বলে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা মনে করছে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ওটিটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহারকারীর পক্ষে থাকায় অপরাধীরা এ মাধ্যমটিকে তাদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম করে ফেলতে পারে। তাদের ধারণা, সন্ত্রাসী, জঙ্গি সংগঠনগুলোতে তথ্যপ্রযুক্তিতে বিশেষজ্ঞ রয়েছে। তারা এ বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিককালে দেশে সংঘটিত কয়েকটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে তারা অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন যে তারা যোগাযোগের ক্ষেত্রে উচ্চ প্রযুক্তি (ওটিটি সেবা) ব্যবহার করে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে এ দেশের জঙ্গি এবং সন্ত্রাসীরা যোগাযোগ রক্ষা করছে এসব মাধ্যমে। দেশের ভেতরে তাদের অপতৎপরতা, কার্যক্রম বিস্তার, সদস্য সংগ্রহ, অর্থায়ন প্রভৃতি বিষয় স্কাইপে, ভাইবার, ট্যাঙ্গো ও হ্যাংআউট সেবা ব্যবহার করে তারা নির্দেশ দিচ্ছে এবং সেই মতে কাজ হচ্ছে বলে সূত্রগুলোর দাবি।
টেলিজিওগ্রাফি নামের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে, টেলিফোন ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ প্রতিদিন কমছে। সেখানে জায়গা নিচ্ছে স্কাইপি। ২০১২ সালের তুলনায় ২০১৩ সালে স্কাইপির মাধ্যমে কথা বলার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৬ শতাংশ। আর ২০১৪ সালে সেই হার বেড়েছে ৫২ শতাংশ। সেখানে টেলিফোন ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ১৭ শতাংশ কমেছে।