
সকাল থেকে জানালার পাশে দাড়িয়ে আকাশ দেখছি। মেঘলা আকাশ। মনটা ভারী হয়ে আছে আকাশের মতো। জানালার ফাঁক দিয়ে থিরথির বাতাস এসে গায়ে লাগছে। সাদা মেঘগুলোকে নগ্ন নারীর একপায়ে লেপ্টে থাকা মোজার মতো দেখাচ্ছে। মাঝে মাঝে রুপালী রোদের ছটা এসে মেঘ তাড়ানো খেলা খেলছে। মেঘলা আকাশ আমার অনেক অনেক প্রিয়। মিডিয়া প্লেয়ারে 'বৃষ্টি' লিখে সার্চ দিতেই বেশ কিছু বৃষ্টির গান পেয়ে গেলাম। গানে গানে বৃষ্টিকে ডাকলে মন্দ হয় না! বৃষ্টি চাই, ঝুম বৃষ্টি। আকাশ দেখতে দেখতে, আমার হঠাৎ মনে হলো- প্রকৃতির কাছে কোন কিছু চাইতে নেই, কারণ প্রকৃতি মানুষের কোন ইচ্ছাই অপূর্ণ রাখে না!
'আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে, মনে পড়লো তোমায়'
ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ গেয়ে চলে। ওস্তাদ বৃষ্টি গান দিয়ে আমাকে তার কাছে নিয়ে যায়। সে; যে বৃষ্টি হতে চেয়েছিলো। বৃষ্টি দিনে ওর সাথে পরিচয় হয়েছিলো বলে আমি ওকে 'বৃষ্টি মেয়ে' নাম দিয়েছিলাম।
#
যেদিন ওর সাথে পরিচয় হয়েছিল, সেদিন অন্যান্য দিনের মতো আমি আমার ছোট্ট রুমটাতে ক্যালকুলাসের বইয়ের পাতায় চোখ বুলাচ্ছিলাম। আমি যে রুমে থাকি সেটা ছাদের উপর, চিলেকোঠায়। দরজা দিয়ে বের হলেই প্রশস্ত ছাদ।
বাইরে সারাদিনভর ঝিরঝির বৃষ্টি। বৃষ্টি আমার কখনো প্রিয় ছিলো না। আমার নাগরিক রুচির দরজায় বৃষ্টির কোন আবেদন, ইসথেটিক্স ছিল না। বৃষ্টি দেখে আমি বরং যারপরনাই বিরক্ত হতাম। বৃষ্টির মাত্রা ধীরে ধিরে বেড়েই চলেছে। আওয়াজহীন আলোর মতো ফ্ল্যাশ দেখে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে কিনা দেখতে বাইরে তাকালাম।
হঠাৎ খেয়াল করে দেখি আকাশ থেকে একটা পরী নেমে এসেছে ছাদে, দুহাত পাখির ডানার মতো মেলে দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে। আমি অবাক নয়নে পরীটাকে দেখছি, চোখে চোখে রাখছি যদি না আবার উড়াল দেয়! ক্যালকুলাস ততক্ষণে একপাশে সরিয়ে রাখি। ড্রয়ার খুলে এক থাবাতে আকিবুকির ডায়েরী আর পেন্সিল নিয়ে বসে পড়ি। আঁকাআঁকিতে আরাম করতে পারছিলাম না দেখে জানালার পর্দাটা আস্তে করে সরিয়ে দিই। একি! আমি যা দেখছি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। কুইন অব সেবা, হার রয়েল হাইনেস বিলকিস হয়তো আঠারো উনিশ বছর বয়সে এই মেয়ের মতোই ছিল। পদ্মীনি গোত্রের এই তরুণীকে দেখে যে তরুণ কিনা কোয়ান্টাম ফিজিক্স পড়ছে, আমি নিশ্চিত সে ও কবি হতে চাইবে, বৃষ্টি কবি।
রবীন্দ্রনাথ ঠিক এই ধরনের কোন মেয়েকে দেখে হয়তো লিখেছিলেন- ' মুখের পানে চাহিনু অনিমেষে, বাজিল বুকে সুখের মতো ব্যথা!'
একসময় সে আমাকে ঠিকই দেখে ফেলে। কিন্তু চমকাল না। সহজ ভঙ্গীতে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর আমাকে অবাক করে দিয়ে সে হাতের ইশারায় আমাকে ডাকছে। স্তম্ভিত আমি কিছু বুঝে উঠার আগে সে কাছে এসে তার কোমল হাত বাড়িয়ে বলে, এসো বৃষ্টিতে ভিজি! এমন সুন্দরীর আহবানে বৃষ্টি কেন আগুনে ঝাপ দিতেও সুবোধ বালকের মতো রাজি হয়ে যেতাম।
তারপর আমরা দুজন বৃষ্টিতে ভিজছি, চুপচাপ। দমকা হাওয়ায় আমাদের সব কথাগুলো হারিয়ে গেলো, নিভে গেলো সব উদ্যম। সমস্ত ইন্দ্রিয় মেলে ধ'রে ভিজছি আমরা, ভিজছে আমাদের সনাতনি মন। ভিজতে ভিজতে আমরা প্রকাশিত হতে থাকি ক্রমশ।
# #
ওর সাথে পরিচয়ের পর বেশ কিছুদিন কেটে যায়। এরপর হঠাৎ একদিন সকালে ঘুমের মধ্যেই শুনছি কে যেন মধুক্ষরা কন্ঠে ডাকছে, এ্যই ছেলে উঠো, এতো ঘুমুচ্ছো কেন?
আমি প্রায়ই দরজা জানালা খোলা রেখে ঘুমাই। এটার একটা সুবিধা আছে, ঘরে বাতাস খেলে, নিজেকে প্রকৃতির অংশ বলে মনে হয়, খাঁচার ভিতরে ঘুমুচ্ছি এরকম মনে হয় না।
আমি ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখি কুইন অব সেবা বিলকিস বানু দাড়িয়ে আছে। পরনে কাঁচা হলুদ রঙের সবুজ পাড় শাড়ী, খোঁপায় পলাশ ফুল কপালে টিপ।
কিছু জিগেস করার আগেই বিলকিস বানু বলে- 'আজ বসন্তের প্রথম দিন, আপনি কি আমাকে আজকের দিনটা ধার দিবেন?'
ইয়া খোদা, আমি তাকে বলি,' আপনাকে আমি কতোদিন ধরে খুঁজছি।'
সে হাসতে হাসতে বলে, বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলতে হবে না। আপনি আমার সাথে ঘুরতে যাবেন কিনা বলেন?
সে তার হাসিটুকুন গুঁড়ো গুঁড়ো করে, যেন কাচের চুড়ির ভাঙা টুকরা, ছড়িয়ে দিলো আমার ছোট্ট রুমটায়।
যাবো মানে, আপনার মতো সুন্দরীর সাথে ঘুরতে যাওয়াটা তো আমার ভাগ্যের ব্যাপার!
আমরা দুজন বসন্ত উৎসব দেখতে বের হয়ে গেলাম। আমি জিগেস করি আপনার পরিকল্পনাটা কি জানতে পারি?
সে বলে, রিক্সা করে সারাদিন উদ্দেশ্যহীন ঘুরাঘুরি। সমস্যা নেই তো?
আমার কোন কিছুতেই অনাগ্রহ নেই।
আচ্ছা আমি আপনার সাথে যদি একটা ছবি তুলি, আপনি কি রাগ করবেন?
রাগ করবো না, আমি বরং আনন্দ পাবো।
আমরা সবাই বড় একটা পরিকল্পনার অংশ। সেই বড় পরিকল্পনা যিনি করেন তাকে আমরা দেখতে পাই না। কেউ তাঁকে বলে নিয়তি, কেউ বলে প্রকৃতি, আবার কেউ কেউ বলে বিধাতা। এই মেয়েটার সাথে আমার দেখা হবে সেটাও আমার ধারণা কোন বড় পরিকল্পনার ক্ষদ্র অংশ!
সারাদিন অনেক ঘুরোঘুরি করে আমরা ক্লান্ত প্রায়। বাসায় ফিরছি, তখন আকাশে হলুদ মেঘ, সূর্য ডিমের বড়ো কুসুমের মতো আকার নিয়ে পশ্চিম দিগন্তে ছুঁয়ে আছে। আমি তাকে জিগেস করেই ফেলি, আচ্ছা আপনি আমাকে নিয়ে ঘুরতে বেরোলেন কেন?
আমার দার্শনিক মানুষ খুব পছন্দ, আপনার চেয়ে বড়ো দার্শনিক এখন পর্যন্ত আমার চোখে পড়ে নি তাই। হিঃ হিঃ হিঃ
বাংলাদেশের বেশিরভাগ ভিক্ষুক শ্রেণী মানুষই কিন্তু দার্শনিক জানেন তো! হাঃ হাঃ হাঃ
'একটা আন্তরিক কথা দিয়ে তিনটা শীতকাল উষ্ণ করা যায়'।
জাপানিসরা বিশ্বাস করে।
আপনার সাথে কথা বলে আমার এমনটা মনে হয়। আচ্ছা আপনি কি হাত দেখতে পারেন?
আমি হাত দেখার আমি কিছুই জানি না। তারপর ও সিরিয়াস ভাব নিয়ে তার বাড়িয়ে দেয়া কোমল হাত আলতো করে আমার হাতে তুলে নিই। তার হাত ধরে ঝিম মেরে বসে থাকি।
সে বিরক্ত হয়ে বলে কি হয়েছে?
আপনার হেডলাইন মাউন্ট অব লুনার দিকে বেঁকে গেছে। যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে সেখানে একটা ক্রস।
এটার মানে কী?
সিরিয়াস কিছু না। এটার মানে আপনার জীবনটা অনেক সুন্দর হবে।
সে আমার কথায় কনভিন্সড হয়েছে বলে মনে হলো না। তাকে ব্যথিত দেখালো খুব, আর বিষণ্ন হলে মন খারাপ করলে তাকে কি যে মায়াবী দেখায়! প্রাচীন লেখক বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন- 'রুপসী ও বিষাদময়ী সমার্থক এবং যে-নারী চুম্বনযোগ্য তার চোখ অশ্রুতে মলিন'।
# # #
সেদিন বাসায় এসে মনের প্রশ্নবোধক চিহ্নটা ঝেড়ে ফেলতে কাউন্ট লুইস হ্যামনের বিখ্যাত বই 'দি ল্যাঙুয়েজ অব দি হ্যান্ড' ঘেঁটে দেখি- হেডলাইন যদি মাউন্ট অব লুনার দিকে বেঁকে যায় এবং সেখানে স্টার থাকে তাহলে সেটা ভয়াবহ ব্যাপার। সুইসাইডের চিহ্ন!
# # # #
কোন কিছুর জন্য অপেক্ষা শুরু করলেই সময় স্লো হয়ে যায়। টাইম ডাইলেশন হয়। আমি যার জন্য অপেক্ষা করছি তার আসার কোন খবর নেই। আকাশ ভেঙে জোছনা নেমেছে আজ, গৃহত্যাগী জোছনা। চারিদিকে থৈ থৈ করছে, মনে হচ্ছে আজ শহরটাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। আজ আমাদের একসাথে জোছনা দেখার কথা ছিলো। আমি আজ সারারাত জেগে আছি, জোছনা দেখছি একা! রাত শেষে একটা সময় ভোর হয়। আলো হয়ে গেছে চারিদিক। তবুও সে আসে নি।
# # # # #
'জীবন মৃত্যুর মাঝখানে যারা থাকে তারা অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে। আমার কোন কথায় তুমি রাগ করো না। আমাকে ভুলে যেও। আমাকে দেখতে যদি মন কাঁদে, বৃষ্টিকে ছুঁয়ে দিও।'
সে বৃষ্টি হতে চেয়েছিলো। ঝুম বৃষ্টি।
আমার কাছে তার দেয়া একটা ছোট্ট ডায়েরী ছিল। সে আমাকে খুলতে বারণ করেছে। শুধু কোনদিন তার কোন খোঁজ না পেলে তবেই খোলা যাবে। অনেকদিন কেটে গেলে আমি তার ডায়েরীতে লেখা একেকটা পৃষ্টা পড়ছি।
তুমিই তো বলেছিলে, প্রতিটি মানুষের পাঁচটি নীলপদ্ম আছে। সে তার সবচে প্রিয় মানুষটাকে নীলপদ্ম দেয়। একটা না দুটা সে তার ইচ্ছে। আমি তোমাকে আমার সবগুলো নীলপদ্ম দিয়েছি। আমি তোমাকে ভালবেসেছি তাই বলে এতো বড় অপরাধ আমি করতে পারব না। আমি HIV-positive। একটা HIV-positive মেয়েকে তুমি বিয়ে করবে বলো?
# # # # #
সকাল থেকে জানালার পাশে দাড়িয়ে আকাশ দেখছি। মেঘলা আকাশ। মনটা ভারী হয়ে আছে আকাশের মতো। জানালার ফাঁক দিয়ে থিরথির বাতাস এসে গায়ে লাগছে। আজ আমাদের বৃষ্টি বার্ষিকী। বৃষ্টি চাই ঝুম বৃষ্টি।
আমি বৃষ্টি দেখেছি, বৃষ্টির ছবি এঁকেছি। অন্জনের গানে গানে বৃষ্টিকে ডাকছি।
প্রতিক্ষিত বৃষ্টি এলো, আকাশ ভেঙ্গে। ঝম ঝম ঝরছে। গলে যাওয়া মেঘের সাথে মিশে স্মৃতিরা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ছে আজ। ভালোবাসার অপরাধে আজ আমি বৃষ্টিবন্দি। বৃষ্টির মাতম যদি বৃষ্টিমেয়ের হদিস দেয় এই আশায় বৃষ্টিতে ঝাপিয়ে পড়ি। দমকা বাতাসে আমার সব কথা নিভিয়ে দিয়ে গেলো নিমিষেই! এখন কিচ্ছু করার নেই, চুপচাপ বৃষ্টিতে ভিজছি। তার ঝরে পরা অনুভব করছি, সে; যে বৃষ্টি হতে চেয়েছিল!
এই সামান্য লেখাটি আমার অসম্ভব প্রিয় এবং অসাধারণ একজন মানুষ 'আবদুর রাজ্জাক শিপন' ভাইকে উৎসর্গ করছি।